অনাথ শিশুদের জীবন গড়ছে ‘বাংলা হোপ’

0
20

আসিফুর রহমান সাগর ও শাহাদুল ইসলাম সাজু: মেনুকা দেবশর্মাকে ছেড়ে যখন তার স্বামী চলে গেল তখন তার কোলে দেড় মাসের এলাইজা। কোনো আয় নেই। দিনাজপুরের এক অজপাড়া গাঁয়ে এই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে দিন কাটবে সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি। এই সময় কোনো আত্মীয়স্বজন নয়, পাড়া-প্রতিবেশী নয়, সহায় হয়ে পাশে দাঁড়াল ‘বাংলা হোপ’।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড ওয়েড ও বেভারলি ওয়েড দম্পতি গড়ে তুলেছেন এই অনাথ আশ্রমটি। নিজেদের সহায় সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি সব কিছু বিক্রি করে সেই টাকায় জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার ও পাঁচবিবি উপজেলা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে আটাপুর ইউনিয়নের নিভৃত হাজরাপুর গ্রামে তারা গড়ে তোলেন ‘বাংলা হোপ’ এতিমখানা। এতিম কিংবা অসহায় পরিবারের যে কোনো শিশুকে আশ্রয় দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু খাওয়া পড়া নয়, শিক্ষার ব্যবস্থাও করছে তারা। প্রাইমারি ও মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা সেখানেই। এরপর কলেজ পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। একবার কোনো অসহায় শিশু তাদের কাছে এলে তার জীবনে আর কখনোই অন্ধকার নামতে দেয় না তারা। আশা জ্বালিয়ে রাখে, জীবনকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা যুগিয়ে চলছে ‘বাংলা হোপ’।


এলাইজা মনোজ দেবশর্মার বয়স এখন ছয় মাস। এলাইজাসহ তার মায়েরও আশ্রয় মেলে বাংলা হোপ এতিমখানায়। অনাথ মেয়ের লালনপালন করার পাশাপাশি দুস্থ নারী হিসাবে কাজ করে টাকাও আয় করতে পারছেন তিনি। এলাইজার মতো এখানে আশ্রয় পেয়েছে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী মেরি এলা মজুমদার, তৃতীয় শ্রেণির পোল সরকার, দশম শ্রেণির আঁখি হেব্রম ও উচ্চমাধ্যমিকের কিম্বালী বালা। এরা সবাই জানাল তাদের সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার গল্প। বলল, এখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি থাকা-খাওয়া, ঘুমানো, খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে।


‘বাংলা হোপ’ এর নির্বাহী পরিচালক সুচিত্রা সরেন বলেন, এতিম ও অসহায় শিশুদের লালনপালন করা ও লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। এখানে ১৬৩ জন অনাথ শিশুর লালনপালন ছাড়াও বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও দিনাজপুরসহ ছয়টি জেলায় আরো ১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৮৮ জন শিশু লেখাপড়া করছে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এসব শিশুর বই-খাতা-কলম, পোশাক, টিফিন ভাতা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে থাকে ‘বাংলা হোপ’।


বাংলাদেশে ডেভিড ওয়েড দম্পতি
ইচ্ছা থাকলে কোনো বাধাই যে কাজে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে না এটা ডেভিড ও বেভারলি ওয়েডের চেয়ে ভালো আর কে বলতে পারে। মানুষের প্রতি ভালোবাসার টান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে টেনে এনেছিল তাকে। যে বয়সে মানুষ নিজের জীবন গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকে সেই সময়ে তারা নতুন করে আরো একবার শুরু করেছিলেন কাজ। দেখেছিলেন নতুন স্বপ্ন। মানুষের জন্য কাজ করার প্রত্যাশায় ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের আর্থিক সহযোগিতায় বাংলাদেশে চালু করেন ‘বাংলা হোপ’ প্রতিষ্ঠানটি। এখন এতিম, দুস্থ ও অসহায় শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ‘বাংলা হোপ’। শুধু অনাথ শিশুরা নয় এখানে রয়েছেন দুস্থ নারীরাও।


১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে বেড়ানোর জন্য আসেন দম্পতি ডেভিড ওয়েড ও বেভারলি ওয়েড। এ সময় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর সময় কিছু শিশু ও নারীর অসহায়ত্বের চিত্র চোখে পড়ে তাদের। পরবর্তী সময়ে তারা কয়েক দফায় বাংলাদেশে আসেন এবং ঢাকা কেন্দ্রিক কিছু অসহায় শিশুকে লেখাপড়াসহ থাকা-খাওয়ায় সহযোগিতা করেন। এক পর্যায়ে এসব শিশু ও নারীদের জন্য কিছু করা দরকার এরকম চিন্তা থেকে কর্মজীবন শেষে ঐ দম্পতি বাংলাদেশে চলে আসেন।


আশা জাগানিয়া ‘বাংলা হোপ’
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায় এতিম, অনাথ ও অসহায় শিশুদের লালনপালনের পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন করা ও দুস্থ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য। প্রায় ১৪ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা ‘বাংলা হোপ’। এতিমখানার চার একর জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিনোদন কেন্দ্র, চিলড্রেন্স হোমসহ বিভিন্ন ভবন। যেখানে শূন্য থেকে বিভিন্ন বয়সের ১৬৩ জন অনাথ ও এতিম শিশু বসবাস করছে। এদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা রয়েছে বাংলা হোপ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে তারা নিয়মিত লেখাপড়া করছে। এখানে শিশুদের জন্য রয়েছে ২৪ ঘণ্টার রুটিন। সেভাবেই চলে তাদের লেখাপড়া, খাওয়া দাওয়া, ঘুমানো, খেলাধুলা ও বিনোদনসহ নানা কার্যক্রম। এতিম ও অনাথ শিশুদের বাইরে স্টাফদের ছেলেমেয়েরাও এখানে লেখাপড়া করে। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮৪ জন। এর মধ্যে প্রাথমিক স্কুলে ৬৩ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯৭ জন ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ২৪ জন ছেলেমেয়ে। এখানে কলেজের অনুমোদন না থাকায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে অনাথ ও এতিম ছেলেমেয়েরা ক্যাম্পাসের বাইরের কলেজে লেখাপড়া করলেও থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় খরচ বহন করে ‘বাংলা হোপ’। এতিমখানার অধিকাংশ শিশুই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের হলেও এই প্রতিষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত। ছোট শিশুদের লালনপালনের জন্য এখানে কাজ করেন ১৮জন দুস্থ নারী। যাদের থাকা ও খাওয়া ফ্রি আবার কাজের জন্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। এতিমখানার শিশুদের শিক্ষাদানের জন্য ১৪ জন শিক্ষক রয়েছেন বলে জানান, অধ্যক্ষ সনজয় কিসকু। এছাড়া এতিমখানার নানা কাজের জন্য রয়েছে ৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।


এতিম শিশুদের দেখাশুনা করার দায়িত্বপালনকারী দুলালী, মিনজী, বন্দনা বৈরাগী, শান্তি কিসকু ও নমিতার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, ছোট ছোট শিশুদের মায়ের মমতা ও আদর-স্নেহ দিয়ে বড় করার চেষ্টা করেন। শিশুদের আদর-যত্ন করার দায়িত্ব পেয়ে নিজেদের ভালো লাগার কথা জানান এই দুস্থ নারীরা। সেই সঙ্গে নিজেদের জীবনও যে বদলে গেছে সেজন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।

জীবনের জন্য জীবন
প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরশিপ পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকা পনুয়েল বাড়ৈ বলেন, বিদেশি দাতাদের আর্থিক সহযোগিতায় এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। এখানে চাকরি করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সামান্য বেতনে কাজ করেন। এটিও অনেকটা স্বেচ্ছাশ্রমের মতো। এতিম ও অসহায় শিশুদের জীবনবৃত্তান্ত তুলে ধরে ওয়েবসাইটে দাতাদের অবহিত করা হয়। বিদেশি দাতারা অনেকেই টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে, কেউ নানাভাবে শ্রমের বিনিময়ে টাকা জমিয়ে এই অনাথ শিশুদের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। দাতাদের মধ্যে কেউ ধনাঢ্য নন। একজন অসহায় লোক বোঝেন আরেক জন অসহায়ের দুঃখ-কষ্ট। সেই থেকে সহূদয়বান বিদেশি দাতাগণ ওয়েবসাইটে সবকিছু জেনে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আর্থিক সহযোগিতা করেন। পরবর্তী সময়ে শিশুদের প্রোগ্রেস সম্পর্কেও দাতাদের অবহিত করা হয় বলে জানান স্পন্সরশিপ পরিচালক।


প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সুচিত্রা সরেন বলেন, অসহায় শিশুরা সমাজের বোঝা না হয়ে ‘বাংলা হোপ’-এর দেখানো পথ অনুসরণ করে নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে সমাজের উপকারে নিজের জীবন বিলিয়ে দেবে এমন প্রত্যাশা নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে। লেখাপড়া শেষ করে অনেকেই যোগ্যতা অনুযায়ী এখানেই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন বলেও তিনি জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here