অবহেলিত বিজ্ঞানী লিসেমাইটনার

0
135

বিপ্লব হোসাইন

“নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে সত্য ও নিরপেক্ষতার কাছে পৌঁছে দেয় বিজ্ঞান; বিস্ময়ের সাথে শেখায় বাস্তবকে গ্রহণ করতে, স্বীকৃতি দিতে। একইসাথে, একজন প্রকৃত বিজ্ঞানীর মনে তার চারপাশের জগতের স্বাভাবিক গঠন এনে দিতে পারে এক গভীর সম্ভ্রম আর আনন্দের ছোঁয়া।”

উপরোক্ত কথাটি যিনি বলেছিলেন, তিনিই আমাদের গল্পের মূল চরিত্র। নাম তার লিসেমাইটনার। তিনি যেমন বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের সব থেকে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের একজন, ঠিক তেমনি সবচেয়ে অবহেলিত ব্যক্তিদেরও একজন। পদার্থবিজ্ঞানের সেরা কয়েকটি আবিষ্কার যা পুরো পৃথিবীর চেহারাই পাল্টে দিয়েছিল, তার মধ্যে একটি হলো নিউক্লিয়ার বিজ্ঞান। নিউক্লিয়ার ফিশান এবং ফিউশান তথা নিউক্লিয়ার বিভাজন আবিষ্কারের পর শিল্পক্ষেত্রেও একপ্রকার বিপ্লব এসেছে। আর সেই শিল্পবিপ্লবের পিছনের গল্পে যারা রয়েছেন, লিসেমাইটনার তাদের মধ্যে অন্যতম। শুধু তাই নয়, লিসেমাইটনার যে শতাব্দীতে জন্ম নিয়েছেন, সেই একই শতাব্দীতে জন্ম নিয়েছিলেন পদার্থবিদ্যাকে পাল্টে দেওয়া আইনস্টাইন, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক-সহ আরও কয়েকজন মহারথী। তবে সালের হিসেবে মাইটনারের জন্ম হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগেই। ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কমাইটনার সম্পর্কে খানিকটা মজা করে বলেছিলেন,

[বিশেষ দ্রষ্টব্য- ১৮৭৯ সালের ব্যাপারটা ভালো করে বুঝতে পারবেন, যদি এটা জানা থাকে যে ঙঃঃড় ঐধযহ আর গধী ঠড়হ খঁব এর মতো নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী পদার্থবিদেরাও একই সালে জন্মেছিলেন। অটো হানের নামটা মনে রাখুন, পরে ওনাকে নিয়ে অনেক কথা আছে।]

বিংশ শতাব্দীর নারী বিজ্ঞানীদের মধ্যে মেরি ক্যুরির পরই উচ্চারিত হয় লিসেমাইটনারের নাম। তিনি ১৯৩৮ সালে প্রথম নিউক্লিয়ার ফিশান (একটি বড়ো পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ভেঙ্গে ছোটো ছোটো দুই বা ততোধিক নিউক্লিয়াস তৈরি করা হয়) বিক্রিয়া আবিষ্কার করেন। দেখিয়ে দেন, নিউক্লিয়ার বিভাজনই পারমাণবিক শক্তির উৎস। ১৮৭৮ সালের ৭ নভেম্বর অস্ট্রিয়ার একটি বনেদি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মাইটনার। ১৯০১ সালে তিনি ভিয়েনার একটি বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯০৫ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করা দ্বিতীয় নারী ছিলেন মাইটনার। গোটা জার্মানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করা দ্বিতীয় নারী মাইটনার আর প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী নারী হলেন মেরি ক্যুরি।

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে লিসেমাইটনারের শিক্ষক বোল্ট্জম্যান (বিখ্যাত পদার্থবিদ খঁফরিম ইড়ষঃুসধহ) আত্মহত্যা করলে মাইটনারের মানসিক অবস্থা ভীষণ ভেঙ্গে পড়ে। তিনি অস্ট্রিয়া ছেড়ে চলে যান জার্মানের বার্লিনে। বার্লিনেই মূলত পদার্থবিদ্যার উপর তার বিশেষ গবেষণা শুরু হয় এবং এখানেই তার সাথে দেখা মেলে আর এক বিখ্যাত পদার্থবিদ অটো হানের (যার কথা এর আগেও বলেছি, ওনারও জন্ম ১৮৭৯ সালে)। পরবর্তীতে তারা দুজন একই সাথে ‘এমিল ফিশার রাসায়নিক ইনস্টিটিউট’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ত্রিশ বছর কাজ করেন। এই ত্রিশ বছরই ছিল মাইটনারের পুরো গবেষণা জীবনের সেরা মাইলফলক। মাইলফলক বললাম এ কারণে যে, এখানে গবেষণা করতে করতে অটো হান এবং মাইটনার যৌথভাবে উপহার দেন বিজ্ঞান জগতের বড়ো দুটি আবিষ্কার। ১৯০৮ সালে তারা ‘একটিনিয়াম’ নামক একটি তেজষ্ক্রিয় মৌলের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং ১৯১৮ সালে আবিষ্কার করেন দ্বিতীয় মৌল, যার নাম প্রোট্যাক্টিনিয়াম।

তবে মাইটনারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান হলো ১৯৩৮ সালে নিউক্লিয়ার ফিশন-এর আবিষ্কার। এর জন্য তার নাম আজও মুখে মুখে ফেরে। তবে এখানেও তাকে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে, কারণ সময়টা ছিল চরম পুরুষতান্ত্রিকতার। বৈষম্যের শিকার আমরা হতে দেখি মেরি কুরি কিংবা গার্টি কোরিকেও। মেরি কুরির মতো মাইটনারকেও দীর্ঘ সময় কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করতে হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে কিছু পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছিল, যেটা অটো হানের তুলনায় অতি সামান্য। শুধুমাত্র নারী হবার কারণেই তাকে চিরকাল নানা বৈষম্য এবং লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছে। ‘নারী’ তকমার কাছে ‘আবিষ্কার’ ব্যাপারটা ছিল অতি অগণ্য বিষয়। বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায়, এমিল-ফিশার রাসায়নিক ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা এমিল ফিশার মানসিকভাবে বিজ্ঞান জগতে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সহাবস্থানের বিষয়টিতে অভ্যস্ত না হলেও যথেষ্ট উদারতা প্রদর্শন করেছেন। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের ছাত্রদের গবেষণাগারে প্রবেশের অধিকার তার ছিল না। অবিবাহিত এবং সুন্দরী হওয়ায় কর্তৃপক্ষের ধারণা ছিল তার উপস্থিতি ছাত্রদের গবেষণায় ব্যাঘাত ঘটাবে। প্রকৃতপক্ষে এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চিরাচরিত মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছু না।

এডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হলে অনেকের মতো মাইটনারও বিপাকে পরে যান। তিনি একদিকে নারী, অন্যদিকে ইহুদি। হিটলারের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে যখন আইনস্টাইন জার্মানি ছেড়ে চলে গেলেন, তখন উভয় সংকটে পড়ে কিছুদিন জার্মানিতে ছিলেন মাইটনার। কারণ এখানেই যে তার পরম সঙ্গী, তার আবিষ্কারের সাথে জড়িত নানা যন্ত্রপাতি, পরম প্রিয় গবেষণাগার! কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও টিকে থাকতে পারেননি। জার্মান ছেড়ে যেতে হয়েছে তাকেও। জার্মান ছেড়ে স্টকহোমে যাবার পর মাইটনার বলেছিলেন, “দেশে থাকার সিদ্ধান্ত শুধু ভুলই ছিল না, ছিল একটি বোকামি।” কেননা দেশে থাকার সিদ্ধান্তের কারণে তাকে অনেক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছিল। স্টকহোমে চলে যাবার পর মাইটনার অধ্যাপনায় নিযুক্ত থাকার পাশাপাশি স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরমাণু বিষয়ে গবেষণায় নিয়োজিত হন। এখানেই ১৯৩৯ সালে তিনি তার ভ্রাতুষ্পুত্র ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী অটো রবার্ট ফ্রিশের (ঙঃঃড় জড়নবৎঃ ঋৎরংপয) সাথে মিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রই পরমাণুর বিভাজন বিষয়ে প্রথমবারের মতো তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা প্রদানে সক্ষম হয়েছিল। মিটনার এবং ফ্রিশ পরমাণুর এই বিভাজন প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছিলেন নিউক্লীয় বিভাজন। নিউক্লিয়ার ফিশান আবিষ্কারের পর লিসেমাইটনার বলেছিলেন, “নিউক্লিয়ার ফিশান আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত কেউ ভাবেনি নিউক্লিয়ার ফিশানের কথা।”

১৯৩৮ সালে লিসে, অটো ও তার দল ইউরেনিয়াম পরমাণুর সাথে নিউট্রন কণার কৃত্রিম সংঘর্ষ ঘটিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন। পরীক্ষার ফলস্বরূপ বেরিয়াম ও ক্রিপটন উৎপন্ন করতে সক্ষম হন। কিন্তু যখন দেখলেন এতে মোট ভর আশ্চর্যজনকভাবে কমে যায় এবং একই সাথে উৎপাদিত হয় বিপুল পরিমাণ শক্তি, তখন কিছুটা বিস্মিত হন। এই রহস্যের কারণ খুঁজতে অটোর প্রয়োজন পড়ল লিসের প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং পদার্থবিজ্ঞানের জ্ঞান। সে সময়ে নিজের ভাগ্নে অটোফ্রিশের সাথে কর্মরত লিসে তৎক্ষণাৎ এই ঘটনার পেছনের কারণ খোঁজা শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পুরো ব্যাপারটা তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। একরকম ভেলকির মতো উধাও হয়ে যাওয়া ভর রূপান্তরিত হয়েছে শক্তিতে- যা কিনা সেই ১৯০৫ সালে করা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের ভবিষ্যদ্বাণী! তার ঊ=সপক্ষ্ম সমীকরণের পরীক্ষার ফল! এটি আজ ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ নামে পরিচিত। নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন সময় তথা ১৯৪২ সালে ম্যানহাটন নামক একটি প্রকল্প চালু হয়। এই প্রকল্পের কাজ হলো যুদ্ধাস্ত্র মানে বোমা আবিষ্কার করা। এ বিষয়ে লিসে মাইটনারের কাছে প্রস্তাবনা দেওয়া হলে তিনি বলেন, “বোমা নিয়ে আমার কিছু করার নেই।”
বিজ্ঞানকে পর পর এতগুলো অমূল্য সম্পদ উপহার দেওয়া এ বিজ্ঞানী চিরকালই শুধু অবহেলা পেয়েছেন। একদিকে ইহুদি হবার কারণে নানা ধরনের নির্যাতন, অন্যদিকে নারী হবার কারণে নানা ধরনের লাঞ্চনা-বঞ্চনা। বিজ্ঞান বিশ্বকে লিসে মাইটনার যা দিয়েছেন তা কখনো অস্বীকার করার নয়। অথচ এরকম মূল্যবান আবিষ্কারের পরও নোবেল কমিটি তাকে না দিয়ে শুধুমাত্র অটো হানকে নোবেল দিল। অবশ্য হান এবং লিসে দুইজনকে যৌথভাবে নোবেল দেবার ব্যাপারে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্ল্যাঙ্কসহ বড়ো বড়ো বিজ্ঞানীরা। কিন্তু ঐ যে সাম্প্রদায়িক প্রভাব! সেটা থেকে নোবেল কমিটিও মুক্ত নয়। নোবেল পুরষ্কারের ইতিহাসে এই বড়ো ভুলকে চিহ্নিত করা হয় ‘নোবেল মিসটেক’ হিসেবে। নারী না হয়ে জন্মগ্রহণ করলে হয়তো অটো হানের পরিবর্তে নোবেলটা তাকেই আগে দেওয়া হত। কেননা বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে তিনি নারী (ছোটো/অবহেলিত) হলেও আবিষ্কারের মাপকাঠিতে তিনি অনেক বড়ো। তাই তো লিসে মাইটনার সম্পর্কে আইনস্টাইন বলেছিলেন, “লিসে মাইটনার হলেন আমাদের জার্মানির মেরি ক্যুরি।”

নোবেল না পেলেও মাইটনার পেয়েছেন আন্তর্জাতিক মানের অসংখ্য পুরষ্কার। ১৯৯৭ সালে সালে তাকে সম্মান জানিয়ে তার নামানুসারে পর্যায় সারণির মৌল ১০৯-এর নাম দেওয়া হয় মাইটনারিয়াম (গঃ)। ম্যানহাটন প্রকল্পের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেবার পর মানবতাবাদী এই বিজ্ঞানী বেশ কিছু বছর যুদ্ধ এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার বিপক্ষে এবং বিজ্ঞানের পক্ষে প্রচার করে কাটিয়েছেন তার দিন। অবশেষে অবসর নেবার কিছুদিন পর ১৯৬৮ সালে কেমব্রিজে অনন্তকালের পথে পাড়ি জমান অবহেলিত এই মহীয়সী। আজও হৃদয়ে দাগ কাটে তার সমাধি প্রস্তরে খোদাই করা তার ভাগ্নের সেই কথাটি, “লিসা মাইটনার: এক পদার্থবিজ্ঞানী যিনি কখনো তাঁর মনুষ্যত্বকে হারাননি।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here