অর্থনীতিতে নারীর অবদান বাড়ছে

0
39

নারী ডেস্ক: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যঅনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০ সালে যেখানে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ছিল ১৬ দশমিক ২ লাখ, সেখানে ২০১৬-১৭ সালে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৬ লাখ। ১৯৭৪ সালে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এটি শ্রমবাজারে পুরুষ শ্রমিকের হার বৃদ্ধির তুলনায় বেশি।


পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী বিগত বছরগুলোতে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে শ্রমবাজারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ। ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে, গ্রামীণ নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার শহরের নারীর তুলনায় বেশি। আবার পোশাক খাত ছাড়াও এখন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, যোগাযোগ খাত, রিয়েল স্টেট সেবা, টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংকিং, ইনসিওরেন্স খাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট (এসিডি)-এর জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট ৪২ লাখ ২০ হাজার পোশাক শ্রমিকের মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৪ লাখ ৯৮ হাজার। পোশাক খাতের পরই প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি নারী শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে মোট ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী প্রবাসে কাজ করতে গেছেন। নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়েও প্রতি বছর এই নারীরা সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যাচ্ছেন।


কৃষি খাতেও নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখ করার মতো। কৃষি তথ্য সার্ভিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, দেশে মোট কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় কৃষিকাজে নিয়োজিত। নারী শ্রমশক্তির ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়োজিত কৃষিকাজে। আশার কথা হচ্ছে, প্রবাসী আয় প্রাপ্তির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। আর এ অবস্থান নিয়ে যেতে দেশের নারী শ্রমিকেরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন। অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারাও। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) সূত্রে, বর্তমানে দেশে ৩ লাখ মানুষ অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আর এদের অর্ধেকই নারী ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা। এই উদোক্তারা নিজের পণ্য বিক্রির মাধ্যমে মাসে সর্বনিম্ন ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।


দেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাড়তি শ্রমশক্তির মধ্যে ৫০ লাখই নারী। কিন্তু এর পরও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এখনো দেশে নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য রয়েছে। নারীর জন্য এখনো নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কর্মজীবী মায়ের সন্তানের জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা খুবই সীমিত। এ ছাড়া অপর্যাপ্ত টয়লেটের সুবিধা এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করায় কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ধরে রাখা কষ্টকর। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো দেশে ৮৫ শতাংশ নারীর নিজের ইচ্ছায় উপার্জনের স্বাধীনতা নেই। আর যারা আয় করেন, তাদের প্রায় ২৪ শতাংশেরই নিজের আয়ের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।


বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। এই পোশাক খাত নিয়েই বিশ্ববাজারে একটি ভালো স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। হিসাব বলছে, শ্রমশক্তিতে বাংলাদেশে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩২ শতাংশ, আর ভারতে এই হার মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পেছনে নারীর এই অগ্রগতি মুখ্য ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, রাজনৈতিকভাবে সরকারের বড় দর্শন কাজ করছে যে, নারীকে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে সুযোগ করে দেওয়া। সচিব, সিনিয়র সচিবসহ সরকারের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এখন নারী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন-পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীতেও উচ্চপদে নারীর অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, এখন পুরুষ সমকক্ষ কর্মক্ষেত্রগুলোতে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সরকার যদি রাজনৈতিক এই অবস্থা ধরে রাখে এবং বেসরকারি খাতকে যদি জেন্ডার সমতাবিষয়ক নীতিগত সিদ্ধান্ত পালনে বাধ্য করে, তাহলে পুরুষ সমকক্ষ কাজেও সমভাবে দেখা যাবে নারীর অংশগ্রহণ। বিগত এক দশকে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে বাংলাদেশ ক্রমেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here