অর্থনীতিতে ৩ কারণে সংকট

0
30

অর্থনৈতিক ডেস্ক: দিন যত যাচ্ছে, অর্থনৈতিক সংকট বাড়ছে। বেশিরভাগই প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে দিন দিন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। এতে তাদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে শিল্পউৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা তো দূরের কথা পুরোনোরাই টিকে থাকতে পারছে না। বর্তমানে যেসব ব্যবসায়ীর ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা আছে, তাদের অবস্থা ভালো।
এছাড়া বাকি অধিকাংশের অবস্থা খারাপ। আগামীতে কর্মসংস্থানে এর প্রভাব পড়বে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মোটা দাগে তিন কারণে এই সংকট। প্রথমত, দীর্ঘদিন থেকে রাষ্ট্রের খাতের সংস্কারের অভাব, করোনার আঘাত এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাব।


বর্তমানে পরিস্থিতি যে জায়গায় গেছে, তাতে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ হলেও ২০২৪ সালের আগে এ সংকট কাটবেনা। এ অবস্থার উত্তরণে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন জরুরি। এক্ষেত্রে সবার আগে সমস্যার কথা স্বীকার করতে হবে। এরপর সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য শুক্রবার বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। কারও জন্য তা আতঙ্কের। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থাকলে অর্থনীতির দুর্বলতা আরও ঘনীভূত হয়, সবল দিকগুলো দুর্বল হতে থাকে।
তিনি বলেন, আমার বিবেচনায় অর্থনীতিতে চার ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে। এগুলো হলো-ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ না হওয়া, কর আহরণে দুর্বলতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বৈষম্য। ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থনীতির নীতি বাস্তবায়ন অনেকটাই আস্থা ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। তাই আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনাই অর্থনীতির স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হওয়া উচিত।


তিনি আরও বলেন, আমরা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। কেউ কেউ মনে করেন, বৈদেশিক চাপের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এটি আংশিক সত্য। বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতি আমাদের চাপে ফেলেছে। দেশের অর্থনীতির সক্ষমতা থাকলে এ চাপ মোকাবিলা করা যেত। যেমন বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৯ শতাংশের মতো। এটি যদি ১৪-১৫ শতাংশ হতো, তাহলে সরকারের আরও বেশি খরচ করার সামর্থ্য থাকত, যা অর্থনীতিকে এক ধরনের স্বস্তি দিত।
তার মতে, ২ থেকে ৩ বছর মেয়াদি ‘অন্তর্র্বতীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা’ জরুরি। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। এগুলো হলো-সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে সমর্থন দেওয়া, বিপন্ন মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। এই নীতি সমঝোতা প্রণয়ন ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। এজন্য সরকারকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে হবে। যেমন মন্ত্রিপরিষদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি উলে¬খযোগ্য। আলোচনা হতে পারে সরকারের নিজেদের রাজনৈতিক সহযোগী, এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট শ্রেণি-পেশার সঙ্গেও এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা দরকার।
তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা হলে দুই ধরনের উপকার। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থার কাছে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে দরকষাকষি সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উত্তাপপূর্ণ সময়ে অংশগ্রহণমূলক নীতি সমঝোতা অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেবে।


জানা গেছে, বাংলাদেশের জাতীয় মোট ৪টি খাত। সেবাখাত, কৃষি, শিল্প এবং রেমিট্যান্স। বর্তমানে তিনটি খাতেই নেতিবাচক অবস্থা। আগামীতে কৃষি উৎপাদনও কমতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১৩-১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে চাপে রয়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। রাজস্ব আয়ে ঘাটতির পাশাপাশি নতুন করে যোগ হয়েছে বিশ্ব সংকট। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স আয়ে ঘাটতির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে।
টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বৃদ্ধিসহ নানাকারণে অসহনীয় হয়ে উঠছে জিনিসপত্রের দাম। এরপর দেশে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়েছে। যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। মনে হচ্ছে, আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও বেসামাল হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানুষের আয় বাড়ানো এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে করোনা উত্তরণের কথা বলা হলেও অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকগুলো এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। রপ্তানিছাড়া অর্থনীতির আর কোনো সূচকই ভালো নেই। মূল্যস্ফীতি এখন ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। রপ্তানি বাড়লেও বাণিজ্য ঘাটতি এখন গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমে যাওয়ায় চলতি হিসাবের যে ঘাটতি, তাও গত ৫০ বছরে দেখা যায়নি। এর প্রভাবে শুধু চলতি বছরেই টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে ১০ শতাংশের বেশি।
সব মিলিয়ে অর্থনীতি চাপ, অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মধ্যে আছে। আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি এখন বিশ্বেরই সবচেয়ে বড় সমস্যা। বাংলাদেশ বিপদে পড়েছে আয় নিয়েও। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় সবচেয়ে কম রাজস্ব আদায় করে, এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশ প্রায়সবার নিচে। ফলে নিজস্ব সম্পদ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। এজন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ৫ বিলিয়ন ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।


সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শুক্রবার বলেন, অর্থনীতি যে অবস্থায় রয়েছে, তার বড় অংশই বহির্বিশ্বের কারণে। প্রথমত, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে আমাদের রপ্তানি কমে যাচ্ছে। আগামীতে তা আরও কমতে পারে প্রবাসী আয়ও (রেমিট্যান্স)। অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপের মুখে। টাকার বিপরীতে ডলারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশে জিনিসপত্রের দামে প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্যদিকে আরেকটি আশঙ্কার কারণ রয়েছে। এমনিতেই জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। এরপর বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। এছাড়া বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। এসব কারণেএবার কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে আমনের উৎপাদন কমবে, যা আগামীতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এ কারণে সরকার বেসরকারিখাতে চাল আমদানির সুযোগ দিয়েছে। আমার পরামর্শ হলো এই পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এক্ষেত্রে মোকাবিলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানোর মাধ্যমে সবার কাছে খাদ্য পৌঁছাতে হবে। এক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে যে দুর্নীতির কথা আসছে, তা কঠোরভাবে রোধ করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here