অলী-আল্লাহ্গণের অসিলায় বিপদ-আপদ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব

8
601

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মিয়া
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বিশ্বজাহান সৃষ্টি করে সকল সৃষ্টিকে প্রতিপালন করে চলেছেন। তাছাড়া বিশ্বের কোটি কোটি সৃষ্টি জীবের আহারের ব্যবস্থাও তিনি করছেন। সাগরের গভীরে নিমজ্জিত থাকা অতিকায় বিশিষ্ট তিমি, যার এক গ্রাসে কয়েক মণ খাবারের প্রয়োজন হয়, সেই বিশাল তিমিকেও আল্লাহ্ খাবার দান করেন। আবার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি মশা, যার আহারের জন্য একটি শষ্য দানাকেও ভাগ করতে হয়। সে খাবারও মহান আল্লাহ্ এ ক্ষুদ্র প্রাণীকে দিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয়, গভীর সাগরের তলদেশে যেখানে কোনো মানুষের পক্ষে খাবার সরবরাহ করা সম্ভব নয়, আবার গভীর অরণ্যে যেখানে মানুষ প্রবেশের ক্ষমতাও রাখে না; সেই দুর্গম স্থানে অতি বিশাল অথবা অতি ক্ষুদ্র, যে প্রাণীই বাস করে, এদের সবার প্রতিপালন এবং আহারের ব্যবস্থা মহান ক্ষমতার অধিকারী স্বয়ং আল্লাহ্ই করে থাকেন। আবার মানুষসহ সকল প্রাণীই যখন মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠে, সেই কঠিন মুহূর্তে যিনি মাতৃগর্ভে তাঁর সৃষ্টিকে খাবার দিয়ে দেহকে বর্ধিত করেন, তিনিই হলেন আমাদের পরম স্রষ্টা মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন। এই মহান স্রষ্টার প্রশংসা করা আমাদের মত নগণ্য মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে আলো ও বায়ু দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

সকাল বেলা যে সূর্যটি তেজ ও দীপ্তির সাথে উদিত হয় এবং সারাদিন আমাদেরকে আলো দিয়ে সজীব রাখে, অপরদিকে সারাদিনব্যাপী যে বাতাস আমাদেরকে অক্সিজেন দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস দ্বারা বাঁচিয়ে রাখেন, এর কোনো বিনিময় মূল্য আমাদের পক্ষে পরিশোধ করা সম্ভব কী? আমাদের বাসায় একটি বাল্ব জ্বালালে অথবা একটি ফ্যান চালালে, তার জন্য অনেক টাকা বিল পরিশোধ করতে হয়। আমাদের স্রষ্টা মহান আল্লাহ্ যদি বিচার দিবসে আমাদেরকে বলেন- একটি বাল্ব ও একটি ফ্যান চালানোর কারণে মাসে তোমাকে ২ শত অথবা আড়াইশত টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। তাহলে তুমি ৬০ বছরের জীবনে আমার দেওয়া যে আলো অথবা বাতাস ব্যবহার করেছ, তার বিল আজ আমাকে পরিশোধ করো।

আমাদের মতো নগণ্য মানুষের পক্ষে কিন্তু মহান আল্লাহর এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেওয়ার সাধ্য নেই। তাহলে আমরা নগণ্য মানুষ কি করে আল্লাহর দান ও দয়াকে ভুলে যেতে পারি? আর কি করে এই মানুষ জগতের বুকে গর্ব ও অহংকার করতে পারে? বরং আল্লাহর এই দয়ার কথা স্মরণ করে মাথা নত করে আল্লাহর কদম মোবারকে সেজদায় লুটিয়ে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা এ বিষয় সম্পর্কে মোটেই অবগত নই বিধায়, তা করছি না। তবে এ বিষয়ে আমাদেরকে অবহিত করে থাকেন আল্লাহর বন্ধু অলী-আল্লাহ্গণ।

সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে নিজের ঐশ্বর্য অথবা শিক্ষা দীক্ষার জন্য গর্ব অহংকার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা মানুষ হলো সৃষ্টি, আর আল্লাহ্ হলেন স্রষ্টা। কোনো সৃষ্টির পক্ষে গর্ব-অহংকার করা চরম অন্যায়। কারণ অহংকার হচ্ছে আল্লাহর ভূষণ বা পোশাক। যে আল্লাহর ভূষণ নিজে ধারণ করতে চায়, অর্থাৎ অহংকারী হয়, আল্লাহ্ তাকে ধ্বংস করে দেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ ফরমান- “ওয়ালা তামশী ফিল আরদে ইল্লা মারাহা।” অর্থাৎ ‘সাবধান! তোমরা দর্পভরে রাস্তায় চলাফেরা করবে না’। প্রতিটি মানুষেরই উচিৎ, মহান আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি পূর্ণ আনুগত্যশীল হওয়া। কেননা এই মানুষের পক্ষে আল্লাহর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার সামান্যতম শক্তিও নেই। পূর্ববর্তী যুগের ইতিহাসই আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বাদশাহ্ নমরুদ ও বাদশাহ ফেরাউনের মত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ পর্যন্ত আল্লাহর একটা ক্ষুদ্র সৃষ্টির কাছে পরাস্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে অলী-আল্লাহ্গণ আল্লাহর একত্ববাদ এবং হযরত রাসুল (সা.)-এর আদর্শ মানুষের কাছে প্রচার করে থাকেন বিধায়, তাঁরা আল্লাহর দয়ায় মানুষের কাছে সম্মানিত হয়ে থাকেন। যে সকল মানুষ অলী-আল্লাহর প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাঁদের অনুসরণ করে, মহান আল্লাহ্ তাদেরকে অশেষ দয়া করে থাকেন। অপরদিকে যারা অলী-আল্লাহর সাথে দুশমনি করে, তাদেরকে আল্লাহ্ শাস্তি প্রদান করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত অলী-আল্লাহ্ হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি

আল্লাহর মহান বন্ধু হযরত শেখ আহমদ সেরহিন্দি মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.) সমকালীন যুগের একজন শ্রেষ্ঠ অলী-আল্লাহ্ ছিলেন। তাঁর আমলে আবু তাহের লাহোরি নামে একজন বড় শরিয়তপন্থী আলেম ছিলেন। তার ওয়াজ শুনলে মানুষ দারুণভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়তো। এতে উক্ত আলেমের প্রভাব আরো বেড়ে যায়। তিনি নিজে আত্মঅহংকারী হয়ে পড়েন। তার ধারণা, যেহেতু তিনি হাদিস কিতাব পড়ে বড়ো একজন আলেম হয়েছেন, তার সমকক্ষ আর কেউ হতে পারে না।

আবু তাহের লাহোরি জানতেন যে, সেই যুগে মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর নাম একজন বড়ো অলী-আল্লাহ্ হিসেবে গোটা ভারতবর্ষে সর্বজন বিদিত। সকল শ্রেণির মানুষই এই মহান অলী-আল্লাহর প্রতি অধিক শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু শরিয়তি আলেম মাওলানা আবু তাহের লাহোরি মহান অলী-আল্লাহ্ হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর দারুণ সমালোচনা করতো এবং ভণ্ড ও কাফের বলে ফতোয়া পর্যন্ত দিত। এভাবে দীর্ঘ দিন চলে গেল। মোজাদ্দেদ হুজুরের কাছে যখন তাঁর ভক্তগণ এসে মাওলানা আবু তাহের লাহোরির ঐ ফতোয়াবাজী ও কুৎসার কথা বলতো, আল্লাহর মহান বন্ধু হযরত শেখ আহমদ সেরহিন্দি (রহ.) শুনে কষ্ট পেতেন বটে, কিন্তু তিনি কখনো আল্লাহর কাছে মাওলানা লাহোরির শাস্তি ও অকল্যাণ কামনা করেননি। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ্ বলেন- “মান আদা লি অলীয়্যান ফাক্বদ আজানতুহু বিল হারবি।” অর্থাৎ ‘আমার অলীদের বিরুদ্ধে যারা দুশমনি রাখে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমি আহবান জানাচ্ছি।’ আল্লাহর মহান অলী হযরত শেখ আহমদ সেরহিন্দ মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর বিরোধীতা করার কারণে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আবু তাহের লাহোরির উপরে অসন্তুষ্ট হলেন। কিছু দিনের মধ্যেই মাওলানা আবু তাহের একটা কঠিন সমস্যায় পড়লেন। তা সমাধানের জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে যখন তিনি ব্যর্থ হলেন, তখন আবু তাহের লাহোরি মানসিকভাবেও ভেঙ্গে পড়লেন। ফলে ওয়াজ নসিহতেও আর তেমন একটা সাড়া জাগাতে পারছেন না।

এমতাবস্থায় হযরত মোজাদ্দেদ হুজুরের একজন ভক্ত, মাওলানা আবু তাহেরের সাথে যার সম্পর্ক ছিল, তিনি বললেন, মাওলানা সাহেব! হযরত শেখ আহমদ সেরহিন্দি (রহ.) হুজুর একজন উচ্চস্তরের অলী-আল্লাহ্। তাঁর সান্নিধ্যে গেলে আপনার সমস্যা দূর হয়ে যেতে পারে। একথায় আশ্বস্ত হয়ে মাওলানা আবু তাহের লাহোরি আল্লাহর মহান অলী হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর দরবার সেরহিন্দ শরীফে গমন করলেন। আল্লাহর মহান অলী, মোজাদ্দেদ হুজুর মাওলানা আবু তাহেরকে দেখে সবকিছু বুঝতে পারলেন। অলী-আল্লাহ্গণ যেহেতু আল্লাহর বন্ধু, সেহেতু তাঁরা হন মানব দরদী, তাই আবু তাহেরকে কাছে পেয়ে একটুও তার সমালোচনা করলেন না। বরং আল্লাহর বিধান ও দয়া সম্পর্কে আবু তাহেরের সাথে কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন। তাঁর মধুমাখা কথা এবং মানব প্রেম দেখে মাওলানা আবু তাহের লাহোরি অবিভূত হয়ে পড়লেন। পরবর্তীতে তিনি মোজাদ্দেদ হুজুরের দিক্ষা গ্রহণ করলেন। তিনি আবু তাহেরকে তাঁর দরবারে কিছুদিন থেকে তরিকার আমল করতে বললেন। মাওলানা আবু তাহের লাহোরি সেরহিন্দ দরবার শরীফে থেকে গেলেন এবং ইবাদত বন্দেগিসহ তরিকার ওয়াজিফা আমল করতে লাগলেন।

আল্লাহর মহান অলীর এত্তেহাদি তাওয়াজ্জোহর ফলে আবু তাহের লাহোরির অন্তরচক্ষু খুলে যায়। তিনি দেখতে পান তার কপালে কাফের লেখা রয়েছে। এটা দেখে তিনি যেমনি ভয় পেয়ে গেলেন, তেমনি লজ্জিতও হলেন। তিনি ভাবলেন, যার বিরুদ্ধে এত সমালোচনা করলাম এবং যাকে কাফের ফতোয়া দিলাম, আসলে আমিইতো কাফের, আর আমি যেহেতু কপালের লেখা দেখতে পাচ্ছি, তাহলে নিঃসন্দেহে মোজাদ্দেদ হুজুরও আমার কপালের লেখা দেখতে পাচ্ছেন। আমি কি করে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াবো? এই ভেবে মাওলানা আবু তাহের লজ্জায় কাল বিলম্ব না করে দরবার শরীফ থেকে বের হয়ে গেলেন। অনেকদূর যাওয়ার পর এক হিন্দু পল্লীতে তিনি প্রবেশ করলেন। তখন একটি সুন্দরী হিন্দু যুবতী নারী আবু তাহেরকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। মাওলানা আবু তাহেরও বয়সে যুবক। তাই ঐ যুবতীকে দেখে তার মনেও প্রেমের সৃষ্টি হলো। এক পর্যায়ে মাওলানা আবু তাহের লাহোরী ঐ হিন্দু যুবতীকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মেয়েটি ভাবলো- এতবড়ো একজন আলেমকে যদি ধর্মচ্যুৎ করতে পারি, তবে এটা হবে হিন্দুদের বিজয়। তাই সে আবু তাহেরকে বললো, আপনি যদি ধর্মত্যাগ করতে পারেন এবং দাঁড়ি কামিয়ে গলায় পৈতা ও ধূতি পরতে পারেন, তাহলে আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজী আছি। মাওলানা আবু তাহের ভাবলেন আমার কপালে যখন কাফের লেখা, তখন আমি হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করলে আর ক্ষতি কি? তাই তিনি রাজী হয়ে গেলেন। নির্দিষ্ট সময়ে বিয়ের আয়োজন হলো।

মাওলানা আবু তাহের লাহোরিও দাঁড়ি কামিয়ে এবং ধূতি ও পৈতা পরে বিয়ের পিড়িতে বসেছেন। এদিকে আল্লাহর মহান অলী হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.) এতদিন পরে আজ হঠাৎ করে তাঁর খাদেমের কাছে জানতে চাইলেন যে, মাওলানা আবু তাহের আমার দরবারে এসেছিল, সে এখন কোথায়? একথা শুনে খাদেম মোজাদ্দেদ হুজুরকে মাওলানা আবু তাহের লাহোরির তাঁর দরবার শরীফ থেকে চলে যাওয়া এবং হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করার সমস্ত ঘটনা জানালেন। মাওলানা লাহোরির বিস্তারিত ঘটনা শুনে মোজাদ্দেদ হুজুর অবাক ও স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। তিনি ভাবলেন, এতবড়ো একজন আলেম ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করবে, এটা কি করে হতে পারে? আল্লাহর মহান বন্ধুর হৃদয়ে আবু তাহেরের প্রতি দয়ার উদ্রেক হলো। তিনি খাদেমকে নির্দেশ দিলেন- লোক পাঠিয়ে আবু তাহেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো। যেই নির্দেশ সেই কাজ। এদিকে মাওলানা আবু তাহের লাহোরি হিন্দু যুবতীর প্রস্তাবে তাকে বিয়ে করতে রাজী হয়ে দাঁড়ি কামিয়ে ফেললেন। ধূতি ও পৈতা পরে বিয়ের পিড়িতে বসে গেছেন। বিয়ের লগন আসলেই ব্রাহ্মণ মন্ত্র পড়িয়ে উভয়ের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক তৈরী করে দেবেন। আবু তাহের সেই প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন। এমন সময় মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর লোক গিয়ে ঐ বিয়ের মজলিসে হাজির হলো। তারা আবু তাহেরকে দেখে অবাক হয়ে গেলো এবং বললো- মোজাদ্দেদ হুজুর আপনাকে এখনি তাঁর দরবারে নিয়ে যেতে বলেছেন। মোজাদ্দেদ হুজুরের নাম শুনে সকলেই নীরব। কারো মুখে টু শব্দটি পর্যন্ত নেই। মাওলানা আবু তাহেরকে নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই আল্লাহর অলীর দরবারে হাজির করা হলো। এদিকে মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.) কুরসি মোবারকে নীরবে বসে আছেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন- তাঁর সামনে বিখ্যাত আলেম মাওলানা আবু তাহের ধূতি ও পৈতা পরা এবং দাঁড়ি বিহিন কপালে লাল রং মাখানো অবস্থায় বসা রয়েছেন। মাওলানা আবু তাহের লাহোরিকে এমন অবস্থায় দেখে মোজাদ্দেদ হুজুর অবাক হয়ে গেলেন। তিনি তাকে লক্ষ্য করে বললেন- একি অবস্থা আপনার? এতবড়ো একজন আলেম হয়ে আপনি একি পোশাক পরে আছেন? আপনার জীবনে এত অধ:পতন কেন নেমে এলো? আল্লাহর মহান অলীর কোনো প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সাধ্য নেই আবু তাহেরের। তিনি মাথা নীচু করে অপরাধীর ন্যায় নীবর হয়ে বসে রইলেন।

মাওলানা আবু তাহেরের এমন করুণ অবস্থা দেখে, তার প্রতি আল্লাহর অলীর দয়া হলো। তিনি দুচোখ বন্ধ করে মোরাকাবা অবস্থায় মহান আল্লাহ্কে বলতে লাগলেন- ওগো দয়াময় খোদা! তুমিতো পরম দয়ালু ও পরম ক্ষমতাশালী, তুমি দয়া করে আবু তাহেরকে ক্ষমা করে দাও। আল্লাহর পক্ষ থেকে এলহাম হলো- হে বন্ধু! আবু তাহের ক্ষমার অযোগ্য। কেননা, সে আমার অলীকে কাফের বলেছে। তার কপালে কাফের লেখা রয়েছে। আমি তাকে ক্ষমা করবো না। তখন মোজাদ্দেদ হুজুর মোরাকাবা অবস্থায় আল্লাহর প্রেমসাগরে হাবুডুবু খেতে লাগলেন। তিনি আল্লাহর কাছে দাবী জানিয়ে বললেন- ওগো দয়াল মাওলা! তুমি আবু তাহেরকে ক্ষমা না করা পর্যন্ত আমি মাথা তুলবো না। তুমিতো মানুষের পাহাড় পরিমাণ গুনাহও মাফ করে দিতে পারো। আমি আরজ করছি, আবু তাহেরকে মাফ করে তাকে মু’মেন বানিয়ে দাও, আল্লাহর পক্ষ থেকে এলহাম হলো, হে বন্ধু শেখ আহমদ! আপনি তার কপালে মুমিন লিখে দেন। তখন হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর চোখ থেকে যে প্রেমাশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল, তা দিয়ে তিনি আবু তাহেরের কপালের কাফের লেখাটি মুছে দিয়ে, সেখানে মুমিন লিখে দিলেন। মাওলানা আবু তাহের লাহোরি দেখতে পেলেন তার কপালে কাফের লেখা মুছে গেছে এবং সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে মুমিন লেখা রয়েছে। এটা দেখে মাওলানা আবু তাহের একটি চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে বেহুঁশ হয়ে গেলেন। তখন মোজাদ্দেদ হুজুর তাঁর খাদেমকে নির্দেশ দিলেন, আবু তাহেরকে গোসল করিয়ে সুন্দর পোশাক পরিয়ে দাও। আজ থেকে আবু তাহেরকে আমি খিলাফত দান করলাম।

আল্লাহর মহান বন্ধু, হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানি (রহ.)-এর দয়ার বদৌলতে মাওলানা আবু তাহের লাহোরি ঐ যুগের একজন শ্রেষ্ঠ অলীতে পরিণত হয়ে তরিকা প্রচারের কাজ করে গেছেন। এভাবেই আল্লাহর মহান অলীদের দয়ার বদৌলতে সাধারণ মানুষ কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি লাভ করেছেন।

বিখ্যাত অলী হযরত বড়োপির আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার বলে ১২ বছর আগে নদীতে ডুবে যাওয়া বর-বধূসহ নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে সকলকে জীবিত করেছেন। বর্তমান যুগের মহান অলী, যুগশ্রেষ্ঠ মহামানব, মহান সংস্কারক মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের জীবনেও এমন বহু অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
সূফী সম্রাটের জনৈক মুরিদ সন্তান পটুয়াখালী নিবাসী জনাব মো. আবদুল্লাহ্ ট্রলারে করে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গেলে, সাগরের প্রচন্ড ঢেউয়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। ফলে ঐ ব্যক্তি সাগরে পড়ে হাবুডুবু খেতে থাকেন। মানুষের সীমিত শক্তি দিয়ে সাগরের প্রচণ্ড ঢেউ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। তবুও তিনি কোনো রকম সাঁতরিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে লাগলেন। এই চরম অবস্থায় আবদুল্লাহ্ আপন মোর্শেদকে স্মরণ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে লাগলেন- ওগো আল্লাহর বন্ধু! ওগো দয়াল বাবাজান! এই গহীন সাগরে প্রচণ্ড ঢেউয়ে আমি হাবুডুবু খাচ্ছি, আপনি যদি দয়া না করেন, তাহলে আমার রক্ষা পাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। আপনি দয়া করে আমাকে এই কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা করেন। এমতাবস্থায় আবদুল্লাহ যেন আর ভেসে থাকতে পারছেন না। উপায়ান্তর না দেখে বারবার শুধু মোর্শেদকে স্মরণ করে কাঁদতে থাকেন। হঠাৎ করে দেখতে পেলেন দূর থেকে একটি জাহাজ তার দিকে এগিয়ে আসছে। জাহাজের সামনে বসা রয়েছেন মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান। মোর্শেদকে দেখার পরেই আবদুল্লাহ হুঁশ হারিয়ে ফেললেন। যখন তার হুঁশ ফিরে এলো তিনি দেখতে পেলেন- ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতালে তিনি শোয়া রয়েছেন। সেখানকার ডাক্তারদের চিকিৎসায় তিনি পূর্ণ সুস্থ হলেন। জনাব আবদুল্লাহ নিজেকে হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পেয়ে ডাক্তারদের কাছে জানতে চাইলেন- এখানে কীভাবে তিনি এসেছেন? কে তাকে নিয়ে এসেছে? হাসপাতাল থেকে জানানো হলো একটি বাণিজ্যিক জাহাজের লোকেরা অচেতন অবস্থায় তাকে এই হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। একথা শুনে আবদুল্লাহর সব কথা মনে পড়ে গেল, তিনি তৎক্ষণাৎ বাবা, বাবা বলে চিৎকার করতে লাগলেন। তখন তার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, আল্লাহর মহান বন্ধু, যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানই তাকে সাগর থেকে জাহাজে তুলে এনেছেন। কারণ, তিনি সাগরে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন, যে জাহাজটি তার নিকট এগিয়ে এসোছিল, তার সামনে মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বসা ছিলেন। নিশ্চয়ই তিনিই তাকে সাগর থেকে জাহাজে তুলে এনেছেন। আর তাতেই আশেকে রাসুল আবদুল্লাহ জীবনে বেঁচে গেছেন। ভারতের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার পরিচয় জানার পর তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিলেন। দেশে ফিরে এসে আবদুল্লাহ মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের সাথে দেখা করার জন্য ঢাকার আরামবাগস্থ বাবে রহমতে আসেন। তিনি মোর্শেদের সাথে দেখা করে কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তার জীবনের এই করুণ ঘটনা বর্ণনা করেন। এমন হৃদয় বিদারক ঘটনা শুনলে কোনো কঠিন হৃদয়ের মানুষও স্থির থাকতে পারে না। আর তখনই আল্লাহর মহান বন্ধু, সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান যে এ যুগের একজন শ্রেষ্ঠ অলী-আল্লাহ্, তা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়। আসলে অলী-আল্লাহর নেক দৃষ্টি ও দয়াতেই মানুষের পক্ষে চরম বিপদ-আপদ ও বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।

8 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here