অসাম্যের চুড়ান্ত প্রদর্শনী

0
191

বাংলাদেশের এক চতুর্থাংশ এলাকা বন্যায় তলিয়ে গেছে। লাখ লাখ লোক তাদের সর্বস্ব হারিয়েছেন। এই সাম্প্রতিক দুর্যোগ বর্তমান সময়ের অসাম্যের এক গুরুতর চিত্র আমাদের সামনে হাজির করেছে-জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী লোকজন এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার।

ভারী বৃষ্টিপাত বাংলাদেশের এক চতুর্থাংশ এলাকা ডুবিয়ে দিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র লোকদের যা কিছু সম্পদ ছিল, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, মাটি-টিনের ঘর, অমৌসুমের জন্য মজুদ করে রাখা ধান, সবই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

সাড়ে ষোল কোটি জনসংখ্যার এই বদ্বীপ রাষ্ট্রের উপর এটি দুর্যোগের সর্বশেষ আঘাত। মাত্র দুই মাস আগেই একটি ঘূর্ণীঝড় দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে তছনছ করে দিয়েছে। সমুদ্র উপকূলে সমুদ্রতলের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বন্যাগুলোর পিছনে জলবায়ু পরিবর্তনের কতটা হাত রয়েছে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয়, তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ঘন ঘন আর ক্রমশ ভয়াবহ বন্যার প্রবণতা প্রত্যক্ষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে পারে।

“দুর্ভোগ ভবিষ্যতে আরো বাড়বে”, বলছিলেন ব্র্যাকের মানবিক সহায়তা বিষয়ক পরিচালক সাজেদুল হাসান। ব্র্যাক বাংলাদেশভিত্তিক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, যারা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের মাঝে খাদ্য, নগদ অর্থ ও তরল সাবান বিতরণ করছে।

আধুনিক যুগের এ এক চূড়ান্ত অন্যায়ের চিত্র। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল দূষণে সবচেয়ে কম দায়ী লোকজন এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গড়ে একজন বাংলাদেশীর চেয়ে একজন আমেরিকান ৩৩ গুণ বেশী বিশ্ব উষ্ণায়নকারী কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরনের জন্য দায়ী।

এই বিষয়টি অনেকদিন ধরেই কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু। কিন্তু করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হওয়া এবং বিশ্বের সবচেয়ে অরক্ষিত লোকজন আরো বিপদগ্রস্থ হওয়ার এটি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সরকারি তথ্য ও স্যাটেলাইটের ডাটা মতে দেশের মোট ভূখন্ডের প্রায় ২৪-৩৭% ভূমি বন্যায় নিমজ্জিত হয়েছে, প্রায় এক কোটি ঘরবাড়ি ডুবে গেছে এবং চার কোটি সত্তর লক্ষ লোক বন্যাক্রান্ত হয়েছে। অন্তত ৫৪ জন মারা গেছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

ব্রহ্মপুত্রের উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হওয়া এই বন্যা আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ততদিন পর্যন্ত, ৩০ বছর বয়সী বর্গাচাষী তাজুল ইসলামকে উঁচু জায়গায় অস্থায়ী বাঁশের ঘরে থাকতে হবে কারণ তার ঘর বন্যায় ভেসে গেছে। সে অন্তত তার ঘরের টিনের চালটি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে, নয়তো নয় জনের পরিবার নিয়ে তাকে খোলা আকাশের নিচেই থাকতে হতো।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির সামনের সারিতে থাকা কোটি কোটি লোকজনের অবস্থা তাজুল ইসলামের মতোই। ভানুয়াতি প্রশান্ত মহাসাগরে প্রায় ডুবেই যাচ্ছে। ক্রমাগত খরায় হর্ন অব আফ্রিকার পশুপালকদের টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অতি ভারী বৃষ্টিতে মেগাসিটি মুম্বাই বিপর্যস্ত হচ্ছে।

আপনি যেভাবেই দেখেন, এই অসাম্যের চিত্র তীব্রভাবে দৃশ্যমান। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশের দশ শতাংশ ধনী লোকজন চল্লিশ শতাংশ পরিবেশ দূষণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী, অন্যদিকে সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ লোকজন ৫ শতাংশের জন্য দায়ী। অন্য এক হিসাবে দেখা গেছে, বিশ্ব উষ্ণায়ন বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর আয় ১৭-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ীলোকেদের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ঝড়ের তীব্রতা আর জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়ে ক্রমেই মূল ভূখন্ডের আরো বেশি ভিতরে প্রবেশ করছে।

জ্বালানী দক্ষতার মাত্রা বিষয়ে নীতিমালা পরিবর্তন করার ফলে সরকারি বিধি লংঘন হয়েছে কি না , এই বিষয়ে তদন্ত করতে যাচ্ছে ইপিএ ইনস্পেক্টর জেনারেল।

দরিদ্র দেশগুলো অনেকদিন থেকেই জলবায়ু পরিবর্তজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দায়ভার তাদের উপর বর্তাবে এই বিবেচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ধনী দেশগুলো এই ধরনের প্রস্তাবে বাধা দিয়ে আসছে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী দরিদ্র দেশগুলোর জন্য জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলায় প্রতিশ্রুত ১০০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা বাস্তবায়ন করতে ধনী দেশগুলো ব্যর্থ হয়েছে।

করোনা ভাইরাস পুনর্বাসন কার্যক্রম জলবায়ু সহনশীলতার সাথে যুক্ত ঋণ মওকুফের বিষয়ে আলোচনার দ্বারকে আবার উম্মুক্ত করেছে। জুন মাসে বেলিজের নেতৃত্বে উন্নয়নশীল ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো বেসরকারী ও সরকারী দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের নিয়ে ঋণ মওকুফ ও জলবায়ু সহনশীলতার জন্য নতুন অর্থায়ন করতে নতুন চুক্তি করার বিষয়ে জোর দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামুদ্রিক ঘূর্র্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্রগুলো করোনা মহামারির কারণে পর্যটন খাতে আয় কমে যাওয়ায় নিজেদের ঋণের জালে আটকে যেতে দেখতে পাচ্ছে। জাতিসংঘের এক কমিশন জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ ২০টি দেশ বিভিন্ন আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ক্ষতির কারণে ৪০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত সুদ প্রদান করেছে।

বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্রের বন্যায় দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার এই অসম যন্ত্রণার প্রতিফলন ঘটেছে। এই বন্যা জুন মাসে শুরু হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নদীর উজানে ভারতে বৃষ্টির কারণে নদী অববাহিকার পানি বৃদ্ধি পায়, যেটা দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। ব্রহ্মপুত্রের তীরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য বন্যা নতুন কোনো বিষয় নয়। নদী যখন ফুলে ফেপে উঠে, কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়, নদী ভাঙন শুরু হয়, লোকজন উঁচু স্থানে সরে যায় আর পানি সরে যাওয়ার অপেক্ষা করে। তারা খাবারের জন্য নিজেদের সঞ্চয় বা খাদ্য সহায়তার উপর নির্ভর করে।

“যদিও এই বছরটি ব্যতিক্রম। কারণ জুন মাসে যখন বন্যা শুরু হয় লোকজন তখনই খাদ্য সংকটে ছিল”, বলছিলেন ব্র্যাকের হাসান। লকডাউনের কারণে লোকজনের কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিদেশী আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে রেমিটেন্স আসা কমে গিয়েছিল, কারণ তাদের অনেকেই সম্প্রতি বিদেশে কাজ হারিয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে লোকজন তাদের গরুছাগল নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছিলেন, তাদের ঘরে খাবার ছিল না।

প্রথম যখন নদীর পানি বাড়ে, কুড়িগ্রামের বর্গাচাষী তাজুল ইসলাম তার হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল রক্ষা করতে চেষ্টা করেছিলেন। তিনি কিছু পশু পাখিকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন, কিছু পারেননি। নদীর পানি প্রথমে তার বাড়ির পাশের সবজি ক্ষেত, তারপর তার বাড়িটি ডুবিয়ে দেয়, যেখানে তার ৬০০ কেজি ধান মজুদ ছিল। তারপর বন্যার পানি তার একটি ছোট দোকান ভাসিয়ে নিয়ে যায়, অন্যের জমিতে কাজ করার সময় বাদে যেখানে দোকানদারি করে কিছু অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করতেন। তার ছয় বছরের ছেলে গ্রামের যে স্কুলে পড়তে যেত, সেটিও ডুবে গিয়েছিল। বর্তমানে তার একটাই চিন্তা কিভাবে কিছু অর্থ আয় করা যায়। তার বড় পরিবারের তিনিই একমাত্র আয়ের উৎস। পরিবারের নয় সদস্যের সকলেই ভাত, ডাল আর সিদ্ধ আলু খেয়ে দিন পার করছেন। সবজি কেনার সামর্থ নেই, মাছ মাংস তো নয়ই, তার ভাষায় ‘কেনার কথা চিন্তাই করা যায় না’।

৪৮ বছরের আক্কাস আলী ইতোমধ্যেই একটা খারাপ বন্যার সাক্ষী। ছয় বছর আগে, যখন তার গ্রাম ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়ে যায়, তিনি তাজুল ইসলামদের গ্রামে এসে আশ্রয় নেন। চার সপ্তাহ আগে যখন নদীর পানি বেড়ে যায়, তার চার একর ফসলী পানির নিচে জমি তলিয়ে যায়। গ্রামের মসজিদ ও বাজার ভেসে যায়। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও ভেসে যায়, যেটায় ২৫০ জন ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করত। গ্রামের ছেলেমেয়েরা এখন কোথায় স্কুলে যাবে, এ নিয়ে তাজুল ইসলাম উদ্বিগ্ন। তার ঘরটি এখনো খাড়া আছে। কিন্তু নদী ভাঙতে ভাঙতে তার বাড়ির ২৫০ গজের মধ্যে চলে এসেছে। তিনি নিশ্চিত, তার ঘরটিও নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।

ব্রহ্মপুত্র নদ একটি ২৪০০ মাইল দীর্ঘ ভয়ানক, ক্রম পরিবর্তনশীল নদ যেটি হিমালয়ের তিব্বত অংশ হতে উৎপন্ন হয়ে উত্তর পূর্ব ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে গঙ্গা নদীতে মিশে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এটা বিরাট অঞ্চলজুড়ে ফসলী জমিতে সেচের উৎস। কিন্তু এটি একইসাথে অনিশ্চিতভাবে বিপদজনক, প্রায়ই এটি নদী তীরের জমি ও জেগে উঠা চরকে গ্রাস করে ফেলে, যেমন করে আক্কাস আলীর গ্রামকে গ্রাস করেছিল।

জলবায়ু পরিবর্তনও এই নদী আর এর কূলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তন করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ একেএম সাইফুল ইসলাম ৩৫ বছরের বন্যার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, বৃষ্টিপাত আগের চেয়ে অনিয়মিত আর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আর নদীও পূর্বের চেয়ে ঘন ঘন ও বিপদজনক মাত্রায় বিপৎ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা পূর্বে হয়নি।

গত পাঁচ বছরে চারটি বড় বন্যা হয়েছে, এতে লোকজনের দূর্যোগের সাথে মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতাকে নষ্ট করেছে। ভবিষ্যতে আরো বেশি আর ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।

যদি পৃথিবীর তাপমাত্রা শুধুমাত্র দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসও বৃদ্ধি পায়, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বন্যা ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বন্যার পরিমাণ বাড়বে ৬০ শতাংশ।

যাই ঘটুক না কেন, সাইফুল ইসলাম বলেন, দেশকে মানিয়ে নিতে হবে। নদী খনন, বাঁধ তৈরী, পানি নিষ্কাশন, নদী ভাঙ্গনে উদ্বাস্তু হওয়া লোকদের সহায়তার জন্য দেশটির অর্থ প্রয়োজন।

দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষ নেওয়াদের মতে, বাংলাদেশের দুর্যোগপূর্ণ অবস্থাই প্রমান করে কেন জলবায়ু আলোচনা যেটি ২০২১ সাল পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে, আবার শুরু করা উচিত, এবং যারা এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয় কিন্তু আক্রান্ত, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত।

“জনগণ তাদের সহায় সম্বল হারাচ্ছে”, বলছিলেন ফারাহ কবির, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের পরিচালক। “কখন আর কিভাবে তাদের সহায়তা করা হবে? কখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দায়ভার নেবে?”

(নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত। নিউ ইয়র্ক থেকে সোমিনি সেনগুপ্ত ও ঢাকা থেকে জুলফিকার আলী মানিক প্রতিবেদটি লিখেছেন।

অনুবাদ: সালাহ উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here