অ্যান্টিনেটাল কেয়ার বা প্রিনেটাল কেয়ার

0
67

অ্যান্টিনেটাল কেয়ার বা প্রিনেটাল কেয়ার
ডা. ফারহানা শারমীন অভি

একজন মায়ের গর্ভধারণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অ্যান্টিনেটাল কেয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই আজকে এই বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।
অ্যান্টিনেটাল কেয়ার কী?
অ্যান্টিনেটাল কেয়ার অর্থ গর্ভবতী মায়ের যত্ন। একজন নারীর গর্ভধারণের পর প্রথম থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত একটি পরিকল্পিত সেবা দানকে আমরা বলি অ্যান্টিনেটাল কেয়ার।


এর আওতায় পড়ে:
১) মায়ের শারীরিক অবস্থার বিশদ ইতিহাস
২) প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা
৩) দৈনন্দিন জীবনযাপনে সাবধানতা, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্রাম সম্পর্কিত উপদেশ
৫) উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ সনাক্ত করা ও প্রয়োজনবোধে চিকিৎসা দেওয়া।

অ্যান্টিনেটাল কেয়ার এর প্রয়োজনীয়তা কী?
১) গর্ভকালীন কোনো জটিলতার উদ্ভব হলে তা দ্রুত নিরসন করা সম্ভব হয়।
২) প্রসবকালীন পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রত্যেক মায়ের ও দম্পতির তৈরি থাকা খুবই জরুরি।
৩) মায়ের শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করা যায়।
৪) গর্ভের সন্তানের সুস্থতা নিশ্চিত করা যায়।

গর্ভধারণের পর কখন, কবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে?
ওয়ার্ল্ড হেলথ ওরগানাইজেশন বলেছে, গর্ভাবস্থায় একজন মাকে ৮ বার অ্যান্টিনেটাল চেকআপ নেওয়া উচিৎ। তবে কমপক্ষে চারবার চিকিৎসকের পরামর্শ অবশ্যই নিতে হবে। প্রথম ১৬ সপ্তাহে একবার, তারপর ২৪-২৮ সপ্তাহে একবার, এরপর ৩২ সপ্তাহে একবার এবং সর্বশেষ ৩৬-৩৮ সপ্তাহে একবার।

কোভিড-১৯ ও অ্যান্টিনেটাল চেকআপ:
ওজিএসবি (Obstetrical and Gynaecological Society of Bangladesh) গাইডলাইন অনুযায়ী, ৮ সপ্তাহ থেকে ১২ সপ্তাহ সময়ে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমেই চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ। পরবর্তীতে ১৬ সপ্তাহ, ২০ সপ্তাহ, ২৪-২৮ সপ্তাহ এবং ৩২ সপ্তাহে সরাসরি চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চেকআপ নিতে হবে।

 প্রসূতি মায়ের প্রথম সাক্ষাৎটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
  • একজন নারী প্রথমবার গর্ভবতী হলে সুখানুভূতির সাথে সাথে একটা আতঙ্কও কাজ করে। সেক্ষেত্রে এই মায়েদের আশ্বস্ত করা প্রয়োজন।
  • মায়ের জানা দরকার কি খেতে হবে, কিভাবে চলতে হবে, কোনো ঔষধের প্রয়োজন আছে কি না, কোনো জটিলতা আছে কিনা, মায়ের আগে থেকে রক্তশূন্যতা, উচ্চ রক্ত চাপ, ডায়বেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, হার্টের সমস্যা, অটোইমিউন ডিজিজ, প্রস্রাবের ইনফেকশন, হেপাটাইটিস ইত্যাদি আছে কিনা বা নতুন করে এই সমস্যাগুলোর কোনটি হতে পারে বা হয়েছে কিনা।
  • গর্ভের সন্তান পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দরভাবে বড়ো হচ্ছে কি না এটাও প্রথম থেকে জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
  • ল্যাবে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা বিশেষ করে রক্তের গ্রুপ জানা ও আল্ট্রাসনোগ্রাম করা খুবই প্রয়োজন।
  • মনে রাখতে হবে একজন সুস্থ ও প্রফুল্ল মা-ই পারবেন সুস্থ শিশু উপহার দিতে।

পরবর্তী চেকআপগুলোতে কী কী দেখা হয়?
গর্ভকালীন সময়ে মায়ের রক্তশূন্যতা, উচ্চ রক্ত চাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা, হার্টের সমস্যা, কোনো ইনফেকশন, হেপাটাইটিস ইত্যাদি নতুনভাবে হতে পারে। এছাড়াও আগে থেকে কোনো সমস্যা থাকলে তা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। গর্ভে বাচ্চার সংখ্যা, বাচ্চার অবস্থান, এমনিওটিক ফ্লুইড বা জরায়ুর পানির পরিমাণ, সর্বোপরি শিশুটি সঠিকভাবে বেড়ে উঠছে কিনা তা ফলোআপ করাও জরুরি। বিশেষভাবে এনোমালি স্ক্যান করা উচিত ২৪-২৮ সপ্তাহের মাঝে। টি টি টিকা ও অন্যান্য ভ্যাক্সিন এবং নেগেটিভ মায়ের জন্য এন্টি-ডি ইঞ্জেকশন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অ্যান্টিনেটাল চেকআপ কোথায় নিতে হবে?
বর্তমানে বাংলাদেশে গর্ভবতী মায়ের যত্নের জন্য এবং সুন্দর ও পরিকল্পিত সেবাদানের উদ্দেশ্যে বহুবিধ কার্যক্রম প্রচলিত আছে। আমাদের সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন আছে, তেমনি কাজ করছে বিভিন্ন এনজিও। আমাদের কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন সাব সেন্টার আছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও যথাযথ সুবিধা আছে। প্রয়োজন অনুযায়ী ইমার্জেন্সি অবসটেট্রিক কেয়ার চালু করা হয়েছে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা আছে। এছাড়া রেফারেলের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধাও আছে।

উল্লিখিত শিডিউলের বাইরে কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বর ও শুকনা কাশি, এছাড়া প্রচন্ড মাথা ব্যথা, হঠাৎ রক্ত চাপ বেড়ে যাওয়া, ওজন বেশি বেড়ে যাওয়া, পায়ে বা শরীরে পানি আসা, খিঁচুনী, পেটে ব্যথা, প্রস্রাবের সমস্যা, অতিরিক্ত বমি, পাতলা পায়খানা, পানি ভেঙে যাওয়া, রক্তপাত শুরু হওয়া বা প্রসব বেদনা ওঠা ইত্যাদি সমস্যার জন্য শিডিউল এর বাহিরেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনে অনতিবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।
গর্ভধারণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পিত স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত জরুরি। এতে একজন মা নিরাপদে একটি সুস্থ শিশুর জন্মদান করতে পারেন। তাছাড়া মাতৃ মৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুর হার কমাতে অ্যান্টিনেটাল কেয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); এমএস (গাইনি অ্যান্ড অবস্) ফেজ-বি রেসিডেন্ট, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here