আইসিইউ (ICU) চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং কিছু অজানা কথা

0
318

ডা. রোজিনা সুলতানা

আইসিইউ নিয়ে আমাদের অনেকের মনেই অনেক প্রশ্ন আছে। বর্তমানে এই করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে আইসিইউ বারবার আলোচনায় আসছে। তাই আইসিইউ নিয়ে আমাদের কিছুটা হলেও ধারণা থাকা উচিত।

আইসিইউ (ICU) বলতে আমরা কী বুঝি?
আইসিইউ (ICU) বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র হচ্ছে হাসপাতালে একটি বিশেষ বিভাগ যেখানে নিবিড় তত্ত্বাবধানে সঙ্কটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র সেইসব রোগীদেরকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে যাদের জীবন আশঙ্কাজনক, যাদের বাঁচানোর জন্য লাইফ সাপোর্ট মেশিন বা কৃত্রিম শ্বাস প্রশ্বাস-এর যন্ত্রের সহযোগিতা লাগে। এই কেন্দ্রসমূহের কার্যক্রম উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, সেবিকা দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে কী কী ধরনের আইসিইউ সেবা আছে?
১) নবজাতক আইসিইউ (NICU)
২) শিশু বা পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (PICU)
৩) জেনারেল আইসিইউ
৪) কার্ডিয়াক আইসিইউ
৫) রেনাল আইসিইউ

এইচডিইউ (HDU) বা হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট বলতে কী বোঝায়?
কিছু সংকটাপন্ন রোগী থাকে যাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবা শুশ্রূষা হাসপাতালে সাধারণ ওয়ার্ডে দেওয়া সম্ভব নয়, আবার তাদের অবস্থা আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা প্রদানের মতোও এতটা সংকটাপন্ন নয়; তখন তাদের সাধারণত এই এইচডিইউতে রেখে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এর সুযোগ সুবিধা অনেকটা আইসিইউ এর সুযোগ-সুবিধার কাছাকাছি। তবে এখানে ভেন্টিলেটর মেশিন বা লাইফ সাপোর্ট মেশিন থাকে না।

আইসিইউতে বিশেষ কী সরঞ্জামাদি থাকে?
১) ভেন্টিলেটর মেশিন বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস পরিচালনাকারী যন্ত্র যাকে আমরা লাইফ সাপোর্ট মেশিন বলে চিনি।
২) কার্ডিয়াক মনিটর যার মাধ্যমে হৃদযন্ত্র সার্বক্ষণিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়।
৩) ডায়ালাইসিস মেশিন যা কিডনি ফেইলিওরের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

লাইফ সাপোর্ট মেশিন বলতে কী বোঝায়?
লাইফ সাপোর্ট মেশিন বলতে মূলত ভেন্টিলেটর মেশিনকে বোঝায়। আমরা জানি যে ফুসফুস আমাদের শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করে শরীরে অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি শরীর থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের হতে সাহায্য করে। রোগের জটিলতার কারণে বা অন্য কোনো কারণে যদি ফুসফুস তার এই স্বাভাবিক কাজ ঠিকমতো করতে না পারে তখন শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। তখন এই কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের যন্ত্র বা ভেন্টিলেটর মেশিন রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যক্রম চালানোর মাধ্যমে শরীরে অক্সিজেনের প্রয়োজনীয় মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এই ভেন্টিলেটর মেশিন মূলত ফুসফুসের কার্যকলাপ বজায় রাখতে সহায়তা করে। কিন্তু হৃদ যন্ত্রের কার্যকলাপ বজায় রাখতে এই মেশিনের সরাসরি কোনো ভূমিকা নেই। কোনো কারনে হৃদযন্ত্রের কার্যকলাপ যদি বন্ধ হয়ে যায় তখন ভেন্টিলেটর মেশিন বা লাইফ সাপোর্ট মেশিন এককভাবে রোগীকে বাঁচাতে পারে না।

অনেক সময় মৃতরোগীকে লাইফ সাপোর্ট মেশিনে দীর্ঘদিন রেখে কোনো কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বিল আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। এই অভিযোগ কতটুকু সত্য?
লাইফ সাপোর্টে থাকা একটি রোগীর যতক্ষণ হৃদ স্পন্দন থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে জীবিত। ভেন্টিলেটর মেশিন থাকা কোনো রোগীর হৃদ যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে, সেই মৃত রোগীকে লাইফ সাপোর্টে রাখার কোনো সুযোগ নেই। মানুষ যখন মারা যায়, তখন থেকে তার শরীরে পচন শুরু হয়। সুতরাং, এরকম একটি পচনশীল মৃতদেহকে ভেন্টিলেটর মেশিনে দীর্ঘদিন রাখার কোনো সুযোগ নেই এবং রোগীর মারা যাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখারও কোনো সুযোগ নেই।
আইসিইউ সেবা কার্যক্রম নিয়ে অনেকের কম ধারণা থাকতে পারে। তাই, সবকিছুকে আবেগ দিয়ে চিন্তা না করে যুক্তি দিয়ে জানার এবং বোঝার চেষ্টা করা উচিৎ। এখানে যেসব চিকিৎসক ও সেবিকা কাজ করেন, তাদের বেশীরভাগই নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে এসব জটিল রোগীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তাদের কাজে উৎসাহ দিন। যাতে তারা আরো আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে আপনার বা আপনার আপনজনের সেবা দিতে পারে।
[লেখিকা: এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন); এমডি (ক্রিটিকাল কেয়ার মেডিসিন), আইসিইউ বিশেষজ্ঞ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here