আক্কেল দাঁতের জটিলতা ও তার চিকিৎসা

0
659

ডা. নাজিয়া মেহেনাজ (জ্যোতি)

মাড়ির সর্বশেষে উভয় দিকে উপরে ও নিচে একটি করে মোট চারটি দাঁত থাকে, যাকে বলে আক্কেল দাঁত। এ দাঁতগুলো ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যেই সাধারণত উঠে যায়। আক্কেল দাঁত নিয়ে সমস্যায় পড়েনি এমন মানুষ হয়তো খুব কমই আছে। আক্কেল দাঁত সঠিকভাবে ও সঠিক সময়ে না ওঠার জন্য নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

জটিলতা:
– দাঁত ওঠার সময় প্রচন্ড ব্যথা হতে পারে ও মাড়ি লালচে হতে পারে।
– দেরিতে আক্কেল দাঁত ওঠার ফলে মাড়ি শক্ত হয়ে যায় এবং মাড়ি ফুলে যায়।
– অনেক সময় আক্কেল দাঁত সঠিকভাবে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা পায় না, ফলে তা বাঁকা হয়ে ওঠে। এর ফলে গালের দিকে বা জিহ্বার দিকে বারবার কামড় লেগে মুখের ভিতর ক্ষত তৈরি হতে পারে।
– বাঁকা হয়ে ওঠার কারণে দাঁতের ফাঁকে খাবার ঢুকে মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করতে পারে।
– সঠিকভাবে না উঠার কারণে দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে দাঁতে গর্ত বা ক্যাভিটি তৈরি হতে পারে। এমনকি পাশের দাঁতও আক্রান্ত হতে পারে।
– দাঁত ওঠার আগে তা মাড়ির যে অংশ দিয়ে আবৃত থাকে সেখানে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে যাকে বলা হয় পেরিকরোনাইটিস (Pericoronitis)। পেরিকরোনাইটিস এর ফলে রোগীর মুখ হাঁ করতে সমস্যা হয়, খাবার খেতে সমস্যা হয়, মাড়ি ফুলে যায়, এমনকি সেই স্থানে অনেক সময় পুজ তৈরি হতে পারে।
– আক্কেল দাঁত ওঠার সময় বা ওঠার পরে যদি কোনো সমস্যা হয় এবং তা যদি বিনা চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ফেলে রাখা হয় তাহলে তা থেকে মুখের ভিতর ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
– সমস্যাযুক্ত আক্কেল দাঁত দীর্ঘদিন বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখলে তা থেকে সিস্ট বা ক্যান্সার হতে পারে।

আক্কেল দাঁতের যত্ন:
– আক্কেল দাঁত ও মাড়ি সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে এবং এর জন্য নিয়মিত সঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ করা জরুরি। আক্কেল দাঁত বাঁকা হয়ে উঠলে দাঁতের ফাঁকে যেন কোনো খাবার জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
– অ্যান্টিসেপটিক মাউথ ওয়াশ অথবা লবণ-গরম পানি দিয়ে মুখ কুলি করতে হবে।

চিকিৎসা:
একজন রোগী আক্কেল দাঁতের সমস্যা নিয়ে যখন একজন দন্ত চিকিৎসকের কাছে যায় তখন প্রথমেই দাঁতের এক্সরে করে নিশ্চিত হতে হয় যে দাঁতটি সঠিক অবস্থানে আছে না বাঁকা ভাবে আছে। দাঁতটি যদি সোজা ভাবে থাকে এবং পুরোপুরি ওঠার সম্ভাবনা থাকে তাহলে নিয়মিত মাড়ি পরিষ্কার রাখতে হবে। অনেক সময় আক্কেল দাঁতটি উঠতে বাধা পায়। তখন দাঁতের অবস্থান বরাবর মাড়ির কিছু অংশ কেটে দিলে দাঁতটি পুরোপুরি উঠতে পারে। এই চিকিৎসাকে বলা হয় অপারকুলেকটমি (Operculectomy)।
আক্কেল দাঁতের কারণে যদি তার পাশের দাঁতে ক্ষত তৈরি হয়, তার জন্য ফিলিং অথবা রুট ক্যানেল চিকিৎসা করাতে হবে।
আক্কেল দাঁত একটি অপ্রয়োজনীয় দাঁত। যদি এটি বাঁকা হয়ে ওঠে বা আক্কেল দাঁতে কোনো ক্ষত সৃষ্টি হয় তাহলে তা তুলে ফেলাই ভালো। এই দাঁত ফেলে দিলে দাঁতের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয় না। আক্কেল দাঁত তোলা একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তাই এই কাজটি একজন অভিজ্ঞ দন্ত-চিকিৎসক দ্বারা করানোই শ্রেয়। হাতুড়ে চিকিৎসক দিয়ে আক্কেল দাঁতের চিকিৎসা করাতে গেলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। কারণ, অভিজ্ঞতা না থাকলে এই দাঁত তোলার সময় তার কিছু অংশ ভেঙে মাড়ির ভিতর থেকে যেতে পারে, মাড়ির স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে রোগী ঠিকমতো মুখ হা করতে পারবে না।
সুতরাং, আক্কেল দাঁত নিয়ে কোনো অবহেলা নয়। অবহেলা করলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই, দাঁতের যে কোনো সমস্যার জন্য সময়মতো একজন অভিজ্ঞ দন্ত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, শিশু দন্ত বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here