আগামি বছরেই স্বাভাবিক হচ্ছে অর্থনীতি

0
134


অনিরুদ্ধ রুদ্র: করোনা মহামারির ক্ষতি কাটিয়ে আগামি অর্থবছরেই স্বাভাবিক হচ্ছে অর্থনীতি- সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এমন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বৈশ্বিক গবেষকরা গত মাসে বলেছিলেন, করোনা পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণ সবচেয়ে দ্রুত গতিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্রুত করোনা পরিস্থিতির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার কারণ হিসেবে সামষ্টিক অর্থনীতিকে সরকারের সময়োপযোগী কার্যকর পদক্ষেপগুলোকে চিহ্নিত করেছে এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
২০২১-২২ অর্থবছরে অর্থনীতি থেকে করোনার প্রভাব কেটে গিয়ে বাংলাদেশর অর্থনীতি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে- এমন দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০২০-২৫) খসড়ায়। এজন্য এই পরিকল্পনায় চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধারা হলেও আগামি অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশন সাড়ে ৬ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরলেও এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রক্ষেপন আরও বেশি। এডিবি’র ধারণা, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এটিকে কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রবণতারই ইঙ্গিত বলে মনে করছে সংস্থাটি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০২০-এর হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনা মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ যা বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তিমত্তা প্রকাশ করেছে। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ যা ছিল এশিয়ার সব দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এডিবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের শক্ত ভিত্তি এবং রফতানি গন্তব্যগুলোতেও প্রবৃদ্ধিতে গতি আসার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এই ক্রমান্বয়ে পুনরুদ্ধার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি সহনশীল মাত্রায় (৫.৫%) থাকবে বলেই আশা করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও কমে ১ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিচক্ষণতা এবং দ্রুততার সঙ্গে প্রণোদনা পরিকল্পনার বাস্তবায়নই এই সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার মূল চাবিকাঠি বলেও উল্লেখ করেছে এডিবি। এই প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে দীর্ঘায়িত মহামারি অথবা এই দেশের রফতানি গন্তব্যগুলোর অবস্থা।
এ ব্যাপারে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর মহমোহন প্রকাশ বলেন, মহামারি পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। স্বাস্থ্য ও মহামারি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে থেকেও সরকার ভালোভাবেই অর্থনীতিকে ধরে রাখতে পেরেছে। মূলত দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য মৌলিক সেবা ও পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে উপযুক্ত প্রণোদনা এবং সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম নেয়ার কারণে এটি সম্ভব করতে পেরেছে সরকার।
তিনি বলেন, রফতানি ও রেমিট্যান্সে অর্থনীতির সাম্প্রতিক অবস্থা এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য বৈদেশিক তহবিলের জোগান নিশ্চিত করতে সরকারের সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা এই পুনরুদ্ধারকে সম্ভব করেছে।
আগেভাগে ভ্যাকসিন প্রাপ্তি এবং স্বাস্থ্য ও মহামারি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়া এই পুনরুদ্ধার প্রবণতাকে সহায়তা করবে উল্লেখ করে মহমোহন বলেন, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, রফতানি বৈচিত্র্য, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এই সঙ্কটই একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। আর এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে এডিবি সরকারের সঙ্গে কাজ করছে।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আর্থ-সামাজিক প্রভাব মোকাবেলা এবং দ্রুত পুনরুদ্ধারে সহায়তা দিতে এডিবি এরই মধ্যে বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে ৬০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ এবং ৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে। এছাড়া ২০২১-২৩ পর্যন্ত সময়ে সহযোগিতা করতে আরো ১১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দেবে।
এদিকে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার খসড়ায় বলা হয়েছে, যেহেতু সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি উন্নতি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে, সেহেতু ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি অর্জনের এই লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। পরের অর্থবছর তথা ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। তারপরের বছর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং পরিকল্পনার শেষ অর্থবছর ২০২৪-২৫ এ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ অর্জিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
খসড়া পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, করোনা না থাকলে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতো ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ।
খসড়ায় আরও বলা হয়, করোনা মহামারি দেশের মানুষের জীবন এবং সম্পদের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ অবস্থায় মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা শক্তিশালীকরণ, জেলা পর্যায় পর্যন্ত মানসম্মত ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
খসড়ায় আরও বলা হয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির শক্তিশালী বাস্তবায়ন এবং দারিদ্র্য কমানোর মতো কর্মসূচি যুক্ত করা হবে। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। কারণ, দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মসংস্থানই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এক্ষেত্রে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রচেষ্টা থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here