আত্মবিশ্বাস ছাড়া লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়

0
261

নারী ডেস্ক: চলতি বিশ্বের আলোচনার তুঙ্গে আছে যে নারীর নাম তিনি হলেন ইমান ইয়াসিন। পুরো নাম ইমান ইয়াসিন খাতিব। জন্ম ১৯৬৫ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। বর্তমানে ইসরায়েলে বসবাস ও সেখানকার সংসদ সদস্য।

তিনিই প্রথম কোনো মুসলিম নারী হিসেবে ইসরায়েল সংসদে হিজাব পরে হাজির হন। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ইসরায়েল সংসদ নির্বাচনে তিনি আরব পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে প্রবেশাধিকার অর্জন করেন, যা ইসরায়েলের সংসদীয় ইতিহাসে অনন্য উদাহরণ। তিনি চার সন্তানের মা।

আরব পার্টির বিজয়ী সংসদ সদস্য হিসেবে ইমান মাথায় হিজাব (স্কার্ফ) পরে প্রবেশ করেন ইসরায়েলি সংসদে। আরব বিশ্বজুড়েই তাই ইমান ইয়াসিনকে নিয়ে আলোচনার ঝড় এখন তুঙ্গে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত ইসরায়েলে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলিমদের ভোটেই ইমানি জয়লাভ করেছেন। রাজনীতিতে আসার আগে স্থানীয় কমিউনিটি সেন্টারের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর কমিউনিটি সেন্টারে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমি জনসমর্থন জোগাড় বা দৃষ্টি আর্কষণ করতে হিজাব পরিনি। জনসমর্থন আগে থেকেই আমার পক্ষে ছিল। সংখ্যালঘু কমিউনিটির মানুষরাই আমাকে আজকের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। আমি বিজয়ী। আপনাদের সম্মানে অভিভূত ও মুগ্ধ। এ বিজয় আপনাদেরও। আসুন আমরা সবাই মানবিক রাষ্ট্রের রূপায়ন করি।

ইসরায়েলি সংসদে হিজাব প্রসঙ্গে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, হিজাব পরার কারণে আমি বহু ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে শান্ত থেকে সবসময় মানুষকে বলেছি, কী পরেছি তা না দেখে- বরং আপনারা দেখুন, আমি কী করছি।

প্রসঙ্গত, আরব পার্টি বেশিরভাগ ইসরায়েলি আরব সংখ্যালঘুর ২১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। মূলত যারা ঐতিহ্যগতভাবে ফিলিস্তিনি। তবে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে ইসরায়েলি। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি নাজারেত শহরের উপকণ্ঠে ইয়াফাত আন-নাসরেহ গালিলি গ্রামের কমিউনিটি সেন্টারে চাকরি করতেন।

অন্যদিকে নাজারেতে শহরে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইমান ইয়াসিন খাতিব বলেন, হিজাব পরার জন্য আমি জনগণকে কাছে টেনেছি- বিষয়টি কোনোভাবেই এমন নয়। বরং আমার যোগ্যতা ও আমার কমিউনিটি আমাকে সবসময় উৎসাহ আর সাহস জুগিয়েছে বলেই আমি আপনাদের মাঝে বিজয়ী হয়ে দাঁড়াতে পেরেছি। রয়টার্স সূত্র বলছে, ইমান ইয়াসিন নির্বাচিত হওয়ার পর তার এলাকায় ব্যাপকভাবে সংবর্ধনা পেয়েছেন। নাজারেত শহরের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে সেলফি তুলতে তরুণরা ভিড় করছেন।

ইমান ইয়াসিন হাইফা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সোশ্যালওয়ার্ক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওমেন অ্যাফেয়ার্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। ম্যান্ডেল কলেজ থেকে লিডারশিপ বিষয়ে আলাদাভাবে স্নাতক করেছেন।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বৈরী ভূখণ্ডে বেড়ে ওঠা ইমান ইয়াসিন মুসলিম বিশ্বের শাসনকেই সবসময় মনে-প্রাণে প্রত্যাশা করেছেন। কিন্তু জীবনের ছক কখনও কখনও উল্টো পথেই নিয়ে যায়। ইয়াসিনের বেলায়ও ঠিক তেমনই ঘটেছে। ইসরায়েলে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও নিজের সম্প্রদায়ের কথা ভেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখেন ইয়াসিন। নারী হওয়ায় এ চ্যালেঞ্জটি ছিল আরও কঠিন। তবে সবদিক ভেবেই মাঠে নেমেছিলেন। আর তার সে সিদ্ধান্ত যে মোটেও ভুল ছিল না- তা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে সারা বিশ্ব। তার এ বিজয় নিয়ে চারদিকে যেন হইচই পড়ে গেছে। ইসরায়েল সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথম দিনেই হিজাব পরে সংসদে নিজের সরব উপস্থিতি সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের নজর এড়িয়ে যায়নি। দুর্দান্ত সাহসী মনের পরিচয় দিয়েছেন। এমন আলোচনায় মুসলিমবিদ্বেষী প্রতিটি রাষ্ট্রেই বইছে আলোচনার ঝড়।

ইয়াসিনের এ বিজয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ভূ-রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আভাস হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইসরায়েল ভূখণ্ডে সংখ্যালঘু মুসলিমদের রাজনৈতিক ও নাগরিক স্বার্থ আদায়ে এখন থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করবেন ইয়াসিন।

নারী হিসেবে সারা বিশ্বেই অসামান্য সাহসের প্রতীক এখন ইয়াসিন। বৈশ্বিক গণমাধ্যমসহ সব ধরনের সভা-সমাবেশেই সগর্বে বলছেন সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা। অধিকার কখনও ধর্মের ভিত্তিতে নয়- বরং নাগরিক আর সভ্য-শিক্ষিত সমাজব্যবস্থার প্রতীক বলে মনে করেন তিনি। রাজনীতিতে এসেছেন সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে। আর সংখ্যালঘু নারীদের অধিকার আদায়ে তিনি লড়বেন আজীবন- এসব কথাই ইমান ইয়াসিনকে ইসরায়েলের নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়ক হয়েছে। ইয়াসিন যে জনপ্রিয়- তা জানা ছিল ইসরায়েলের। কিন্তু জয়ী হয়ে যাবেন এমন কঠিন বাস্তবতা মেনে নেয়া কঠিন। ইসরায়েলে আরব পার্টির এ উত্থান সত্যিই নতুন ভাবনায় ফেলে দিয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

উদ্দেশ্য নিয়ে লক্ষ্য অর্জনে সততা ও মানবিক মূল্যবোধ সবচেয়ে বড় শক্তি। কঠিন পরিস্থিতি সবকিছু চিরদিন দাবিয়ে রাখতে পারে না। সময়ের প্রয়োজনেই তা এক সময় ফুঁসে ওঠে। আর তা নিপীড়িত মানুষের পক্ষেই উজ্জীবিত হয়। ইতিহাস এ কথা আবারও পুনরাবৃত্তি করল। এভাবেই নিজের লড়াকু জীবনের ভাবনার কথা উঠে আসে ইমান ইয়াসিনের ভাষায়।

জীবনযুদ্ধে জয়টিই সব নয়- বরং সবচেয়ে মধুর স্মৃতি লুকিয়ে থাকে লড়াকু জীবনের বাঁকে বাঁকে। আত্মবিশ্বাস ছাড়া লক্ষ্য দুরস্ত। এসব বিশ্বাসকে পুঁজি করেই ভবিষ্যৎ ইসরায়েলের সংখ্যালঘু মুসলিমদের কথা সারা বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করতে ইমান ইয়াসিন খাতিব যেন দৃঢ় প্রত্যয়ী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here