আত্মোপলব্ধি থেকে জিজ্ঞাসা: আমি কে?

0
307

আত্মোপলব্ধি থেকে জিজ্ঞাসা: আমি কে?
ড. পিয়ার মোহাম্মদ

আমরা কথায় কথায় আমি, আমরা বা আমার শব্দটি ব্যবহার করে যাচ্ছি। অবশেষে একদিন আমি আমি বলতে বলতে ধরাধাম ছেড়ে চলে যাচ্ছি। পড়ে থাকছে একটি অসাড় দেহ। সবাই তাকে বলছে আমার লাশ। এই লাশ দাফন করতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এই লাশের মধ্যে নিশ্চয় আমি আর নেই। তাহলে আমি কোথায় ছিলাম আর কোথায় গেলাম? আসলে আমি কে? কি আমার পরিচয়? দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন- ‘নিজেকে চেনো’। আমাদের দেশের চিরায়ত বাউল শিল্পীরা গানে গানে বলছেন- ‘আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে অচেনারে চেনা’। আরো বলছেন- ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর সেথায় একঘর পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’। তাহলে আমি কি একটি অচিন অস্তিত্ব?


নিজেকে যদি চিনতে না পেরে সারাজীবন অচিন হিসেবেই থাকলাম, তাহলে অন্যকে চেনার চিন্তা করি কীভাবে? সেজন্য সবার আগে নিজেকে চেনা জরুরি। কিভাবে চেনা যাবে নিজেকে? এটা কি আদৌ সম্ভব? খোলা চোখে দেহ ছাড়া কিছুই দেখি না আর বেশি কিছু ভাবতেও পারি না। শুধু এটুকু বুঝা যায় যে, এই দেহ একটি খাঁচা মাত্র। এটার মধ্যে অন্য কেউ আমি হিসেবে বসবাস করে। সেজন্য দেহ থেকে সেই অচেনা আমি বের হয়ে গেলে দেহ হয়ে পড়ে লাশ। সে লাশ আর নড়া চড়া করে না, কোনো কিছুই করতে পারে না। কবর পর্যন্তও তাকে যেতে হয় অন্যের কাঁধে ভর করে। সময় গেলে গলে পচে শেষ হয়ে যায়। মাটির দেহ মাটিতে মিশে যায়। সেজন্য নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই দেহ বলতে আমাকে বুঝায় না বা এই দেহ অর্থ আমি নই। বরং এই দেহ খাঁচার মধ্যে অচেনা এক আমি বসবাস করি। কে সেই অচেনা আমি? সে কি আমার কাছে অচেনা থেকেই যাবে?


মহান আল্লাহ হযরত আদম (আ.)-এর দেহ প্রথম মাটি, পানি, আগুন ও বায়ু দিয়ে তৈরি করে রোদে ৪০ দিন শুকালেন। সেই দেহ শুকিয়ে ঠন ঠন করলেও তা কিছুই করতে পারেনি। স্বয়ং আল্লাহ পাক যখন সেই অসাড় ঠন ঠনে দেহে স্বীয় রূহ ফুঁকে দিলেন, সাথে সাথে আদম (আ.) দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে গেলেন। কেননা, তখনও সে ফুঁকের প্রভাব সারা দেহে পৌঁছায়নি। এই ফুঁকের প্রভাব সারা দেহে পৌঁছানোর সাথে সাথে আদম (আ.) উঠে দাঁড়ালেন। সেই থেকেই শুরু হলো তাঁর চলা ফেরা আর চাওয়া পাওয়ার পালা। শুরু হলো জাগতিক নানান কার্যক্রম। পরবর্তীতে হযরত আদম (আ.)-এর ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বাম পাশের হাড় থেকে মহান আল্লাহ সৃষ্টি করলেন তাঁরই সহধর্মিণী হযরত মা হাওয়া (আ.)-কে। তাঁদের দু’জন থেকে জন্মগ্রহণ করে চলেছে মানুষ। পৃথিবীতে পর্যায়ক্রমে মানুষ আসছেন আবার চলে যাচ্ছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পৃথিবীতে জীবিত আছেন প্রায় ৭০০ কোটি মানুষ। আমি তাদেরই একজন। এই থেকে বুঝা যায় আমি আদম (আ.) ও মা হাওয়ার বংশধর কিন্তু তাতেও তো সমাধান হলো না আমি কে। আমি জানতে চাচ্ছি আমার ভিতরের সেই অদৃশ্য মানুষটি আসলে কে?


মহান আল্লাহ ছিলেন গুপ্ত ধনাগারে। তাঁর নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছা জাগ্রত হওয়ায় তিনি মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু করলেন। সেই কারণেই নুরে মোহাম্মদী থেকে প্রথম আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁকে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদের আদেশ দিলেন। সব ফেরেশতা হযরত আদম (আ.)-কে সিজদা করলেও ইবলিশ, যিনি ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিলেন তিনি সিজদা করলেন না। তিনি মহান আল্লাহর আদেশ অমান্য করায় শয়তানে পরিণত হলেন। হযরত আদম (আ.) থেকে বংশ পরম্পরায় মানুষের আগমন হতে থাকে। এতে আমার আগমনের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে কিছু ধারণা হলো, কিন্তু বুঝলাম না, আসলে আমি কে? আমি যে আদম (আ.)-এর বংশধর, যাকে মহান আল্লাহর আদেশে ফেরেশতাগণ সিজদা করেছিলেন। আমি সেই ‘আমাকে’ চিনতে পারছি না। এযে আমার চরম ব্যর্থতা। আমার ভিতরের মূল্যবান আসল আমাকে চেনার যে খুবই প্রয়োজন।


ইবলিশ আল্লাহর প্রতিনিধি হযরত আদম (আ.)-এর কারণে আল্লাহর অনুগ্রহ হারিয়েছে। ফেরেশতাদের শিক্ষক থেকে ঘৃণিত শয়তানে পরিণত হয়েছে। সেজন্য সেই থেকেই তার তো আদম (আ.)-এর উত্তরসুরিদের সাথে শত্রুতার শেষ নেই। সে সারাক্ষণ লেগে আছে আমাদের পিছনে। আমাদের বিপথগামী করতে সে মহাব্যস্ত। সে তো আসল আমাকে চিনতে দিচ্ছে না। কেননা আমি নিজেকে চিনতে পারলেতো শক্তিশালী হয়ে যাব। সে আর আমার পিছনে শয়তানি করতে পারবে না। সে আমাকে প্ররোচনা দিয়ে সুবিধা করতে পারবে না। আমরা নিজেকে চিনতে না পারায় এ শয়তানের হাত থেকে কেউ রক্ষা পাচ্ছি না। তার হাত থেকে রক্ষা পেতে হলেও তো আমাদের নিজেদের চেনা দরকার। সেজন্য জানা দরকার কিভাবে চিনব আমরা আমাদের। আসল আমাকে চিনতে পারছি না বলেই দেহ খাঁচাকে স্বয়ং আমি ভেবে সারাক্ষণ তার যত্ন করতে ব্যস্ত আছি।


এই দেহ যন্ত্রকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করতে সব সময় থাকছি তৎপর। দেহ যন্ত্র সুস্থ, সবল ও সতেজ করতে পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছি। এতে দেহ মোটা তাজা হচ্ছে। বারবার হাত পা আর মুখ ধুয়ে ওজু করে পবিত্র হওয়ার চেষ্টা করছি। এতে দেহ সতেজ ও পরিচ্ছন্ন হলেও আমি কি সতেজ হচ্ছি, নাকি পবিত্র হতে পারছি? তাতো হতে পারে না। কারণ এ দেহ বলতেতো আমাকে বুঝায় না। আমি আমাকে চিনতে না পারলে নিজেকে সতেজ করব কিভাবে আর পরিস্কারই বা হব কিভাবে? প্রকৃত গাছের গোড়ায় পানি না দিয়ে অন্য জায়গায় পানি ঢাললে কি গাছ মোটা তাজা হবে? আমি নিজেকে না চিনে কাকে খাওয়াচ্ছি আর কার ওজু করছি? লাশ স্বরূপ দেহের ওজু করে আমার ওজু হচ্ছে কিনা তাও বুঝতে পারছি না। তবুও আশায় আশায় করে যাচ্ছি। আমি যদি আমাকে চিনতে পারতাম, তাহলে আমাকে সতেজ ও পরিচ্ছন্ন করার কথা ভাবতাম। আমার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিতাম আর আমার প্রকৃত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ওজু করতাম। সেজন্য যে প্রথমেই প্রয়োজন আসল আমাকে চেনা। আমার স্বরূপ উদঘাটন করা।


আমি আমাকে চিনি না কিন্তু আমার মাঝে আমিত্বের কোনো অভাব নেই। সারাক্ষণ গর্বে মাটিতে পা পড়ে না। কাউকে আমার ধারে কাছে ভাবি না। আমাকে সবার সেরা ভাবতে ভালো লাগে। আমি সারাক্ষণ অন্যকে ছোটো করে নিজে বড়ো হতে পারলে আনন্দ পাই। কারো কোনো সাফল্য আমার সহ্য হয় না। মনে হয় সব সাফল্য আমার হবে সেটাই কাম্য। নিজেকে মনে হয় অনেক ক্ষমতাবান কিন্তু একবারও ভাবতে পারি না আমি বলতে যা বুঝছি তা আসলে একটি জ্যান্ত লাশ। এ সব কিছুই সম্ভব হচ্ছে আসল আমিকে চিনি না বলে। এভাবে ভুলের মাঝে জীবন চলতে পারে না। কে আমি আর কিজন্য আমার এ পৃথিবীতে আগমন তা জেনে সেই মোতাবেক চলা আবশ্যক। এতো কিছু বুঝেওতো আমার লাভ হচ্ছে না। বুঝতে পারছি না আমাকে আমি চিনব কীভাবে? আমাকে চেনার উপায় কী এতো চেষ্টা করেও তাতো জানতে পারলাম না।


এদিকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য কোনোটার প্রাধান্য নেই আমার ভিতর। আমার মাঝেতো চলছে এদেরই রমরমা রাজত্ব। এরা দখল করে নিয়েছে আমাকে। আমি হয়েছি তাদেরই বশীভূত। আমাকে আয়ত্ব করে তারা আমার নামে যা কিছু করছে কিছুই প্রকৃতপক্ষে আমার কর্ম নয়। বরং আমার ভেতরের ছয় শত্রু আমার ঘাড়ে চড়ে যত অপকর্ম চালাচ্ছে। তারা জগত সংসারে মজা করছে আর দায়ভার চাপাচ্ছে আমার ঘাড়ে। আমি মোটেই বুঝতে পারছি না। এ যে আমার চরম বোকামি। আমি এভাবে আর কতকাল বোকা থাকব। শত্রুকে না চিনে আর কতদিন তার তাবেদারী করব। আমাকে যে তাদের হাত থেকে নিজকে রক্ষা করে আমার রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সেজন্য সত্যিকার আমাকে চিনতেই হবে। আমাকে আমার রাজত্বের সর্বেসর্বা আমাকে বানাতেই হবে। তা না হলে যে আমার শান্তি নেই।

আমি নিজেকে চিনতে না পারায় আসলে আমার প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারছি না। আমি যদি আমাকে দেখতে পারতাম বা বুঝতে পারতাম, তাহলে হয়ত চোখে পড়ত আমার জীর্ণ শীর্ণ অবস্থা। আমি যে আমাকে উপযুক্ত খাবার দিতে পারিনি। দিবই বা কিভাবে? কোথায় দিব? আমিতো আমাকে চিনতে পারিনি। মনে হয় আমার মোটা তাজা দেহের মাঝে জীর্ণ শীর্ণ ‘আমি’ ভুখা আছি। এই আমাকে অভুক্ত রেখে শান্তির সন্ধানে জগতময় ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিছুই হচ্ছে না তাতে। চিন্তা করে কূল কিনারা পাই না কত অসহায় অবস্থায় অন্ধকারে আছি সেই আমি। সেই অন্ধকার থেকে বের হতে আমার যে প্রকৃত আমাকে চেনা খুবই জরুরি। কীভাবে চিনব আমি আমাকে? কীভাবে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করব আমি সেই আসল আমাকে? কেউতো আমাকে চিনাতে পারল না সেই আসল আমাকে। যাকে জিজ্ঞাস করলাম সবাই এড়িয়ে গেল। তারা ভাবল আমি কিসব আবোল তাবোল ভাবছি। আমি পাগলামি করছি। আসলে কি তাই? আমি যদি আমাকে চিনতে না পারি তাহলে চিনলামটা কী?


বিষয়টা নিয়ে আমি অনেকের সাথেই আলাপ করেছি। জানতে চেষ্টা করেছি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে কার কী ধারণা। সবাই নিজ নিজ মতো করে ‘আমি’ বলতে কী বুঝায় তা ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তাতে মনে হয়েছে মানুষ তার নিজ অবস্থান থেকেই সব কিছু ভাবতে চেষ্টা করে। নিজ পরিধির বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না। আমাকে যারা জবাব দিয়েছেন হয়ত তাদের বিষয়টি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা নেই অথবা আমি ঠিকমত তাদের প্রশ্ন করতে পারিনি। এটাই বাস্তবতা। আসলে জগৎ সংসারের মোহে পড়ে আমাদের নিজকে নিয়ে চিন্তা করার সময় কোথায়। এভাবেই চলছে পৃথিবী? এভাবেই চলছে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের জীবন। নিজেকে ভুলে সংসার করছে আল্লাহর প্রতিনিধি মানুষ। এভাবেতো উদাসীন থাকা যায় না। আমাকে যে নিজেকে চিনতেই হবে। কোথায় যাব কে বলতে পারবে আমি কে? আর দিতে পারবে আমার পরিচয়।


এক পর্যায়ে শুনতে পারলাম সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী হুজুর কেবলাজানের বাণী। আত্মশুদ্ধি আর দিল জিন্দার আহ্বান। তাতে বুঝলাম আমার দেহের ভিতর আত্মা আছে, যাকে অভুক্ত রেখে ষড়রিপুর ইন্ধনে পথ হারিয়ে অশুদ্ধ করে ফেলেছি। পরমাত্মা জীবাত্মার প্রভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সে আত্মার শুদ্ধতা প্রয়োজন। তার মাধ্যমে দিলকে জিন্দা বা সতেজ করা আবশ্যক। মনে হলো- তাহলে আত্মার শুদ্ধতাই আমার শুদ্ধতা। আর তাতেই আমি অভুক্ত ও জীর্ণ শীর্ণ থেকে সতেজ হতে পারব। ওগো দয়াল বাবাজান! আপনার কদম মোবারকে এসেছি। আপনার দয়া ভিক্ষা চাই। আমাদের দয়া করেন, আমরা যেন দিল জিন্দার মাধ্যমে নিজেদের জিন্দা করতে পারি। আমাদের অন্তর চক্ষু খুলে দিন, আমরা যেন প্রকৃত আমাদের চিনতে পারি। নিজেকে চিনে প্রকৃত ঈমানদার হয়ে নিজের করণীয় সঠিকভাবে করে মানবজীবন স্বার্থক করতে পারি। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here