আদর্শ জাতি গঠনে সূফী সম্রাটের শিক্ষা

2
410
সূফী সম্রাট হযরত মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মাঃ আঃ) হুজুর কেবলাজান ।

ড. মো. নাজমুল আলম

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। বাগানে রোপিত চারা গাছটি সুষ্ঠুভাবে বেড়ে উঠতে না পারলে ঐ গাছ থেকে ভালো ফল প্রত্যাশা করা নিবুর্দ্ধিতার শামিল। আজ যে শিশু আগামীকাল সেই জাতির কর্ণধার হবে, জাতির সমৃদ্ধিকে আরো গতিশীল করবে। কিন্তু এ শিশুটি যদি আদর্শগতভাবে বেড়ে উঠতে না পারে, তবে সে জাতির জন্য আশীর্র্বাদ না হয়ে জগদ্দলে রূপান্তরিত হবে। মানবজীবনের নানা স্তর- শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধ ইত্যাদি সময়ের মধ্যে শিশু ও কিশোরকালকে পরবর্তী জীবনের ভিত্তি বলা হয়। এ সময়ে সংসর্গ বা কুসংসর্গের প্রভাব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চরিত্রে স্থায়ীরূপ ধারণ করে নেয়। এজন্য শিশুকাল থেকেই অলী-আল্লাহগণের সাহচর্য আদর্শ চরিত্র গঠনে সর্বোত্তম পন্থা।

আদর্শ জাতি গঠনে সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেব্লাজানের শিক্ষা ও দীক্ষার ফলপ্রসূতা বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণের দাবী রাখে। জগতের বুকে অসংখ্য নবি-রাসুল যুগে যুগে প্রেরিত হয়েছিলেন হেদায়েত বা সৎ পথের নির্দেশনা প্রদান করার জন্য। যাতে মানুষ তাঁদের আনুগত্যের ও অনুসরণের মাধ্যমে মহান আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জন করতে পারে। পবিত্র কুরআনে এ পথ বা নির্দেশনাকে ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ বলা হয়েছে। মূলত নবি-রাসুল ও অলী-আল্লাহ্গণ হলেন আলোর পথের দিশারী। মানুষ এ পথের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে মহান প্রভুর জ্যোতির্ময় আলোয় নিজেকে আলোকিত করে মানবজীবনকে সার্থক করার দুর্লভ সুযোগ লাভ করেন। হযরত রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘‘তোমরা আল্লাহ্র গুণে গুণী হও।” মহান আল্লাহ্র গুণের সর্বোত্তম প্রকাশরূপে হযরত রাসুল (সা.) আমাদের মাঝে আগমন করেছেন। তাঁর দীক্ষায় উজ্জীবিত হয়েই সাহাবাগণ নক্ষত্রতুল্য হয়েছেন।

বাল্যকালে ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’ কিংবা ‘সদা সত্য কথা বলিব’ এরূপ সুবচন পঠন ও লিখনের মাধ্যমে শ্রেণী উত্তীর্ণ হলেও এ মূল্যবান বাক্যগুলোর বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত খুব অল্পই হতে দেখা যায়। একটু অনুসন্ধিৎসু হলে অনুভব করা যায় যে, সমাজে অনাচার সৃষ্টি বা শান্তির পরিবেশের প্রধান প্রতিবন্ধক হলো মানবদেহের বিরাজিত ষড়রিপু- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য। এগুলোর কুপ্রভাব মূখ্য অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। তাই বলা যায়, মনুষ্য সংগঠিত সর্বপ্রকার অন্যায়, অবিচার, হত্যা, ব্যভিচার, প্রতারণা ইত্যাদি কর্মের মূল কারণ হলো ষড়রিপু। প্রসঙ্গত ছয়টি রিপুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা ‘তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী’ গ্রন্থে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কামরিপু-কামাচারের উদ্রেককর, এর কুপ্রভাবতাড়িত হয়ে মানুষ ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। ক্রোধ রিপু- রাগ বা রাগের উৎস। ক্রোধের কু-প্রভাবে মারামারি, হানাহানি, রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞ ঘটে। লোভ হলো লিপ্ত বা লালসা। এর নেতিবাচক প্রভাবে চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি ইত্যাদি সংগঠিত হয়। মোহ বলতে বুঝায়- দুনিয়ার প্রভাব প্রতিপত্তি, ক্ষমতার জন্য ব্যাকুলতা, মূর্খতা, বিবেকশূন্যতা। মদ রিপু- হলো আনন্দ স্ফূর্তি প্রবৃত্তি। এর প্রভাবে মানুষ ধরাকে শরা জ্ঞান করে। মাৎসর্য রিপু- ঈর্ষা, হিংসা ও পরশ্রীকাতরাতার প্রবৃত্তিকে উদ্রেক করে। নিজের স্বার্থ বৈ অন্যের সমৃদ্ধিকে সহ্য করতে পারে না। (তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী, ১ম খণ্ড : পৃষ্ঠা-৪৮১)

সুতরাং আদর্শজাতি গঠনে রিপুসমূহের যথেচ্ছাচারকে সংযমী করে আত্মিক বিশোধন অনিবার্য। আত্মশুদ্ধির এ শিক্ষাকে আল কুরআনে বলা হয়েছে- তাযকিয়ায়ে নফ্স’। আল্লাহ্ বলেন- ‘‘নিশ্চয়ই ঐ ব্যক্তি সফলকাম যে তার আত্মিক পরিশুদ্ধিতা অর্জন করেছে। আর সে ধ্বংস হয়েছে যে তার আত্মাকে কলুষিত করেছে।’’ (সূরা আলা ৮৭ : আয়াত ১৪-১৫) শান্তির চরিত্র অর্জনে আত্মিক সংশোধনের শিক্ষা পূর্বাপর সর্বযুগেই তাৎপর্যময়।
‘‘প্রত্যেক নবি-রাসুলই আত্মাকে স্বচ্ছ ও দীপ্তিময় করে তোলার নিমিত্তে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দিয়েছেন। কেননা, কলুষমুক্ত পুতপবিত্র আত্মাই প্রতিবিম্বিত ও প্রতিভাত হয় পরম সত্তার মহৎ জ্যোতির্ময়রূপে।’’ (প্রফেসর ড. সৈয়দা তাকলিমা সুলতানা, সূফীবাদের আত্মপরিচয় ও ক্রমবিকাশের অন্তরায়, ২য় সংস্করণ, সূফী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-৮) তাই আত্মাকে ষড়রিপুর নিগূঢ় থেকে অবমুক্ত করা শান্তিকামী আদর্শ জাতি গঠনের পূর্বশর্ত। এ দীক্ষায় দীক্ষিত হয়েই রাসুল প্রেমিক সাহাবিগণ হিংসাবিদ্বেষ হানাহানি ইত্যাদি ত্যাগ করে পরার্থপরতার মূর্ত প্রতীক হয়ে আছেন। মহান সংস্কারক, সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) মোর্শেদ কেব্লাজান সর্বোত্তম সহজ পদ্ধতিতে প্রত্যক্ষভাবে ব্যক্তিকে আত্মশুদ্ধি দীক্ষা দিচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে, সাধক নিজ পরিশুদ্ধিতার মাধ্যমে ধাপে ধাপে স্রষ্টার জ্যোর্তিময় নুর অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান হতে সক্ষম। এজন্য প্রয়োজন একজন মোকাম্মেল মোর্শেদের সাহচর্য। কারণ, আত্মাশুদ্ধ করতে মোর্শেদের হৃদয় থেকে মুরিদের হৃদয় বা ক্বালবে ফায়েজ হাসিল করতে হয়। কোনো যুগেই নবি-রাসুলগণের এ দীক্ষার কোনো ব্যত্যয় হয়নি। আত্মশুদ্ধির শিক্ষা ‘এলমে তাসাউফ’ বা তাযকিয়ায়ে নফস’ বিষয়টি সূফী সম্রাট মোর্শেদ কেব্লাজানের মাধ্যমিক স্তর থেকে বিশ^বিদ্যালয় পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে সর্বোচ্চ শ্রেণিতে অন্তর্ভূক্ত করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা সম্পর্কে জানার সুযোগকে আরো প্রসারিত করেন।

সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী হুজুর কেব্লাজান স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন জীবনবাজি রেখে মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করেন, তেমনি এখনও নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন কিভাবে মানুষ ষড়রিপুর বেড়াজাল হতে মুক্ত হয়ে আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান হবে এমন সুমহান মহৎ কর্মে। আত্মশুদ্ধি তথা চরিত্র গঠনের এ শিক্ষাটি যদি শৈশব-কৈশোর বয়স থেকে মোকাম্মেল মোর্শেদের সান্নিধ্যে এসে অর্জন করে তবে এ শিশুটাই একদিন জাতির জন্য আশীর্বাদ হবে। মহান প্রভুর নুরানীময় চরণ মোবারকে প্রার্থনা তিনি যেন করুণা করে এ জাতির প্রতিটি সন্তানকে মোকাম্মেল মোর্শেদের আনুগত্য করে চরিত্রবান হওয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here