আধুনিকতা: সময় এবং শিল্পের পরিপ্রেক্ষিত

0
188

সৈয়দ আলী আহসান

আমি এ মুহূর্তে যে সময়ের মধ্যে বাস করছি সে সময়টি আমার অবস্থানের এবং বোধের সীমানা নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে। আমি আমার সময়কালে সকল ঘটনার সাক্ষী, আমি আমার সময়কালে সকল আবিষ্কারের লক্ষ্য এবং আমি আমার সময়কালের সকল বিশ্বাসের অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার এবং সাক্ষ্য আমার অনুভূতিকে একদিকে যেমন শাসন করে, আবার অন্যদিকে, পশ্চাতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে সাহায্য করে। আমি যে অবস্থায় যেখানেই বাস করি না কেন, আমার কাছে কিন্তু অতীতের ইতিহাস সুস্পষ্ট, আমি অতীতকে গ্রহণ করি বা না করি, অতীত আমার কাছে অনুকূল না প্রতিকূল এ সমস্ত চিন্তা এবং বিবেচনার অধিকার আমি পেয়ে থাকি বর্তমান সময়ের অঙ্গীকার থেকে। আমি আধুনিকতা বলতে বুঝি বর্তমান সময়ের সর্বপ্রকার চৈতন্যকে। এ চৈতন্য একই সঙ্গে প্রকাশ্যে পরিস্ফূট জীবনের এবং অন্তর্লীন মানসলোকের। প্রকাশ্য জীবনকে আমারা দৃষ্টির অধিকারে গ্রহণ করে থাকি এবং এ প্রকাশ্য জীবনে বিজ্ঞান আছে, প্রকৌশল আছে, নির্মিতি আছে, আবার প্রকৃতির বহুমাত্রর ঔদার্য আছে, তেমনি আবার মানস-চৈতন্যের মধ্যে ঐতিহ্যবোধ আছে, বিশ্বাসের পরিমিতি আছে এবং জ্ঞানের অধিকার আছে। সুতরাং আধুনিকতার চৈতন্য অত্যন্ত ব্যাপক, বিস্তৃত এবং গভীর।
একজন মানুষ তার দৃষ্টির অধিকারে পৃথিবীকে গ্রহণ করে। এ অধিকারটি একই সঙ্গে দু’রকম: একটি হচ্ছে দর্শনজাত, অপরটি উপলব্ধিজাত। যা আমাদের দৃষ্টিতে পড়ে, তাকে আমরা নির্ণয় করি কখনও গণিতের সাহায্যে, কখনও পরিমাপের সাহায্যে, কখনও বিবৃতির সাহায্যে, আবার কখনও কল্পনার স্পর্শ দিয়ে। আমরা যা দেখি তার কিছু অংশ বাস্তব, আবার কিছু অংশ কাল্পনিক। কল্পনা হচ্ছে বোধ ও অনুভূতির সাহায্যে বাস্তবের এক নব নির্মিতি। এই নির্মিতিটা ধরা পড়ে চিত্রকলায়, কবিতায়, ভাস্কর্যে এবং স্থাপত্যে। একজন শিল্পী তার দৃশ্যমান জগতকে তার দৃশ্যমান অনুভূতির সাহায্যে প্রশ্ন করে থাকে এবং এ প্রশ্নের সাহায্যে যে উত্তরটি গড়ে ওঠে সে উত্তরটি বিভিন্ন রূপ নিয়ে থাকে; কখনও কবিতা হয়, কখনও রূপবান ছবি হয়, কখনও একটি শূন্যস্থানে একটি অট্টালিকার আকৃতি হয়। ইংরেজি ভাষায় এটাকে দুটি শব্দের দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একটি হচ্ছে পারসেপশন, আরেকটি হচ্ছে এক্সপ্রেশন। পারসেপশনকে আমরা প্রত্যক্ষকরণ বলতে পারি যা হচ্ছে একজন মানুষের প্রত্যক্ষ দৃষ্টির অনুভূতি। এক্সপ্রেশন হচ্ছে অভিব্যক্তি, যা প্রতীকগতরূপে কখনও শব্দে, আবার কখনও বস্তুগত নির্মিতিতে প্রকাশ্য হয়। এ পৃথিবীতে মানুষ নানারূপে পার্থিব বস্তুকে দেখে থাকে এবং সকলের দেখা এক রকমের হয় না। আবার সকল কালের দেখাও একই রকমের নয়।

যে প্রকৃতি পৃথিবীর আদি থেকে আছে সে অর্থে সনাতন, সে প্রকৃতিও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম হয়ে পড়ছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এক সময়ের বনাঞ্চল পরবর্তী সময়ে কলরবমুখর জনপদে পরিণত হয়। এক সময়কার নদী এবং পুকুর পরবর্তী সময়ে ভরাট হয়ে ক্রীড়া ক্ষেত্রে পরিণত হয়, এক সময়কার শীতল আবহাওয়া হয়তো অন্য এক সময়ে গ্রীষ্মের দাবদাহে পরিণত হয়। মোটকথা, আধুনিক সময় একেক কালে একেক রকম। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শৈশবে যে নির্জন পথঘাট দেখেছিলেন, কোলাহল শোনেননি এবং প্ষ্কুরিণীতে স্নানরতা কয়েকজন রমনীকে দেখেছিলেন। তিনিই তাঁর পরিণত বয়সে জোড়াসাঁকোতে এ দৃশ্য আর দেখেননি। আমরা এভাবেই দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যাই। এ দৃশ্যান্তর সম্পর্কে মিলিন্দ পইনহোতে একটি সুন্দর প্রশ্নোত্তর আছে। গ্রীক সম্রাট মিলিন্দ অর্থাৎ মিরান্ডার বুদ্ধের সেবক নাগ সেনকে প্রশ্ন করেছিলেন: “মানুষের সতত পরিবর্তনশীলতার তাৎপর্য কি?” অর্থাৎ পুনর্জন্ম কি? নাগ সেন উত্তরে বলেছিলেন: “মহারাজ, আপনার একটি শৈশব ছিল, আপনার একটি যৌবন ছিল এবং বর্তমানে আপনি একজন পরিণত বয়সী, শৈশবের আপনি, যৌবনের আপনি এবং বর্তমানের আপনি এই তিনজন কি একই রিপুর অধিকারী? না, মহারাজ তা নয়, আপনাকে অনবরত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে এবং আপনার জীবনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বোধ মূর্তি লাভ করেছিল। বর্তমানে আপনি একজন অন্য মানুষ। মৃত্যুর পরও আপনার পরিবর্তন চলতে থাকবে বহু অয়নের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে অবশেষে নির্বাণে তার পরিসমাপ্তি ঘটবে।” নাগ সেনের কথা থেকে আমরা যে সত্যটি পাচ্ছি তা হচ্ছে মানুষের জীবনে সময় বিভিন্ন কালে বিভিন্ন রকম এবং বিভিন্ন মুহূর্তে বিভিন্ন প্রকৃতির। কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়কালে যে বোধ এবং দৃষ্টির সীমায় আবদ্ধ ছিলেন এখনকার দিনের আমরা অবকিল সেই বোধ ও দৃষ্টির সীমার মধ্যে আবদ্ধ নই। আমরা পৃথিবীতে এমন একটি চলাচলের মধ্যে বাস করি তা সতত পরিবর্তন এবং বিভিন্ন মুহূর্তে বিভিন্ন অঙ্গীকারে অভিষিক্ত।

আধুনিককালে মানব জীবনের যে পরিবর্তনটা এলো সে পরিবর্তনটির সূচনা হয় প্রথম মহাযুদ্ধের কিছুটা পূর্ব দিকে। ১৯১৪ সালের পূর্ব দিকে ইউরোপীয় সভ্যতায় কেমন একটি সংক্ষুবদ্ধতা জেগে উঠেছিল। এই সংক্ষুবদ্ধতার প্রভাব পড়ে শিল্পকলার উপর এবং সাহিত্যের উপরে। এরফলে শিল্পে ও কাব্যে যে পরিবর্তন আসে তাকেই আমরা বর্তমানকালের আধুনিকতা বলে থাকি। যে কোনো সময়ে কবি এবং শিল্পীর প্রধান কর্তব্য হচ্ছে কিছু সমস্যার সমাধান করা। সে সমস্যা আঙ্গিকের হতে পারে, কল্পনারও হতে পারে। কবি ও শিল্পীরা যখন সমস্যার সম্মুখীন হন এবং সমাধান দেবার চেষ্টা করে থাকেন তখন সে সমস্ত সমাধানের ফলে শিল্পগত সকল প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না, বরং নতুন বিবেচনার জন্ম হয় এবং সেই সমাধান থেকে আগামীকালের জন্য একটি নতুন সমস্যারও উদ্ভাবনা জাগে। একজন শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে যুগের প্রাণধর্মকে আবিষ্কার। এ আবিষ্কারের চেষ্টায় তিনি যুগের ঘটনা পরম্পরাকে স্পর্শ করেন, কিন্তু তার মধ্যে আবদ্ধ থাকেন না। রাজনৈতিক চেতনায় পরিবর্তন অথবা সমাজ ব্যবস্থায় একটি নবলব্ধ বিশ্বাস এগুলোর একটা আকস্মিকতা আছে এবং এই পরিবর্তনগুলোর দ্বারা কোনো সমাজ বা জাতির বিচার চূড়ান্তভাবে একটি ব্যতিক্রমী প্রসঙ্গও নির্মাণ করে না। যেহেতু শিল্পের মূল নির্ভরতা হচ্ছে মানুষের একটি অন্তর্গূঢ় চৈতন্য কবি বা শিল্পী প্রত্যক্ষ বস্তুর প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন না করে মানববোধের সত্য স্বরূপকে আবিষ্কার করতে তৎপর হন। আমি বলতে চাচ্ছি, কবি এবং শিল্পী মানুষের চেতনলোকে সকলের চেয়ে অধিকতর অগ্রসর। তারা সর্বকালেই সমস্ত চৈতন্য এবং অনুভূতির পুরোভাগে থাকেন। যেমন প্রকৃতির বর্ণ- বৈচিত্র্যকে তারা অনুভব করেন তেমনি মানুষের অস্থিরতা, যন্ত্রণা, আগ্রহ ও প্রশান্তিকে তারা সহজেই অনুভব করেন। এভাবে কবি এবং শিল্পীগণ একটি জাতির চূড়ান্ত সচেতনতাকে বহন করেন। (চলবে)

[লেখক: জাতীয় অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here