আধ্যাত্মিক কবি হাফিজ ও তাঁর কবিতা

0
480

অধ্যাপক ড. তারিক সিরাজী
কবি হাফিজ (১৩২৫-১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ) শুধু ইরানেরই নয়; বরং সমগ্র বিশ্বের প্রথিতযশা কবিদের একজন। তিনি ইরানের শিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম হলো শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ হাফিজ শিরাজী এবং কবি নাম বা ভনিতা হলো হাফিজ। তাঁর পিতা বাহাউদ্দীন ছিলেন ইসফাহানের একজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী। পরবর্তীকালে তিনি ইসফাহান ত্যাগ করে শিরাজে চলে আসেন। তাঁর মা ছিলেন কাজরুনের অধিবাসী। তাঁর দুই ভাই ছিল যারা তাঁর চেয়ে বয়সে বড় এবং বয়ঃপ্রাপ্তির পর তারা শিরাজ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু হাফিজ মায়ের সাথেই আর্থিক সংকটের মধ্যে শিরাজে থেকে যান এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি শিরাজেই অবস্থান করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ‘খাকে মুসাল্লা’ নামক স্থানে দাফন করা হয়।

হাফিজের শৈশব খুব একটা সুখের ছিল না। কারণ, পিতৃহারা হাফিজকে সংসারের দায় শৈশবেই বহন করতে হয়েছিল। যে কারণে অর্থ উপার্জনের বোঝা তিনি মাথায় পেতে নিয়েছিলেন। প্রসিদ্ধ ইরানি লেখক ও সাহিত্যিক আব্দুন্নবী তাঁর মেইখানে নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হাফিজ স্থানীয় একটি রুটির দোকানে কাজ করতেন আর এখান থেকে লব্ধ অর্থ দিয়েই দিনযাপন করতেন। এই রুটির দোকানের পাশেই একটি বিদ্যালয় ছিল যেখানে কাওয়াম উদ্দিন আবদুল্লাহ (মৃত্যু ৭৭২ হি.) নামে একজন প্রসিদ্ধ আলেম শিক্ষা দান করতেন। হাফিজ রুটির দোকানে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর কাছ থেকে বিদ্যার্জন করতেন। শুধু প্রাথমিক শিক্ষাই নয়, বরং কুরআন হেফ্জ করা থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও দর্শনশাস্ত্রেরও জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর ধীরে ধীরে ইসলামের বিধি-বিধান ও সাহিত্য সংক্রান্ত জ্ঞান নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে শুরু করেন। যেহেতু সেকালে সাহিত্যের জ্ঞান শরীয়তের জ্ঞান লাভের পটভূমি ছিল, সেহেতু তিনি ধর্মীয় জ্ঞানেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেন। হাফিজের যুগে শিরাজ ছিল ধর্মীয় জ্ঞান ও কবি-সাহিত্যিকদের আবাসভূমি। এই বিষয়টি তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানার্জনে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করে।

হাফিজ উপরিউক্ত শিক্ষক ছাড়াও শামসুদ্দীন আবদুল্লাহ শিরাজী ও কাজী এযদুদ্দীন আবদুর রহমান ইয়াহইয়ার নিকট থেকে দর্শন ও তাসাউফের জ্ঞান অর্জন করেন। জানা যায়, হাফিজ চল্লিশ বছর পর্যন্ত বিদ্যার্জনে রত ছিলেন। কুরআন কণ্ঠস্থকরণ ও কুরআনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণেই অবশেষে ‘খাজা হাফিজ’ নামে তিনি অভিহিত হয়েছিলেন। তাঁর কাব্যের ছত্রে ছত্রে এই কুরআনের প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। হাফিজ নিজেই এ ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন : হে হাফিজ! তোমার বক্ষে ধারণকৃত এই কুরআনের চেয়ে সুন্দর ও সুমিষ্ট বাণী আর কিছুই দেখি নি।

ইরানিরা কবি হাফিজকে আদর করে ‘বুলবুলে শিরাজ’ অর্থাৎ শিরাজের বুলবুল বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তারা হাফিজকে লেসানুল গায়েব (অজ্ঞাতের বাণী), তরজমানুল আসরার (রহস্যের মর্ম সন্ধানী) প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করে থাকেন।

হাফিজ ছোটবেলা থেকেই কাব্যচর্চায় অনুরক্ত হয়ে পড়েন। আবদুন্নবী তাঁর মেইখান গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, শিরাজে যেখানে তিনি অবস্থান করতেন তার সন্নিকটে একটি বাজার ছিল। বাজারে একজন বড় বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। যিনি ছিলেন কাব্যপ্রেমিক ও রসিক প্রকৃতির লোক। যেখানে রসিক কবি-সাহিত্যিকরা এসে জড়ো হতেন এবং কাব্যচর্চায় মুখরিত থাকতেন। হাফিজও এখানে যাতায়াত করতেন এবং সমকালীন কবিদের সংস্পর্শ লাভ করতেন। তাঁর কাব্যচর্চা দেখে অনেক সময় বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করত। উল্লেখ্য যে, তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খোদায়ী প্রেমের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। কেননা, এ খোদায়ী প্রেমই কাব্য সাধনায় তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল।


হাফিজের মতে প্রেম-ভালোবাসা এমন এক ঐশী চেতনা যা মানুষকে তার প্রেমের মূলে তথা প্রেমাস্পদের সান্নিধ্য লাভে উদ্বুদ্ধ করে। স্রষ্টার আকর্ষণ তার মধ্যে এমনিভাবে এক বিশাল আকার ধারণ করে যে, সৃষ্টির যে কোনো সৌন্দর্যই তাকে স্রষ্টার স্মরণে আকুল করে তোলে। কবি হাফিজ এ প্রেমকে এমন এক মূল্যবান অর্ঘ্য বলে মনে করেনÑ যার প্রাপ্তি কেবল তার প্রেমাস্পদের একান্ত অনুগ্রহেই সম্ভব। হাফিজ মনে করেন, তাঁর মাঝে যে ঐশীপ্রেম বিদ্যমান রয়েছে তা কেবল তাঁর স্রষ্টার বিশেষ অনুগ্রহ ও দান। বিশ্বলোকের অপরাপর প্রাণিকূল এ অনুগ্রহ ও দান থেকে বঞ্চিত। হাফিজের কবিতা ও গজলের ছত্রে ছত্রে সেই প্রেমের দৃষ্টান্ত ও প্রতিভাস বিলক্ষণ খুঁজে পাই। লৌকিক প্রেমের পাশাপাশি তিনি স্বর্গীয় প্রেমকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে হাফিজের ভাষায় এ প্রেম কোনো সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। প্রেম সলিলে অবগাহন করতে হলে প্রেমিকের জন্য যে অফুরন্ত ও অসীম সাধনার প্রয়োজন রয়েছে তা তাঁর কাব্যে ভাস্বর হয়ে ফুটে উঠেছে। হাফিজ বলেন
“হায় বধুয়া! দাও পেয়ালা ঢালো শারাব মধুক্ষর
সহজ ছিল পথটি প্রেমের দেখছি এখন কাঁটা ভরা।
ভেবেছিলাম ভোর বাতাসে কস্তুরী-বাস আসবে ভেসে
বধুর চিকন চিকুর হতে, কলজে হলো ঘায়েল শেষে” (হাফিজ, ১৯৮ : ১৭)

হাফিজের একটি দিভান তথা কাব্যসমগ্র রয়েছে। এতে আছে গজল ও রুবায়িসহ নানা আঙ্গিকের কবিতা। কিন্তু হাফিজ গজল রচনা করেই বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন এবং গজল রচনায় তাঁকে ফারসি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলা হয়ে থাকে। হাফিজ মধুর কণ্ঠে ও সুললিত ভাষায় তাঁর গজলসমূহে সুফি তত্ত্বই বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর কবিতার মধ্যে বসন্ত, গোলাপ, বুলবুল, মদ, যৌবন, সৌন্দর্য এবং বিশেষ করে প্রেমিকা ও প্রেমাস্পদের রূপ, গুণ ও দোষের বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু তাঁর এ সকল বর্ণনা রূপকভাবে খোদার প্রতি ভালোবাসার অপূর্ব কাহিনী মাত্র।

হাফিজের গজল শেখ সাদির প্রেমময় বিষয়বস্তু এবং ফরিদ উদ্দিন আত্তার ও মাওলানা রুমির আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তুকে ধারণ করে আছে। এছাড়া কবি সানায়ির সামাজিক ও সমালোচনামূলক বিষয়ও তাঁর কাব্যে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে তিনি কাসিদার ন্যায় স্তুতি বর্ণনায়ও পারদর্শী ছিলেন। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রভু, প্রেমাস্পদ ও প্রশংসিত ব্যক্তি। তাই তাঁর কবিতা সাদির গজলের ন্যায় দ্রুত বুঝা যায় না এবং মাওলানা রুমীর প্রতীকী কবিতার মতো তা বুঝতে কঠিন বলেও মনে হয় না। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই হলো আধ্যাত্মিক সুলভ। হাফিজ তাঁর কবিতাগুলোকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন যাতে পাঠক তৎক্ষণাৎ তা থেকে একটি কল্পিত ভাব গ্রহণ করতে পারে।

হাফিজের কবিতার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো কবিতার শ্লোকগুলোর সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক। তাঁর গজলগুলোতে একটি নীরব চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। হাফিযের গজলে পদগুলোর ধারাবাহিকতায় একটি পঙ্ক্তি বা ছত্রের সাথে অপর একটি পঙ্ক্তি বা ছত্রের বিষয়বস্তুগত পারম্পর্য বাহ্যিকভাবে লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু যখন কোনো অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁর পুরো একটি গজলের বিষয়বস্তু হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন তখন তিনি একটি শ্লোকের সাথে অপর শ্লোকের বিষয়বস্তুরগত যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে তা অনায়াসে বুঝতে পারবেন।

হাফিজ তাঁর কাব্যে শুধু রূপক প্রেমের বর্ণনাই করেন নি, বরং কবিতার কাঠামো নির্মাণে বিভিন্ন প্রকারের সাহিত্যালংকারের এমন প্রয়োগে দেখিয়েছেন যা তুলনা রহিত। তিনি তাঁর কবিতার শ্লোকগুলোতে ইহাম (দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্য বা পরোক্ষ ইঙ্গিত), এস্তেখ্দাম (একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ), তাশ্বিহ (উপমা বা সাদৃশ্য), তাজনিস (সাদৃশ্য), কেনায়া (রূপক) অত্যন্ত দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে ইহাম তথা দ্ব্যর্থবোধক শব্দ তাঁর কবিতায় বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি তাঁর কাব্যে সুন্দর-সুন্দর উপমা ও উৎপ্রেক্ষা বর্ণনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাছাড়া আরবি ও ফারসি সাহিত্যের একটি বড় বিষয় হচ্ছে কাফিয়া তথা অন্ত্যমিল। এ অন্ত্যমিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। যেমন:
সতেজ, রক্তবর্ণ মণি বিশেষের ন্যায় আমার বন্ধুর ঠোঁট রক্তপিপাসু
এবং আমার কর্তব্য তাকে পেয়ে আত্মোৎসর্গ করা।
বিদ্রূপাত্মক ও সমালোচনাধর্মী বিষয়গুলোও তাঁর দিভানে বহুল পরিমাণে পরিলক্ষিত হয় এবং সাধারণত তিনি কপট ও বকধার্মিকদেরকে শ্লেষমিশ্রিত ভাষায় সমালোচনা করেছেন।

চৈন্তিক ও মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাফিজের কবিতা হলো ‘নেযামে রেন্দি’ তথা সূক্ষ্মদর্শী তাপসের জীবন পদ্ধতি। রেন্দি হলো বাকচাতুর্যে পটু এমন একজন তাপস ব্যক্তি বা সূক্ষ্মদর্শী আরেফ, যিনি চিন্তা ও কর্মে প্রেম বা এশ্কের ওপর নির্ভর করে থাকেন। এমনিভাবে এশ্্ক শব্দটি প্রায়শই তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং তা প্রায় ২৩৪ বার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। হাফিজের ভাষায় মূলত রেন্দির সাথে এশকের একটা পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে, সাধারণত সে কারণেই এ শব্দ দুটি তাঁর কাব্যে একত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, শরাবের বর্ণনা হাফিজের কাব্যে অসংখ্যবার এসেছে। কারণ এটাই যে, হাফিজ ‘শরাব’-কে দুঃখ-বেদনার উপশম হিসাবে মনে করেছেন। তাঁর নিকট এটিই একমাত্র বস্তু যার মাধ্যমে জীবনের যত রকমের তিক্ততা ও বিস্বাদ আছে তা বিদূরিত করা যেতে পারে। যেমন হাফিজ বলেন:
হে সাকী! ওঠ, আমাকে শরাবের পেয়ালা দাও,
আর দুঃখের দিনের শিরে ধূলি নিক্ষেপ কর।

হাফিজের কাব্যে এই যে উন্মত্ততার বহিঃপ্রকাশ তার অন্তর্নিহিত ও গূঢ় রহস্য অত্যন্ত ব্যাপক। তাঁর এই উন্মত্ততা এই জন্য নয় যে, তিনি কিছুক্ষণের জন্য শরাব পান করে নিজেকে অসাড় ও তন্ময়গ্রস্ত করে তুলবেন, বরং তিনি চাচ্ছেন এই প্রেম মদিরা পান করে নিজেকে সতেজ-সজীব ও প্রাণবন্ত করে তাঁর প্রেমাস্পদের বা আরাধ্যের সমীপে উপস্থিত হবেন। এছাড়া তিনি চাচ্ছেন এই প্রেমের শরাব পান করে তাঁর মধ্যে এমন একটি যোগ্যতা সৃষ্টি করবেন যাতে তিনি একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে প্রেমাস্পদের সম্মুখে হাজির করতে পারেন।
আমরা প্রবন্ধের প্রারম্ভে উল্লেখ করেছি যে, হাফিজ দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত জ্ঞান সাধনা করেছেন যা তাঁর নিজের গজল থেকে উদ্ধৃত করা যেতে পারে:
দীর্ঘ চল্লিশ বছরের সাধনায় আমার অন্তরে
যে জ্ঞান-বৈশিষ্ট্য সঞ্চিত হয়েছে,
ভয় হয়, না জানি প্রেয়সীর চোখের চাহনি
তা হরণ করে নিয়ে যায়।

কাব্যচর্চার পাশাপাশি তাঁর এই জ্ঞানচর্চা নিছক কোনো বৈষয়িক জ্ঞান ছিল না। অধিকন্তু ক্ষেত্রে তা ছিল অধ্যাত্ম বা পরমার্থ জ্ঞান। তবে এই আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে হাফিজ মুরশিদের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেছেন বিধায় তিনি বাহাউদ্দিন নকশেবন্দীসহ একাধিক প্রসিদ্ধ সুফির সংস্পর্শে সময় ব্যয় করেছেন। এ ব্যাপারে হাফিজের মত হচ্ছে এই মুর্শিদ ব্যতীত প্রেমের পথে পা বাড়িও না। এ পথের পথপ্রদর্শক (সালেক) বা মুর্শিদ না পেলে পথিককে পথভ্রান্ত হতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সতর্কতা অপরিহার্য। কারণ, গুরু চিনতে ভুল করলে শিষ্যের জীবনে ভ্রান্তি, ভ্রষ্টতা ও বিচ্যুতি নেমে আসা একান্তই স্বাভাবিক। হাফিজ বলেন:
তোমার খাঁটি পীর যদি বলে তবে শরাব রং-এ তোমার মুসাল্লা রাঙ্গিয়ে নাও,
কেননা, সালেক মানযিলের পথ-পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত।
হাফিজ তাঁর কাব্যে সুরা-সাকী প্রভৃতি শব্দ কতটা রূপক (অপ্রকৃত) বা প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে বলে অনেকে মনে করেন।

গোঁড়াপন্থীরা যাই বলুন, হাফিজ যে একজন ধর্মপ্রাণ, খোদাভক্ত মুসলমান ছিলেন, তাঁর রচিত কাব্যের বহু স্থানে সেই সত্য বিক্ষিতপ্তভাবে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাফিজের ইন্তেকালের পর জানাযা নিয়ে গোঁড়াপন্থী ও উদারপন্থীদের মধ্যে যে বিরোধ উপস্থিত হয়েছিল তা উল্লেখযোগ্য। গোঁড়াপন্থীরা হাফিজকে ধর্মদ্রোহী শারাবখোর বলে তাঁর জানাযা দিতে অস্বীকার করে এবং এ নিয়ে হাফিজের উদারপন্থী ভক্তবৃন্দের সাথে তাদের বিবাধ ঘটে। কতিপয় লোকের হস্তক্ষেপের ফলে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, হাফিজের রচিত কবিতা একত্র করে সেখান থেকে যে কোনো একটি কবিতা তুলে দেখা যাক, এ সম্বন্ধে তিনি কিছু লিখে গেছেন কি-না। তাই করা হলো এবং যে কবিতাটি প্রথম তুলে নেয়া হলো তা হলো:
হাফিজের জানাযা থেকে ফিরে যেও না ভাই
যদিও সে পাপে মগ্ন রয়েছে তথাপি বেহেশতে পাবে ঠাঁই।

এ কবিতা উদ্ঘাটনের পর হাফিজকে ‘লেসানুল গায়েব’ বা অদৃষ্টের রসনা বলে স্বীকার করে উভয় দল মহাসমারোহ ও সম্মানের সাথে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। অনেকের বিশ্বাস এখন পর্যন্ত কেউ তাঁর দিভান খুলে দিভানের যে কবিতার ওপর প্রথম দৃষ্টি পড়ে, সে কবিতায় তার ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত লাভ করে।
হাফিজ তাঁর গজল ও রূবাইগুলোতে বিশুদ্ধ প্রেমের মাহাত্ম্য ও খোদাপ্রাপ্তির তথা খোদার নৈকট্য লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন। হাফিজের কাব্যে কোথাও ধর্মের ভান বা প্রতারণার অবকাশ নেই। তাঁর মতে খোদার প্রেমে অবগাহন করে যে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারে সেই প্রকৃত খোদাপ্রেমিক। ধর্মের নামে প্রতারণা বা ভান করা সম্পর্কে হাফিজ বলেন :
কপটতা ও প্রতারণার আগুন ধর্মের ভান্ডারকে অবশ্যই জ্বালিয়ে ফেলবে,
হে হাফিজ! এ দরবেশি পোশাক পরিত্যাগ করে সামনে অগ্রসর হও।

বাহারে হেজাজ (কবিতার এক প্রকার ছন্দের নাম) ছন্দে লিখিত কবি হাফিজের এই শ্লোকটি অথবা অনুরূপ আরো অনেক শ্লোকই তাঁর শব্দচয়ন, ভাষা-ছন্দ ও অলংকারের নিপুণতার স্বাক্ষর বহন করে।
তিনি আরো বলেন, মুখে যা কিছু উচ্চারিত সেটাই প্রেমের কথা নয়, হে সাকী! ঢালো শরাব আর সংক্ষিপ্ত কর তোমার কথাবার্তা।

প্রেম-বিরহ এবং মায়ামমতায় ঘেরা এই নশ্বর পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তুচ্ছ ও অনর্থক নয়। মানুষের জীবনে সুখ-শান্তির পাশাপাশি বিরহ-বেদন, দুঃখ-যাতনা অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। মানুষ এই পৃথিবীতে স্বপ্নের তাজমহল গড়তে চেষ্টা করে। সংসার গড়ে। স্ত্রী-পুত্র পরিজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। আর এ পথ ধরে মানুষের জীবনে আসে নিরবচ্ছিন্ন প্রেমের তাগাদা। কবি হাফিজের জীবনও হয়তো এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাই আমরা তাঁর যৌবনের শুরুতেই দেখতে পাই শাখ-ই-নাবাতের মত এক প্রেয়সীর সান্নিধ্য লাভের একান্ত বাসনা। কবির জীবনে এটা কতটা সত্য তা আমরা জানি না, তবে জীবনীকাররা এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন।

হাফিজ সংসার ধর্ম যাপন করেছেন যে কথা আমরা উপরে উল্লেখ করেছি। তাঁর পুত্রসন্তান ‘বুলবুল’ অকালে প্রাণ হারালে হাফিজ তার জন্য ক্রন্দন করেছেন। হাফিজ বলেন :
“ওরে হৃদয়” তুই দেখেছিসÑ পুত্র আমার আমার কোলে
কি পেয়েছে এই সে রঙিন গগণ-চন্দ্রাতপের তলে।
সোনার তাবিজ রূপার সেলেট মানাত না বুকে রে যার,
পাথর চাপা দিল বিধি হায় কবরের সিথানে তার।” (নজরুল, ১৯৯৬: ৪৩)

কবির জীবনে প্রেমের এই যে বিচিত্র লীলাখেলা তা কতটা লৌকিক আর কতটা স্বর্গীয় তা নির্ণয়ের ভার হাফিজের বোদ্ধা পাঠক ও সমালোচকদের ওপরেই ছেড়ে দেয়া ভালো। তবে তিনি যে যৌবনের প্রারম্ভেই এই প্রেমসাগরে অবগাহন করেছেন তা তাঁর কাব্যে বিচিত্রভাবে বিধৃত হয়েছে। হাফিজ বলেন:
শিরাজের সেই তুর্কী তন্বী যদি আমার হৃদয় হরণ করে
তবে তার কালো তিলের তরে সমরকন্দ ও বোখারা দান করে দেব।
ওগো সাকী, অবশিষ্ট শরাবটুকু আমায় দাও, কেননা বেহেশতে
রোকনাবাদের স্রোতস্বতী ও মোছাল্লায় পুষ্প উদ্যান মিলবে না।

হাফিজ আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন হলেও দেশ, দেশের মাটি ও মানুষকে গভীর অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। এই ভালোবাসা ছিল যেমনি সনাতন তেমনি নির্বিশেষ। হাফিজ শিরাজের লোক। শিরাজকে তিনি কীভাবে ভালোবেসেছেন তার নির্দশন আমরা খুঁজে পাই তাঁর কবিতার পরতে পরতে। কবি হাফিজ জীবনভর শিরাজ নগরীর সঙ্গে তাঁর অন্তরকে বেঁধে রেখেছিলেন। যেমন তিনি বলেন:
যদিও ইসফাহান হচ্ছে সঞ্জিবনী সুধা, কিন্তু আমাদের শিরাজ হচ্ছে
ইসফাহানের তুলনায় সহস্রগুণে শ্রেষ্ঠ।
শিরাজ নগরী তুলনাহীন, তার প্রশংসা আর কত করব
হে খোদা! যে কোনো ধরনের পতন থেকে একে রক্ষা কর।

তিনি সব সময়ই এ সবুজ শ্যামল ও সুখময় স্থান তথা তাঁর স্থায়ী বাসস্থানের সঙ্গে নিজের অন্তরকে বেঁধে রেখেছিলেন। জানা যায় তিনি একবার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কিন্তু শিরাজ থেকে ইয়ায্দ পর্যন্ত পৌঁছেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর প্রিয় শিরাজ নগরীকে বার বার স্মরণ করেন এবং বলেন:
সেই সৌভাগ্যপূর্ণ দিনগুলো কখন ফিরে আসবে,
যখন আমি এই বিরাণ ভূমি থেকে প্রত্যাবর্তন করতে পারব?
কখন সে দুঃখ-বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং প্রিয়তমার সাক্ষাৎ লাভ হবে?
আলেকজান্ডারের জেলখানার আতংকে আমার অন্তর সংকীর্ণ ও আড়ষ্ট হয়ে গেছে,
কখন সফরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করব
কখন সোলাইমানের নগরীতে প্রত্যাবর্তন করব?

কবি রচিত এই কবিতাগুলোতে আধ্যাত্মিকতা চিন্তা করলে কবির অন্তরের গভীর অনুধ্যান কী তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এখানে উল্লিখিত দ্বিতীয় শ্লোকটির ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, ইতিহাস এবং প্রাচীন উপাখ্যানসমূহে লিপিবদ্ধ আছে যে, আলেকজান্ডার যখন ইরানে পদার্পণ করেন তখন তিনি ইয়ায্্দ নগরীতে তাঁর জেলখানা স্থাপন করেন। অর্থাৎ যখনই কাউকে গ্রেফতার করা হতো তখন তাকে ইয়ায্্দরে কয়েদখানায় প্রেরণ করা হতো। অন্যদিকে সে সুপ্রাচীনকাল থেকেই ‘শিরাজ’ এবং ‘তাখ্তে জামশিদ’ সোলাইমান নগরী বলে খ্যাত।

হাফিজের কাব্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আশাবাদ। প্রেমের ক্ষেত্রে তিনি কখনো নৈরাশ্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর জীবনে অন্য কবিদের মতো বিরহ-বিচ্ছেদের অন্ধকার গভীর রজনী উপস্থিত হয়েছে বটে, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন এ রাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না। প্রেম-ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অচিরেই উজ্জ্বল প্রভাত অন্ধকারের কুহেলিকা ভেদ করে আবির্ভূত হবেÑ যা খুশির বার্তা বয়ে আনবে এবং বিষণ্ন কুটির একদিন আনন্দের বাগানে পরিণত হবে। যেমন তিনি বলেন :
হারানো ইউসুফ আসবে ফিরে আবার কেনানে, চিন্তা করো না তাই,
এই বিষণ্ন কুটির একদিন হবে যে গুলিস্তান, চিন্তা করো না ভাই।
প্রেমের শক্তিমত্তার কথা তুলে ধরে হাফিজ বলেন:
প্রেমের শক্তি ও মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি দাও, কেননা, এর গৌরব এতটাই যে,
তোমার ক্রন্দন ও ফরিয়াদে সাম্রাজ্যের কোনা ধসে পড়বে।

হাফিজের অবস্থান ছিল ভাবজগতের এতটাই ঊর্ধ্বে যে, তিনি নিজেকে কখনো কোনো সম্প্রদায়ের গন্ডির মাঝে ধরে রাখতে চেষ্টা করেন নি। তাঁর মতে প্রেমের রাজ্যে কোনো গন্ডিভেদ নেই। কবি হাফিজের অন্যকিছু ভাবার সময় ছিল না।

বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দীন সেকান্দর শাহ (৭৬৮ হি.) সিংহাসনে আরোহণের পর এই গজল সম্রাটকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এই সোনার বাংলায় তাঁর রাজধানীতে। কবি আসতে পারেন নি বটে, কিন্তু সুদূর ইরান থেকে তাঁর অন্তরের নির্যাসস্বরূপ যে মিছরি-খন্ড পাঠিয়েছিলেন তার অমিয় স্বাদ এখনও আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করছে বিপুলভাবে। কবির সে বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি শ্লোক এখানে উদ্ধৃত করা হলো :
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ চরণ দু’টির মর্মার্থ নিম্নরূপ উল্লেখ করেছেন:
“আজকে পাঠাই বাঙ্লায় যে ইরানের এই ইক্ষু-শাখা,
এতেই হবে ভারতের সব তোতার চঞ্চু মিষ্টিমাখা।
দেখ গো আজ কল্পলোকের কাব্যদূতীর অসম সাহস,
এক বছরের পথ যাবে যে, একটি নিশি যাহার বয়স।” (নজরুল, ১৯৯৬: ৪৫)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here