আধ্যাত্মিক কবি হাফিজ ও তাঁর কবিতা

0
236

অধ্যাপক ড. তারিক সিরাজী

কবি হাফিজ (১৩২৫-১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ) শুধু ইরানেরই নয়; বরং সমগ্র বিশ্বের প্রথিতযশা কবিদের একজন। তিনি ইরানের শিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম হলো শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ হাফিজ শিরাজী এবং কবি নাম বা ভনিতা হলো হাফিজ। তাঁর পিতা বাহাউদ্দীন ছিলেন ইসফাহানের একজন প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী। পরবর্তীকালে তিনি ইসফাহান ত্যাগ করে শিরাজে চলে আসেন। তাঁর মা ছিলেন কাজরুনের অধিবাসী। তাঁর দুই ভাই ছিল যারা তাঁর চেয়ে বয়সে বড় এবং বয়ঃপ্রাপ্তির পর তারা শিরাজ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু হাফিজ মায়ের সাথেই আর্থিক সংকটের মধ্যে শিরাজে থেকে যান এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি শিরাজেই অবস্থান করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁকে ‘খাকে মুসাল্লা’ নামক স্থানে দাফন করা হয়।

হাফিজের শৈশব খুব একটা সুখের ছিল না। কারণ, পিতৃহারা হাফিজকে সংসারের দায় শৈশবেই বহন করতে হয়েছিল। যে কারণে অর্থ উপার্জনের বোঝা তিনি মাথায় পেতে নিয়েছিলেন। প্রসিদ্ধ ইরানি লেখক ও সাহিত্যিক আব্দুন্নবী তাঁর মেইখানে নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হাফিজ স্থানীয় একটি রুটির দোকানে কাজ করতেন আর এখান থেকে লব্ধ অর্থ দিয়েই দিনযাপন করতেন। এই রুটির দোকানের পাশেই একটি বিদ্যালয় ছিল যেখানে কাওয়াম উদ্দিন আবদুল্লাহ (মৃত্যু ৭৭২ হি.) নামে একজন প্রসিদ্ধ আলেম শিক্ষা দান করতেন। হাফিজ রুটির দোকানে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর কাছ থেকে বিদ্যার্জন করতেন। শুধু প্রাথমিক শিক্ষাই নয়, বরং কুরআন হেফ্জ করা থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও দর্শনশাস্ত্রেরও জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর ধীরে ধীরে ইসলামের বিধি-বিধান ও সাহিত্য সংক্রান্ত জ্ঞান নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে শুরু করেন। যেহেতু সেকালে সাহিত্যের জ্ঞান শরিয়তের জ্ঞান লাভের পটভূমি ছিল, সেহেতু তিনি ধর্মীয় জ্ঞানেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেন। হাফিজের যুগে শিরাজ ছিল ধর্মীয় জ্ঞান ও কবি-সাহিত্যিকদের আবাসভূমি। এই বিষয়টি তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানার্জনে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করে।

হাফিজ উপরিউক্ত শিক্ষক ছাড়াও শামসুদ্দীন আবদুল্লাহ শিরাজী ও কাজী এযদুদ্দীন আবদুর রহমান ইয়াহইয়ার নিকট থেকে দর্শন ও তাসাউফের জ্ঞান অর্জন করেন। জানা যায়, হাফিজ ৪০ বছর পর্যন্ত বিদ্যার্জনে রত ছিলেন। কুরআন কণ্ঠস্থকরণ ও কুরআনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণেই অবশেষে ‘খাজা হাফিজ’ নামে তিনি অভিহিত হয়েছিলেন। তাঁর কাব্যের ছত্রে ছত্রে এই কুরআনের প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। হাফিজ নিজেই এ

ব্যাপারে উল্লেখ করেছেন :
হে হাফিজ! তোমার বক্ষে ধারণকৃত এই কুরআনের চেয়ে
সুন্দর ও সুমিষ্ট বাণী আর কিছুই দেখি নি।
ইরানিরা কবি হাফিজকে আদর করে ‘বুলবুলে শিরাজ’ অর্থাৎ শিরাজের বুলবুল বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তারা হাফিজকে লেসানুল গায়েব (অজ্ঞাতের বাণী), তরজমানুল আসরার (রহস্যের মর্ম সন্ধানী) প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করে থাকেন।

হাফিজ ছোটবেলা থেকেই কাব্যচর্চায় অনুরক্ত হয়ে পড়েন। আবদুন্নবী তাঁর মেইখানে গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, শিরাজে যেখানে তিনি অবস্থান করতেন তার সন্নিকটে একটি বাজার ছিল। বাজারে একজন বড় বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। যিনি ছিলেন কাব্যপ্রেমিক ও রসিক প্রকৃতির লোক। যেখানে রসিক কবি-সাহিত্যিকরা এসে জড়ো হতেন এবং কাব্যচর্চায় মুখরিত থাকতেন। হাফিজও এখানে যাতায়াত করতেন এবং সমকালীন কবিদের সংস্পর্শ লাভ করতেন। তাঁর কাব্যচর্চা দেখে অনেক সময় বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করত। উল্লেখ্য যে, তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খোদায়ী প্রেমের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। কেননা, এ খোদায়ী প্রেমই কাব্য সাধনায় তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল।

হাফিজের মতে প্রেম-ভালোবাসা এমন এক ঐশী চেতনা যা মানুষকে তার প্রেমের মূলে তথা প্রেমাস্পদের (মাশুক) সান্নিধ্য লাভে উদ্বুদ্ধ করে। স্রষ্টার আকর্ষণ তার মধ্যে এমনিভাবে এক বিশাল আকার ধারণ করে যে, সৃষ্টির যে কোনো সৌন্দর্যই তাকে স্রষ্টার স্মরণে আকুল করে তোলে। কবি হাফিজ এ প্রেমকে এমন এক মূল্যবান অর্ঘ্য বলে মনে করেনÑ যার প্রাপ্তি কেবল তার প্রেমাস্পদের একান্ত অনুগ্রহেই সম্ভব।

কবি হাফিজ মনে করেন, তাঁর মাঝে যে ঐশীপ্রেম বিদ্যমান রয়েছে তা কেবল তাঁর স্রষ্টার বিশেষ অনুগ্রহ ও দান। বিশ্বলোকের অপরাপর প্রাণিকুল এ অনুগ্রহ ও দান থেকে বঞ্চিত। হাফিজের কবিতা ও গজলের ছত্রে ছত্রে সেই প্রেমের দৃষ্টান্ত ও প্রতিভাস বিলক্ষণ খুঁজে পাই। লৌকিক প্রেমের পাশাপাশি তিনি স্বর্গীয় প্রেমকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে হাফিজের ভাষায় এ প্রেম কোনো সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। প্রেম সলিলে অবগাহন করতে হলে প্রেমিকের জন্য যে অফুরন্ত ও অসীম সাধনার প্রয়োজন রয়েছে তা তাঁর কাব্যে ভাস্বর হয়ে ফুটে উঠেছে। হাফিজ বলেন :
“হায় বধুয়া! দাও পেয়ালা ঢালো শারাব মধুক্ষরা
সহজ ছিল পথটি প্রেমের দেখছি এখন কাঁটা ভরা।
ভেবেছিলাম ভোর বাতাসে কস্তুরী-বাস আসবে ভেসে
বধুর চিকন চিকুর হতে, কলজে হলো ঘায়েল শেষে” (হাফিজ, ১৯৮ : ১৭)

হাফিজের একটি দিভান তথা কাব্যসমগ্র রয়েছে। এতে আছে গজল ও রুবায়িসহ নানা আঙ্গিকের কবিতা। কিন্তু হাফিজ গজল রচনা করেই বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন এবং গজল রচনায় তাঁকে ফারসি সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলা হয়ে থাকে। হাফিজ মধুর কণ্ঠে ও সুললিত ভাষায় তাঁর গজলসমূহে সুফি তত্ত্বই বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর কবিতার মধ্যে বসন্ত, গোলাপ, বুলবুল, মদ, যৌবন, সৌন্দর্য এবং বিশেষ করে প্রেমিকা ও প্রেমাস্পদের রূপ, গুণ ও দোষের বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু তাঁর এ সকল বর্ণনা রূপকভাবে খোদার প্রতি ভালোবাসার অপূর্ব কাহিনী মাত্র।

হাফিজের গজল শেখ সাদির প্রেমময় বিষয়বস্তু এবং ফরিদ উদ্দিন আত্তার ও মাওলানা রুমির আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তুকে ধারণ করে আছে। এছাড়া কবি সানায়ির সামাজিক ও সমালোচনামূলক বিষয়ও তাঁর কাব্যে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে তিনি কাসিদার ন্যায় স্তুতি বর্ণনায়ও পারদর্শী ছিলেন। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রভু, প্রেমাস্পদ ও প্রশংসিত ব্যক্তি। তাই তাঁর কবিতা সাদির গজলের ন্যায় দ্রুত বুঝা যায় না এবং মাওলানা রুমীর প্রতীকী কবিতার মতো তা বুঝতে কঠিন বলেও মনে হয় না। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই হলো আধ্যাত্মিক সুলভ। হাফিজ তাঁর কবিতাগুলোকে এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন যাতে পাঠক তৎক্ষণাৎ তা থেকে একটি কল্পিত ভাব গ্রহণ করতে পারে।

হাফিজের কবিতার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো কবিতার শ্লোকগুলোর সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক। তাঁর গজলগুলোতে একটি নীরব চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। হাফিযের গজলে পদগুলোর ধারাবাহিকতায় একটি পঙ্্ক্িত বা ছত্রের সাথে অপর একটি পঙ্্ক্িত বা ছত্রের বিষয়বস্তুগত পারম্পর্য বাহ্যিকভাবে লক্ষ্য করা যায় না। কিন্তু যখন কোনো অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁর পুরো একটি গজলের বিষয়বস্তু হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন তখন তিনি একটি শ্লোকের সাথে অপর শ্লোকের বিষয়বস্তুরগত যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে তা অনায়াসে বুঝতে পারবেন।

হাফিজ তাঁর কাব্যে শুধু রূপক প্রেমের বর্ণনাই করেন নি, বরং কবিতার কাঠামো নির্মাণে বিভিন্ন প্রকারের সাহিত্য অলংকারের এমন প্রয়োগে দেখিয়েছেন যা তুলনা রহিত। তিনি তাঁর কবিতার শ্লোকগুলোতে ইহাম (দ্ব্যর্থবোধক বক্তব্য বা পরোক্ষ ইঙ্গিত), এস্তেখ্দাম (একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ), তাশ্বিহ (উপমা বা সাদৃশ্য), তাজনিস (সাদৃশ্য), কেনায়া (রূপক) অত্যন্ত দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে ইহাম তথা দ্ব্যর্থবোধক শব্দ তাঁর কবিতায় বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি তাঁর কাব্যে সুন্দর-সুন্দর উপমা ও উৎপ্রেক্ষা বর্ণনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাছাড়া আরবি ও ফারসি সাহিত্যের একটি বড় বিষয় হচ্ছে কাফিয়া তথা অন্ত্যমিল। এ অন্ত্যমিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতার ছাপ পরিলক্ষিত হয়। যেমন :
সতেজ, রক্তবর্ণ মণি বিশেষের ন্যায় আমার বন্ধুর ঠোঁট রক্তপিপাসু
এবং আমার কর্তব্য তাকে পেয়ে আত্মোৎসর্গ করা।

বিদ্রƒপাত্মক ও সমালোচনাধর্মী বিষয়গুলোও তাঁর দিভানে বহুল পরিমাণে পরিলক্ষিত হয় এবং সাধারণত তিনি কপট ও বকধার্মিকদেরকে শ্লেষমিশ্রিত ভাষায় সমালোচনা করেছেন।

চৈন্তিক ও মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাফিজের কবিতা হলো ‘নেযামে রেন্দি’ তথা সূক্ষ্মদর্শী তাপসের জীবন পদ্ধতি। রেন্দি হলো বাকচাতুর্যে পটু এমন একজন তাপস ব্যক্তি বা সূক্ষ্মদর্শী আরেফ, যিনি চিন্তা ও কর্মে প্রেম বা এশ্্করে ওপর নির্ভর করে থাকেন। এমনিভাবে এশ্্ক্ শব্দটি প্রায়শই তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং তা প্রায় ২৩৪ বার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। হাফিজের ভাষায় মূলত রেন্দির সাথে এশ্্করে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে, সাধারণত সে কারণেই এ শব্দ দুটি তাঁর কাব্যে একত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, শরাবের বর্ণনা হাফিজের কাব্যে অসংখ্যবার এসেছে। কারণ এটাই যে, হাফিজ ‘শরাব’-কে দুঃখ-বেদনার উপশম হিসাবে মনে করেছেন। তাঁর নিকট এটিই একমাত্র বস্তু যার মাধ্যমে জীবনের যত রকমের তিক্ততা ও বিস্বাদ আছে তা বিদূরিত করা যেতে পারে। যেমন হাফিজ বলেন :
হে সাকী! ওঠ, আমাকে শরাবের পেয়ালা দাও,
আর দুঃখের দিনের শিরে ধূলি নিক্ষেপ কর।

হাফিজের কাব্যে এই যে উন্মত্ততার বহিঃপ্রকাশ তার অন্তর্নিহিত ও গূঢ় রহস্য অত্যন্ত ব্যাপক। তাঁর এই উন্মত্ততা এই জন্য নয় যে, তিনি কিছুক্ষণের জন্য শরাব পান করে নিজেকে অসাড় ও তন্ময়গ্রস্ত করে তুলবেন, বরং তিনি চাচ্ছেন এই প্রেম মদিরা পান করে নিজেকে সতেজ-সজীব ও প্রাণবন্ত করে তাঁর প্রেমাস্পদের বা আরাধ্যের সমীপে উপস্থিত হবেন। এছাড়া তিনি চাচ্ছেন এই প্রেমের শরাব পান করে তাঁর মধ্যে এমন একটি যোগ্যতা সৃষ্টি করবেন যাতে তিনি একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেকে প্রেমাস্পদের সম্মুখে হাজির করতে পারেন।
আমরা প্রবন্ধের প্রারম্ভে উল্লেখ করেছি যে, হাফিজ দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত জ্ঞান সাধনা করেছেন যা তাঁর নিজের গজল থেকে উদ্ধৃত করা যেতে পারে :
দীর্ঘ চল্লিশ বছরের সাধনায় আমার অন্তরে
যে জ্ঞান-বৈশিষ্ট্য সঞ্চিত হয়েছে,
ভয় হয়, না জানি প্রেয়সীর চোখের চাহনি
তা হরণ করে নিয়ে যায়।
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here