আধ্যাত্মিক কবি হাফিজ ও তাঁর কবিতা

0
1123

অধ্যাপক ড. তারিক সিরাজী
কাব্যচর্চার পাশাপাশি তাঁর এই জ্ঞানচর্চা নিছক কোনো বৈষয়িক জ্ঞান ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ছিল অধ্যাত্ম বা পরমার্থ জ্ঞান। তবে এই আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে হাফিজ মুরশিদের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেছেন বিধায় তিনি বাহাউদ্দিন নকশেবন্দীসহ একাধিক প্রসিদ্ধ সুফির সংস্পর্শে সময় ব্যয় করেছেন। এ ব্যাপারে হাফিজের মত হচ্ছে এই মুর্শিদ ব্যতীত প্রেমের পথে পা বাড়িও না। এ পথের পথপ্রদর্শক (সালেক) বা মুর্শিদ না পেলে পথিককে পথভ্রান্ত হতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে সচেতনতা ও সতর্কতা অপরিহার্য। কারণ, গুরু চিনতে ভুল করলে শিষ্যের জীবনে ভ্রান্তি, ভ্রষ্টতা ও বিচ্যুতি নেমে আসা একান্তই স্বাভাবিক। হাফিজ বলেন :
তোমার খাঁটি পীর যদি বলে তবে শরাব রং-এ তোমার মুসাল্লা (জায়নামাজ) রাঙ্গিয়ে নাও, কেননা, সালেক মানযিলের পথ-পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত।

হাফিজ তাঁর কাব্যে সুরা-সাকী প্রভৃতি শব্দ কতটা রূপক (অপ্রকৃত) বা প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে বলে অনেকে মনে করেন।

গোঁড়াপন্থীরা যাই বলুক, হাফিজ যে একজন ধর্মপ্রাণ, খোদাভক্ত মুসলমান ছিলেন, তাঁর রচিত কাব্যের বহু স্থানে সেই সত্য বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাফিজের ইন্তেকালের পর জানাযা নিয়ে গোঁড়াপন্থী ও উদারপন্থীদের মধ্যে যে বিরোধ উপস্থিত হয়েছিল তা উল্লেখযোগ্য। গোঁড়াপন্থীরা হাফিজকে ধর্মদ্রোহী শারাবখোর বলে তাঁর জানাযা দিতে অস্বীকার করে এবং এ নিয়ে হাফিজের উদারপন্থী ভক্তবৃন্দের সাথে তাদের বিবাধ ঘটে। কতিপয় লোকের হস্তক্ষেপের ফলে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, হাফিজের রচিত কবিতা একত্র করে সেখান থেকে যে কোনো একটি কবিতা তুলে দেখা যাক, এ সম্বন্ধে তিনি কিছু লিখে গেছেন কি-না। তাই করা হলো এবং যে কবিতাটি প্রথম তুলে নেয়া হলো তা হলো :
হাফিজের জানাযা থেকে ফিরে যেও না ভাই
যদিও সে পাপে মগ্ন রয়েছে তথাপি বেহেশতে পাবে ঠাঁই।

এ কবিতা উদঘাটনের পর হাফিজকে ‘লেসানুল গায়েব’ বা অদৃষ্টের রসনা বলে স্বীকার করে উভয় দল মহাসমারোহ ও সম্মানের সাথে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। অনেকের বিশ্বাস এখন পর্যন্ত কেউ তাঁর দিভান খুলে দিভানের যে কবিতার ওপর প্রথম দৃষ্টি পড়ে, সে কবিতায় তার ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত লাভ করে।
হাফিজ তাঁর গজল ও রূবাইগুলোতে বিশুদ্ধ প্রেমের মাহাত্ম্য ও খোদাপ্রাপ্তির তথা খোদার নৈকট্য লাভের উপায় বর্ণনা করেছেন। হাফিজের কাব্যে কোথাও ধর্মের ভান বা প্রতারণার অবকাশ নেই। তাঁর মতে খোদার প্রেমে অবগাহন করে যে নিজেকে বিলীন করে দিতে পারে সেই প্রকৃত খোদাপ্রেমিক। ধর্মের নামে প্রতারণা বা ভান করা সম্পর্কে হাফিজ বলেন :
কপটতা ও প্রতারণার আগুন ধর্মের ভান্ডারকে অবশ্যই জ্বালিয়ে ফেলবে,
হে হাফিজ! এ দরবেশি পোশাক পরিত্যাগ করে সামনে অগ্রসর হও।
বাহারে হেজাজ (কবিতার এক প্রকার ছন্দের নাম) ছন্দে লিখিত কবি হাফিজের এই শ্লোকটি অথবা অনুরূপ আরো অনেক শ্লোকই তাঁর শব্দচয়ন, ভাষা-ছন্দ ও অলংকারের নিপুণতার স্বাক্ষর বহন করে।
তিনি আরো বলেন,
মুখে যা কিছু উচ্চারিত সেটাই প্রেমের কথা নয়,
হে সাকী! ঢালো শরাব আর সংক্ষিপ্ত কর তোমার কথাবার্তা।

প্রেম-বিরহ এবং মায়ামমতায় ঘেরা এই নশ্বর পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তুচ্ছ ও অনর্থক নয়। মানুষের জীবনে সুখ-শান্তির পাশাপাশি বিরহ-বেদনা, দুঃখ-যাতনা অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। মানুষ এই পৃথিবীতে স্বপ্নের তাজমহল গড়তে চেষ্টা করে। সংসার গড়ে। স্ত্রী-পুত্র পরিজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। আর এ পথ ধরে মানুষের জীবনে আসে নিরবচ্ছিন্ন প্রেমের তাগাদা। কবি হাফিজের জীবনও হয়তো এর ব্যতিক্রম ছিল না। তাই আমরা তাঁর যৌবনের শুরুতেই দেখতে পাই শাখ-ই-নাবাতের মতো এক প্রেয়সীর সান্নিধ্য লাভের একান্ত বাসনা। কবির জীবনে এটা কতটা সত্য তা আমরা জানি না, তবে জীবনীকাররা এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন।
হাফিজ সংসার ধর্ম যাপন করেছেন যে কথা আমরা উপরে উল্লেখ করেছি। তাঁর পুত্রসন্তান ‘বুলবুল’ অকালে প্রাণ হারালে হাফিজ তার জন্য ক্রন্দন করেছেন। হাফিজ বলেন :
“ওরে হৃদয়” তুই দেখেছিস- পুত্র আমার আমার কোলে
কি পেয়েছে এই সে রঙিন গগণ-চন্দ্রাতপের তলে।
সোনার তাবিজ রূপার সেলেট মানাত না বুকে রে যার,
পাথর চাপা দিল বিধি হায় কবরের সিথানে তার।” (নজরুল, ১৯৯৬: ৪৩)

কবির জীবনে প্রেমের এই যে বিচিত্র লীলাখেলা তা কতটা লৌকিক আর কতটা স্বর্গীয় তা নির্ণয়ের ভার হাফিজের বোদ্ধা পাঠক ও সমালোচকদের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। তবে তিনি যে যৌবনের প্রারম্ভেই এই প্রেমসাগরে অবগাহন করেছেন তা তাঁর কাব্যে বিচিত্রভাবে বিধৃত হয়েছে। হাফিজ বলেন :
শিরাজের সেই তুর্কী তন্বী যদি আমার হৃদয় হরণ করে
তবে তার কালো তিলের তরে সমরকন্দ ও বোখারা দান করে দেব।
ওগো সাকী, অবশিষ্ট শরাবটুকু আমায় দাও, কেননা বেহেশতে
রোকনাবাদের স্রোতস্বতী ও মোছাল্লায় পুষ্প উদ্যান মিলবে না।
হাফিজ আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন হলেও দেশ, দেশের মাটি ও মানুষকে গভীর অন্তর দিয়ে ভালোবাসতেন। এই ভালোবাসা ছিল যেমনি সনাতন তেমনি নির্বিশেষ। হাফিজ শিরাজের লোক। শিরাজকে তিনি কীভাবে ভালোবেসেছেন তার নির্দশন আমরা খুঁজে পাই তাঁর কবিতার পরতে পরতে। কবি হাফিজ জীবনভর শিরাজ নগরীর সঙ্গে তাঁর অন্তরকে বেঁধে রেখেছিলেন। যেমন তিনি বলেন :
যদিও ইসফাহান হচ্ছে সঞ্জিবনী সুধা, কিন্তু আমাদের শিরাজ হচ্ছে
ইসফাহানের তুলনায় সহস্রগুণে শ্রেষ্ঠ।
শিরাজ নগরী তুলনাহীন, তার প্রশংসা আর কত করব
হে খোদা! যে কোনো ধরনের পতন থেকে একে রক্ষা কর।

তিনি সব সময়ই এ সবুজ শ্যামল ও সুখময় স্থান তথা তাঁর স্থায়ী বাসস্থানের সঙ্গে নিজের অন্তরকে বেঁধে রেখেছিলেন। জানা যায় তিনি একবার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। কিন্তু শিরাজ থেকে ইয়ায্দ পর্যন্ত পৌঁছেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি তাঁর প্রিয় শিরাজ নগরীকে বারবার স্মরণ করেন এবং বলেন :
সেই সৌভাগ্যপূর্ণ দিনগুলো কখন ফিরে আসবে,
যখন আমি এই বিরাণ ভূমি থেকে প্রত্যাবর্তন করতে পারব?
কখন সে দুঃখ-বেদনা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে এবং প্রিয়তমার সাক্ষাৎ লাভ হবে?
আলেকজান্ডারের জেলখানার আতংকে আমার অন্তর সংকীর্ণ ও আড়ষ্ট হয়ে গেছে,
কখন সফরের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করব
কখন সোলাইমানের নগরীতে প্রত্যাবর্তন করব?

কবি রচিত এই কবিতাগুলোতে আধ্যাত্মিকতা চিন্তা করলে কবির অন্তরের গভীর অনুধ্যান কী তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এখানে উল্লিখিত দ্বিতীয় শ্লোকটির ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, ইতিহাস এবং প্রাচীন উপাখ্যানসমূহে লিপিবদ্ধ আছে যে, আলেকজান্ডার যখন ইরানে পদার্পণ করেন তখন তিনি ইয়ায্্দ নগরীতে তাঁর জেলখানা স্থাপন করেন। অর্থাৎ যখনই কাউকে গ্রেফতার করা হতো তখন তাকে ইয়ায্দের কয়েদখানায় প্রেরণ করা হতো। অন্যদিকে সে সুপ্রাচীনকাল থেকেই ‘শিরাজ’ এবং ‘তাখ্তে জামশিদ’ সোলাইমান নগরী বলে খ্যাত।

হাফিজের কাব্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আশাবাদ। প্রেমের ক্ষেত্রে তিনি কখনো নৈরাশ্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর জীবনে অন্য কবিদের মতো বিরহ-বিচ্ছেদের অন্ধকার গভীর রজনি উপস্থিত হয়েছে বটে, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন এ রাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না। প্রেম-ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অচিরেই উজ্জ্বল প্রভাত অন্ধকারের কুহেলিকা ভেদ করে আবির্ভূত হবেন, যা খুশির বার্তা বয়ে আনবে এবং বিষণ্ন কুটির একদিন আনন্দের বাগানে পরিণত হবে। যেমন তিনি বলেন :
হারানো ইউসুফ আসবে ফিরে আবার কেনানে, চিন্তা করো না তাই,
এই বিষণ্ন কুটির একদিন হবে যে গুলিস্তান, চিন্তা করো না ভাই।
প্রেমের শক্তিমত্তার কথা তুলে ধরে হাফিজ বলেন :
প্রেমের শক্তি ও মর্যাদার প্রতি দৃষ্টি দাও, কেননা, এর গৌরব এতটাই যে,
তোমার ক্রন্দন ও ফরিয়াদে সাম্রাজ্যের কোনা ধসে পড়বে।
হাফিজের অবস্থান ছিল ভাবজগতের এতটাই ঊর্ধ্বে যে, তিনি নিজেকে কখনো কোনো সম্প্রদায়ের গন্ডির মাঝে ধরে রাখতে চেষ্টা করেন নি। তাঁর মতে প্রেমের রাজ্যে কোনো গন্ডিভেদ নেই। কবি হাফিজের অন্যকিছু ভাবার সময় ছিল না।

বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দীন সেকান্দর শাহ (৭৬৮ হি.) সিংহাসনে আরোহণের পর এই গজল সম্রাটকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এই সোনার বাংলায় তাঁর রাজধানীতে। কবি আসতে পারেন নি বটে, কিন্তু সুদূর ইরান থেকে তাঁর অন্তরের নির্যাসস্বরূপ যে মিছরিখন্ড পাঠিয়েছিলেন তার অমিয় স্বাদ এখনও আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করছে বিপুলভাবে। কবির সে বিখ্যাত কবিতার কয়েকটি শ্লোক এখানে উদ্ধৃত করা হলো :
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ চরণ দুটির মর্মার্থ নিম্নরূপ উল্লেখ করেছেন :
“আজকে পাঠাই বাঙ্লায় যে ইরানের এই ইক্ষু-শাখা,
এতেই হবে ভারতের সব তোতার চঞ্চু মিষ্টিমাখা।
দেখ গো আজ কল্পলোকের কাব্যদূতীর অসম সাহস,
এক বছরের পথ যাবে যে, একটি নিশি যাহার বয়স।” (নজরুল, ১৯৯৬: ৪৫)
তথ্যনির্দেশ:
১. আব্দুল হাফিজ (১৯৮৪ খ্রি.): হাফিজের গজল গুচ্ছ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা
২. আল্লামা শিবলী নোমানী, শেরুল আজম (পারস্যের কবি), এম ফরমান আলী এন্ড সন্স বুক সেইলারজ, লাহোর
৩. আয়াতুল্লাহ মুর্তজা মোতাহারী (১৯৮৭ খ্রি.): হিজরত ও জিহাদ, [অনুবাদ: অধ্যাপক সিরাজুল হক], সাজেমানে তাবলিগাতে ইসলামি (বাংলা বিভাগ), তেহরান
৪. আহমাদ তামীমদারী (২০০৭ খ্রি.): ফার্সী সাহিত্যের ইতিহাস, [বাংলা ভাষায় অনূদিত], আলহুদা আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা, ইরান
৫. কাজী নজরুল ইসলাম (১৯৯৬): নজরুল রচনাবলী, (২য় খন্ড) বাংলা একাডেমী, ঢাকা
৬. বাহাউদ্দীন খুররম শাহী (১৯৮৭ খ্রি.): হাফেজ নামে (হাফিজের সাহিত্যকর্ম), সরুশ প্রকাশনী, তেহরান, (১ম ও ২য় খন্ড)
৭. মির্যা মকবুল বেগ বাদাখশানি, আদব নামে ইরান (ইরানের সাহিত্য), (২য় খন্ড) ইউনিভার্সিটি বুক এজেন্সী, লাহোর
৮. মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন (১৩৭৫ বঙ্গাব্দ): ইরানের কবি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা
৯. মুহাম্মদ সুদি বাসনুভি (১৯৮৬ খ্রি.): শারেহ সুদি বার হাফেজ (মুহাম্মদ সুদি বাসনুভিকৃত হাফিজের কবিতার ব্যাখ্যা) [অনুবাদ: আছমাত সেতারে যাদেহ], র্যারিন প্রকাশনী তেহরান
১০. মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ (২০০০ খ্রি.): পারস্য প্রতিভা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা
১১. রেযা যাহেদ শাফাক, তারিখে আদাবিয়্যাতে ইরান (পারস্য সাহিত্যের ইতিহাস), পাহলভী বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান
১২. হরেন্দ্র চন্দ্র পাল (১৩৬০ বঙ্গাব্দ): পারস্য সাহিত্যের ইতিহাস, শ্রী জগদীশ প্রেস, কলকাতা
১৩. হাফেজ শিরাজী (১৯৯৯ খ্রি.): দিভানে গাযালিয়াতে মাওলানা শামসুদ্দীন হাফেজ শিরাজী (হাফিজের গজলসমগ্র), সাফি আলী শাহ প্রকাশনী, ইরান
১৪. Edward G. Browne (1969 CE): A literary History of Persia, Vol.-III, Cambridge University press, London

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here