আমরা যেভাবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলাম

0
160

মোহাম্মদ সায়েদুল হক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে যেদিন ভর্তি হলাম সেদিনকার একটি শ্লোগান আমার মনে ও মগজে সবসময়ই ধ্বনিত হয় ‘বঙ্গবন্ধুর অবদান, কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে জানতে পারলাম সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশের কৃষকদের কতখানি ভালোবাসতেন, কৃষি পেশাকে কতখানি সম্মানের চোখে দেখতেন। ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারির পূর্বপর্যন্ত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাশ করে চাকরিতে যোগদান করতে হতো দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে। জাতির জনক ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কৃষিবদদের প্রথম শ্রেণির পদমর্যাদা প্রদান করেন। ১৯৭২-৭৩ সালে ৫০০ কোটি টাকা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ছিল, এর মধ্যে ১০১ কোটি টাকা বঙ্গবন্ধু কৃষি উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ করেন। কৃষকের মাঝে আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেবার জন্য জাতির জনক প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)-সহ কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য বহু প্রতিষ্ঠান। গতিশীল কার্যক্রমের জন্য নতুন করে পুর্নগঠন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বারি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট কালোরাতে ঘাতকের বুলেট কেড়ে নিলো পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ জাতির জনকের প্রাণ; তখন থেকেই বলতে গেলে থেমে গেল দেশের কৃষক ও কৃষিবিদদের জাতির জনকের দেখানো পথে চলা, কাজ করা।

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মতো অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাত্র চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার জন্য ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কাছ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রহণ করেন ‘সেরেস পদক-১৯৯৯’। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে আমাদের কৃষিতে ঘটলো কাংখিত বিপ্লব। আবার ২০০৯ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ে আমরা ফিরে পেলাম বিপ্লবী কন্যাকে। এবার অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে কৃষির সবকয়টি সাব-সেক্টর যেমন মৌসুমি ফল ফুল শাকসবজি থেকে শুরু করে তৈল বীজ, অর্থকরী ফসল, সর্বোপরি দানাদার শস্য উৎপাদনে অর্জিত হলো অকল্পনীয় সাফল্য। বাংলাদেশ প্রথম নাম লেখালো চাল রপ্তানিকারক দেশের তালিকায়। আমি ছোট্ট একটি উদাহরণ দিই। বিএনপি শাসনামলে ১৯৯৫-৯৬ সালে বোরো আবাদ হয় ২৬.০৩ লাখ হেক্টর জমিতে। বোরো ধান উৎপাদন হয় ৭২.২১ লাখ মেট্রিক টন। তখন হেক্টর প্রতি ধানের ফলন হয় ২.৭৭৪ মেট্রিক টন। ২০১৮-২০১৯ সালে দেশে বোরো আবাদ হয় ৪৭.৮৮ লাখ হেক্টর জমিতে। বোরো ধান উৎপাদন হয় ১৯৫.৬১ লাখ মেট্রিক টন। হেক্টর প্রতি বোরো ধানের ফলন হয় ৪.০৮৫ মেট্রিক টন। সহজ হিসাব হলো আয়তনের দিক থেকে ১৯৯৫-৯৬ সালের চেয়ে বর্তমানে বোরো ধানের আবাদ বেড়েছে ৮৩% জমিতে, হেক্টর প্রতি ফলন বেড়েছে ৪৭.২৬% এবং মোট বোরো ধানের ফলন বেড়েছে ১৭০.৮৯%। এই অধিক পরিমাণ বোরো ধান উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয়েছে অনেক বেশি পরিমাণ সেচ সুবিধা, বীজ ধান, সার, কীটনাশক, বালাইনাশক; কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম। সবই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা এবং অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে। শুধু বোরো ধান নয় আমরা দেখতে পাই ১৯৯৫-৯৬ সালে আমন ধানের ফলন ছিল ৮৭.৯০ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ সালে আমন ধানের ফলন হয়েছে ১৪০.৫৫ লাখ মেট্ট্রিক টন। ১৯৯৫-৯৬ সালে আউশ ধানের ফলন ছিল ১৬.৭৬ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ সালে আউশ ধানের ফলন হয়েছে ২৭.৭৫ লাখ মেট্রিক টন। ১৯৯৫-৯৬ সালে পোল্ট্রি শিল্পের জন্য অপরিহার্য ভূট্টার ফলন ছিল মাত্র ৩ হাজার মেট্রিক টন। বলতে গেলে তখন পোল্ট্রি শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ভূট্টার পুরোটাই আমদানি করতে হতো। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী পোল্ট্রি শিল্পের কথা চিন্তা করে ১৯৯৬ সালেই ভূট্টা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার জন্য নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তাঁর মন্ত্রণালয় ২০১১-১২ সালের রবি মৌসুমে ৫০ হাজার ভূট্টা চাষির প্রত্যেককে বিনামূল্যে ৩ কেজি উন্নত জাতের ভূট্টা বীজ, ২৫ কেজি ডিএপি ও পঁচিশ কেজি এমওপি সার বিতরণ করে। যার ধারাবহিকতায় ২০১৭-১৮ সালে দেশে ভূট্টার ফলন দাঁড়িয়েছে ৩৮.৯৩ লাখ মেট্রিক টনে। ১৯৯৫-৯৬ সালের পাটের ফলন ছিল ৫০.৪০ লাখ বেল। ২০১৭-১৮ সালে পাটের ফলন হয়েছে ৮৮.৯৫ লাখ বেল। দেশের প্রধান সবজি ফসল আলুর ১৯৯৫-৯৬ সালে উৎপাদন ছিল ১৪.৯২ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ সালে দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছে ৯৬.৫৫ লাখ মেট্রিক টন। অথচ বিগত দুই দশক ধরে দেশে আবাদী জমির পরিমাণ কমছে ১% হারে। এইযে একদিকে আবাদী জমির পরিমাণ কমছে অন্যদিকে ফলন বাড়ছে এটা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর শতভাগ সততা, শ্রম, বিচক্ষণতা, উদারতা এবং মানবিকতার জন্য। আমি মনে করি কৃষির এই সাফল্যের পিছনে বিশেষ অবদান রাখছে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে প্রণীত ‘জাতীয় কৃষি নীতি, ১৯৯৯’। অবাক করা বিষয় হলো স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ২৮ বছর অতিবাহিত হলেও দেশের সবচেয়ে বেশী শ্রমশক্তি যে পেশায় নিয়োজিত সেই পেশা নিয়ে নির্দিষ্ট কোন নীতিমালা তৈরী না করা। যে কারণে কৃষিখাতের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বারবার ব্যাহত হতে থাকে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করে কৃষির উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। এরই ধারাবাহিকতায় অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে প্রণীত হয় ‘জাতীয় কৃষি নীতি-১৯৯৯’। অত:পর রূপকল্প-২০২১, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি), টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), ৬ষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ইত্যাদিতে সরকারের লক্ষ্য ও উন্নয়ন কৌশল অনুসরণে ‘জাতীয় কৃষি নীতি ১৯৯৯’ পরিমার্জন ও সংশোধন করে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর হাত দিয়েই আসে সময়োপযোগী ‘জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৩’ অত:পর ‘জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮’।

মতিয়া চৌধুরীর হাতেই প্রণীত হয়, ‘বীজ বিধি, ১৯৯৮’, ‘জাতীয় বীজ নীতি, ১৯৯৯’, ‘সার (নিয়ন্ত্রণ) আদেশ, ১৯৯৯’, ‘বালাইনাশক (সংশোধনী) আইন, ২০০৯’,‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা, ২০০৯’, ‘সার ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন, ২০০৯’, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সহিঞ্চু আগাম ও স্বল্পমেয়াদী ফসলের জাত ও প্রযুক্তি বিষয়ক নীতিমালা, ২০১০’, ‘উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন, ২০১১’, ‘জাতীয় শস্য ও বন জীবপ্রযুক্তি নীতি নির্দেশিকা, ২০১২’, ‘উদ্ভিদ জাত ও কৃষক অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১৩’, ‘জাতীয় জৈব কৃষি নীতি, ২০১৬’, ‘সমন্বিত ক্ষুদ্র সেচ নীতিমালা, ২০১৭’, ‘বীজ আইন, ২০১৮’, ‘কৃষি কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১৮’, ‘উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিধিমালা, ২০১৮’, ‘বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন, ২০১৮’ প্রভৃতি।

সরকারের তিন মেয়াদে মতিয়া চৌধুরী কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৫ বছর। এই ১৫ বছরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান প্রায় দুই শতাধিক বিভিন্ন ফসলের নতুন জাত কৃষক পর্যায়ে ছাড় করেছে। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর সময়েই কৃষকের মাঝে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্য, সিন্ডিকেট ভেঙ্গে স্বচ্ছতা আনয়নের জন্য বারো লক্ষ আটান্ন হাজার ছয়শত সাতচল্লিশ জন কৃষাণী এবং এক কোটি ৯৩ লাখ ২৪ হাজার ১৭৭ জন কৃষক মোট ২ কোটি ৫ লক্ষ ৮২ হাজার ৮২৪টি কৃষক পরিবারকে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান করা হয়েছে। তারা এই কার্ড ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনে ঋণ, উপকরণ সহায়তা প্রাপ্তি ও দশ টাকার বিনিময়ে কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছেন। ২০০৮ সালের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মতো অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী চার দফা সারের দাম কমিয়েছেন। কখনও বিনামূল্যে কখনও ত্রিশ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে কৃষক-কৃষাণীদের কৃষি যন্ত্রপাতি দিয়েছেন। বোরো সেচের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিয়েছেন। ২০১০-১১ সালে পাট মৌসুমে পনেরো লাখের অধিক পাট চাষিকে দশ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক একাউন্ট খুলে সেই ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে জনপ্রতি ২শত টাকা করে সহায়তা প্রদান করেছেন। পাহাড়ী এলাকা, খরা-প্রবণ এলাকা, বরেন্দ্র এলাকা, চরাঞ্চল, হাওর এলাকা, জলাবদ্ধ এলাকা, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকার জন্য নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের ফলে ফসল উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ২০০৮-০৯ সাল থেকে চালু হওয়া কৃষকের জন্য নানা ভর্তুকি এবং প্রণোদনা কর্মসূচি যেমন পাহাড়ী ঢলে কিংবা যে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ লাখ লাখ কৃষক পরিবারে বিনামূল্যে বীজ ফসল, রাসায়নিক সার, ধানের চারা বিতরণ কর্মসূচী প্রতিবছর বৃদ্ধিই পাচ্ছে। মতিয়া চৌধুরীর হাত ধরে বাংলাদেশের কৃষিতে যে বিপ্লব সাধিত হয়েছে একজন কৃষিবিদ হিসেবে আমার বিশ^াস তার দেখানো পথ অনুসরণ করলে আমরা দিন দিন সমৃদ্ধির দিকেই এগিয়ে যাবো।
লেখক: কৃষিবিদ; [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here