আলবার্ট আইনস্টাইনের ধর্মানুভূতি

0
236

ড. মাণিকলাল দাস
জার্মান বংশোদ্ভূত জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ১৮৭৯ সালে একটি ধর্মনিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবকালে তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না; এমনকি শারীরিকভাবেও অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। আইনস্টাইনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল নাও হতে পারে- এই ছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভবিষ্যদ্বাণী। তবে সকল প্রতিকূলতা অমূলক করে দিয়ে সেই বালকই কিনা কর্মজীবনে এসে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হিসেবে আপেক্ষিক তত্ত্ব (Theory of Relativity) এবং ই=এমসি২ (E=mc2)-এর জনকরূপে বিশ্ববাসীর জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাঁর সূত্র ধরেই আধুনিক বিজ্ঞান এগিয়ে চলেছে। তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞান এবং বিশেষত ‘আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া’র সূত্র আবিস্কারের জন্য (for his services to theoretical  physics; especially for his discovery of the law of photoelectric effect) তাঁকে ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিখ্যাত টাইম সাময়িকী ১৯৯৯ সালে আইনস্টাইনকে ‘শতাব্দীর সেরা ব্যক্তি’ এবং তদানীন্তন কালের পদার্থ বিজ্ঞানী সমাজও তাঁকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পদার্থ বিজ্ঞানী’র মর্যাদায় ভূষিত করেছিল। মহান এই বিজ্ঞানীর ধর্ম ও ঈশ্বর ভাবনা সম্পর্কে অসংখ্য মানুষের মনে কৌতূহল লক্ষ্য করা যায়। তিনি কি ধার্মিক ছিলেন, ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন, নাকি নাস্তিক ছিলেন? মানুষের মনের এসব কৌতূহল নিরসনার্থে ব্যক্তি আইনস্টাইনের ধর্ম ও ঈশ্বর-ভাবনা এবং উপনিষদের প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাসহ বিভিন্ন মনীষীদের মন্তব্য যুক্ত করে একটি পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হলো।

এ কথা সত্যি যে, আলবার্ট আইনস্টাইনের ব্যক্তি জীবন ঈশ্বরীয় পূজা-প্রার্থনাময় ছিল না। তাঁর নিজ বর্ণনা মতে- ‘আমার যখন মোটামুটি ইঁচড়েপাকা বয়স, সে সময় আমি ছিলাম সম্পূর্ণভাবে নিরাশাগ্রস্ত। তখন মনে হতো, নিরাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে ধর্ম। তবে আমার বয়স যখন ১২ বছর, তখন থেকে আমি বিভিন্ন জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক পুস্তকাদি পড়তে শুরু করি এবং আমার চিন্তন জগতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। দ্রুতই আমি অনুধাবন করতে পারি যে, আমার সামনে অজানা এক বিশাল মহাজাগতিক বিশ্বব্রহ্মাণ্ড রয়েছে; যার গূঢ় রহস্য উদঘাটন করাই হতে পারে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম এবং এ বিষয়ে আমার মধ্যে যথেষ্ট উৎসাহের সঞ্চার হয়।’’

বহির্জগতের রহস্য উদঘাটনের সময় আইনস্টাইনের মনে এক ধরনের উপলব্ধির জন্ম হতো; যা ছিল তাঁর ভাষায়- ‘‘আমার উপলব্ধিগুলো ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং আমার কাছে সেসব প্রকৃত ধর্মানুভূতির মতো মনে হতো। তবে আমার উপলব্ধির সাথে অতীন্দ্রিয়বাদের (Mysticism) কোনোরূপ সংশ্লিষ্টতা ছিল- আমার তা কখনই মনে হয়নি। কারও মৃত্যু বা হঠাৎ নিভে যাওয়া মোমবাতি দেখাটা ভয় মিশ্রিত হলেও সেটিই হচ্ছে রহস্য; আর এই রহস্য অনুধাবনের জন্য যে ধরনের সাধনার প্রয়োজন হয়, তাকে ধর্মকর্ম বলা হলে, সেই অর্থে আমি একজন প্রকৃত ধার্মিকও বটে। তবে সাম্প্রতিককালে দ্রুতগতিতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ধর্মতত্ত্ব এবং অধ্যাত্মবাদ বিষয়ক রহস্যাদি কখনো কখনো আমার মনকে বেশ দুর্বল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়। দেহ ব্যতীত আত্মার অস্তিত্ব আমার কাছে অন্তঃসারশূন্য এবং অর্থহীন মনে হয়। আমি ‘ব্যক্তি-অমরত্বে’ বা পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি না এবং নীতিশ্রাস্ত্র হচ্ছে সম্পূর্ণ মনুষ্যসৃষ্ট, যার পেছনে নেই কোনো প্রভু বা এমন কারও অতি মানবিক কর্তৃত্ব।’’
প্রসঙ্গত, নীতিশাস্ত্র বা ধর্মশাস্ত্র মনুষ্যসৃষ্ট -এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে যাঁদের মাধ্যমে সর্বসাধারণের কাছে ধর্মশাস্ত্র প্রবর্তিত হয়েছে; তাঁরা ছিলেন উচ্চস্তরের সত্যদ্রষ্টা মুনি-ঋষি, ঈশ্বরীয়-জ্ঞান জ্যোতির অখণ্ড আলোয় উদ্ভাসিত। এসকল মুনি-ঋষি আজীবন সাধনা করে উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন যে, সত্য কখনই সৃষ্টি করা যায় না; সত্যের দর্শন হয়, সত্য চিরকালই সত্য এবং নিত্য। আইনস্টাইনও জড়জগতের মধ্যে লুক্কায়িত রহস্যভেদকালে অনুরূপ উপলদ্ধি করেছিলেন। প্রাকৃতিক নিয়মগুলোর কেউ যেমন স্রষ্টা নহেন, কেবলই দ্রষ্টা ও প্রচারক মাত্র, সে রকম অন্তর্জগতের আলোয় উদ্ভাসিত মুনি-ঋষিগণও বেদ মন্ত্রের জনক নহেন, দ্রষ্টামাত্র। আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মুনি-ঋষিরা ধ্যানযোগে উপলদ্ধি করেছিলেন- সত্য অনড়, অটল, চিরকালীন; আইনস্টাইনের বহির্জাগতিক বিজ্ঞান ও মুনি-ঋষিদের সেই কথার প্রতিধ্বনি করে বলেছে- সত্য সব সময়ই নিয়মাবদ্দ এবং এর কখনই ব্যতিক্রম ঘটে না।

‘‘ঈশ্বর সম্পর্কে আমার অবস্থান একজন অজ্ঞেয়বাদীর ন্যায়’’-বলেছেন আইনস্টাইন। অর্থাৎ এটি ছিল তাঁর কাছে জ্ঞানের অতীত একটি বিষয়। এ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকান্দ বলেছেন যে, ‘‘সত্য স্বরূপ ব্রহ্ম অজ্ঞেয় নহেন; তাঁহাকে জানিয়াছি বলিলেই তাঁহাকে ছোটো করা হইল।’’ সেই অর্থে আইনস্টাইন সঠিকই বলেছিলেন যে, তাঁর কাছে এটি একটি জ্ঞানাতীত (অজ্ঞেয়) বিষয়। তিনি প্রায়শ ক্ষোভের সঙ্গে বলতেন যে, ‘‘এটা অবশ্যই মিথ্যা কথা, যা তোমরা আমার ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে জানো এবং বারবার বলো। ব্যক্তিবাচক-ঈশ্বর (Presonal God) আমাদের কাছে একটি শিশুসুলভ নৃতাত্ত্বিক ধারণামাত্র এবং সে কথা আমি কখনই অস্বীকার করিনা। তবে আমি নাস্তিকও নই। বরং আমি পরিস্কারভাবে বলার চেষ্টা করি যে, আমার কর্মের মধ্যে যদি কিছু থেকে থাকে, তবে সেটা ধর্মও হতে পারে। বিশ্ব পরিমণ্ডলে লক্ষ-কোটি গ্রহ-নক্ষত্রাদি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নিজ নিজ পথে আবর্তন করছে। এরূপ সুশৃঙ্কলতার পেছনে কারও ইচ্ছে বা লক্ষ্য ক্রিয়াশীল আছে- আমার তা মনে হয় না। তবে মানুষের জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির ক্ষমতা অসীম নয়; সে বিষয়টিও আমাদের বুঝতে হবে এবং অবশ্যই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’’ মানুষের জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টির সীমা সম্পর্কে কি অসাধারণ উপলদ্ধি ছিল আইনস্টাইনের!
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here