আলবার্ট আইনস্টাইনের ধর্মানুভূতি

0
338

ড. মাণিকলাল দাস
মানুষ বিশ্বাস করে যে, ঈশ্বর সর্বজনীন; সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ এবং সর্বশক্তিমান; অস্তিত্বশীল সকল কিছুর জন্মদাতা, পরিপালক ও ত্রাণকর্তা। এ প্রসঙ্গে আইনস্টাইন হতাশার সুরে বলেছেন যে, ‘‘সর্বশক্তিমান, ন্যায়বান, পরম দয়ালু ঈশ্বর মানুষের সাত্ত্বনাদাতা, সাহায্যদাতা এবং পথপ্রদর্শক- নিষ্পাত্তিমূলক এরূপ ধারণার ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতাও আছে, যা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বেদনার সাথে উপলদ্ধ হয়ে আসছে। ঈশ্বর যদি সর্বশক্তিমান হন, তাহলে মানুষের চিন্তা ভাবনা, অনুভূতি, আশা-আকাক্সক্ষা, সর্বপ্রকার দোষত্রুটি, ভালোমন্দ সকলই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। এমন একজন সর্বশক্তিমান ঈশ্বর থাকতে কিভাবে মানুষকে তার চিন্তা-ভাবনা, দোষ-ত্রুটি, ভালো-মন্দের জন্য দায়ী করা যায়! ঈশ্বর (বিশ্বপিতা) শাস্তি বা পুরস্কার প্রদান করেন, ব্যাপারটি আমার কাছে ধারণাতীত মনে হয়। মৃত্যুর পর শাস্তি বিধানের কথা বলে গির্জাগুলো ভয় দেখায়, এবং বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে।’’ আইনস্টাইন অদ্বৈতবাদী বারুচ স্পিনোজার সর্বেশ্বরবাদরূপ দর্শনের ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন। অর্থাৎ- ‘‘সুশৃঙ্খল ও সমন্বয়পূর্ণ একটি চলমান বিশ্বপ্রকৃতি, যেখানে মানুষের কর্ম নিয়ে ঈশ্বরের কোনোরূপ উদ্বেগ বা সম্পৃত্ততা থাকতে পারে না। কারণ ঈশ্বর কখনো পাশা খেলতে পারেন না।’’
‘‘সাধারণভাবে বৈজ্ঞানিকেরা গবেষণার দ্বারা যেসব তথ্য বা সূত্র নির্ণয় করেন, সেসব সূত্রাদি মিথ্যা প্রমাণ করা কঠিন। সূর্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রহ এবং গ্রহকে কেন্দ্র করে উপগ্রহগুলো এক অলঙ্ঘনীয় সূত্রে আবর্তিত হচ্ছে। এসব সত্যের পরিপন্থি অর্থাৎ ঈশ্বর প্রাকৃতিক কোন নিয়মের ব্যতিক্রম করেন- আমার তা বিশ্বাস হয় না। আমার ধর্ম হচ্ছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই সুশৃঙ্খল নিয়মের প্রতি আমার ভালোবাসা মিশ্রিত বিস্ময়ানুভূতি- আইনস্টাইন।

শশ্বত-ধর্ম সম্বন্ধে মধ্য ও শেষ জীবনে এসে বর্ষীয়ান আইনস্টাইনের মনোজগতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এসময় একদিন জনৈক বেন গুরিয়ন (Ben Gurion) আইনস্টাইনকে সরাসরি জিজ্ঞাস করেছিলেন- ‘‘আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?’’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে, ‘‘আমার মনে হয় শক্তির পেছনে অবশ্যই কিছু আছে (there must be something behind the energy)। ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পর বিপরীত- এখন আর আমার তেমন মনে হয় না; বরং মনে হয়, উভয়ের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। বিজ্ঞান ধর্ম ছাড়া খোঁড়া, আর ধর্মও বিজ্ঞান ছাড়া অন্ধ। যে মানুষ ধর্ম ও সত্যের ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করে না, সে মৃতের তুল্য।’’

আইনস্টাইনের ধর্ম ও বিজ্ঞান চিন্তা সম্পর্কে জনৈক রোনাল্ড ডব্লিও ক্লার্ক (Ronald W. Clark) তাঁর বইয়ে লিখেছেন যে, ‘‘ঈশ্বর অবশ্যই অধরা এবং নৈব্যত্তিক (বিমূর্ত) ; স্বর্গীয় মেশিন বা কোনো যন্ত্র তৈরির তত্ত্বাবধায়কমাত্র নন। তিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তর্কাতীত শক্তি হিসেবে অতি দক্ষতার সাথে বিশ্ব পরিচালনা করছেন।’’

প্রসঙ্গত, মৃত্যুবরণের আগের বছর, ১৯৫৪ সালে আইনস্টাইন খেদোক্তি করে বলেছিলেন যে, ‘‘ইহুদি পরিবারে জন্মালে আমি সমমনা বন্ধুদের সাথে নিয়ে একজন ‘কোয়াকার’ হিসেবে সমস্ত রকম বিভেদের দেয়াল ভেঙ্গে সাম্য, মানবতা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করে অন্তর্জগৎ আলোকিত করতাম।’’ অর্থাৎ শেষ জীবনে এসে আইনস্টাইন নিজেও দুটি আলাদা জগতের কথা উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁর মতো স্বনামধন্য বিজ্ঞানিবর্গ জড়জগতের বিভিন্ন তথ্য অথবা সূত্র নির্ণয়ের প্রতি যতটা একনিষ্ঠ ছিলেন, সে তুলনায় ঈশ্বরের মহিমা উপলদ্ধির ক্ষেত্রে ততটাই উদাসীন ছিলেন। অন্তর্জগতের মহিমা উপলব্ধির জন্য যাঁরা একনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরা হলেন ‘দিবীব আততম্’ চক্ষুর্ধারী মুনিঋষি।

উল্লেখ্য, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, মিসাইলম্যান’ নামে খ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট পণ্ডিত ড. এ. পি. জে আবদুল কালাম বলেছেন যে, ‘‘মানুষের অসাধারণত্ব এই যে, সে অন্তর্জগৎ ও বহির্জগৎ- দুটির ওপরই আধিপত্য বিস্তার করতে পারে- সে সামর্থ তার আছে। স্বামী রঙ্গনাথানন্দজী ‘বিবেকচূড়ামণি ও তার মর্মবাণী’ গ্রন্থে বলেছেন যে, এই দ্বিমুখী অভিযাত্রার ফলও আলাদা। বহির্জগতে অনুগমনের ফল পার্থিব উন্নতি এবং অন্তর্জগতে অনুগমনের ফল আধ্যাত্মিক মুক্তি। ভৌত বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে আমরা যেমন বহির্জগতে নানারকম অনুসন্ধান চালাই, ঠিক সেরকম, অন্তর্জগতকে জানারও একটি বিজ্ঞানসম্মত প্রণালির কথা মহারাজ ব্যক্ত করেছেন। যখন আমি আইনস্টাইনের ‘ইউনিফাইড থিওরির ফোর ডাইমেনসনার কনটিনিউয়াম’ (four-dimensional continuum of Unified Theory) তত্ত্বটি বোঝার চেষ্টা করি এবং বিবেকচূড়ামণির ২৩৯ সংখ্যক শ্লোক সম্বন্ধে রঙ্গনাথানন্দজীর আলোচনা পড়ি যে- ‘একম্ এব অদ্বিতীয়ম্’- সত্য ব্রহ্মে জ্ঞাতা-জ্ঞান ও জ্ঞেয়’র সব পার্থক্য মুছে যায়- কারণ ব্রহ্ম অসীম, সকল আপেক্ষিকতার উর্ধ্বে আত্যন্তিক জ্ঞান, তখন মনে হয় শঙ্করের দেওয়া ব্রহ্মের বর্ণনার আলোকে ‘ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি’র (Unified Field Theory) সমস্যাটিকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। আমার মনে হয়, ভারতীয় ও অন্যান্য দেশের বিজ্ঞান-গবেষকদের এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে।’’ ভারতের প্রাক্তন এই রাষ্ট্রপতি বিজ্ঞান ও ধর্মে কোনো বিরোধ দেখেননি; বরং স্বামী বিবেকানন্দের সুরে বলেছেন যে, এমন এক ঐশ্বরিক শক্তি আছে, যা মানুষের দুর্দশা ও ব্যর্থতা থেকে মুক্তি দিতে পারে।

সনাতন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ উপনিষদে উল্লেখ আছে যে, জড়জগৎ এবং অতীন্দ্রিয় জগৎ মিলে যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলমান, তা একটি সুশৃঙ্খল নিয়মের দ্বারা অখণ্ড সূত্রে বাঁধা। বিজ্ঞানীরা অজানা জড়জগতের সত্য উদ্ঘাটন করে থাকেন; আর মুনি-ঋষিরা আজীবন অতীন্দ্রিয় জগতের মহাসত্যান্বেষণে ডুবে থাকেন। অর্থাৎ বিজ্ঞান শিক্ষার স্থান বিশ্বপ্রকৃতি (বহিঃপ্রকৃতি)। এ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন যে, সত্যদ্রষ্টা মুুনি-ঋষিগণ প্রায়শ জড় বিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞ; অনুরূপভাবে জড়বিজ্ঞানীরাও ধর্মবিজ্ঞানে প্রায় অনভিজ্ঞ। কারণ বিজ্ঞান ও ধর্ম দুটি আলাদা বিষয় (বহিঃপ্রকৃতির বিজ্ঞান ও অন্তঃপ্রকৃতির বিজ্ঞান)। তাই স্বামীজী ধর্মকে বিজ্ঞানমুখী এবং বিজ্ঞানকে ধর্মমুখী করার উপর অনেকখানি জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। মনুষ্য সমাজ থেকে ধর্মকে সরিয়ে নিলে যেমন শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যদি পড়ে থাকে, তেমনি বৈজ্ঞানিক আবিস্কার তথা প্রযুক্তিগত সুফলাদি পরিত্যাগ করা হবে মানবজাতির জন্য চরম বোকামি। স্বামীজীর এই ধারণার অনুবৃত্তি করে ভৌত-জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর এ মিলিকান(R. A Milikan) লিখেছেন; ‘‘যে-দুটি স্তম্ভের উপর সকল মানবের কল্যাণ ও উন্নতি নির্ভরশীল, তার প্রথমটি হলো- ধর্মভাব এবং দ্বিতীয়টি বিজ্ঞান-চেতনা বা সাধারণ জ্ঞান।’ এ প্রসঙ্গে স্বামীজী বলেছেন যে, অবশেষে মানুষের মন বা অন্তর্জগতই বহির্জগতের উপর প্রভুত্ব করে।

শ্রীশ্রী গীতার তৃতীয় অধ্যায়ের ৩য় শ্লোকের অর্থ: এ জগতে আত্মনিষ্ঠ হওয়ার দুরকম প্রয়োগবিধি আছে, জ্ঞাননিষ্ঠা বা জ্ঞানযোগ এবং কর্মনিষ্ঠা বা কর্মযোগ। জ্ঞানযোগীরা বেদান্ত বিজ্ঞানে প্রাজ্ঞ এবং জ্ঞানভূমিতে সমারূঢ় থেকে তাঁরা সাধনমার্গে বিচরণ করেন। এখানে জ্ঞান মানে ঈশ্বরোপলব্ধি জাত জ্ঞান। পক্ষান্তরে বিজ্ঞান চর্চা হচ্ছে বহির্জাগতিক কর্মসকলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়। উপনিষদ মতে একনিষ্ঠ বিজ্ঞান সাধনাও আধ্যাত্মিক সাধনার তুল্য এবং এসব কর্ম কখনই যান্ত্রিক নয়। এ প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, উভয় বিজ্ঞান গোষ্ঠী, (অর্থাৎ বেদ ও বিজ্ঞান) পরস্পর সম্পূরক, এই দুটি ভাবের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন।

বস্তুত, উপনিষদ ও শ্রীশ্রীগীতাশাস্ত্র এবং স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী রঙ্গনাথানন্দ, ড. এ.পি.জে আবদুল কালাম প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের মতে, বহির্জগত ও অন্তর্জগত- উভয় প্রণালিই বিজ্ঞানসম্মত এবং এই দ্বিমুখী অভিযাত্রার ফলও আলাদা। প্রকৃতার্থে আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন একজন গীতোক্ত মহান কর্মযোগী। প্রথম জীবনে একজন বৈজ্ঞানিক হিসেবে ঈশ্বর ও ধর্ম সম্বদ্ধে তাঁর যে অনুভুতি ছিল, পরিণত বয়সে এসে তা থেকে তিনি অনেক দূরে সরে গেছেন। বর্ষীয়ান আইনস্টাইনের মতে তখন অন্তর্জগতের (ঈশ্বরীয়) আলোর পরিস্ফুটন ঘটতে শুরু করেছে এবং ক্রমেই তা স্পষ্টরূপ লাভ করেছে। ফান্সিস বেকনের একটি উক্তি এখানে স্মরণযোগ্য- ‘‘বিজ্ঞানের সুগভীর অনুশীলন বৈজ্ঞানিককে ধর্মের পথে নিয়ে যায়।’’ জীবন-সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে সাম্য ও উদার মানবসেবার আকাক্সক্ষা বুকে নিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯৫৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র ;
১। Subtle Is the Lord : The Science and the Life of Albert Einstein, Abraham Pais, 1982, Oxford University Press, NY.

২। Autobigraphical Notes. Albert Einstein 1979. Open Court Publishing Company, Chicago, Illinois. pp 3-5

৩। Albert Einstein, The World Asl See It, Secaucus, 1999. The Citadel Press, NJ. p-5.

৪। Albert Einstein, the Humab Side, Helen Dukas and Banesh Hoffman, eds, 1981. Princeton University Press, Princeeton, New Jersey, p 39-43.

৫। The Expanded Quotable Einstein, Alice Calaprice, ed, 2000, Princeton, New Jersey, Princton University Press . p 216.

৬। Einstein: His Life and Universe, Issacson, Walter, 2008. Simon & Schuster. p 390-461.

৭। Albert Einstein Cretor and Rebel, Banesh Hoffmann, 1972. New American Library, NY. p 95.

৮। Einstein’s God; Just What did Einstein Believe about God. Alice Calaprice, ed.2000. Princeton University Press, Princeton, NJ  p 201

৯। The Great Thoughts, George Slades, ed. 1996. Ballantine books, NY, p 134.

১০। Religion & Science, Albert Einstein. Alice Calaprice, ed. 2000. Princeton University Press, Princeton, NJ, p. 205-206.

১১। The Ultimate Quotable Einstein. Alice Calaprice, ed. 2010. Princeton University Press, Princeton, NJ pp 325.

১২। The Private Albert Einstein, Peter A Bucky, 1992. Andrews & McMeel, Kansas City, p 86.

১৩। The Einstein Almanac, Calaprice, Alice 2005. Baltimore; JHU Press, p 91

১৪। Einstein; The Life & Times. Ronald W. Clark, 1971. World Publishing, NY p 19-20.

১৫। ibid, 1995, NY; Random House Value pub, p 339. (Quaker’s believe in inner light’ or sense working in soul, it is a doctrine of a religious society consisting of friends in Christianity).

১৬। ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম। স্বামী রঙ্গনাথানন্দ-এর ‘বিবেকচূড়ামণি ও তার মর্মবাণী’ গ্রন্থের ভূমিকা, পৃষ্ঠা (১৬-১৭)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here