আলোর পথযাত্রী হেলেন কেলার

0
149
হেলেন কেলার

নারী ও শিশু ডেস্ক: ১৮৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় কেলার দম্পতির কোল আলো করে এলো একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান, নাম রাখা হলো হেলেন। ছোট্ট হেলেন স্বভাবসুলভ চপলতায় মাতিয়ে রাখে সবাইকে, ঘর আলো করে রাখে শিশুমনের খুনসুটিতে। এমন সময় হঠাৎ ভীষণ জ্বরে পড়লো শিশু হেলেন। অনেকদিন লাগিয়ে সেই জ্বর সারলো, হেলেনের পরিবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু মা উদ্বিগ্নচিত্তে খেয়াল করলেন, কই, দরজার ঘণ্টার আওয়াজে হেলেনের কোনো বিকার নেই কেন? আগে তো আওয়াজ শুনলেই সবার আগে দৌড়ে যেত হেলেন!

দুরুদুরু বুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে শুনলেন সবচেয়ে খারাপ খবরটা- এই সর্বনাশা জ্বর হেলেনের শ্রবণশক্তি কেড়ে নিয়েছে! শুধু তাই না, অসুখ হেলেনকে চিরদিনের মতো অন্ধ করে দিয়েছে! আকাশ ভেঙে পড়লো বাবা-মা’র উপর। এই নিদারুণ অসহায়ত্ব হেলেনকে উন্মাদ করে তুললো। আঁচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় সে কাছের মানুষদের। উপায়ন্তর না দেখে হেলেনকে নিয়ে তার বাবা-মা পাড়ি জমালেন বাল্টিমোরে। সেখানে পরিচয় হয় এক তরুণী ডাক্তার এন সুলিভানের সাথে।

শুরু হলো শিশু হেলেনের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এদিকে হেলেনকে শেখাতে এসে সুলিভান পড়লেন মহা সমস্যায়। এমন দুরন্ত শিশু তিনি আর দেখেননি! শান্ত করে তাকে বসানোই দায়! বহুকষ্টে হেলেনকে তিনি নিয়ে গেলেন এক পুকুর পাড়ে। হেলেনের ছোট্ট হাতে ছোঁয়ালেন পানি, আরেক হাতে হাত ধরে লিখলেন “-িধ-ঃ-ব-ৎ” এতদিনে যেন কিছুটা শান্ত হলো হেলেন, এক রাতেই তার শেখা হয়ে গেল ৩০টি শব্দ!

সেই যে শেখার যাত্রা শুরু, তা আর থামেনি হেলেনের জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। সুদীর্ঘ ২৫ বছর সাধনা করে তিনি শিখলেন মানুষের সাথে আলাপচারিতা করার উপায়। পড়ালেখা করতে দৃঢ সংকল্পবদ্ধ হেলেন ভর্তি হলেন কেমব্রিজে, ইতোমধ্যে তার এই সংগ্রামের কথা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। এই সময়ে মার্ক টোয়েনের মতো বিভিন্ন গুণী ব্যক্তির সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় তাঁর। তাদের সংস্পর্শে হেলেন স্বপ্ন দেখলেন পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার, নিজের জীবনে অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন অনন্য এক জীবনকাহিনী ‘দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ’।
পরবর্তী জীবনে হেলেন প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে অসামান্য অবদান রাখেন। বিভিন্ন দেশে বক্তব্য রাখেন এই মানুষটি শিক্ষা, অধিকার ও মানবতার উপর। অবদান রাখেন বিভিন্ন জনহিতৈষী কার্যক্রমে, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। জীবনসায়াহ্নে এসে হেলেন উপলব্ধি করলেন পৃথিবীকে আরো কিছু দেবার আছে তার, তাই বেরিয়ে পড়লেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিযানে- পাঁচ মাস ব্যাপী সফরে ভ্রমণ করলেন এশিয়াজুড়ে চল্লিশ হাজার মাইল, বক্তব্য রাখলেন দেশে দেশে, অনুপ্রাণিত করলেন শত কোটি মানুষকে।

এতদিনে যেন নিজেকে মুক্ত করলেন হেলেন। পৃথিবীর রূপ রস আপন আলোকে দেখা হয়নি জীবনে। হয়তো মৃত্যুর পর স্রষ্টার দর্শনেই প্রথম চোখ মেলবেন তিনি, তাই ৮৮তম জন্মদিনের মাত্র অল্পকিছুদিন আগে ঘুমের মধ্যে পরম শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন হেলেন কেলার।

এই মহীয়সী নারীর চোখে জ্যোতি ছিল না, কিন্তু তার অন্তরের যে দ্যুতি তা তো ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীজুড়ে, আলোকিত করেছে শত কোটি মানুষকে। জীবনজুড়ে মানুষটির পৃথিবী ছিল শব্দহীন, কিন্তু কাজের মাধ্যমে তিনি যে স্বপ্নময় এক পরিবর্তনের ঝংকার এনেছিলেন তা পৃথিবীবাসীর হৃদয়ে ধ্বনিত হবে চিরদিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here