আল্লাহতে পৌঁছার বিজ্ঞান সুফিবাদ

1
448


প্রফেসর ড. সৈয়দা তাকলিমা সুলতানা
ইসলাম মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কিভাবে জীবন পরিচালনা করতে হয়, তার বিধি-বিধান এতে রয়েছে। এ শান্তিময় জীবন বিধানকে কার্যকরী করার জন্য প্রয়োজন সুফিবাদের চর্চা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘‘সে সফলকাম, যে পবিত্রতা অর্জন করেছে ও প্রভুর জিকির করে এবং নামাজ কায়েম করে।’’ (সূরা আলা ৮৭ : আয়াত ১৪) অন্যত্র এরশাদ হয়েছে- ‘‘যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো কাজে আসবে না সেদিন উপকৃত হবে সে যে আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে আসবে।’’ (সূরা শুআরা ২৬ : আয়াত ৮৮ ও ৮৯)
মহান আল্লাহ আরও এরশাদ করেন- ‘‘যে ব্যক্তি আত্মাকে পুতঃপবিত্র রাখল, সে সাফল্য লাভ করল। আর যে ব্যক্তি আত্মাকে কলুষিত করল সে ধ্বংস হয়ে গেল।’’ (সূরা শামস ৯১ : আয়াত- ৯-১০)
হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসুল (সা.) ফরমান- ‘‘সাবধান! নিশ্চয়ই মানুষের দেহের ভিতর এমন এক টুকরা মাংস আছে, সেই মাংস টুকরা যখন যথার্থরূপে পবিত্র হয়ে, তখন সমস্ত দেহই পবিত্র হয়। আর সেটা যখন অপবিত্র হয়ে পড়ে তখন সমস্ত দেহই অপবিত্র হয়ে যায়, আর তাহলো ক্বালব (হৃদয়)।’’ [বোখারী শরীফ]
সুফিবাদ মানুষকে ষড়রিপুর বেড়াজাল হতে মুক্ত হতে সাহায্য করে, মানুষের মাঝে স্রষ্টার গুণাবলী সংস্থান করে আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য লাভে সক্ষম করে তোলে। সুফিবাদের সাধনা বলে একজন অতি সাধারণ মানুষই আদর্শ মানব ও ইনসানে কামেলে পরিণত হয়ে যায়। একজন মানুষ ষড়রিপু কি উপায়ে দমন করতে পারবে এবং মানবীয় গুণাবলী অর্জন করতে সক্ষম হবে, মূলত এই শিক্ষাই হলো সুফিবাদের শিক্ষা।
সুফি সাধনার পথিক বা তরিকত পন্থীগণকে সর্বদা যে বিষয়গুলির প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, তাহচ্ছে-
১। হুঁশ দরদম: অর্থাৎ- শ্বাস প্রশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রাখা ও শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সর্বদাই জিকির করা। সদা-সর্বদা এভাবে খেয়াল রাখলেই আল্লাহর রহমতে শীঘ্রই ‘হুজুরি ক্বালব’ লাভ হবে। নতুন বা প্রথম শিক্ষার্থীর জন্য এই নিয়মটি খুবই উপকারী। তরিকত পন্থীগণ সবকসমূহের মধ্যে কিছুদূর অগ্রসর হলে সর্বদাই এই খেয়াল রাখতে হবে, যেন কোনো মুহূর্তে আল্লাহ পাকের জিকির দিল হতে সরে না যায় অর্থাৎ- জিকির ভুলে না যায়। কোনো সময় মনের অজান্তে জিকির হতে গাফেল হয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে আবার জিকির খেয়াল করা শুরু করতে হবে। এভাবে জিকির খেয়াল করতে করতে আল্লাহর ফজলে শীঘ্রই হুজুরি ক্বালব লাভ হবে।
২। নজর বর কদম: চলাফেরা করার সময় পায়ের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করা। চতুর্দিকে আনন্দ স্ফূর্তির নানা লোভনীয় দৃশ্য হতে যেন দৃষ্টি এদিক ওদিক গিয়ে অন্তরকে আল্লাহ পাকের দিক হতে বিচ্ছিন্ন করে দিতে না পারে সেইদিকে সতর্ক থাকা। চোখের দৃষ্টি হতে অনেক পাপের সৃষ্টি হয়, তাই চোখকে মনের আয়না বলা হয়। তাই সুফি সাধনায় চোখের দৃষ্টির হেফাজত করার শিক্ষা দেওয়া হয়। চোখ দিয়ে খারাপ বস্তু, নিষিদ্ধ বস্তু দৃষ্টিপাত হতেই বহু পাপের সৃষ্টি হয়। চোখের দৃষ্টি লাগামহীন হয়ে পড়লে তরিকতের শিক্ষার্থীর পক্ষে একদিকে যেমন জিকিরের উন্নতি লাভ করা খুবই কষ্টকর অপর দিকে পাপ চিন্তা ও পাপ কর্ম হতে মনকে আল্লাহ পাকের খেয়ালে মোতওয়াজ্জুহ রাখা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য সর্বদা জাহেরি দৃশ্য হতে চোখকে যথা সম্ভব নিম্নগামী করে রাখতে সচেষ্ট হবে।
৩। ছফর দর ওতন: মানবীয় কু-অভ্যাসসমূহ হতে মনকে পাক-পবিত্র করত ফেরেশতার পবিত্র স্বভাবর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। ছফর দর ওতন অর্থাৎ তরিকত পন্থীগণ নিজ চরিত্রের মধ্যে অনুসন্ধান করে দেখবে যে, নিজের ভিতরে কি কি দোষত্রুটি আছে, সেই দোষত্রুটি খুঁজে বের করে তা দূর করার জন্য চেষ্টা করা।
৪। খেলওয়াৎ দর আনজুমান: লোক সমাগম, সভা সমিতি অর্থাৎ- লোকালয়ে অবস্থান করলেও নিজের মনে নিজে একা থাকবার অভ্যাস করা এবং সদা সর্বদা আল্লাহর জিকির খেয়ালে মনকে লিপ্ত রাখা। অর্থাৎ- বাহ্যিক কাজ কর্ম ও কথাবার্তার সময়ও মন যেন খোদার জিকির হতে একেবারে দূর না হয়ে পড়ে এর প্রতি লক্ষ্য রাখা একান্ত আবশ্যক। এই মর্মে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘পৃথিবীর ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর জিকির হতে বিরত না রাখে।’’ (সূরা মুনাফিকুন ৬৩ : আয়াত ৯) তরিকত পন্থীদের এই অবস্থার উৎকর্ষ সাধনের জন্য নিপুণতার সাথে নিয়মিত সাধনা করতে হয়।
৫। ইয়াদ কারদ: এর অর্থ হচ্ছে স্মরণ করা। সর্বদা আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকা অর্থাৎ- আল্লাহর জিকির হতে মন গাফেল না হওয়া। এ ক্ষেত্রে মোর্শেদের পরামর্শ মোতাবেক যার যে স্থানে সবক আছে সেখানে রীতিমত খেয়াল রাখবে এবং তরিকার আমল করবে। তাফসীরে আজীজীর টীকায় লিখিত আছে, হযরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) বলেছেন, ‘সর্বদা আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ ও তাঁর ভক্তিপূর্ণ মন রাখাই জিকির করার মূল উদ্দেশ্য।’
৬। বাক্ত গাশত: করজের অবস্থায় লতিফার জি¦কির কমে যায় বা বন্ধ হয় যায় কিংবা লতিফা ভারি বোধ হয় সাধারণত ফাসেক লোকদের সঙ্গ লাভে। আবার আত্মগরীমা, কখনও গীবত করা, আবার কখনও পরস্ত্রীর প্রতি দৃষ্টিপাত করা। মোটকথা তরিকত পন্থীদের যে সমস্ত কাজগুলো হতে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে তাতে নিজেকে জড়ালে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে। যে প্রকারেই আরজ হোক না কেন, তা স্বীয় কৃত পাপের জন্য হয়েছে মনে করে জি¦কির করার পূর্বে বা কিছুক্ষণ জি¦কির করার ফাঁকে ফাঁকে বিনীতভাবে কেঁদে কেঁদে আল্লাহর দরবারে এস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয় ও কিছু সময় জিকির করবার পর তিনবার কিংবা পাঁচবার বলবে ‘‘হে আল্লাহ! তুমিই আমার একমাত্র মকছুদ, তোমারই জন্য আমি দুনিয়া ও অন্যান্য সব ত্যাগ করেছি, তোমার নৈকট্য লাভে আমাকে সুখী করো।’’এরূপ মোনাজাত করলে আল্লাহর অনুগ্রহে পুনরায় লতিফা জারি হয়। আর যদি হৃদয় গায়তম কালিমায় আচ্ছন্ন হওয়ার করজা দূর না হয়, তবে মোর্শেদকে অবহিত করে তাঁর নির্দেশ মোতাবেক লতিফা জারি করে নিতে হবে।
১০। নেগাহ দাশত: অন্য চিন্তা যেন মনে না আসে, তা লক্ষ্য রাখা। হযরত খাজা নকশবন্দ (রহ.) বলেছেন, মনে চিন্তা, অন্যভাব আসলে তৎক্ষণাৎ তা দূর করার চেষ্টা করবে, কেননা তা দিলে বেশি সময় স্থায়ী হলে তরিকত পন্থীর বিশেষ ক্ষতির আশঙ্কা আছে। কাজেই তা অল্প সময়ের জন্যেও দিলে স্থান দিবে না।
১১। ইয়াদ দাশত : সর্বদা আল্লাহ তায়ালার নাম স্মরণ রাখা। অবশ্য মুখে উচ্চারণ করা শর্ত নয়। ক্বালবে খেয়াল করাই এর উদ্দেশ্য। যাদের হয়ে যায় ক্বালবে আল্লাহর জিকির জারি তাদের জন্য আর কোনো প্রকার অসুবিধা হয় না।
১২। অকুফে জামানী: অর্থাৎ- নিজ মোরাকাবা ও জিকির রীতি মত হচ্ছে কিনা, প্রতি ঘন্টায় তা লক্ষ্য করে দেখা। যদি দেখা যায় যে, গাফেল অবস্থায় কিছু সময় ব্যয় হয়ে গিয়েছে, তাহলে আবার তওবা করে রীতিমত মোরাকাবা ও জিকির আরম্ভ করতে হয় এবং পুনঃ যাতে এরূপ না হয়, সাবধান থাকতে হয়।
১৩। অকুফে আদাদী: বেজোড় সংখ্যার জিকির করার প্রতি লক্ষ্য রেখে এই জিকির খেয়াল রাখতে হয়।
১৪। অকুফে ক্বালবী: অর্থাৎ ক্বালবে সদা সর্বদা আল্লাহর জিকির হচ্ছে কিনা লক্ষ্য রাখা। কাদেরিয়া তরিকার মাশায়েখগণ বলেছেন, আল্লাহর জিকির ব্যতীত কোনো কু-চিন্তা দিলে আসতে পারে তৎপ্রতি লক্ষ্য রাখাই অকুফে ক্বালবী। পবিত্র কুরআনুল কারিমে রাব্বুল আলামিন ফরমান, ‘‘হে ইমানদারগণ! তোমরা অত্যাধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করো।’’ (সূরা আহযাব ৩৩: আয়াত ৪১) এ আয়াতের তাফসিরে রুহুল বয়ানে লিপিবদ্ধ আছে যে, দিবসে, রাত্রে, শীতে, গ্রীস্মে, নদ-নদীতে, প্রবাসে-আবাসে, লোকালয়ে বা জঙ্গলে, আরামে-ব্যারামে, শয়নে-উপবেশনে সর্বাবস্থায় আল্লাহর জিকির করো। আবার এ কথার সমর্থনে তাফসীরে রুহুল বয়ানের ৩য় খণ্ডে সূরা আহযাবে হযরত রাসুলে করিম (সা.)-এর হাদিস আছে যে, ‘‘যে যার প্রতি ভালোবাসা রাখে, সে তার নাম সর্বদা স্মরণ করে থাকে।’’ এ প্রসঙ্গে আমাদের মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান স্বরচিত গজলে তার মোর্শেদ ইমাম সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ (রহ.)-এর পরশে ধন্য হয়ে গেয়েছিলেন- ‘‘যে যাহারে ভালোবাসে, সে তাহারে ভুলে না; যারে মোর্শেদ ভালোবাসে, তারে মোর্শেদ কভু ছাড়ে না।’’
সম্মানিত পাঠকগণ, প্রত্যেকটি জিনিসেরই দুটি দিক থাকে একটি জাহের আরেকটি বাতেন। মহাগ্রন্থ কুরআনেরও জাহেরি ও বাতেনি দিক আছে। কুরআনের জাহেরি দিক হলো শরিয়ত তথা ইসলামের মনোনীত আদেশ, নিষেধ, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ অন্যান্য বিধি-বিধান। আল-কুরআনের বাতেনি দিক হলো সুফিবাদ বা এলমে তাসাউফ। তাসাউফ বা সুফিবাদ ব্যতীত কোনো ইবাদতই আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।
সমাজে একদল আলেম আছে যারা কেবলমাত্র কুরআন-হাদিস পড়ে কিন্তু এর বাতেনি দিক বা সুফিবাদের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে না। তারা বাহ্যিকভাবে নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত আদায় করছে কিন্তু তাদের পাশবিক চরিত্রের বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন ঘটছে না। কারণ ইসলামের বাতেনি দিক বা সুফিবাদকে ছেড়ে তারা জাহেরি বিধি-বিধান বা শরিয়তকে আঁকড়ে ধরেছে। তাই তাদের শত ইবাদতেও কু-রিপু দমন হয় না। ফলে ধর্মের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে পারে না। অপরদিকে, এক শ্রেণীর ধ্যান সাধনাকারী আছেন, যারা ইসলামের ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনের গুরুত্ব অস্বীকার করেন। কেবলমাত্র মৌখিক জ্বিকির নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। মূলত এ দুই দলই ইসলামের মূল সত্তা হতে দূরে আছেন। কেননা, শরিয়ত ইসলামের দেহ আর মারেফত বা সুফিবাদ হলো আত্মা। এই দুইয়ের সমন্বয়ে যেমন দেহ গঠিত, তেমনি শরিয়ত ও মারেফত নিয়েই ইসলাম ধর্ম গঠিত। যে পর্যন্ত আমরা এলমে তাসাউফ বা সুফিবাদ দ্বারা নিজেদের অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে সক্ষম না হবো, সে পর্যন্ত কুরআন ও হাদিসের জাহের ও বাতেন কার্যাবলী আমল করতে পারবো না। কেননা এলমে তাসাউফ বা সুফিবাদ ব্যতীত কারো পক্ষেই কুরআন ও হাদিসের জাহের ও বাতেন কার্যাবলী বুঝে আমল সম্ভব নয়। যখন আমরা সুফিবাদের দ্বারা অন্তরাত্মা শুদ্ধ করতে, ঐশী সত্তায় হৃদয় প্রজ¦লিত করতে সক্ষম হবো তখনই পবিত্র কুরআন ও হাদিসের জাহেরি ও বাতেনি অর্থ আমাদের কাছে স্পষ্টতর হতে থাকবে। আর আমরা হতে পারবো আল্লাহর গুণে গুণান্বিত। আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন। আল্লাহর প্রতিনিধির মর্যাদা অর্জন করতে হলে, ধর্মের নিগূঢ় তথ্য অনুধাবন করতে হলে হৃদয়ের পাপরাশি হতে আত্মাকে মুক্ত করতে হলে নিভৃত হৃদয়ে ঐশী আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করতে হবে। আর সেই অন্ধকার হৃদয় তখনই আলোকিত হতে পারে, যখন কোনো প্রজ্বলিত প্রদীপের ঘর্ষণ বা ছোঁয়া পায়। অর্থাৎ অলীয়ে কামেলের পবিত্র আলোকিত হৃদয় সাধক বা মুরিদের নিভন্ত হৃদয়কে প্রজ্বলিত করে থাকে। যেমনিভাবে একটি জলন্ত মোমবাতি দ্বারা অপর একটি নিভন্ত মোমবাতি জ্বলে উঠে। এভাবে মোর্শেদ ভক্তের হৃদয়ে ‘আল্লাহ’ নামের একটি বীজ বপন করে দেন। যখন ভক্ত ধ্যান বা মোরাকাবা দ্বারা মোর্শেদের মুখাপেক্ষী হন তখন মোর্শেদের হৃদয় হতে মুরিদের হৃদয়ে আল্লাহ নামের ফায়েজ আবর্তিত হতে থাকে। ক্রমে ক্রমে মোর্শেদ হতে প্রাপ্ত অঙ্কুরিত শিশু বীজটি ফলবান বৃক্ষে পরিণত হয়ে উঠে। সে হয়ে উঠে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফাতুল্লাহ। আমাদের দেহের যেমন খোরাক বা আহার আছে তেমনি আত্মারও খাদ্য বা আহার আছে। আত্মার খাদ্যই হলো আল্লাহর জিকির। যখন কোনো অলীয়ে কামেল ভক্তের হৃদয়ে আল্লাহর নুরের বীজ বপন করে দেন তখন দুনিয়ার ভোগ বিলাস, লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা পাপাচার-কামাচারের প্রতি তার অনীহা হতে থাকে। সে তখন আল্লাহ রাসুলের প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে পড়ে। কাজেই সকল কু-রিপু দমন করত আত্মার পরিশুদ্ধতার জন্য প্রত্যেকেরই কামেল অলীর সাহায্য গ্রহণ করতে হবে।
যদি সাধকের একাকী জীবনে আল্লাহর দিদার পাওয়া সম্ভব হতো, তাহলে নিশ্চয়ই হযরত আবু হানিফা (রহ.) এ কথা বলতে পারতেন না- ‘‘আমি যদি দুই বৎসর হযরত ইমাম বাকের (রহ.)-এর সংস্পর্শে থেকে সুফিবাদ বা মারেফত শিক্ষা না করতাম তবে আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম।’’ ‘লজ্জাতুল ইমাম’ নামক কিতাবে আছে- নোমান যদি দুই বৎসর ইমাম বাকের (রহ.)-এর সংশ্রবে না থাকত, তবে ধ্বংস হয়ে যেত। হানাফি মাযহাবের ইমাম হযরত আবু হানিফা (রহ.) যখন এ কথা বলতে পারেন, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের অবস্থান কি হতে পারে?
পাঠক একটু চিন্তা করে দেখুন।
সাধকের একাকী জীবনে অসিলা ব্যতীত আল্লাহর দিদার লাভ করা যায় না। যেমন- আল্লাহ ইচ্ছা করলে নবি রাসুলদের অসিলা ব্যতীত মানুষকে হেদায়েত করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে যুগে যুগে মহামানবকে মানব মুক্তির অসিলা বা দূত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- প্রত্যেক সুফি, অলী, মহামানবই কারো না কারো মাধ্যমে কামালিয়াত অর্জন করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-সহ প্রত্যেকেই এই পথ অনুসরণ করেছিলেন। যেমন- ইমাম ফখরুদ্দীন রাজি নামক বিখ্যাত আলেম ইমাম সাঞ্জালি (রহ.)-এর সাহায্যে ইমানের সাথে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।
হযরত জালাল উদ্দিন রুমি (রহ.) জগৎবিখ্যাত আলেম হওয়া সত্তে¦ও শামস তীবরীজ (রহ.)-এর অসিলা গ্রহণ করেছিলেন। প্রত্যেক তরিকার ইমামগণের পথ প্রদর্শক বা মোর্শেদ ছিলেন। যেমন- হযরত আব্দুল কাদের জিলানি (রহ.)-এ মোর্শেদ ছিলেন হযরত শেখ আবু সাঈদ মাখদুমি (রহ.), হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.)-এর মোর্শেদ ছিলেন হযরত শাহ আমীর সৈয়দ কামাল শাহ (রহ.), হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-এর মোর্শেদ ছিলেন হযরত খাজা ওসমান হারুনি (রহ.), হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসাান (রহ.)-এর মোর্শেদ ছিলেন হযরত বাকী বিল্লাহ (রহ.), পিরানে পির, দস্তগীর সুলতানুল মাশায়েখ, সুলতানীয়া-মোজাদ্দেদীয়া তরিকার ইমাম সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ (রহ.)-এর মোর্শেদ ছিলেন হযরত খাজা ইউনুস আলী এনায়েতপুরী (রহ.)। সুতরাং জীবাত্মার শৃঙ্খল হতে মুক্ত হয়ে মহান আল্লাহ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর নৈকট্য লাভের জন্য প্রত্যেকেরই প্রয়োজন আল্লাহর মনোনীত কোনো খাঁটি অলীয়ে কামেলের সহবত লাভ করা। আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনে ফরমান-‘‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর নৈকট্য লাভের উপায় (অসিলা) অন্বেষণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’’ বর্তমান মুসলমানগণ আচার অনুষ্ঠানের মাঝেই ইসলামকে প্রাণহীন বা শক্তিহীন করে রেখেছে। তাই সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বর্তমানকালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতির প্রেক্ষাপটে এজিদি ইসলামের অর্থাৎ- প্রচলিত বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান ভিত্তিক (অন্তঃসারশূন্য) ইসলামের স্থানে মোহাম্মদী ইসলামকে পুনর্জাগরিত এবং পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি এলমে তাসাউফকে ইসলামের মহামূল্যবান বিষয় হিসেবে স্বীকৃতির জন্য এক মহা আন্দোলনের সূচনা করেছেন। এলমে তাসাউফের সঠিক চর্চা মানুষকে আত্মিক শান্তি ও পবিত্রতা এবং জাগতিক জীবনের উন্নতির সকল প্রয়োজনীয় কৌশল সম্পর্কে জ্ঞানী করতে পারে। উহা মানুষকে বাস্তব জীবনের এবং সামাজিক উন্নতি ও শান্তি বিধানের উৎকৃষ্ট বিদ্যা শিক্ষা দেয়। উহা বৈজ্ঞানিক চিন্তা ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এর চর্চার মাঝেও বিজ্ঞান নিহিত আছে। সূফী সম্রাটের এ শিক্ষা দিন দিন সকল স্তরের মানুষের নিকট সমাদৃত হচ্ছে। তাঁর অনুসারী ও ভক্তগণ আশেকে রাসুল হিসেবে পরিচয় দিয়ে আনন্দ ও গর্ববোধ করেন। তারা এর প্রসারে দৃঢ় সংকল্প বদ্ধ। তাদের শক্তি ও প্রেরণা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা ও হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রেম, ক্বালবে আল্লাহর জিকির। ক্বালবে আল্লাহর জিকির প্রকৃতপক্ষে ইমানের আসল বস্তু। সূফী সম্রাটের তাওয়াজ্জোহ শক্তি বলে তাঁর অনুসারী ভক্তগণ ক্বালবে জ্বিকিরের গুণ অর্জন করতে সক্ষম হন। এর মাধ্যমে আল্লাহ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর পরিচয় লাভের পথ ক্রমশ পরিস্কার ও প্রশস্ত হয়ে। সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী এভাবে ইসলামের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবান বস্তুকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে আজ সংস্কারক হিসেবে বিশে^র বিভিন্ন দেশে আল্লাহ ও রাসুল প্রেমিক তৈরি করছেন। এ প্রক্রিয়া যত দ্রুত বিশ্বে প্রসার লাভ করবে তত তাড়াতাড়ি মুসলিম জাতি তাদের শক্তি ও সুখ্যাতি ফিরে পাবে। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে তাঁর এ মহান বন্ধুর শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করত বাকী জীবন তাঁর কদমে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
[লেখিকা: সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের মেজো সাহেবজাদী]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here