আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

0
191

ড. পিয়ার মোহাম্মদ
আশুরা শব্দটি আরবি আশারা থেকে এসেছে, যার অর্থ দশ। সে কারণেই ইসলামি পরিভাষায় পবিত্র মহররম মাসের দশ তারিখকে আশুরা বলা হয়। এ দিনটি নানান কারণে গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনেই মহান আল্লাহ সৃষ্টিজগতের সৃষ্টি কাজ সম্পন্ন করে আরশে সমাসীন হয়েছিলেন। অর্থাৎ এটি মহান আল্লাহর অভিষেকের দিন। এ দিনে মহান আল্লাহ হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন এবং এ দিনেই তার তওবা কবুল করেছিলেন, হযরত নূহ (আ.)-কে মহাপ্লাবন থেকে রক্ষা করে তার নৌকাসহ জুদি পাহাড়ে উঠিয়েছিলেন, হযরত ইব্রাহীম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে এ দিন মুক্তি পেয়েছিলেন, হযরত ইউনুস (আ.)-কে মাছের পেট থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, হযরত দাউদ (আ.)-এর তওবা এ দিনে কবুল হয়েছিল, হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে মহান আল্লাহ এ দিনেই দুনিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন, হযরত আইয়ুব (আ)-কে রোগমুক্তি দিয়েছিলেন, হযরত ইয়াকুব (আ.) দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছিলেন, হযরত মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করে ফেরাউন ও তার দলবলকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন, হযরত ইউসুফ (আ.)-কে কূপ থেকে উদ্ধার করেছিলেনন, হযরত ঈসা (আ.)-কে ধরাধামে প্রেরণ এবং দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। এ ধরনের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এ দিনে ঘটেছে। কারবালার হৃদয় বিদারক ঘটনার পর এ দিনটি আমাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হযরত রাসুল (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পরিবার ও তাঁর সঙ্গীদের নির্মম শাহাদত দিবস হিসেবেই পরিচিত।
প্রকৃতপক্ষে, আশুরা একটি ঘটনাবহুল দিন হওয়ার কারণে হযরত রাসুল (সা.)-এর আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই এ দিনটিকে মানুষ নানাভাবে স্মরণ করে আসছিলেন। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত রাসুল (সা.) মদীনায় এসে দেখলেন যে, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা রাখে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন এটা কোন দিন যে তোমরা রোজা পালন করছ? তারা বলল এটা এমন এক মহান দিবস যেদিন মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে তার দলবলসহ লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। হযরত মুসা (আ.) এ দিনে শুকরিয়া হিসেবে রোজা পালন করেছেন। এ কারণে আমরাও রোজা পালন করে থাকি। এ কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, তোমাদের চেয়ে আমরা মুসা (আ.)-এর অধিকতর ঘনিষ্ঠ ও নিকটবর্তী। অতপর রাসুল (সা.) রোজা পালন করলেন এবং অন্যদের পালনের নির্দেশ দিলেন (বোখারী ও মুসলিম শরীফ)। সে বিবেচনায় রাসুল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় এ দিনটিকে মুসলিম জাহানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
সে নির্দেশনার আলোকে মুসলমান সমাজ আশুরার দিনটি পালন করে আসছিল। হযরত রাসুল (সা.)-এর ওফাত গ্রহণের পর কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত বিয়োগান্ত ঘটনার পর এ দিবস পালনের ক্ষেত্রে নানা রকম ব্যাত্যয় ঘটে।
মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার মনোনয়ন অনুসারে তার পুত্র ইয়াজিদ ৬১ হিজরির সাবান মাসে সিংহাসনে আসীন হয়। এটি ছিল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে খলিফা নির্বাচনের বিপরীত। তাছাড়া, ইয়াজিদ ছিল ইসলামী ভাবাদর্শ বিবর্জিত ব্যক্তি। সেজন্য মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.) স্বৈরাচারী ইয়াজিদের খেলাফত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। কুফাবাসীরাও ইয়াজিদের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং ইমাম হোসাইন (রা.)-কে খলিফা হিসেবে দেখতে চান। তারা ইমাম হোসাইন (রা.)-কে কুফা আসার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সে আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েই হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবার পরিজন ও ৭২ সঙ্গী-সাথীসহ কুফার উদ্দেশে রওনা হন। ইতোমধ্যে কুফাবাসী ইয়াজিদের চক্রান্তে বিশেষ পরিস্থিতির শিকার হয়ে সমর্থন ত্যাগ করে। ইয়াজিদের বাহিনী এ সুযোগে কারবালার প্রান্তরে ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা ঘটায়।
সত্য মিথ্যার দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখী হয়েছিলেন বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম ইরাকের কুফা নগরীর অদূরে ফোরাত নদীর তীরবর্তী কারবালা প্রান্তরে তিনি ইয়াজিদ বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে পরিবার পরিজন ও ৭২ জন সঙ্গীসহ নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন। উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের অন্যায় সিদ্ধান্ত মেনে না নেওয়ার কারণেই ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সাথে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সম্মুখ যুদ্ধে সুবিধা হবে না জেনেই ইয়াজিদ ইমাম হোসাইন (রা.)-এর সাথে প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে। একটি সমঝোতায় পৌঁছার জন্য তাকে কুফায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। অথচ পথিমধ্যে ইয়াজিদ বাহিনী তাঁদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। ফোরাত নদীর পানি গ্রহণ করতে না দেওয়ায় পানির অভাবে তৃষ্ণার্ত মানুষের কষ্ট ইয়াজিদের বিবেচনায় আসেনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ইমাম হোসাইন (রা.) শত্রু বাহিনীর সাথে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেন।
সে কারণে আশুরার দিন সংঘটিত অনেক ঘটনা থাকলেও কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর শাহাদতই এ দিবসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত। মুসলিম উম্মাহ আশুরার ব্যাপারে কারবালার ঘটনাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। ইয়াজিদ বাহিনীর মোকাবিলায় পরম করুণাময়ের প্রতি অবিচল আস্থা নিয়ে ও অকুতোভয় চিত্তে ইমাম হোসাইন (রা.) যে প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলেছিলেন, তা বিশ্বের ইতিহাসে এক নজীর বিহীন ঘটনা। তিনি অন্যায় ও অসত্যের কাছে মাথা নত না করে সত্য ও ন্যায়ের পতাকাকে উড্ডিন করার জন্য কারবালার প্রান্তরে যে ত্যাগের নজরানা পেশ করেছিলেন, তা প্রতিটি মুসলমানের জন্য প্রেরণার উৎস, মানব জাতির জন্য শিক্ষণীয়, অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ হয়ে আছে ও থাকবে। ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন অসাধারণ তেজোদীপ্ত ও বলিষ্ঠ ইমানী চরিত্রের অধিকারী। তিনি ইসলামী মূলনীতির আলোকেই মানবজাতির ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি সম্ভব বলে বিশ্বাস করতেন। এ বিশ্বাস ও মূল্যবোধের কারণেই তাকে নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করতে হয়েছিল।
তিনি অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদের বায়াত গ্রহণ করলে কারবালার প্রান্তরের বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটত না। কিন্তু তিনি তা না করে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে ইসলামের সুমহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হয়েছেন।
এ বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করলে আশুরার দিনটি মুসলিম জাহানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) তাঁর দৌহিত্র ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.)-কে অত্যধিক ভালোবাসতেন। তিনি সিজদারত অবস্থায় ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.) পিঠে চড়লে তাঁরা পিঠ থেকে না নামা পর্যন্ত সিজদায় থাকতেন। রাসুল (সা.)-এর অতি প্রিয় মানুষ হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু ও কন্যা মা ফাতেমা (রা.)-এর আদরের ধন ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.)। সে আদরের ধন ইমাম হোসাইন যেদিন নির্মমভাবে ইয়াজিদের বাহিনী দ্বারা নিহত হলেন পরিবার পরিজনসহ, সে ঘটনাকে আমরা ভুলি কিভাবে।
অনেককে বলতে শুনি আশুরা শিয়াদের অনুষ্ঠান। কত বড়ো ভুল আমাদের। এ কথা বললে আমরা কি রাসুল (সা.)-এর উম্মত দাবী করতে পারি। রাসুল (সা.) যাকে ভালোবেসেছেন আমরা যদি তাঁকে ভালোবাসতে না পারি তাহলে আমরা কিভাবে আশেকে রাসুল দাবী করতে পারি? অনেকে বলে থাকেন আশুরার দিন রাসুল (সা.) শুধু রোজা পালন করেছেন। কথা সত্য কিন্তুরাসুল (সা.)-এর সময়তো কারবালার ঘটনা ঘটেনি। তাহলে কি কারবালার ঘটনার পরও আমরা এ দিনটিকে অন্য আঙ্গিকে চিন্তা করব না। এ বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করা দরকার। সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন- আশুরার দিনটি শুধুমাত্র শিয়াদের হতে পারে না। এটি মুসলিম উম্মার সকলের। এর তাৎপর্য সকলের উপলব্ধি করে আশেকে রাসুল হওয়ার চেষ্টা করা দরকার।
আমরা যদি তা করতে না পারি তাহলে সহজেই অনুমেয় যে, আমরা ইয়াজিদের কার্যকলাপকে মেনে নিচ্ছি। তা কি হতে পারে? কখনই না। আমরা অনুসরণ করি হযরত রাসুল (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের মধ্যে বিদ্যমান আদর্শকে। দয়াল রাসুল (সা.) আমাদেরকে সেভাবেই নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা ইয়াজিদের আদর্শকে কোনোভাবেই মানতে পারি না। কারবালার যুদ্ধের পর ৮৯ বছর ইয়াজিদ গোষ্ঠী রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল। সে রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে মানুষের মন থেকে কারবালার ঘটনা মুছে ফেলার জন্য ঘটনা প্রবাহকে ভিন্ন খাতে রূপ দিতে চেয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক, কেননা সব অপরাধীই সুযোগ পেলে তার অপরাধকে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করে। আমরা কি সে ষড়যন্ত্রে পা দিব নাকি সত্যকেই গ্রহণ করব। অবশ্যই আমরা আশেকে রাসুলেরা রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত পথে জীবন যাপন করব। এ দিনের বিয়োগান্তক ঘটনাকে স্মরণ করে সত্যকে প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়ে শপথ গ্রহণ করব। ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবার ও সঙ্গী সাথীদের সে মর্মভেদী বর্ণনা শুনেও যদি আমাদের হৃদয়ে অশ্রু না আসে আর এ দিনটিকে শিয়াদের বলে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করি, তাহলে রাসুল (সা.) আমাদের উপর সন্তুষ্ট থাকবেন তা ভাবা বাতুলতা মাত্র।
ইয়াজিদের চক্রান্তে মুসলিম উম্মাহ ইসলামের সে ইতিহাস এতদিন অনেক ক্ষেত্রেই উপলব্ধি করতে পারেনি। তাই ইয়াজিদের উত্তরসুরিরা বহাল থেকে আমাদের বিভ্রান্ত করার সুযোগ পেয়েছে। যারা ইমাম হোসাইন (রা.)-কে হত্যা করেছে তারা চেয়েছে কেউ যেন এ দিনটি স§রণ না করে। সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, সে চক্রান্তের বেড়াজাল পেরিয়ে আশেকে রাসুল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
আমরা উপলব্ধি করব আশুরার দিনটি অসংখ্য ফজিলতপূর্ণ ঘটনার সাথে সাথে রাসুল (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পরিবারের নির্মম শাহাদত দিবস। আশেকে রাসুল হিসেবে এটা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। এ বিষয়টি সকল রাসুল প্রেমী মানুষের উপলব্ধিতে আসা দরকার। তা না হলে ইয়াজিদ বাহিনীর দোসরেরা এখনো এ ঘটনাকে ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে ফায়দা লুটতে চাইবে। আশুরা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের ইমানদীপ্ত পরকালমুখী জীবন গড়ে তুলতে হবে। অপরাধমুক্ত জীবন গড়ার প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। সত্যের উপর অবিচল ও অটল থাকার দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের সে চেষ্টা সফল করুন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here