ইতিহাস বিখ্যাত মুসলিম সাহিত্যিক

0
23


তানভীর আহমেদ
সাহিত্য সময়কে ধরে রাখে। সাহিত্য মানুষের মনের খোরাক জোগায়। মুসলিম সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্যজ্ঞান দিয়ে শতাব্দীকাল ধরে পাঠকের মনের পুষ্টির জোগান দিয়েছেন। জ্ঞানের আলো ও পাঠের আনন্দ তাদের সাহিত্য সৃষ্টিকে করেছে কালজয়ী। মুসলিম সাহিত্যের বড় অংশই আলোচনা করেছে স্রষ্টা প্রেমের অনবদ্য আকুল আবেদন।
স্রষ্টা প্রেমের পাশাপাশি মানবপ্রেমের নানাদিক উঠে এসেছে এই সাহিত্যকর্মগুলোতে। কবিতা ছাড়াও দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও ভ্রমণও ছিল তাদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু।


শেখ সাদি (রহ.)
শেখ সাদিকে বলা হয় ইরানের প্রধানতম কবি। তাঁর পুরো নাম আবু মুহাম্মাদ মুসলিহ আল-দিন বিন আবদেল্লা শিরাজি। প্রকৃত নাম শরফুদ্দিন। ডাক নাম মুসলিহ উদ্দিন। আর উপাধি বা খেতাব হচ্ছে সাদি। আসল নাম নয়, তিনি বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে আছেন উপাধি ‘সাদি’ নিয়ে। তাঁর সাহিত্যের ভক্ত, পাঠক ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। তিনি শুধু একজন কবি নন, মানবতাবাদী সমাজচিন্তাবিদও। ইরানের শিরাজ শহরে শেখ সাদি জন্মগ্রহণ করেন। শিরাজ ছিল এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভূমি। এখানেই মনোরম সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেন শেখ সাদি তাঁর কাব্য প্রতিভার গুণে। তাঁর জীবন শুরু হয় বেদনাসিক্ত অনুভবে। যখন শেখ সাদির বাবার মৃত্যু ঘটে তখন তিনি নিতান্তই শিশু। এ ছাড়া পরিবারে ছিল নিদারুণ অভাব। এই অভাব তাঁকে গ্রাস করতে পারেনি। কৈশোরেই তাঁর স্বভাবজাত জ্ঞানের দ্যুতির দেখা মেলে। শিক্ষাগ্রহণের আকুলতাকে তিনি এড়িয়ে যাননি। তরুণ বয়সে কবি চলে আসেন বাগদাদ শহরে। বাগদাদ তখন সাহিত্য আর সাহিত্যিকদের চারণ ভূমি। এ যেন জ্ঞানের তীর্থস্থান। বাগদাদের সুবিখ্যাত ‘আলনিজামিয়া’ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। সময়টা ১১৯৫ থেকে ১২২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এ সময় তিনি উচ্চ শিক্ষা নেন শারিয়া, আলকেমি, গভর্নমেন্ট, হিস্টোরি, অ্যারাবিক লিটারেচার অ্যান্ড থিওলজি বিষয়ে। তাঁর জ্ঞানের পরিধি কতদূর বিস্তৃত- বিষয়গুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এরই মধ্যে এলো যুদ্ধ। দুর্ধর্ষ মঙ্গোলরা মধ্য এশিয়ার খোওয়াইজম নগর ও পারস্য আক্রমণ করেছে। জন্মভূমিতে আর ফিরতে পারেননি শেখ সাদি। বাগদাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ালেন। এ সময় তিনি রচনা করলেন তাঁর সেরা কাজ বোস্তান। এটি শেষ করেন ১২৫৭ সালে। তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গুলিস্তান শেষ করেন এর পরের বছর। গুলিস্তানের ‘বনি আদম’ সারসংক্ষেপ কাব্যিক বৈশিষ্ট্যে এখনো মুগ্ধ করে পাঠকদের।


জালালউদ্দিন রুমি (রহ.)
মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম কবি-সাহিত্যিকের অন্যতম। এখনো তাঁর সাহিত্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। ইরানি সাহিত্যকে তিনি দিয়েছেন বিশ্বজুড়ে সম্মান। কবি মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির জন্ম ১২০৫ সালের (মতান্তরে ১২০৭) ২৯ সেপ্টেম্বর, ৬০৪ হিজরি ৬ রবিউল আউয়াল আফগানিস্তানের বালখে। তাঁর প্রকৃত নাম মুহাম্মদ। জালালউদ্দিন ছিল তাঁর উপাধি। সুলতান মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন মাওলানা রুমির পিতা। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) ছিলেন মাওলানা রুমির পিতৃকুল থেকে নবম বংশধর এবং মাতৃকুল থেকে ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলীর (রা.) বংশধর।
তিনি শুধু কবি ছিলেন না, ছিলেন একজন আধুনিক আধ্যাত্মিক চিন্তাচর্চার সাধক। অন্য মরমি কবি-দার্শনিকের থেকে তিনি ভিন্ন। মরমিয়াবাদী হিসেবে তিনি ছিলেন নীতি-শিক্ষক এবং সংস্কারক। দর্শন ও বিশ্বসাহিত্যের একজন অগাধ পান্ডিত্যপূর্ণ মনীষী।
মাওলানা রুমি সাহিত্যচর্চা করেছেন ফারসিতে। তাঁর স্বাভাবিক প্রবণতা আল্লাহর সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়ার ব্যাকুল তার স্তর পেরিয়ে তাঁকে ঘিরে বিরাজ করে তীব্র আকাংক্ষা। রুমির সব কাব্য ও সংগীতনানারূপে কেবল এ কথাটিই বলে। তিনি ফারসি ভাষায় অনেক জ্ঞানগর্ভ শিক্ষামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক ও উপদেশমূলক একাধিক প্রবন্ধও আছে। তার মধ্যে ‘ফিহি মা ফিহি’ অন্যতম। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ উল্লেখযোগ্য কীর্তিমান অমরত্ব পাওয়া গ্রন্থ ‘মসনবি’। মসনবি শুধু ফারসি সাহিত্য ভান্ডারে নয়, এটি বিশ্বসাহিত্য ভান্ডারেরও একটি অমূল্য সম্পদ। এই গ্রন্থে দ্বিপদী ছন্দবদ্ধ কবিতার সংখ্যা ২৫ হাজার। যা ছয় খন্ডে বিভক্ত। মসনবিতে পাঠক প্রিয় সৃষ্টিকর্তার প্রেমের অপার রহস্য উদঘাটনে তৃপ্তি লাভ করতে পারবেন। মসনবি কেবল ধর্মতত্ত্বের ওপর নয়, সাধারণ দর্শনের একটি আদর্শ গ্রন্থ হিসেবেওপরিচিত। মসনবিকে বলা হয়, একটি ধর্মীয় নীতিশাস্ত্র গ্রন্থ।


ফরিদউদ্দিন আত্তার (রহ.)
তাঁর পুরো নাম আবু হামিদ বিন আবু বকর ইব্রাহিম। লেখালেখি করতেন ফরিদউদ্দিন নামে। তাঁর লেখনী এতটাই হৃদয়গ্রাহী ছিল যে, পাঠকরা তাঁকে সুগন্ধির সঙ্গে তুলনা করতেন। তাঁর নামের সঙ্গেই জুড়ে দেওয়া হয় আত্তার বা সুগন্ধি ব্যবসায় শব্দটি। হয়ে ওঠেন তাঁর সময়ের অন্যতম প্রধান মুসলিম কবি হিসেবে। তাঁর কবিতা পড়ে মানুষের মন স্রষ্টার প্রতি আকৃষ্ট হতো।
হদয় ছুঁয়ে যাওয়ার আবেগ তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই ফারসি কবি কিন্তু সুফিবাদের ছোঁয়া রাখতেন তাঁর কবিতায়। শুধু তাই নয়, কবিতার আড়ালে সুফিবাদের যে প্রেমময় দিক উঠে আসত তা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী ভিত্তি লাভ করে।
ফরিদউদ্দিন আত্তার অন্তত ৩০টি বই লিখে গেছেন। তাঁর একটি বিখ্যাত বই হচ্ছে ‘মানতিকে তাইয়ার’ বা ‘পাখির সমাবেশ’। তিনি গবেষণার মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জন করেন তা কবিতা আকারে লিখে গেছেন।

বুল্লে শাহ (রহ.)
বুল্লে শাহ একজন প্রখ্যাত সুফি কবি। তাঁর জন্ম ১৬৮০ খ্রিস্টাব্দে। এই পাঞ্জাবি কবি, সুফি, দার্শনিকের পুরো নাম সৈয়দ আবদুল্লাহ শাহ কাদরি। তাঁর বাবা শাহ মুহাম্মদ দরবেশ। তাঁর বাবা পেশায় শিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ধর্ম প্রচারক হিসেবেও একটি মসজিদে কাজ করতেন। বুল্লে শাহের পূর্ব পুরুষগণ বুখারা থেকে এসেছিলেন।
ধারণা করা হয়, তাঁর পূর্ব পুরুষগণ মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর। তিনি মাত্র ৬ বছর বয়সে তাঁর পরিবারের সঙ্গে মা লাকওয়ালে চলে আসেন। এখানেই তিনি মাওলানা মইনুদ্দিনের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর সাহিত্য প্রতিভা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। তাঁর কবিতাগুলো মুখে মুখে পাঠ হতো। কবিতার ধরনের দিক থেকে বুল্লেশাহের ধরন ছিল কাফি।
এটি পাঞ্জাবি ঘরানার রাগ, সিন্ধি এবং সিরাকি কবি তা শুধু সুফি এবং সিন্ধি এবং পাঞ্জাবিদের দ্বারাই ব্যবহৃত হতো না, বরং শিখ গুরুরাও তা ব্যবহার করতেন।


ফেরদৌসি
শাহনামা লিখে সাহিত্যের ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছেন কবি ফেরদৌসি। তিনি ছিলেন পারস্যের একজন বিখ্যাত কবি। তাঁর রচিত ‘শাহনামা’ একই সঙ্গে ইরান ও সারাবিশ্বের ফারসি ভাষাভাষী মানুষের জাতীয় মহা কাব্য।
শাহনামা প্রাচীন ইরানের ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন কাব্য গাথা। এতে আছে ৯৯০টি অধ্যায় ও ৬২টি কাহিনি। পুরো মহাকাব্যে ৬০ হাজার বার আছে অন্ত্যমিল।
মনে করা হয়, শাহনামার আগেও ফেরদৌসি কিছু কবিতা লিখে ছিলেন কিন্তু সেগুলো খুঁজে পাওয়া যায় নি। তিনি দীর্ঘ ৩৩ বছর ইরানের বিভিন্ন শাসক ও বাদশাহদের কাহিনি তুলে ধরেন শাহনামাতে।


হাফিজ
হাফিজ শিরাজি একজনইরানিকবি। তাঁকে অনেকে চেনেন বুলবুল-ই-শিরাজ নামে। শিরাজ ছিল পারস্যের তীর্থভূমি। এখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এই শহরের মানুষ তাঁর কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বলত, ‘লিসান-উল-গায়েব’, ‘তর্জমান-উল-আসরার’।
হাফিজ তাঁর জীবদ্দশায় কবিতাসমূহ সংগ্রহ করে যাননি। তাঁর বন্ধু গুল-আন্দামই সর্বপ্রথম তাঁর মৃত্যুর পর ‘দিওয়ান’ আকারে হাফিজের সব কবিতা সংগ্রহ ও একত্রিত করেন।
হাফিজের প্রায় সব কবিতা ‘শাখ-ই-নবাৎ’ নামক কোনো ইরানি সুন্দরীর স্তবগানে মুখরিত। এটি হয়তো ছদ্মনাম। সেই তরুণীর আসল নাম হাফিজ গোপন করে গেছেন।
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here