ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.)-এর শাহাদত বার্ষিকী

0
148

২৫ মহররম ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.)-এর শাহাদত বার্ষিকী। ৯৫ হিজরির এই দিনে তিনি মুসলিম জাহানের তদানীন্তন খলিফা হিশামের প্ররোচনায় আল-ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের বিষ প্রয়োগে শাহাদত বরণ করেন।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.)-এর কুনিয়াত ছিল আবু মুহাম্মাদ, তবে তিনি জয়নুল আবেদীন উপাধিতেই সমধিক পরিচিত ছিলেন। মহানবি (সা.)-এর দৌহিত্র সাইয়েদুশ শুহাদা ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন তাঁর পিতা এবং পারস্যের বাদশা তৃতীয় ইয়াজদে গার্দের কন্যা শাহর বানু ছিলেন তাঁর মাতা। ইমাম জয়নুল আবেদীন ৩৬ হিজরির ১৫ জমাদিউল আউয়াল শনিবার মদীনায় জন্মলাভ করেন এবং ৯৫ হিজরির ২৫ মহররম ৫৮ বছর বয়সে একই স্থানে শাহাদত লাভ করেন।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) শৈশবের প্রথম দুবছর অতিবাহিত করেন পিতামহ আলী ইবনে আবু তালিবের স্নেহক্রোড়ে এবং পরবর্তী বারো বছর লালিত-পালিত হন চাচা ইমাম হাসান ইবনে আলীর পৃষ্ঠপোষকতায়। ৬১ হিজরিতে কারবালায় দুরাচার এজিদ বাহিনীর হাতে পিতা, চাচা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-পরিজনের গণহত্যা এবং গণবন্দির সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইমাম হোসাইন (রা.) যখন তাঁবুতে তাঁর আত্মীয়-পরিজনের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিতে এসেছিলেন, ইমাম জয়নুল আবেদীন সে সময় অসুস্থতার দরুন অর্ধচেতন অবস্থায় শুয়েছিলেন এবং তদ্দরুন তিনি শহিদ হওয়া থেকে রক্ষা পান। ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) তাঁর পিতার শাহাদতের পর প্রায় ৩৪ বছর পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং সমগ্র জীবনকাল নিবেদিতচিত্তে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি ও শহিদ পিতার স্মরণের মধ্যে অতিবাহিত করেন। তিনি অধিক পরিমাণ সময় নামাজ ও সেজদারত থাকতেন বিধায় ‘সাজ্জাদ’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। ইমাম জয়নুল আবেদীন আল্লাহ তাআলার প্রতি এত বেশি মনোযোগী থাকতেন যে, নামাজের প্রস্তুতির জন্য ওজু করার সময়ই তাঁর চেহারায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যেত এবং নামাজে দন্ডায়মান অবস্থায় আল্লাহর ভয়ে তাঁর শরীর কাঁপতে থাকত। কেন এমন হয় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন : ‘তোমরা কি জান, নামাজে আমি কার সামনে দাঁড়াই এবং কার সাথে কথা বলি?’
শুধু তাই নয়, আশুরার সেই ভয়াল দিনটিতে এজিদ বাহিনী যখন তাঁর পিতা, আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং শিবিরে আগুন ধরিয়ে দেয়, তখনও এই মাসুম ইমাম তাঁর প্রভুর বন্দেগিতে নিমগ্ন ছিলেন।
এজিদের বর্বর বাহিনীর লোকেরা যখন মহিলা ও শিশুদের বন্দি করে উটের খালি পিঠে করে রশি দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছিল এবং অসুস্থতা সত্ত্বেও ইমামের ঘাড়ে ও পায়ের গোড়ালিতে ভারী শিকল পরিয়ে খালি পায়ে কারবালা থেকে কুফা ও দামেস্ক পর্যন্ত হেঁটে যেতে বাধ্য করেছিল, তখনও এই খোদায়ী আত্মা এক মুহূর্তের জন্য তাঁর প্রভুর আরাধনা থেকে মনোযোগ হারাননি।
ইমাম জয়নুল আবেদীন ছিলেন অত্যন্ত প্রকাশবিমুখ ও গোপন স্বভাবের একজন পরোপকারী। তিনি পিতামহ ইমাম আলী ইবনে আবু তালিবের মতো রাতে নিজের পিঠে আটার বস্তা ও রুটি বহন করে মদীনার গরিব ও অভাবী পরিবারগুলোকে পৌঁছে দিতেন। তিনি শত্রুদের প্রতিও অতিথিপরায়ণ ছিলেন। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে সর্বদা শত্রুদেরও সঠিক পথ বাতলে দিতেন।
ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) আহলে বাইতের অন্যদের মতোই তদানীন্তন স্বৈরশাসকদের চরম আগ্রাসন ও নির্যাতনের মধ্যে ভয়াল ও বিপদসঙ্কুল দিন অতিবাহিত করেন। নির্দয় হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আস-সাকাফী আহলে বাইতের প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল লোকদের হুমকির মধ্যে রাখত। আহলে বাইতের প্রতি অনুরক্ত হওয়ার কারণে সে যাদেরকে গ্রেফতার করত তাদেরকে হত্যা করত। ইমাম জয়নুল আবেদীনের চলাফেরার ওপর আরোপ করা হয় কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং কোনো ব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ স¤পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। আহলে বাইতের অনুসারীদেরকে খুঁজে বের করার জন্য গোয়েন্দা নিয়োগ করা হয় এবং এ লক্ষ্যে প্রতিটি বাড়ি ও পরিবারে তল্লাশি চালানো হয়।
ইমাম জয়নুল আবেদীনকে শান্তির সাথে নামাজ পর্যন্ত আদায় করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি ধর্মোপদেশ দেওয়ার মতো সুযোগও তাঁকে দেওয়া হয়নি। আল্লাহর এই প্রতিনিধি তাই একটি তৃতীয় পন্থা অবলম্বন করেন। সেটা হলো আল্লাহর কাছে নিবেদন পেশ করার জন্য দৈনন্দিন মোনাজাতের সংকলন তৈরি। ‘আস-সাহীফা আল-কামিলাহ’ বা ‘আস-সাহীফা আস-সাজ্জাদীয়া’ বলে খ্যাত তাঁর মোনাজাতের এসব মূল্যবান সংগ্রহ ‘আলে মুহাম্মাদের যাবুর’ বলেও পরিচিত। এসব মোনাজাতের মাধ্যমে ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনকালে বিশ্ববাসীর জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
৯৫ হিজরির ২৫ মহররম ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) যখন মদীনায় তখন তদানীন্তন গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। তাঁর পুত্র ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ আল-বাকের (রহ.)। তাঁর পবিত্র দেহ মোবারক দাফন করা হয় মদীনার জান্নাতুল বাকীতে।
(সংগৃহীত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here