ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বাংলা বর্ণমালার বিন্যাস

0
174

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হাই
বাংলা গদ্যের নির্মাণ যুগ (১৮০১-১৮৫০ খ্রি.) ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার পর রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩), ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), অক্ষয়কুমার দত্তের (১৮২০-১৮৮৬) মতো কোনো উদ্যোগ মুসলমান লেখকগণ নিতে পারেননি। কিন্তু ১৮৫০ সালের পর থেকে বাংলা গদ্যের সৃষ্টিযুগ শুরু হলে মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) রত্নবতী (১৮৬৯) নিয়ে এসেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) প্রকাশের মাত্র চার বছরের মধ্যে। এ সময়ে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে দাদ আলী (১৮৫২-১৯৩৬), কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১), মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন (১৮৬০-১৯২৫), ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৭৯-১৯৩১), আবদুল করীম সাহিত্য বিশারদ (১৮৬৯-১৯৫৩), মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০), বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), কাজী ইমদাদুল হক (১৮৮২-১৯২৬), শেখ ফজলল করীম (১৮৮২-১৯৩৬), মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী চৌধুরী (১৮৮৬-১৯৩৮), মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (১৮৮৯-১৯৩৬), এস ওয়াজেদ আলী (১৮৯০-১৯৫১), মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (১৮৯৬-১৯৫৪), গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪) প্রমুখ সাহিত্য সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সমর্থ হন। সমসাময়িককালে এদের অনেকেই সহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি মুসলিম ঐতিহ্যমুখী বাংলা পাঠ্যপুস্তক রচনায়ও হাত দেন।

সেকালে নবপ্রচলিত কিন্ডারগার্টেন কিংবা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিকট গ্রহণযোগ্য বঙ্গে বঙ্গভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য সর্বব্যাপক প্রচলিত পাঠ্যবই ছিলো ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত বর্ণপরিচয়, বোধোদয় (চতুর্থ ভাগ), সীতার বনবাস, আখ্যান মঞ্জরী, কথামালা এবং চরিতাবলী। বিদ্যাসাগর প্রণীত পুস্তকের পাশাপাশি আরো যে দু’টি পুস্তক স্থান করে নিয়েছেন, সে দু’টি হলো অক্ষয়কুমার দত্তের চারুপাঠ এবং মদন মোহান তর্কালঙ্কারের (১৮১৭-১৮৫৮) শিশু শিক্ষা। বিদ্যাসাগরের শিশু পাঠ্য পুস্তকগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো শিশুদের উচ্চারণে সঙ্গতিপূর্ণ শিশু মনের উপযোগী শব্দচয়ন ও সহজবোধ্য বাক্যগঠন। অবিভক্ত বাংলার অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্য বইয়ের প্রকাশক ছিল কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি। স্কুল বুক সোসাইটির পক্ষ থেকে মি. মে সংকলিত গণিত, মি. পিয়ারসন সংকলিত বাংলাপাঠ সংকলন পাঠ্যান্তভুক্ত ছিল। পূর্ববঙ্গের উত্তরাঞ্চলের স্কুল সমূহের পাঠ্য তলিকায় দেশীয় পন্ডিতদের রচিত অমরকোষ, প্রবোধ চন্দ্রিকা, হিতোপদেশ, পাঠকৌমুদীর উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজশাহীর নাটোরের স্কুলে তখন পড়ানো হতো বর্ণমালা, নীতিকথা, শিশুশিক্ষা (চতুর্থ ভাগ) ও বর্ণপরিচয়। দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয়ের পাশাপাশি চলছিল বিদ্যাসাগরের সুহৃদ মদন মোহননের শিশু শিক্ষা (প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগ)। শিশু শিক্ষার চতুর্থ ভাগের রচয়িতা ঈশ^র চন্দ্র বিদ্যাসাগর। প্রথম প্রকাশের সময় (এপ্রিল ১৮৫১) মদন মোহন তর্কালঙ্কারের শিশু শিক্ষা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাগের সঙ্গে ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এর নাম দেওয়া হয়েছিলো শিশু শিক্ষা চতুর্থ ভাগ।

পরে এ পুস্তকের নামকরণ করা হয় বোধোদয়। বিদ্যাসাগরের বোধোদয়ের পরে বর্ণ পরিচয় (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ ১৮৫৬), অপেক্ষাকৃত বয়স্কদের উপযোগী আখ্যানমঞ্জরী (নভেম্বর ১৮৬৩), ঋজুপাঠ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়ভাগ (নভেম্বর ১৮৫১) ইত্যাদি বইয়ের নাম তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া যায়। সেকালের এমন কোনো কিশোরী কিংবা নারীর সন্ধান পাওয়া যাবে না যে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন অথচ সীতার বনবাস পড়েনি। এছাড়া বিদ্যাসাগরের ব্যাকরণ কৌমুদী (১৮৫৩-১৮৬২)-এর পর থেকে এ ব্যাকরণগ্রন্থ অপরাপর ছাত্রের জন্যও অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

বিদ্যাসাগরের আরো দুটি গ্রন্থ শকুন্তলা (ডিসেম্বর ১৮৫৪) এবং বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) গ্রন্থদ্বয়ের নামও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে হয়। এ গ্রন্থদ্বয় সমকালের প্রয়োজন মিটিয়ে অদ্যাবধি খন্ডিতভাবে হলেও বিশ^বিদ্যালয়ের স্নাতক, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বাংলা গদ্যের নিদর্শন হিসাবে অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে। তবে বিদ্যাসাগরের পরিচয়ের পরিধি প্লাবিত করে যে বইটির নাম সমকালীন সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি ঝড় তুলেছিল, সে বইটির নাম বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব (অক্টোবর ১৮৫৫)। সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে বিধবা বিবাহ প্রচলন বিদ্যাসাগরের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তির স্মারক। এই পুস্তকের প্রস্তাব শুধু বর্ণহিন্দু নয়, অপরাপর সম্প্রদায়ের কাছেও তখন বিস্ময়কর, শাস্ত্রবিরুদ্ধ তথা গর্হিত কাজ বলে গণ্য হতো। আর বিদ্যাসাগর এ ‘গর্হিত’ কাজেই কৃতকার্য হয়ে সমাজে গৌরব অর্জন করলেন।

পূর্ববঙ্গে ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পরিচয়ের পরিধি প্রসারিত হতে থাকে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ্ব থেকে। বিদ্যাসাগর রচিত গ্রস্থসমূহ এ শতকের শেষ দিকে পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রায় চার দশক পর্যন্ত প্রচলিত ছিলো। বিদ্যাসাগর তখন পূর্ববঙ্গে এতাটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, মাত্র বত্রিশ বছর বয়সে তাঁর ছবি ঢাকা শহরেও প্রচুর বিক্রি হতো।

গোটা উনিশশতকে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসাবে নিত্য স্মরণীয় হয়ে উঠলেন বিদ্যাসাগর। স্মরণকালের অসংখ্য বাঙালির মধ্যে ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগরই ছিলেন একমাত্র যথার্থ বাঞ্ছিত মানুষ। পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ রাজা ও জমিদারের ওপর বিদ্যাসাগরের বিরাট প্রভার ছিলো। সমকালীন পূর্ববঙ্গে এমন শিক্ষিত লোক খুব কমই ছিলেন যাঁরা বিদ্যাসাগরের নাম শোনেননি বা তাঁকে ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন না। শিক্ষিত ও ব্যক্তিত্ববানদের অনুকরণীয় চরিত্র ছিলেন বিদ্যাসাগর। পূর্ববঙ্গের রাজা-জমিদারদের বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে বিদ্যাসাগরকে নিমন্ত্রণ করে আনার চেষ্টা চলতো। কিন্তু বিদ্যাসাগর এসব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আচার সর্বস্ব প্রথাগত অনুষ্ঠানে যোগদানে কখনো সম্মতি দেননি। তবে পূর্ববঙ্গের সাধারণ মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো। বিদ্যাসাগর তাঁর তৃতীয় কন্যা বিনোদিনী দেবীর (মৃত্যু ১৯২৮) বিয়ে দিয়েছিলেন ফরিদপুর জেলার ভূষণা (সৈয়দপুর) থানার উলুকান্দা গ্রামে, সে সময়ের উচ্চ শিক্ষিত তরুণ শিক্ষক সূর্যকুমার অধিকারীর (১৮৫৬-১৯২৬) সঙ্গে।

জীবিতকালে বিদ্যাসাগর পূর্ববঙ্গের যে সকল জায়গায় এসেছিলেন তারমধ্যে যশোর, ঢাকা, বরিশাল ও নাটোরের কথা জানা যায়। যশোর ও ঢাকার কথা জানা যায় বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের মাধ্যমে। বরিশালে এসেছিলেন তিনি ছোটভাই দীনবন্ধুর (মৃত্যু ১৮৮৮) [বরিশালের তৎকালীন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট] কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতনদের অনুরোধে। নাটোর এসেছিলেন মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ রায়ের (১৮৬৮-১৯২৬) আমন্ত্রণে। বিদ্যাসাগরের পূর্ববঙ্গে পদচারণা সম্পর্কে আরো তথ্য জানা যায় সমকালীন খ্যাতিমন লেখকদের স্মৃতিকথা ও স্থানীয় ইতিহাস গ্রন্থ থেকে। বিদ্যাসাগর যদি নিজের জীবনচরিত সম্পূর্ণ করে যেতে পারতেন তাহলে এ বিষয়ে আমরা সর্বাধিক তথ্য পেতাম। সমকালীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিদ্যাসাগর সমকালে বিভিন্ন কার্যব্যপ দেশে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলার শহরাঞ্চলে বেশ কয়েকবার তাঁর সংস্কার কাজে সমর্থনপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বাড়িতে পদধূলি দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও গিয়েছেন। ষাটের দশকের শেষের দিকে ঢাকার প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরি বিদ্যাসাগরের ছবি সংবলিত ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে। এরপর বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি ও ছবি ব্যবহারের পরিধি আরো প্রসারিত হতে থাকে। সমকালীন পূর্ববঙ্গের শিক্ষা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষাসম্পর্কিত অপরাপর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও বিদ্যাসাগর তখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী জনপ্রিয় ব্যক্তিত্¦। বিদ্যাসাগরের এ জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই অনেক পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাম রেখেছেন ‘বিদ্যাসাগর লাইব্রেরী’।
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here