ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বাংলা বর্ণমালার বিন্যাস

0
164

অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হাই
সমকালে অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি যাঁরা নামের শেষে সংস্কৃত কলেজের কৃতবিদ্যার স্মারক ঐ উপাধিটা অর্জন করেছিলেন, তাঁদের অর্জিত ঐ উপাধি তাঁদের ধন্য করেনি যতোটা করেছে ঈশ^রচন্দ্র নামের সাথে সংযুক্ত হয়ে। বাঙালির স্মরণের সরোবরে সমুজ্জ্বল বিদ্যাসাগর মানেই ঈশ^রচন্দ্র এবং ঈশ^রচন্দ্র মানেই বিদ্যাসাগর। বাঙালির যা কিছু শ্রদ্ধা এবং সম্মানের, তার স্মারক এই বিদ্যাসাগর নামটি।
বিদ্যাসাগর জন্মেছিলেন কৌলিক আচারনিষ্ঠ সনাতন রাঢ়ীয় দরিদ্র ব্রাহ্মণকুলে; পিতামহ সকৌতুকে প্রচার করেছিলেন ‘এঁড়ে বাছুর’ জন্মেছে বলে। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘এই অবমানিত দেশে’ এ জন্ম ‘বিধাতার নিয়মের আশ্চর্য ব্যতিক্রম।’ হ্যাঁ, আশ্চর্য তো বটেই , নইলে ‘সাড়ে তিন কোটি দেবদেবী বেষ্টিত’ হিন্দু বাঙালি সমাজকে ধর্ম নিরপেক্ষ বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার পাঠ দিলেন কিভাবে? তিনি কোনো রাজনৈকিত দল গঠন করে এ কাজ করেননি। জেদ ও যুদ্ধে তিনি ছিলেন একক; ছিলেন মানুষের মন থেকে কুসংস্কার দূর করে সুস্থ মানবিকতাবোধ জাগিয়ে তোলার রক্ষাবর্ম। তাই গোটা উনিশ শতকের সংস্কারমুক্ত, আধুনিক মানসিকতার উদগাতা বিদ্রোহী বিদ্যাসাগর নির্বিঘ্নে বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি দেশাচারের দাস নহি। নিজের বা সমাজের মঙ্গলের নিমিত্ত যাহা উচিত বা আবশ্যক বোধ হইবে, তাহা করিব- লোকের বা কুটুম্বের ভয়ে কদাচ সংকুচিত হইব না। ’ এ উচ্চারণে কোনো অহমিকা ছিলো না- ছিল না কোনো ভন্ডামি, ছিল না কথায় ও কাজে বৈপরীত্য। তিনি দেখেছেন- ‘আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না, আড়ম্বর করি, কাজ করি না, যাহা বিশ^াস করি, তাহা পালন করি না; ভুরিপরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না।’
আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি, পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব; পরের অনুগ্রহ আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স এবং নিজের বাক্ চাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তি বিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।’ যে কারণে ‘এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক গভীর ধিক্কার ছিল। কারণ, তিনি সর্ব বিষয়েই ইহাদের বিপরীত ছিলেন।’ স্বকালের এ বিপরীত মানসিকতা তিনি কীভাবে ধারণ করলেন, সমকালের শ্রেষ্ঠ ‘রাজা সম্রাট’দের স্বধর্মী ধ্যান-ধারণা থেকে দুশো বছর এগিয়ে বাঙালি সমাজকে কীভাবে তিনি মানবমুখী করলেন- সে উপলব্ধির মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিদ্যাসাগরের আজকের প্রাসঙ্গিকতা। বিদ্যাসাগর সারাজীবন নিজেকে ব্যপৃত রেখেছেন বিধবাবিবাহ প্রচলন, বহুবিবাহ নিরোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, সহবাস সম্মতি আইনসহ নারী শিক্ষা ও নারী মুক্তির আন্দোলনে। এসব সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষানীতি প্রণয়ন, পাঠ্যপুস্তক রচনা, সর্বোপরি বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি এবং নিজ হাতে গড়া মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন ও কলেজের উন্নতি সাধনই ছিলো বিদ্যাসাগরের শেষ স্বপ্ন। তাঁর জ্ঞান, দান, দয়া, অজেয় পৌরুষ, অক্ষয় মনুষ্যত্ব প্রভৃতি মনে রেখেও রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা।’
মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টি করেননি বিদ্যাসাগর। তাঁর অধিকাংশ সাহিত্য কর্মই সংস্কৃত, ইংরেজি ও হিন্দি সাহিত্যের উৎস থেকে আহরিত। এসব ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য তর্কাতীত। অনুবাদে, সমালোচনায়, শব্দগঠনে, পরিভাষা নির্মাণে তিনিই পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। শেকসপিয়ারের ঈড়সবফু ড়ভ ঊৎৎড়ৎং এর অনুবাদ রূপান্তর ভ্রান্তিবিলাসকে রচনা কৌশল বিবেচনায় বিদ্যাসাগরের মৌলিক রচনা বলে ভ্রম হয়। এ অনুবাদ দেখে মনে হয় বিদ্যাসাগর সৃজনশীল সাহিত্য মনোনিবেশ করলে তাঁর পক্ষে একজন সার্থক কথা শিল্পী কিংবা নাট্যকার হওয়া বিচিত্র কিছু ছিলো না। বিদ্যাসাগর শব্দ মঞ্জরী ও শব্দ সংগ্রহ অভিধানে তিনি আজ থেকে দেড়শো বছর আগে যে বানানরীতির প্রস্তাব করেছেন (এ বানান বিদ্যাসাগর তাঁর রচনাবলির কোথাও প্রয়োগ করেননি) ১৯৩৬ সালের কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের বানানের নিয়ম অতিক্রম করে ১৯৯২ সালে গৃহীত বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান প্রায় অভিন্ন। যেমন ‘পুজারিনি’ বানানটি এখনও পর্যন্ত অনেকের কাছে ‘পূজারিণী।’ হরফ সংস্কার ও বিন্যাসে যিনি এগিয়ে আসেন তিনি হলেন বিদ্যাসাগর, বড় কীর্তি তাঁর নবতর বাংলা বর্ণমালার বিন্যাস। মধ্যযুগে বর্ণমালা ছিল বিশৃঙ্খল। উনিশ শতকের প্রথমদিকে বাংলা বর্ণমালা সুগ্রথিতরূপ নেয়, কিন্তু তাতে ছিল সংস্কৃতের অপ্রয়োজনীয় প্রভাব। বিদ্যাসাগর-এর সংস্কার করে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিন্যাস করেন। পঁচিশটি ব্যঞ্জন বর্ণের সম্ভব হয়। ১৮৫৫ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার ‘সংস্কৃত যন্ত্র’ থেকে বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয় প্রথমভাগ এবং জুন মাসে এর দ্বিতীয়ভাগ ছাপা হয়।
সেই সূত্রে মাতৃভাষার এ পুণ্যশ্লোক সংস্কর্তা বিদ্যাসাগর বাংলা মুদ্রণ-হরফে আমূল সংস্কারে ব্রতী হন। বিদ্যাসাগর বর্ণমালার সংস্কার সাধনের সঙ্গে সঙ্গে বর্ণমালার নব বিন্যাসও করলেন। তিনি দীর্ঘ ঋ, দীর্ঘ ৯-কার বর্ণমালা থেকে ছেঁটে দিলেন। রেফের পর ব্যঞ্জন বর্ণের দ্বিত্ব বর্জন করার সুপারিশ করলেন। অনুস্বর-বিসর্গকে স্বরবর্ণ থেকে ব্যঞ্জন বর্ণের স্থানান্তরিত করলেন। ড় ঢ়-কে স্বতন্ত্র বর্ণের মর্যাদা দিলেন যেহেতু ক+ষ মিলে ক্ষ হয় তাই একে অসংযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ থেকে বিদায় দিলেন। বিদ্যাসাগর ছিলেন বর্ণের রূপান্তরের বিরোধী এবং অধিকল্প বর্ণরূপের প্রবর্তক। সংস্কৃত বা দেবনাগরী বর্ণমালাকেই বাংলা বর্ণমালা হিসোবে গ্রহণ করে নেয়ার ফলে ধ্বনির জন্য বাংলায় এমন বর্ণ বা লিপি রয়েছে, বাংলা ভাষায় যে ধ্বনির অস্তিত্বই নেই। বিদ্যাসাগর সেই বর্ণমালার অপ্রয়োজনীয় অংশের সংস্কার সাধন করেন। সংস্কৃতের ১৬ স্বর ও ৩৪ ব্যঞ্জন, ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর এ সংখ্যার প্রয়োজনীয় হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটিয়ে যে নব বিন্যাস করেন তাতে বাংলায় ১২ স্বর ও ৪০ ব্যঞ্জন সংস্থাপিত হয়। বিদ্যাসাগর কৃত বর্ণমালার এ বিন্যাস আজও প্রচলিত।
লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে বর্ণ পরিচয়ের যে সংস্করণগুলো রক্ষিত আছে, তার ওপর ভিত্তি করে নিঃসন্দেহে বলা চলে যে, বিদ্যাসাগর শিশু পাঠ্য নিয়ে যে সুদূর প্রসারী চিন্তা করেছিলেন তা আজও আমাদের শিশু শিক্ষা প্রণয়নে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
বাংলা বর্ণানুক্রমে দিগ দর্শনের দিশারীও বিদ্যাসাগর। বর্তমানে অনেক শ্রমসাধ্য বর্ণাণুক্রমের কাজ কম্পিউটারের সহায়তায় কমে যায়। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষার ক্ষেত্রে তা সম্ভব হলেও এখন পর্যন্ত বাংলা বর্ণানুক্রমে প্রোগ্রাম কম্পিউটারে ঢোকানো সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে দায়ী বাংলায় প্রচলিত স্বেচ্ছাচারী জটিল বর্ণানুক্রম। এখানেও বিদ্যাসাগরীয় অনুক্রম গ্রহণ না করলে গত্যন্তর নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here