উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের কিছু ভুল এবং তার সমাধান

0
28

উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের কিছু ভুল এবং তার সমাধান
ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)

উচ্চ রক্তচাপ ও এর চিকিৎসা নিয়ে রোগীদের মাঝে বেশ কিছু ভুল ধারণা আছে। আজ সেই ভুলগুলো থেকে কিভাবে মুক্ত থাকা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করবো।

উচ্চ রক্তচাপের উপসর্গ কী?
উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি রোগ যার বলতে গেলে তেমন কোনো উপসর্গ নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে রোগী হয়তো অন্য কোনো সমস্যার জন্য চিকিৎসকের কাছে গিয়েছে। চিকিৎসক রুটিন মাফিক তার রক্তচাপ পরিমাপ করে দেখলেন যে তার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে।

ঘাড় ব্যাথার সাথে উচ্চ রক্তচাপের কোনো সম্পর্ক আছে কী?
উচ্চ রক্তচাপ হলে তার উপসর্গ হিসেবে ঘাড় ব্যাথার বিষয়টি প্রমাণিত নয়। বরং ঘাড় ব্যাথাসহ শরীরের যে কোনো ব্যথা-বেদনায় সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়তে পারে। ঘাড় ব্যথা হলে অনেকে সে সময় রক্তচাপ মেপে সেই মাত্রা বেশি পেলে সেটাকে উচ্চ রক্তচাপের জন্য হয়েছে বলে মনে করেন।

উপসর্গ যদি না থাকে তাহলে উচ্চ রক্তচাপ আছে কিনা তা বোঝার উপায় কী?
যেহেতু এই রোগটির সাধারণত কোনো উপসর্গ নেই, তাই কারও এই রোগটি হলো কিনা তা দেখার জন্য বছরে একবার অন্তত রক্তচাপ পরিমাপ করা উচিৎ।

উপসর্গ যেহেতু নেই, তাহলে এই উচ্চ রক্তচাপের জন্য ঔষধ খেতে হবে কি?
উপসর্গ না থাকলেও এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিয়মিত ঔষধ খেতে হবে। কারণ, এই উচ্চ রক্তচাপ যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে তাহলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস বা কিডনি বিকল হবার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে এই সমস্যাগুলো উচ্চ রক্তচাপ হবার কয়েকদিনের মধ্যেই হয় না। এসব জটিলতা তৈরি হতে সময় নেয়।

উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ সেবনের পর রক্তচাপ এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। এক্ষেত্রে ঔষধ সেবন চালিয়ে যেতে হবে কি?
হ্যাঁ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সেক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ সেবন করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ ভালো হয়ে গেছে চিন্তা করে যদি কেও ঔষধ বন্ধ করে দেন, তখন হঠাৎ এই ঔষধ বন্ধ করে দেওয়াতে তার রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক-এর মতো সমস্যাগুলো ঘটাতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ মাঝে মাঝে বন্ধ রাখলে কোনো সমস্যা হবে কি?
কিছু রোগী আছে যারা মাঝে মাঝে রক্তচাপ বেশি বেড়ে গেলে কয়েকদিন ঔষধ খান, তারপর রক্তচাপ কিছুটা স্বাভাবিক পর্যায়ে আসলে তিনি সেই ঔষধ সেবন করা আবার বন্ধ করে দেন। এটা মারাত্মক একটি ভুল। কারণ, ঔষধের মাধ্যমে তার যে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত ছিলো, সেই ঔষধ হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়াতে তখন দেখা যায় যে তার রক্তচাপ হঠাৎ করে আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস এর মতো সমস্যাগুলো ঘটাতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ সেবনকালীন সময়ে ফলআপ কতটা জরুরি?
অনেক রোগী আছেন যারা চিকিৎসকের পরামর্শে উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ শুরু করেছেন, তারপর সেই ঔষধ তিনি নিয়মিত খেয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু এর মাঝে আর তিনি চিকিৎসকের কাছে ফলোআপে যাননি। তিনি যেই ঔষধটি নিয়মিত খেয়ে যাচ্ছেন এতে তার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হলো কিনা সেটা দেখাও জরুরি। কারণ, সবার একই রকম ঔষধে যে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হবে বিষয়টি তা নয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ঔষধের মাত্রা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে, এমনকি ঔষধটি পরিবর্তন করারও প্রয়োজন হতে পারে। রোগী যদি নিয়মিত ফলোআপে না থাকেন তাহলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকছে কিনা তা বোঝা সম্ভব নয়। দেখা গেলো যে রোগী কষ্ট করে ঔষধ সেবন করেই যাচ্ছেন। কিন্তু তার উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেই। এছাড়াও ঔষধের কোনো পার্শ-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা সেটা দেখার জন্যও এই ফলোআপ জরুরি।

যে কোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ বন্ধ করা উচিৎ নয়।
উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ শুরু করলে অনেক সময় পার্শ-প্রতিক্রিয়া হিসেবে পা ফুলে যেতে পারে, কাশি হতে পারে, মাথা ঘুরাতে পারে। এই সমস্যার জন্য অনেকে ঔষধ সেবন বন্ধ করে দেন। এটাও মারাত্মক একটি ভুল। চিকিৎসক যে ঔষধটি প্রেস্ক্রাইব করেছেন সেটা এই রোগীর ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর তা আগাম বলা সম্ভব নয় বা এই ঔষধে তার কোনো পার্শ-প্রতিক্রিয়া হবে কিনা সেটাও আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তাই সেই ঔষধে যদি রোগীর কোনো সমস্যা হয় তাহলে তা চিকিৎসককে জানাতে হবে, চিকিৎসক প্রয়োজনে সেই ঔষধ বদলিয়ে দিবেন। কিন্তু কখনই নিজের ইচ্ছামত ঔষধ বন্ধ করে দেয়া যাবেনা।

  • উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগী ঔষধ সেবনের পাশাপাশি কিছু নিয়ম অবশ্যই মেনে চলবেন
    • প্রতিদিন আধা ঘণ্টা হাঁটতে হবে।
    • তেল-চর্বি জাতীয় খাবার পরিহার করতে হবে।
    • শাকসবজি বেশি করে খেতে হবে।
    • শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে হবে।
    • উচ্চ রক্তচাপে ভোগা রোগী অতিরিক্ত লবণ খাবে না, ধূমপান করবে না, তামাক পাতা, গুল, জর্দা এসব ব্যবহার করবে না।
    • ডায়াবেটিক থাকলে সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

বাড়িতে রক্তচাপ পরিমাপের সময় সতর্কতা
বাসায় যদি রক্তচাপ মাপার মেশিন থাকে তাহলে মাঝে মাঝে রক্তচাপ পরিমাপ করা উচিৎ। রক্তচাপ পরিমাপের নিয়ম ভালো করে না জেনে রক্তচাপ পরিমাপ করতে গেলে ফলাফল ভুল হতে পারে। রক্তচাপ মাপার আগে পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিতে হবে। প্রস্রাবের চাপ থাকলে রক্তচাপ মাপার আগে প্রস্রাব করে আসতে হবে। চা-কফি পান করার পরপর রক্তচাপ মাপা ঠিক নয়, এতে রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেশি দেখাতে পারে।


উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক। বিশেষ কোনো উপসর্গ না থাকায় অনেক রোগী এই উচ্চ রক্তচাপকে গুরুত্ব দেন না। উচ্চ রক্তচাপকে গুরুত্বসহ বিবেচনা করে একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here