একই দিনে ঈদসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন

1
251

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মিয়া
ইসলাম একটি যুগোপযোগী বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম। এ ধর্ম সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানগণ ঈদসহ অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান বিশ্বব্যাপী একই দিনে প্রতিপালনের পরিবর্তে বিভিন্ন দিনে উদযাপন করে থাকে। এরূপ আচরণ মুসলমানদেরকে বিধর্মীদের কাছে কেবল হেয় প্রতিপন্নই করে না, ধর্ম পালনে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যও ব্যাহত করে। মুসলমানগণ বিশ্বব্যপী জুমার নামাজ একই দিনে অর্থাৎ শুক্রবারে আদায় করে থাকেন। কোথাও একদিন আগে বা একদিন পরে জুমার নামাজ আদায় করা হয় না। শুধুমাত্র সময়ের ব্যবধানে কয়েক ঘণ্টা আগে বা পরে যেমন আমরা জুমার নামাজ আদায় করি, তদ্রুপ রোজা পালন ও ঈদ পালনসহ যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান একই তারিখে পালন করা সম্ভব না হওয়ার কোনো ন্যায়সঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। বরং একই ধর্মানুষ্ঠান বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে ভিন্ন ভিন্ন দিনে উদযাপন কিংবা একই রাষ্ট্রে বিভিন্ন দিনে উদযাপনের ফলে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, কলহ ও দলাদলির মনোভাব সৃষ্টি করে, যাতে বিশ্ব মুসলিম সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব ব্যাপকভাবে ক্ষুন্ন হয়।

বিগত ২/৩/৯৭ইং তারিখে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে তৎকালীন ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকার সম্পাদক এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব শেখ সেলিম সারা বিশ্বে একই তারিখে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন সংক্রান্ত বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে এ ব্যপারে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে একই দিনে ঈদ পালন করা হাদিস সম্মত নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। একই দিনে ঈদ পালন সংক্রান্ত ব্যাপারটি নিয়ে এদেশের বহু বিজ্ঞ আলেম ওলামা ও বিজ্ঞান সম্মত চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ একমত পোষণ করে বলেছেন যে, ইমামে আজম হযরত আবু হানিফা (রহ.)-সহ ৪টি মাযহাবের ৩ জন বিজ্ঞ ইমামই একই তারিখে রোজা, ঈদ ও সকল প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। হযরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন, বিশ্বের কোথাও রোজা অথবা ঈদের চাঁদ দেখা গেছে, এ খবর পাওয়া মাত্রই সকল মুসলমানের রোজা শুরু করা অথবা রোজা ভেঙ্গে ঈদ পালন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আমাদের দেশসহ এ উপমহাদেশের বেশির ভাগ মানুষই ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর তথা হানাফী মাযহাবের অনুসারী অথচ আমাদের ইমাম বলেন একই তারিখে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে, আর আমরা কতিপয় লোক এটা সম্ভব নয় বলে মত প্রকাশ করছি।

একই তারিখে ঈদসহ যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার পক্ষে সবচেয়ে জোরালো এবং বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি ও বক্তব্য পেশ করেছেন মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান। তিনি বলেন-আমাদের এই পৃথিবীর জন্য চাঁদ একটি। আমাদের দেশে তা দেখা না গেলেও বিশ্বের কোথাও না কোথাও এ চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া সারা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ১১ ঘন্টার বেশি সময়ের ব্যবধান নেই। সুতরাং মাত্র ১১ ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে ২৪ ঘন্টার একটি দিন পাল্টিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান আরো বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন যে, পবিত্র হজ পালিত হয় মক্কা মোয়াজ্জামায় ৯ই জিলহজ তারিখে। বিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান এ দিনে আরাফাতের ময়দানে একত্রিত হয়ে হজ পালন করে থাকেন। বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশে হজ পালিত হয় না। সুতরাং আরবে যেদিন হজ সম্পন্ন হয়, তার পরের দিন ১০ জিলহজ তারিখে হাজিগণ সেখানে কোরবানি করে থাকেন। সুতরাং হজের পরের দিন কেরবানি বাংলাদেশসহ সকল দেশের মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। তিনি আরো বলেন- আজ যদি সমগ্র মুসলিম বিশ্ব একটি দেশ হতো, আর তার সব কিছু সৌদি আরব কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতো, তাহলে আমাদের জন্য কী করণীয় হতো? তাছাড়া ৯ জিলহজ অর্থাৎ হজের দিন ফজরের নামাজের পর থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আছর পর্যন্ত (৫ দিন) প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে ৩ বার তাকবীরে তাশরীক পাঠ করতে হয়, যা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য পাঠ করা ওয়াজিব। তাহলে মক্কা মোয়াজ্জামায় যেদিন হজ পালিত হয়, সেদিন যদি আমাদের দেশে ৯ তারিখ গণনা করা না হয় তাহলে আমরা তাকবীরে তাশরীক আদায় করবো কীভাবে?

সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, তাহলো- হাদিস শরীফে আছে, ১০ মহররম শুক্রবার কিয়ামত হবে অর্থাৎ সমগ্র পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। কিন্তু আমাদের দেশে চাঁদ গণনার ক্ষেত্রে ব্যবধানের কারণে বর্তমানে ঈদ পালন করতে সৌদি আরবের সাথে যেহেতু ১ দিন বা ২ দিন ব্যবধান হয়, তাহলে ১০ মহররম সৌদি আরবে কিয়ামত হওয়ার ২ দিন পরে কী আমাদের বাংলাদেশে কিয়ামত হবে? আসলে একই তারিখে ঈদসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে আমাদের মত পার্থক্য হওয়াটা চরম অজ্ঞতা বৈ কিছুই নয়। কেননা, বাংলাদেশে যেদিন শুক্রবারে মুসমানগণ জুমার নামাজ আদায় করেন, সৌদি আরবেও সেদিনই জুমার নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে, তবে আমাদের চেয়ে ৩ ঘন্টা পরে। বিশ্বের সর্বত্রই শুক্রবারেই জুমার নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে। কোথাও শনিবার জুমা আদায় করা হয় না। আমাদের দেশের সাথে সময়ের সর্বোচ্চ ১১ ঘন্টা ব্যবধান রয়েছে আমেরিকার সাথে। সেখানকর মুসলমানগণও ১১ ঘন্টা ব্যবধানে যদি একই দিনে বাংলাদেশের মুসলমানগণ জুমার নামাজ আদায় করতে পারেন, তাহলে পবিত্র হজের পরের দিন কোরবানি করতে না পারার যৌক্তিকতা কোথায়? চাঁদ না দেখার অজুহাতে ২ দিন পরে কোরবানি করা সত্যিই হাস্যস্কর ব্যাপার বৈ কিছুই নয়। সুতরাং যেহেতু ১১ ঘন্টার বেশি সময়ের ব্যবধান বিশে^র কোথাও নেই, সেহেতু ১০ জিলহজ কোরবানি করা হলে বিশ্বের সর্বত্রই ১০ জিলহজ তারিখই থাকবে, কোথাও ১১ জিলহজ হবে না। তাই বর্তমান বিজ্ঞানের এই চরম উন্নতির যুগে সমগ্র বিশ্ব যখন একটি পরিবারের মতো বিবেচিত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে চাঁদ দেখা যায়নি এই অজুহাতে ঈদসহ যাবতীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান একই তারিখে প্রতিপালন না করাটা সত্যিই দুঃখজনক ব্যাপার। আশাকরি দেশের গণতান্ত্রিক সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করবেন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here