একজন শিল্পীর ধর্ম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।

0
186


খ্যাতিমান বেদ-ব্যাখ্যাকার শঙ্করাচার্য বলেছেন:
বলিদান-অনুষ্ঠানের পরে যে খাদ্য-ভোগ বেঁচে যায় তা প্রশস্তি পায়, কারণ
তা ব্রহ্মের প্রতীক, মহাবিশ্বের আদি উৎসের।
এই ব্যাখা-অনুযায়ী ব্রহ্মা তার আতিশয্যে অপার, প্রকাশ পায় যা চিরন্তন বিশ্ব-প্রক্রিয়ায়। এখানেই রয়েছে সৃষ্টির উদ্ভবের তত্ত্ব এবং শিল্পের উদ্ভবের। পৃথিবীর সব প্রাণীর মধ্যে মানুষেরই রয়েছে তার প্রয়োজনের বিপুল অতিরিক্ত প্রাণ আর মানসিক শক্তি, যা তাকে সৃষ্টির নানা ধারায় কাজ করার আহ্বান জানায়, সৃষ্টির জন্যেই। ব্রহ্মের মতো তার নিকট অপ্রয়োজনীয় যা, এমন সৃষ্টিতেই সে আনন্দ পায়, অতএব আনন্দ তার অমিতব্যয়ে, দিন-আনা-দিন-খাওয়ার নয়। মাত্র পর্যাপ্ত যে কণ্ঠস্বর, তা কথা বলতে পারে আর প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় মাত্রায় চিৎকার করতে; কণ্ঠস্বর যেখানে বিপুল, তা করে গান এবং তাতে পাই আমরা আনন্দ। শিল্প মানুষের জীবন-সম্পদকে উদঘাটন করে দেয়, যা তার মুক্তি খোঁজে উৎকৃষ্ট আঙ্গিকে, আর তা নিজেই নিজের লক্ষ্য।
যা কিছু অসাড় আর নিষ্প্রাণ, তা শুধু অস্তিত্বের নিরেট সত্যে সীমাবদ্ধ। জীবন অন্তহীনভাবে সৃষ্টিশীল, কারণ, তা নিজের মধ্যে সেই উদ্বৃত্তকে ধারণ করে যা সারাক্ষণ অব্যবহিত সময় আর স্থানের উপচে বইছে, আত্ম-অর্জনের বিচিত্র রূপে প্রকাশের আপন অভিযানের লক্ষ্যকে তা অস্থিরভাবে অনুসরণ করছে। আমাদের জ্যান্ত দেহের সেই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে যা আপন দক্ষতা ধরে রাখার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ; তবে আমাদের দেহ শুধুই পাকস্থলি, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস আর মস্তিষ্ককে ধারণ করার উদ্দেশ্যে একটি যুৎসই বস্তা নয়; এ এক মুর্ত্তি এর সর্বোচ্চ মূল্য এই সত্যে যে এ এর ব্যক্তিত্বকে জ্ঞাপন করে। এর রয়েছে রঙ, আকার আর গতি, যার অধিকাংশ রয়েছে উদ্বৃত্তে, প্রয়োজন যার শুধু আত্মপ্রকাশে, আত্মরক্ষায় নয়।
মানুষের মধ্যকার উদ্বৃত্ততার এই জীবন্ত পরিবেশ তার কল্পনা দ্বারা শাসিত, পৃথিবীর পরিবেশ যেমন আলো দ্বারা। একটি সাযুজ্যের মধ্যে অসংলগ্ন অনেক সত্যকে সংগ্রথিত করতে তা আমাদেরকে সাহায্যে করে, আর তার পরে সাহায্য করে শুদ্ধতার আনন্দের জন্যে একে আমাদের কর্মকাণ্ডে পরিণত করতে। তা আমাদের মধ্যে উদ্বুদ্ধ করে সেই বিশ্বজনীন মানুষকে যে সব দেশ-কালের দ্রষ্টা এবং স্রষ্টা। শুদ্ধতম আঙ্গিকে বাস্তবতার অব্যবহিত চেতনা, যদি তা স্বার্থের ছায়া দ্বারা অস্পষ্ট না হয়ে থাকে, নৈতিক কিংবা উপযোগিতাগত সুপারিশ-নির্বিশেষে তা আমাদেরকে আনন্দ দেয়, যেমনটা দেয় আমাদের আত্মা-উন্মোচনকারী ব্যক্তিত্ব। সাধারণ ভাষায় আমরা যাকে সৌন্দর্য বলি, যা রয়েছে রেখা, রং, শব্দ কিংবা চিন্তার গুচ্ছে, আমাদেরে তা আনন্দ দেয় শুধুই এই কারণে যে এর একটি সত্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না, যা চূড়ান্ত। কবি বলেছেন,’ প্রেমই পর্যাপ্ত।’ এর ব্যাখা এ নিজেই বহন করে। যার আনন্দ শিল্পের সেই আঙ্গিকেই শুধু প্রকাশ পায় যারও রয়েছে সেই চূড়ান্ততা। প্রেম তারই প্রমাণ দেয় যা আমাদের বাইরে, তবে যা তীব্রভাবে বিরাজ করে আর সে-ভাবেই আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের বোধক মদদ করে। তা তার লক্ষ্যবস্তুকে উজ্জ্বলভাবে উন্মোচন করে, যদিও সেখানে মূল্যবান আর দীপ্ত গুণাবলীর অভাব থাকতে পারে।
আমার ভেতরকার আমি তার নিজের এক সম্প্রসারণ অর্জন করে, অর্জন করে তার নিজের অনন্তকে, যখন সে অন্য কিছুকে সত্য অর্জন করে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, আমাদের সীমাবদ্ধতা এবং আরো হাজারো-একটা কারণে আমাদের পৃথিবীর একটি বড় অংশ, যদিও আমাদেরকে ঘিরে আছে তা ঘনিষ্ঠভাবে, আমাদের মনোযোগের ল্যাম্পপোষ্ট থেকে থাকে অনেক দূরে: তা নিষ্প্রভ, ছায়ার কারাভাঁর মতন তা আমাদেরকে অতিক্রম করে চলে যায়, রাতের বেলায় একটি আলোকিত রেল্ওয়ে কম্পার্টমেন্টের জানালা থেকে দেখা ভূদৃশ্যের মতো: যাত্রী জানে যে বাইরের পৃথিবী সেখানে রয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণও; তবে সে-সময়টুকুর জন্যে রেল গাড়িটিই তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই পৃথিবীর অসংখ্য বস্তর মধ্যে অল্প কিছু থাকে যারা আমাদের আত্মার পূর্ণ আলোকছটায় আসে, আর এভাবেই বাস্তবতা অর্জন করে, নিরন্তর তারা আমাদের সৃষ্টিশীল মনের কাছে স্থায়ী এক প্রতিনিধিত্বের জন্যে আর্তি জানায়। একই রাজ্যের তারা যেখানকার আমাদের আকাঙ্খারা, তারা আমাদের অহং-এর স্থায়ীত্বের আকাঙ্খার প্রতিনিধিত্ব করে।
আমি এ কথা বলতে চাই না যে স্বার্থের বন্ধনে যা-কিছুর সঙ্গে আমরা যুক্ত, বাস্তবের অনুপ্রেরণা তাদের রয়েছে; বিপরীত ভাবে, আমাদের অহমের ছায়ার দ্বারা তারা গ্রাসপ্রাপ্ত। প্রিয়ার চেয়ে ভৃত্য অধিক বাস্তব নয়। উপযোগিতার সঙ্কীর্ণ জোর আমাদের মনোযোগকে পূর্ণাঙ্গ মানবের চেয়ে অধিক চালিত করে উপকারী মানবের দিকে।
বাজার-মূল্যের পুরু লেবেল বাস্তবের চূড়ান্ত মূল্যকে ঢেকে ফেলে।
আমরা রয়েছি এ তথ্যের সত্যতা রয়েছে ঐ সত্যে যে অপর সবকিছুও রয়েছে, আর আমার মধ্যকার ‘অহম’, এর সসীমতাকে অতিক্রম করে যায় যখন তা ‘তুমি রয়েছো’-র মধ্যে নিজেকে অর্জন করে। এই গন্ডী পার-হওয়া আনে আনন্দ, আমাদের যে- আনন্দ থাকে সৌন্দর্যে, প্রেমে, মহত্বে। আত্মবিস্মরণ, এবং এর উচ্চতর মাত্রায়, আত্মত্যাগ আমাদের এই সসীমতার অভিজ্ঞতারই স্বীকৃতি।
এটাই সেই দর্শন যা সকল শিল্পে আমাদের আনন্দকে ব্যাখ্যা করে দেয়, সেই সব শিল্প যা তাদের সৃষ্টিতে সেই ঐক্যের বোধকে তীব্র করে যে সত্যের ঐক্যকে আমরা আমাদের অভ্যন্তরে বহন করি। আমার ব্যক্তিত্ব একটি জীবন্ত ঐক্যের আত্ম-সচেতন নীতি; একই সঙ্গে তা উপলব্ধি আর অতিক্রম করে সত্যের সেই সকল খুঁটিনাটিকে যা প্রাতিস্বিকভাবে আমার, আমার জ্ঞান, অনুভব, ইচ্ছে আর অভিপ্রায়, আমার স্মৃতি, আমার আশা, আমার প্রেম, আমার কর্মকাণ্ড আর আমার সকল সম্পত্তি। এই ব্যক্তিত্ব যার প্রকৃতির মধ্যে একের বোধ রয়েছে, তা নিজেকে এককে পরিণত বস্তু, চিন্তা আর সত্যের মধ্যে অর্জন করে। যে ঐক্যের নীতিকে তা বহন করে, তা কম-বেশি চরিতার্থ হয় একটি সুন্দর মুখ, ছবি, কবিতা, গান, চরিত্র কিংবা আন্ত:সম্পর্কিত ধারণা কিংবা সত্যের কোনো সাযুজ্যে, আর তখন এর জন্যে এই দব্র্যগুলো হয়ে ওঠে তীব্রভাবে বাস্তব আর সে-কারণেই আনন্দদায়ক। এর বাস্তবতার মান, বাস্তবতা, যার পরম প্রকাশ ঘটে সৌসাম্যের পরমতায়, আহত হয় তা বিরোধের বোধে, কারণ বিরোধ এর কেন্দ্রস্থিত মৌলিক ঐক্যের বিরুদ্ধে।
অপর সব সত্য আমাদের কাছে এসেছে আমাদের অভিজ্ঞতার ক্রমান্বয়িক ধারায়, আর তাদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান নূতন তথ্যাদি আবিষ্কারের মাধ্যমে নিরন্তর চলেছে বিরোধপূর্ণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। অস্তিত্ববান কোনো কিছুর চূড়ান্ত প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পেরেছি এমন নিশ্চিত আমরা কখনো হতে পারি না। তবে, সমর্থনের জন্যে কোনো তর্কের প্রয়োজন হয় না এমন প্রত্যয় নিয়ে তেমন জ্ঞান আমাদের কাছে মাত্র এসেছে। আর তা হচ্ছে আমার সব কাজের উৎস রয়েছে আমার এই ব্যক্তিত্বের মধ্যে যা নির্ণয়যোগ্য, এবং তথাপি যার সত্য সম্পর্কে আমি পৃথিবীর অন্য যে কোনোর চেয়ে অধিক নিশ্চিত। যদিও ওজন এবং মাপযোগ্য সব প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এই সত্যকেই সমর্থন দেয় যে শুধু আমার আঙ্গুলই এই কাগজটির ওপরে ছাপ রাখছে, তথাপি কোনো প্রকৃতিস্থ মানুষই সন্দেহ করতে পারে না যে এই যান্ত্রিক গতিগুলোই আমার লেখার সত্য উৎস নয়, উৎস হচ্ছে এমন সত্ত্বা যাকে শুধু সহানুভূতির মাধ্যমে জানা যেতে পারে। এ-ভাবেই কাজের দুটো দিককে আমরা আমাদের আপন দেহের মধ্যে অর্জন করতে পেরেছি, একটি মাধ্যমের মধ্যে বিবৃত আইনের দিক, অপরটি ব্যক্তিত্বের মধ্যে বাসরত ইচ্ছের দিক।
অসীমের সীমাই ব্যক্তিত্ব: ঈশ্বর ব্যক্তিক, যেখানে তিনি সৃষ্টি করেন।
তিনি তাঁর আপন আইনের সীমাকে গ্রহণ করেন আর খেলা চলতে থাকে, যা এই পৃথিবী, যার বাস্তবতা ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের মধ্যে। সারবস্তুর মধ্যো কোনোকিছু স্পষ্ট নয়, স্পষ্ট তাদের চেহারায়, অন্যভাবে বললে যার কাছে তারা উপস্থিত হয় তার সঙ্গে তার সম্পর্কে। এটাই শিল্প, যার সত্য সারবস্তু কিংবা যুক্তিতে নয়, প্রকাশে। বিমূর্ত্ত সত্য বিজ্ঞান কিংবা অধিবিদ্যায় থাকতে পারে, তবে বাস্তবের জগৎ থাকে শিল্পে।
রূপকল্প-নির্মাণে যার স্ফূতি, সেই শীর্ষ-পুরুষের খেলা হচ্ছে শিল্প হিসেবে বিশ্ব। তুমি রূপের উপকরণ খোঁজার চেষ্টা করো- তারা তোমার সাথে লুকোচুরি খেলবে, – চিরন্তন রহস্য তারা কখনো তোমার কাছে উন্মোচন করবে না। জীবন্ত কোষে প্রকাশিত জীবনকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় তুমি কার্বন পাবে, নাইট্রোজেন, এবং আরো অনেক কিছু যা একেবারেই জীবনের মতো নয়। চেহারা নিজের উপাদানের ওপরে কোনো ধারা-বিবরণী দেয় না। তুমি একে মায়া বলতে পারো এবং অবিশ্বাস করতে পারো, তবে বড় শিল্পী, মায়াবী, তাতে আহত হবে না। কারণ, শিল্পী মায়া, এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা নেই, শুধুই যে এ যা নয় তা হওয়ার অভিনয় করে। এর পলায়নপরতাকে লুকনোর চেষ্টা এ কখনোই করে না, বিদ্রুপ করে এমনকি নিজের সঙ্গাকে, পরিবর্তনের নিরন্তর উড়ালগুলোর মধ্য দিয়ে খেলে চলে লুকোচুরি।
আর এ-ভাবেই জীবন, যা হলো স্বাধীনতার এক অনি:শেষ বিস্ফোরণ, তার লয় খুঁজে পায় মৃত্যুর মধ্যে অবিরাম পতনের মাঝে। প্রতিটি দিন একটি মৃত্যু, এমনকি প্রত্যেক মুহূর্ত্ত। তা না হলে, তৈরি হতো মৃত্যুহীনতার অনিয়তাকার এক মরুভূমি যা চিরদিন বোবা, নিস্পন্দ। অতএব, জীবন হচ্ছে মায়া, যেমনটা বলতে নাকি নীতিবাদীরা পছন্দ করেন, তা আছে এবং নেই। এর মধ্যে আমরা যা পাই তা হচ্ছে সেই ছন্দ, যার মাধ্যমে তা নিজেকে উপস্থিত করে পাথর আর খনিজ কি কিছুমাত্র শ্রেয়? বিজ্ঞান কি আমাদের এই সত্য দেখায় নি যে এক পদার্থ থেকে অপরের চূড়ান্ত পার্থক্য তাদের ছন্দে? পারদ থেকে সোনার মৌলিক তফাৎ তাদের যার-যার আনবিক গঠনের ছন্দে, প্রজা থেকে রাজার পার্থক্যের মতো, যা তাদের পৃথক গঠন-উপাদানে নয়, বরং অবস্থা আর পরিস্থিতির পৃথক লয়ে আর সেখানেই তুমি পাচ্ছো দৃশ্যের আড়ালের শিল্পীকে, ছন্দের যাদুকরকে, যা অধরাকে দেয় বস্তুর চেহারা।
ছন্দ কি? এ হচ্ছে সাযুজ্যপূর্ণ বাধা দ্বারা সৃষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত গতি। শিল্পীর হাতে এটাই সৃজনশীল শক্তি। শিল্পীর হাতে রয়েছে সৃজনী শক্তি। যতোক্ষণ শব্দ থাকে ছন্দ-লয়হীন গদ্য রূপে, তারা বাস্তব সম্পর্কে কোনো স্থায়ী ধারণা দেয় না: যে মুহূর্তে তাদেরকে তুলে নিয়ে ছন্দে বসিয়ে দেয়া হয়, তারা আলোয় স্পন্দিত হয়ে ওঠে। গোলাপেরও একই সত্য। এর পাঁপড়ির মধ্যে তুমি পেতে পারো গোলাপ-সৃষ্টির সকল উপাদান, তবে হারিয়ে যাবে যে- গোলাপ মায়া, যে-গোলাপ একটি ছবি। গোলাপকে আমার স্থির মনে হয়, তবে এর গঠনের তালের জন্যে সেই স্থৈর্যের মধ্যেই থাকে গতির এক সংগীত, যা একটি নিখুঁত সামঞ্জস্যপূর্ণ ছবির গতিশীলতার গুণটির মতো একই। আপন গতির দোলার সাথে সমলয়সম্পন্ন এক সংগীত তা আমাদের চেতনায় সৃষ্টি করে। ছবিটি যদি রঙ আর রেখার অসমঞ্জস সমবেশে তৈরি হতো তা হলে তাও হতো মৃত-স্থির।
সুষম ছন্দে শিল্প-রূপ হয়ে ওঠে নক্ষত্রদের মতো যারা তাদের আপাত স্থিরতায় কখনোই স্থির নয়, যেমন গতিহীন শিখা যা গতি ব্যতীত অন্য কিছু নয়। একটি মহৎ চিত্রকর্ম সবসময়ই বলতে থাকে, কিন্তু সংবাদপত্রের সংবাদ, যদি তা কোনো ট্র্যাজিক ঘটনারও হয়, সদ্যোজাত মাত্র। কোনো জার্নালের অস্পষ্টতায় কিছু সংবাদ মামুলি হয়ে থাকে; কিš‘ একে এক সঙ্গত ছন্দ দিন, তখন তার ঝলমলে ভাব আর যাবে না। সেটাই শিল্প। এর রয়েছে সেই যাদুর দণ্ড যা সে স্পর্শ করে এমন সব কিছুকে দেয় অমর বাস্তবতা। আর যুক্ত করে দেয় আমাদের ভেতরকার ব্যক্তিকে সত্ত্বার সাথে। এর সৃষ্টির সম্মুখে আমরা দাঁড়াই আর বলি: নিজেকে যেমনটা জানি, তোমাকেও, তুমি বাস্তব।
একবার পিকিং-এর রাস্তায় আমার সাথে চলতে-চলতে আমার এক চীনা বন্ধু অকস্মাৎ অনেক উত্তেজনার সাথে একটি গাধার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সাধারণত আমাদের জন্যে গাধার সত্যের কোনো বড়ো শক্তি থাকে না, যদি না সে আমাদেরকে পদাঘাত করে কিংবা যদি তার নিমরাজি সেবা আমাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবে, তেমন পরিস্থিতিতে সত্যের জোর গাধার ওপরে থাকে না, বরং তার বাইরে কিছু উদ্দেশ্য কিংবা শারীরিক বেদনার। আমার চীনা বন্ধুর আচরণ তৎক্ষনাৎ সেই সব চীনা কবিতাকে স্মরণ করিয়ে দিল যেখানে বাস্তবের আনন্দদায়ক বোধ এতো স্বত:স্ফূর্তভাবে অনুভূত হয়, আর এত সরলভাবে প্রকাশিত।
ঊস্তুর স্পর্শের প্রতি এই সংবেদন, তাঁদের স্বীকৃতিতে এমন প্রভূত আনন্দ বাধাপ্রাপ্ত হয় যখন আমাদের সমাজে পীড়াপীড়িমূলক উদ্দেশ্য অসংখ্য আর সূক্ষ্ম হয়ে পড়ে, যখন সমস্যা আমাদের পথে মনোযোগের দাবিতে ভীড় করে দাঁড়ায় আর জীবনের যাত্রা বাধাপ্রাপ্ত হয় তেমন সামগ্রী আর চিন্তার দ্বারা, যারা সুষম নিরসনের পক্ষে অত্যধিক কঠিন।
আধুনিক যুগে এটা প্রতিদিন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, যা জীবনের উপকরণ উপভোগের চেয়ে তাদের সংগ্রহে বেশি সময় বরাদ্দ করে। সত্য বলতে কি, তখন জীবনের উপকরণের কাছে জীবন নিজে গৌণ হয়ে পড়ে, এমনকি বাগানের দেয়ালের জন্যে সংগৃহীত ইটের তলায় চাপা-পড়া বাগানের মতো। যে-কোনোভাবেই হোক, ইট্-চুন-সুরকির খাই বেড়ে চলে, আবর্জনার সাম্রাজ্য প্রকান্ডহয়ে ওঠে, বসন্তের দিনগুলো যায় ব্যর্থ হয়ে, ফুল কখনোই ফোটে না।
আমাদের আধুনিক মন এক দ্রুতগতি ভ্রমণকারী; বিবিধ বিষয়ে তার দ্রুত চক্করের কখনো সে উথালপাথাল করে ফেলে মজার জিনিসের সস্তা বাজারকে, যার অধিকাংশ মেকী। এটা ঘটে; কারণ, অস্তিতের সরল অংশগুলোর প্রতি এর স্বাবাভিক টান বিক্ষিপ্তকারী সব পূর্বমনোযোগ দ্বারা ভোতা হয়ে যায়। যে-সাহিত্য এতে তৈরি হয় তা অসাধারণ সব সামগ্রী আর ফলাফলের জন্যে নাক গলায় অনুপযোগী সব স্থানে। চমকপ্রদ হওয়ার জন্যে সে তার সম্পদের ওপরে মাত্রাধিক চাপ তৈরি করে। চালচলনে সে অস্থিও বদল দাঁড়া করায়, যেমনটা দেখা যায় আধুনিক সহস্রাব্দে; আর ফলবস্তুটি সামনে আনে যতোটা না জীবনের প্রস্ফুটন, তার চে’ বেশি ইস্পাতের পলিশ।
সাহিত্যেও যেসব ফ্যাশন দ্রুতই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ক্বচিৎ তারা গভীর থেকে উৎসারিত। ওপরের ফেনাময় আলোড়নের ব্যাপার তারা ক্ষণিকের স্বীকৃতির প্রচন্ড হইচই নিয়ে চলে। তেমন সাহিত্য, আপন চাপেই, আন্তর বিকাশকে হারিয়ে ফেলে, দ্রুত পার হয়ে যায় হেমন্তের পাতার মতোন বাহিরিক পরিবর্তনকে রঙ আর তুলির সাহায্যে তৈরি করে এক সর্বশেষ সময়ের ভাব, লজ্জায় ফেলে দিয়ে অব্যবহিত গতকালের ছাপকে। প্রায়শই এর প্রকাশ মুখভঙ্গি, মরুভূমির ক্যাকটাসের মতোন, যার বিকৃতিতে থাকে বিনয়ের অভাব আর কাঁটায় শান্তির, যার দৃষ্টিভঙ্গীতেফলে ওঠে আগ্রাসী এক দুর্বিনয়, সেখানে ইঙ্গিত দারিদ্র্যের কষ্টকৃত দম্ভের। এর তুলনা আমরা পাই কিছু আধুনিক রচনায়, যাকে উপেক্ষা করাটা কঠিন তাদের কণ্টকময় চমক আর স্ববিরোধময় অঙ্গভঙ্গীর জন্যে। এগুলোতে জ্ঞান দুর্লভ নয়, তবে এ এমন জ্ঞান যা আপন শান্ত মর্যাদায় বিশ্বাস হারিয়েছে, তেমন জনতা একে উপেক্ষা করবে বলে ভয়, যা আকৃষ্ট হয় বাহুল্য আর অস্বাভাবিক দ্বারা। জ্ঞানকে চুর রূপের জন্যে সংগ্রাম করতে দেখলে মায়া লাগে, প্রশস্তিরত সংখ্যার সামনে দাঁড়িয়ে টুপি-ঘন্টায় সজ্জিত কোনে অবতারকে দেখলে।
কিন্তু, সব মহৎ শিল্পে, সাহিত্যিক কিংবা ভিন্ন, মানুষ আপনার তেমন অনুভূতিকে প্রকাশ করেছে যা স্বাভাবিক এক আঙ্গিকে অনন্য, তবে নয় অস্বভাবী। যখন ওয়ার্ডসওয়র্থ তাঁর কবিতায় প্রেম-পরিত্যক্ত এক জীবনকে বর্ণিত করলেন, আপন শিল্পের জন্যে স্মৃতিতে জাগ্রত করলেন তিনি সেই স্বাভাবিক করুণ রসকে যা তেমন এক বিষয়ের সাথে পরিচিত সব স্বাভাবিক মনেরই প্রত্যাশা। যে ছবিতে তিনি আবেগটিকে প্রাণসঞ্চার করলেন, তা ছিল অপ্রত্যাশিত; তথাপি সুস্থ পাঠকমাত্র আনন্দের সাথে স্বীকৃতি দেন যখন তার সামনে মেলে ধরা হয় … নিষ্পত্র এগ্লেন্টাইনের আপন ঝোপের মাঝে/তুষারে-পূর্ণ, পরিত্যক্ত এক পাখীর বাসা’র ছবি।
অপর পক্ষে, আমি কিছু আধুনিক রচনা পড়েছি যেখানে সন্ধ্যার আকাশে তারাদের ফুঠে-ওঠাকে বর্ণনা করা হয়েছে অন্ধকারের ফুলে-ওঠা শরীরে কোনে ব্যাধির আকষ্মিক উপস্থিতি রূপে। লেখক তারাখচিত আকাশে এক শান্ত স্বাভাবিক পবিত্রতার বোধকে ধারণ করতে ভয় পাচ্ছেন, পাছে তাকে সাধারণ ভাবা হয়ে যায়। বাস্তবাতাবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে ছবিটি সম্পূর্ণ অযথার্থ নয়, আর একে বিবেচনা করা যেতে পারে তার অসঙ্কুচিত অভদ্রতায় দু:সাহসিকভাবে উর্বর। তবে, এ তো শিল্প নয়: এ হলো কম্পিত চীৎকার, অনেকটা আধুনিক বাজারের আলোড়ন-পীড়িত বিজ্ঞাপনের মতো, জনতার অমনোযোগ কাটতে যা জনমনস্বত্ত্বকে কাজে লাগায়। অস্বভাবীর ওপরে অতিগুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে শক্তিমত্তার মিথ্যে আবেশ তৈরিতে প্রলুব্ধ হওয়াটা জ্ঞান-হারানোর লক্ষণ। কল্পনার ক্ষীয়মাণ শক্তিই এ-কালের শিল্পে মরিয়া ক্ষিপ্রতাকে ব্যবহার করে আঘাত সৃষ্টির জন্যে, অনভ্যস্ততার আবেশকে ঝলমলে আলোতে হাজির করে দেয়ার জন্যে। যখনই আমরা দেখি কোনো এক যুগের সাহিত্য বিষয়বস্তু আর আঙ্গিকে এক কৃত্রিম নতুনত্বের অনুসন্ধানে খেটে মরেছে, আমাদের বুঝতেই হবে যে এটা বার্ধক্যের লক্ষণ, রক্তাল্পতাজনিত মানসগড়নের লক্ষণ, যা এর বুড়িয়ে-যাওয়া রুচিকে মদদ করতে চায় রুচিহীনতায় ঝাল আর অসহিষ্ণুতার ঝনাৎকারক স্পর্শ দ্বারা। এটাও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে এই লক্ষণগুলো বিগত শতাব্দীর সাহিত্যের প্রতি একটি প্রতিক্রিয়ার ফল যা অত্যধিক সূক্ষ্মভাবে শর্করাপূর্ণ একটি মুদ্রাদোষের উদ্ভব ঘটায়, এর প্রক্ষালনের বিলাস-বৈভবে আর প্রকাশগুলোর অতিরিক্ত উপদেয়তায় যা অপৌরুষেয়। পরিশীলনের এক চর সীমায় এরা পৌঁছায় যা এর ধারাগুলোকে প্রায় বিধিবদ্ধ করে দেয়, যার ফলে ভীরু প্রতিভাদের পক্ষে সাহিত্যিক গণ্যতার আরামদায়ক মাত্রায় পৌঁছানো সহজ হয়। এই ব্যাখ্যা সত্য হতে পারে; তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিক্রিয়াগুলো স্বতস্ফূর্ততার শান্ত ভাবটি ক্বচিৎ বজায় রাখে, প্রায়শ তারা মুদ্রাঙ্কনের বিপরীত দিকটি উপস্থিত করে, যাকে তারা মিথ্যে বলে বাতিল করতে চায়। একটি নির্দিষ্ট মুদ্রাদোষের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিক্রিয়া জঙ্গীভাবে এর নিজের মুদ্রাদোষ তৈরি করতে পারে, যুদ্ধের রঙটির প্রক্ষালন-প্রস্তুতিকে ব্যবহার করে, ব্যবহার করে আদিম রূঢ়তার স্বেচ্ছায় উৎপন্ন রীতিকে। বিস্তারিতভাবে পরিকল্পিত পুষ্পোদ্যানগুলোতে ক্লান্ত হয়ে মালি তার কঠোর সঙ্কল্প নিয়ে সর্বত্র কৃত্রিম পাথরের প্রাঙ্গণ তৈরির কাজে এগোতে পারে, ছন্দের স্বাভাবিক প্রেরণাকে বাদ দিয়ে, যেখানে রয়েছে অত্যাচারের ফ্যাশনের প্রতি শ্রদ্ধা, যা নিজেই ফ্যাশনের অত্যাচার। এক বিদ্রোহের পদ্ধতিতেও অনুসরণ করা হয় সেই পালে-চলার প্রবৃত্তি যা ছিল মেনে-নেয়ায়, আর আনুগত্যের বিপরীত যে অমান্যতা তাও অমান্য চালে বাধ্যতাকেই দেখায়। পৌরুষের উন্মত্ততা তৈরি করে সার্কাসের জন্যে তৈরি পেশল ক্রীড়াপরায়ণতাকে, সেই স্বাভাবিক বীরত্বকে নয়, যা অজেয় কিš‘ বিনীত, সকল শিল্পে যার সম্মানের সার্বভৌম আসনের দাবি।
এর সমর্থকরা প্রায়শ বলেছেন যে শিল্পে অভদ্ররকম উচ্চৈ:স্বর এবং সস্তা ভয়ঙ্করদের এই দৃশ্যের সাফাই রয়েছে এদের তরফে সত্যের নিরপেক্ষ স্বীকৃতির মধ্যে। আর, এদের মতে বাস্তবতাকে কখনোই ত্যাগ করা যাবে না যদি তা ছেঁড়াখোঁড়া কিংবা পূঁতিগন্ধও হয়। স্বাভাবিক পরিবেশ সম্পর্কে এদের নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাধি এক বাস্তবতা যাকে সাহিত্যে স্বীকৃতি দিতে হবে। কিন্তু হাসপাতালের রোগ তা তেমন বাস্তবতা যা বিজ্ঞানের ব্যবহারের উপযুক্ত। সাহিত্যকে তাড়িয়ে বেড়াতে দিলে এ হলো এক বিমূর্ত্ততা যা তার অবাস্তবতার কারণে এক চমকপ্রদ উপস্থিতি তৈরি করে। অমন ভবঘুরে ভূত স্বাভাবিক পরিবেশে কোনো যথাযথ গতিবিধি রাখে না, আর তাদের চেহারার অলীক কতোক গড়নরেখা তারা উপস্থিত করে, কারণ তাদের পরিবেশের অনুপাতকে নয়-ছয় করা হয়। আবশ্যকীয়ের অমন কাটছাঁট কিন্তু শিল্প নয়, বরং একটা চাতুরী, যা নয়-ছয়ের সাহায্য নিয়ে বাস্তবতা সৃষ্টির মিথ্যে দাবি তৈরি করে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন লোক দুর্লভ নয় যারা বিশ্বাস করে যে যা তাদেরকে বলপূর্বক চমকিত করে, তা তাদেরকে তেমন সত্যের চেয়ে অধিক দেখতে দেয় যা সংযত আর ভারসাম্যপূর্ণ, যার মানভঞ্জন এবং মন-জয় তাদের করতে হবে। খুবই সম্ভব যে অবসরের অভাবে তেমন ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে, আর যৌন-মনস্তত্ত্ব এবং নৈতিক ক্ষতিকারকতার ঔষধালয়ের অন্ধকার প্রকোষ্ঠগুলোতে সিধ কেটে তাদেরকে সেই উদ্দীপনা দেয়া হয় যাকে তারা নন্দনতাত্ত্বিক উদ্দীপনা বলে বিশ্বাস করে।
আমাদের পাড়ায় কিছু আদিম ধরনের মানুষ গায় গানের এমন একটি সরল লাইন এরকম: ‘হৃদয় আমার নুড়ির জমিন, তার নিচে বইছে এক বোকা স্রোত।’
মন:সমীক্ষণবাদী একে অবদমিত আকাঙ্খার দৃষ্টান্ত হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করতে পারেন এবং সেভাবেই একে কোনো কল্পিত সত্যের বিজ্ঞাপনের নমুনা হিসেবে তৎক্ষণাৎ অবমূল্যায়ন করতে পারেন, যেমনটা নাকি ঘটে এক টুকরো কয়লার ক্ষেত্রে যাকে সন্দেহ করা হয় আপন কালোর মধ্যে বিস্মৃত কালের সূর্যের জ্বলন্ত দ্রাক্ষারসকে ধারণ করতে। কিন্তু, এ তো সাহিত্য; আর আদি উদ্দীপনটি যা-ই হোক না যা এই চিন্তাটিকে একটি গানে চমকিয়ে নিয়েছে, এর সম্পর্কে তাৎপযপূর্ণ সত্য হচ্ছে যে এটি একটি ছবির রূপ নিয়েছে, অনন্য এক ব্যক্তিগত, তথাপি বিশ্বজনীন চারিত্র্যের সৃষ্টি এটি। কোনো আকাঙ্খার অবদমনের ঘটনাগুলো বহুসংখ্যকভাবে সাধারণ; কিন্তু এই বিশিষ্ট প্রকাশটি এককভাবে অসাধারণ। শ্রোতার মনস্পৃষ্ট হয় এ কারণে নয় যে এ এক মনস্তাত্ত্বিক সত্য, বরং, কারণ, এ এক প্রাতিস্বিক কবিতা, উপস্থিত করছে এক ব্যক্তিক বাস্তবতাকে যা আবার মানব-বিশ্বের সকল সময়ের, স্থানের।
তবে এটাই সব নয়। এ কবিতাটির আঙ্গিক নিশ্চয় তার স্রষ্টার স্পর্শের কাছে ঋণী; তবে, একই সময়ে পরম বিযুক্ততা নিয়ে তা তার উপকরণকে অতিক্রম করে গেছে- তার রচয়িতার আবেগী মেজাজকে। আত্মজৈবনিক বন্ধন থেকে তা তার স্বাধীনতা অর্জন করেছে এক ছন্দগত নিখুঁততায় পৌঁছে, যা তার একেবারে নিজস্ব গুণে মূল্যবান। একটি কবিতা রয়েছে যা তার শিরোনামের মধ্য দিয়ে স্বীকার করে নেয় এক নিরানন্দের মেজাজে এর উদ্ভবের সত্যকে। কেউ বলতে পারে না যে কোনো সাবলীল মনের কাছে অবসাদের অনুভূতির মধুরভাবে স্মরণীয় কিছু রয়েছে। তথাপি, এই পদ্যগুলোকে ভুলতে দেয়া হয় না; কারণ, যতো সরাসরিভাবে একটি কবিতা নির্মিত হয়, ততো চিরন্তনভাবে তা তার জন্ম থেকে মুক্ত, তা হ্রাস করে আনে তার ইতিহাস আর জোর দেয় তার স্বাধীনতার ওপরে। যে দুঃখ এক সম্রাটের মধ্যে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ছিল, তা মুক্তি পেল যখন তা পাথেও কাব্যেও রূপ পেল, তা শোকগাথার জয়ে পরিণত হলো, আনন্দেও ওপচানো স্রোত, এর কষ্টেও উৎসের কালো পথ কে তা ঢেকে দিয়েছে। সব সৃষ্টির বেলাতেই তা সত্য। এক বিন্দু শিশির এক নিখুঁত শুদ্ধতা, যার পিতৃ-মাতৃত্বের কোনে সন্তান-স্মৃতি নেই।
সৃষ্টি শব্দটি যখন আমি ব্যবহার করি, আমি বোঝাই যে এর মধ্য দিয়ে এক অভাবনীয় বিমূর্ত্ততা তার সাথে আমাদের সম্পর্কে এক ইন্দ্রিগ্রাহ্য ঐক্যকে লাভ করেছে। এর আধেয়কে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, তবে এই ঐক্যকে নয়, যা রয়েছে তার স্ব-উপস্থাপনায়। একটি শিল্প হিসেবে সাহিত্য আমাদের সেই রহস্যকে দেয়, যা রয়েছে তার ঐক্যে।
আসুন আমরা কবিতাটি পড়ি।

কখনো তোমার প্রেমকে বলতে যেয়ো না,
প্রেম যা কখনো বলা যায় না;
কারণ, মৃদুমন্দ বাতা বয়ে যায়
নীরবে, অদৃশ্যভাবে।
আমি আমার প্রেমকে বলেছিলাম, আমি আমার প্রেমকে বলেছিলাম,
আমার সমস্ত হৃদয় বলেছিলাম;
মৃত্যুবৎ ভয়ঙ্কর ভয়ে শীতল কম্পিত
আহা সে বিদায় নিল।
আমার কাছ থেকে তার বিদায়ের পর দ্রুত
এলো এক পথিক;
নীরবে, অদৃশ্যভাবে
দীর্ঘশ্বাসযোগে সে তাকে নিয়ে চলে গেল।
এক রয়েছে ব্যাকরণ, শব্দভার। যখন একে অংশে-অংশে ভাগ করি, আর এগুলো থেকে স্বীকারোক্তি বের করে নিতে চেষ্টা করি অত্যাচারী টিপে, তখন যে-কবিতাটি ছিল এক এক, মৃদু বাতাসের মতো তা চলে যায়, অতিক্রম করে সকল আইনকে, আর যুক্ত হয় ব্যক্তির সাথে। ঐক্যের ভেতরে রয়েছে যে তাৎপর্য তা চিরকালের এক বিস্ময়।
কবিতাটির নির্দিষ্ট অর্থের ক্ষেত্রে আমাদের সন্দেহ থাকতে পারে। আটপৌরে গদ্যে বললে, আমরা অসহিষ্ণু বোধ করতে পারি, এবং একে প্রত্যাখ্যান করার জন্যে উঠে দাঁড়াতে পারি। নিশ্চয় আমরা ব্যাখ্যা চাইতে পারি কে ছিল সেই পরিব্রাজক, আর কোনো যৌক্তিক উস্কানি ছাড়াই কেন সে প্রেমকে ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে, এই কবিতায় আমাদের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই যদি না আমার আশাহীনভাবে ব্যাখ্যা-সংগ্রহে আসক্ত হই, যা কি-না মৃত-প্রজাপতি-সংগ্রহের মতো। কবিতাটি সৃষ্টি হিসেবে, যা শুধু ধারণার চেয়ে অধিক কিছু, আমাদের মনোযোগকে জয় করে নেয় অনিবার্যভাবে। এর শব্দসমূহে যে অর্থ আমরা অনুভব করি, তা মৃদু হাসির একটি সুন্দর মুখ দেখে সৃষ্ট অনুভবের মতো, যা অবর্ণনীয়, ছলনাময় আর গভীরভাবে সন্তোষজনক।
কবিতা হিসেবে ঐক্য নিজেকে উপস্থিত করে এক ছন্দোময় ভাষার, চরিত্রের ভঙ্গিতে। ঐ ছন্দ থাকে না শব্দের কোনো পরিমিত মিশ্রণে, বরং ধারণার তাৎপর্যপূর্ণ সাযুজ্যে, চিন্তার সেই সংগীতে যা রয়েছে বণ্টনের এক সূক্ষ্ম নীতিতে, যা প্রথমত যৌক্তিক নয়, বরং সাক্ষ্যগত। শব্দের চরিত্রে যে অর্থ রয়েছে, তাকে সংঙ্গায়িত করা কঠিন। এটা বোধগম্য হয় দিকগুলোর বিশেষ সেই দলগঠনে যা একে দেয় এক অপ্রতিরোধ্য গতি। যে মিশ্রণের প্রতিনিধিত্ব তা করে, তা উদ্ভট হতে পারে, অসমাপ্ত, বেসুরো, তথাপি সামগ্রিকতায় এমন এক গতিময় প্রবলতা এর রয়েছে, যা স্বীকৃতি দাবি করে, যা আমাদের প্রায়শই যুক্তির সম্মতির জন্যে আমাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে। একটি হিমবাহের একটি চরিত্র রয়েছে, যা এমন কি আরো ভারী কোনো বরফস্তুপের নেই; এর চরিত্র এর বিশাল চলায়, এর অগণনীয় সম্ভাবনায়।
পৃথিবীকে শিল্পীরই এটা স্মরণ করিয়ে দেয়ার রয়েছে যে আমাদের প্রকাশের সত্যের মধ্য দিয়ে আমরা সত্যে বেড়ে উঠি। যখন মনুষ্যসৃষ্ট জগৎ যেন মানুষের সৃজনশীল আত্মার তুলনায় বেশি হয়ে পড়ে কোনো ক্ষমতার উদ্দেশ্যে একটি যান্ত্রিক ফন্দী, তখন তা নিজেকে কঠিন করে তোলে, জীবন্ত বিকাশের সূক্ষ্ম ইঙ্গিতময়তার মূল্যে অর্জন করে দক্ষতা। সৃজনশীল কাজে মানুষ প্রকৃতিকে সজীব করে তোলে আপন জীবন আর প্রেম দিয়ে। তবে তার উপযোগমুখী শক্তির সাহায্যে সে প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে, আপন জগৎ থেকে তাকে নির্বাসনে পাঠায়। নিজের উচ্চাকাঙ্খার কুৎসিতকে দিয়ে তাকে করে তোলে বিকৃত এবং অপবিত্র।
এরা বেসুরো চীৎকার আর উচ্চরব বড়াই নিয়ে মানুষের বানোয়াট এই জগৎ তার নিকট তুলে ধরে বিশ্বের এমন এক ছককে যার মধ্যে ব্যক্তির কোনো ছোঁয়া নেই। মানবতার এমন ভ্রান্ত প্রকাশের মধ্য দিয়েই বিলীন হয়ে যাওয়া সব সভ্যতা তাদের সমাপ্তিতে পৌঁছে ছিল; সম্পদ-সৃষ্ট এক প্রকান্ড মাত্রার পরজীবিতা আর বস্তুগত সম্পদের ওপরে তার টেনে-চলা নির্ভরতার মধ্য দিয়ে; প্রত্যাখ্যান আর নেতিকরণের উপহাসকর চেতনার মধ্য দিয়ে, সত্যের পথে আমাদের টিকে থাকার উপায়কে কেড়ে নিয়ে।
চিরদিনের ইতিতে তাঁর আ¯’াকে শিল্পীর ঘোষণা করা রয়েছে- এটা বলার যে : আমি বিশ্বাস করি যে জগতের ওপরে এবং তাকে মাখামাখি করে একটি আদর্শ রয়েছে, সেই স্বর্গের আদর্শ যা নিছক কল্পনার ফল নয়, বরং সেই পরম বাস্তব যার ভেতরে সব কিছু বাস আর নড়াচড়া করে।’
আমি বিশ্বাস করি যে স্বর্গের ছবি দেখতে হবে রৌদ্রালোক আর পৃথিবীর সবুজে, মনুষ্য মুখমন্ডলের সৌন্দর্যে আর মনুষ্য জীবনের সম্পদে, এমনকি তেমন দ্রব্যে যা দেখতে তাৎপর্যহীন আর পূর্বপক্ষপাতমুক্ত। পৃথিবীর সর্বত্র স্বর্গের চেতনা জাগ্রত, আর তা ছড়িয়ে দিচ্ছে তার কণ্ঠ। আমরা না-জানতে তা আমাদের অন্তর্কর্ণে পৌঁছায়। আমাদের জীবনের বীণায় সে সুর বাঁধে যা সংগীতে আমাদের আকাঙ্খাকে সীমার ওপরে পাঠায়, শুধুই প্রার্থনা তার আশায় নয়; মন্দিরেও যা হচ্ছে পাথরে অগ্নিশিখা, ছবিতে যা অমরকৃত স্বপ্ন, নাচে যা গতির স্থির কেন্দ্রে আনন্দিত ধ্যান।
ভাষান্তর : কাজল বন্দোপাধ্যায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here