একজন শিল্পীর ধর্ম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

0
141

গত সংখ্যার পর
আমার পরিবারের সকল সদস্যেরই কিছু গুণ ছিল- কেউ-কেউ ছিলেন শিল্পী, কেউ কবি, কেউ সঙ্গতীকার এবং আমাদের বাড়ির গোটা পরিবেশ নিষিক্ত ছিল সৃষ্টির চৈতন্যে। প্রায় শৈশব থেকেই আমার মধ্যে প্রকৃতির সৌন্দর্যের একটি গভীর বোধ ছিল, বৃক্ষ আর মেঘের সাথে সখ্যের অন্তরঙ্গ এক বোধ, বাতাসে ঋতুর গীতিময় ছোঁয়ার সাথে আমি একাত্ম বোধ করতাম। একই সঙ্গে আমি ছিলাম মানবিক দয়ায় কাতর। এসবই প্রকাশের মুখ চেয়ে ছিল। আমার আবেগগুলোর ঐকান্তিকতা নিজেদের প্রতি সৎ থাকতে চাইত, যদিও তাদের প্রকাশকে কোনো শুদ্ধ রূপ দেওয়ার পক্ষে আমি খুবই অপক্ক ছিলাম।
তখন থেকে স্বদেশে আমি যশ পেয়েছি, কিন্তু বহুদিন পর্যন্ত দেশবাসীর একটা বড়ো অংশের মধ্যে বিরোধিতার একটি বড়ো স্রোত থেকে গিয়েছিল। কেউ বলেছে আমার কবিতা জাতীয় হৃদয় থেকে উৎসারিত নয়; কেউ অভিযোগ করেছে তার অবোধগম্য; আরো অন্যরা, যে তারা ক্ষতিকর। সত্য কথা বলতে আমার নিজ জনগণ থেকে আমি কখনো সম্পূর্ণ গ্রহণ পাইনি, আর তাও হয়েছে একটি আশীর্বাদ; কারণ, অগুণান্বিত সাফল্যের চেয়ে মনোবলহানিকর আর কিছু নেই।
আমার জীবনক্রমের এ-ই হলো ইতিহাস। আমার ইচ্ছে হয় যে একে আমি আরো পরিষ্কারভাবে উদ্ঘাটন করি, নিজের ভাষায় নিজের রচনার বিবরণ দিয়ে। আমি আশা করি কখনো-না-কখনো তা সম্ভব হবে। ভাষারা ঈর্ষাপরায়ণ। কোনো বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীর মালিকানাধীন কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যারা নাড়াচাড়া করতে চেষ্টা করে তাদের কাছে ভাষা তাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তুলে দেয় না। তাকে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে খুশি করতে হবে, হাজিরা নাচতে হবে। কবিতা হস্তান্তরযোগ্য বাজারী পণ্য নয়। কোনো অ্যাটর্নির মাধ্যমে আমাদের মনোহারিণীর হাসি আর দৃষ্টি আমরা পেতে পারি না, তা তিনি যত পরিশ্রমী আর কর্তব্যপরায়ণই হোন না কেন।
ইউরোপীয় ভাষাগুলোর সাহিত্যে সৌন্দর্যের যে সম্পদ পাওয়ার আছে, তার জন্যে প্রয়াস আমি নিজেই করেছি, তাদের আতিথ্যের অধিকার পাওয়ার বহু আগেই। তরুণ বয়সে আমি দান্তেÍর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করি, ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে। নিদারুণভাবে ব্যর্থ হই আমি এবং ঐ প্রয়াস থেকে নিবৃত্ত হওয়াকেই নিজের ধর্মীয় কর্তব্য জ্ঞান করি। দান্তে আমার জন্যে একটি বন্ধ বই-ই থেকে যান।
আমি জার্মান সাহিত্য জানার চেষ্টাও করেছিলাম, আর অনুবাদ-যোগে হাইনে পড়ার পরে ভেবেছি যে তার সৌন্দর্যের চকিত দেখা পেয়েছি। জার্মানি থেকে আগত এক মিশনারি ভদ্রমহিলার সাথে সৌভাগ্যক্রমে আমার পরিচয় হয়, আমি তাঁর সাহায্য চাই। কয়েক মাস আমি কঠোর পরিশ্রম করি, তবে দ্রুতবুদ্ধি হওয়াতে, যা কোনো সদগুণ নয়, আসি অধ্যবসায়ী ছিলাম না। অর্থ অনুমান করার সেই বিপজ্জনক সুবিধেটি আমার ছিল যা কাউকে সহজে অর্থ অনুমান করতে সাহায্য করে। আমার শিক্ষক ভেবেছিলেন যে ভাষাটি আমি প্রায় আয়ত্ত করে ফেলেছি, যা সত্য ছিল না। অবশ্য আমি হাইনে পড়ে ফেলতে পেড়েছিলাম, ঘুমের মধ্যে সহজে অচেনা পথে হেঁটে ফেলে যে মানুষ, তার মতো এবং আমি বিপুল আনন্দ লাভ করেছিলাম।
তারপরে আমি গ্যোয়েতে চেষ্টা করি। তবে তা ছিল অতি উচ্চাকাক্সক্ষী। যেটুকু সামান্য জার্মান শিখেছিলাম, তার সাহায্যে পড়ে ফেলেছিলাম ফস্ট। আমার বিশ্বাস আমি রাজপ্রাসাদে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম, এমন কারো মতো নয় যার হাতে সকল দরজার চাবি রয়েছে, বরং কোনো কেজো আগন্তকের ন্যায় যাকে কোনো সাধারণ অতিথিকক্ষে সহ্য করা হয়, আরামদায়ক কিন্তু অন্তরঙ্গ নয়। সত্য কথা বললে, আমি আমার গ্যোয়েতেকে জানি না এবং একইভাবে বহু মহৎ জ্যোতিষ্কই আমার কাছে ধোঁয়াশামন্ডিত।
এ হলো যা হওয়া উচিৎ। তীর্থযাত্রা সম্পন্ন না করে কেউ মন্দিরে পৌঁছতে পারে না। অতএব, আমার রচনার অনুবাদ থেকে কেউ সত্য কিছু পেতে পারেই না।
সংগীতের ক্ষেত্রে আমি নিজেকে এক ধরনের সংগীতজ্ঞ দাবি করি। গোঁড়া শুদ্ধতার নিয়মকে অমান্য করে আমি অনেক গান রচনা করেছি, আর ভালো মানুষজন এমন এক লোকের ধৃষ্টতায় বিরক্ত, যে কিনা প্রশিক্ষণহীন হওয়াতেই উদ্ধত। তবে আমি চালিয়ে যাই এবং ঈশ্বর আমাকে মার্জনা করেন, কারণ, আমি জানি না আমি কি করছি। সম্ভবত শিল্পের ক্ষেত্রে সেটাই সর্বোত্তম কর্মপদ্ধতি। কারণ, আমি দেখি যে লোকে দোষারোপ করে, আবার আমার গান গায়ও, যদিও সর্বদা নির্ভুলভাবে নয়।
অনুগ্রহ করে ভাববেন না যে আমি অহঙ্কৃত। আমি নৈর্ব্যক্তিকভাবে নিজেকে বিচার করতে পারি এবং খোলামেলাভাবে নিজের সৃষ্টির প্রশংসা প্রকাশ। কারণ, আমি বিনয়ী। এ কথা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে আমার গান আমার দেশের হৃদয়ে স্থান পেয়েছে, তার অশেষ ফুলের সঙ্গে এবং ভাবী কালের মানুষকে তাদের আনন্দের দিনে, কিংবা দু:খের কিংবা উৎসবের, আমার গান গাইতে হবে। এও এক বিপ্লবীর সৃষ্টি।
ধর্ম বিষয়ে আমার নিজের মত সম্পর্কে বলতে আমি যদি নিমরাজি রোধ করে থাকি, তার কারণ আমি আমার জন্মের দুর্ঘটনার কারণে একটি বিশেষ ধর্মাদর্শ নিষ্ক্রিয়ভাবে গ্রহণের তোরণের মাধ্যমে নিজের ধর্মে এসে পৌঁছাইনি। এমন একটি পরিবারে আমার জন্ম যাঁরা আমাদের দেশে উপনিষদে ভারতীয় ঋষিদের উচ্চারণ-ভিত্তিক একটি ধর্মের পনরুজ্জীবনে পথিকৃৎ ছিলেন। তবে, আমার মেজাজ-বৈশিষ্ট্যের কারণে এটা সম্ভব ছিল যে শুধুমাত্র আমার পরিপার্শ্বের মানুষগুলো সত্য মনে করত বলেই আমি কোন ধর্মশিক্ষাকে গ্রহণ করে নেবো। আমি এটা কল্পনা করতে নিজেকে রাজি করাতে পারিনি যে আমার ধর্ম ছিল শুধুই এ-কারণে যে আমি যাঁদেরকে বিশ্বাস করছিলাম তাঁরা এর মূল্যে বিশ্বাস করত।
আমার ধর্ম আত্যন্তিকভাবে একজন কবির ধর্ম। এর স্পর্শ আমার কাছে তেমনই অদৃশ্য এবং পথচিহ্নহীন পথে পৌঁছয়, যেমনভাবে আসে সংগীতের প্রেরণা। আমার ধর্মীয়জীবন বিকাশের ঠিক সেই রহস্যময় ধারাকেই অনুসরণ করেছে, যা করেছে আমার কাব্যিক জীবন। কোনো-না-কোনোভাবে তারা প্রণয়ান্বিত এবং যদিও তাদের বাগদানের দীর্ঘ অনুষ্ঠান ছিল, আমার কাছ থেকে দীর্ঘকাল তাকে গোপন রাখা হয়েছিল। আশা করি আমি অহঙ্কার করছি না যখন আমি আমার কাব্যশক্তি দাবি করছি, অনুভবের গভীরতা থেকে উঠে-আসা নি:শ্বাসের প্রতি সূক্ষ্মভাবে সাড়া দিতে সক্ষম একটি প্রকাশযন্ত্র এটি। অতিশৈশব থেকেই আমার সেই তীক্ষè সংবেদনশীলতা ছিল যা আমার মনকে সারাক্ষণ আমার চারপাশের প্রাকৃতিক এবং মানবিক জগত-সম্পর্কিত চেতনায় অনুরণিত করে চলত।
বিস্ময়ের সেই বোধ আমি পেয়েছিলাম যা একটি শিশুকে তার অস্তিত্বের হৃদয়স্থ রহস্যের সিন্দুকঘরে প্রবেশ করার অধিকার দেয়। আমি লেখাপড়াকে অবহেলা করেছি, কারণ তা আমাকে আমার চারপাশের জগত থেকে বলপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যেতো, অথচ তারাই ছিল আমার বন্ধু আর সঙ্গী এবং তেরো বছর বয়সে আমি সেই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিই যা তার পাঠের পাথর-প্রাচীরে আমাকে বন্দী করে রাখতে চেয়েছিল।
কে বা কি আমার হৃদয়ের তন্ত্রীকে স্পর্শ করত, সে-সম্পর্কে আমার একটি অস্পষ্ট ধারণা ছিল সেই ছোট্ট শিশুর মতো যে তার মার নাম জানে না, কিংবা সেই মা কে বা কি। যে বোধটি আমার সর্বদা ছিল, তা হচ্ছে ব্যক্তিত্বের সেই সন্তোষ যা চারদিক থেকে যোগাযোগের জ্যান্ত সব ধারা বেয়ে আমার প্রকৃতিতে পৌঁছাত।
পরিপার্শ্বের জগতের সত্যাদি সম্পর্কে আমার চেতনা যে কখনোই ভোঁতা ছিল না, তা আমার জন্যে ছিল খুব বড়ো ব্যাপার। মেঘ যে ছিল মেঘ, আর ফুল, ফুল, তা-ই ছিল যথেষ্ট: কারণ, তারা আমার সাথে সরাসরি কথা বলত; কারণ, আমি তাদের প্রতি উদসীন হতে পারতাম না। আমি এখনো স্মরণ করতে পারি সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তটিকে যখন এক বিকেলবেলা স্কুল থেকে ফিরে গাড়ি থেকে নামলাম আর হঠাৎ আমাদের বাড়ির চাতালের পিছনের আকাশে তাকিয়ে দেখলাম বর্ষার ঘন কালো পুঞ্জ-পুঞ্জ মেঘ চারদিকে গভীর, শান্ত ছায়া ফেলেছে। এর বিস্ময়, এর উপস্থিতির ঔদার্য আমাকে যে আনন্দ দিল, ত-ই মুক্তি, যা আমরা প্রিয় বন্ধুর জন্যে আমাদের প্রেমে অনুভব করি।
অপর এক প্রবন্ধে আমি একটি ধন্ধকে ব্যবহার করেছি যেখানে আমি ভাবছি যে অপর কোনো গ্রহ থেকে এক আগন্তক আমাদের পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছে আর গ্রামোফোনে সে শুনছে এক মানবকণ্ঠ। তার কাছে যা অতি স্পষ্ট আর অত্যন্ত সক্রিয়, তা হচ্ছে ঘূর্ণায়মান ডিস্কটি; পেছনকার ব্যক্তিগত সত্যটি আবিষ্কার করতে অক্ষম সে, আর সে-কারণেই ডিস্কটির নৈর্ব্যক্তিক-বৈজ্ঞানিক সত্যটিকে সে চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে পারত- শুধু যে-সত্যকে স্পর্শ আর পরিমাপ করা যায়। সে বিস্মিত হতো একটি যন্ত্রের পক্ষে কিভাবে আত্মার সাথে কথা বলা যায়। সেই রহস্যটিকে অনুসরণ করে গীতিকারের সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে সে যদি সেই সংগীতের হৃদয়ে অকস্মাৎ পৌঁছয়, তাহলে ব্যক্তিগত সংযোগ হিসেবে সেই সঙ্গীতের অর্থ সে তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারবে।
সত্যের নিরেট জানান, ক্ষমতার নিরেট আবিষ্কার, বস্তুর বাইরের জগতের, তাদের অন্তর নয়। আনন্দ তার একটি মাপকাঠি, যখন সত্য যে সংগীত দান করে তা দিয়ে তাকে স্পর্শ করি, আমাদের ভেতরকার সত্যের নিকট তা যে বার্তা পাঠায়, তার আনন্দ। সকল ধর্মের তা-ই সত্য ভিত্তি, এটা গোঁড়া মতবাদে নেই। আগেই আমি যেমনটা বলেছি, আলো আমরা ইথার-তরঙ্গ হিসেবে পাই না; প্রভাতকে আমাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যে আমরা কোনো বৈজ্ঞানিকের জন্যে অপেক্ষা করে থাকি না। একইভাবে, আমাদের অব্যবহিত অভ্যন্তরের অনন্ত বাস্তবকে আমরা তখনই স্পর্শ করি যখন প্রেম বা শুভের শুদ্ধ সত্যকে অনুভব করি, ধর্মবেত্তাদের ব্যাখ্যার মাধ্যমে কিংবা নৈতিক মতবাদগুলোর জ্ঞানগর্ভ আলোচনার মধ্য তা ঘটে না।
আমি ইতোমধ্যেই স্বীকার করেছি যে আমার ধর্ম কবির ধর্ম; এ-সম্পর্কে আমি যা অনুভব করি তা অন্তর্দৃষ্টি থেকে, জ্ঞান থেকে নয়। আমি অকপটে বলি যে অশুভের সমস্যা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না, কিংবা মৃত্যুর পরে কি ঘটে সে- সম্পর্কে এবং আমি তথাপি নিশ্চিত যে এমন মুহূর্ত আমার এসেছে যখন আমার আত্মা অনন্তকে স্পর্শ করেছে এবং আনন্দের আলো থেকে এ-সম্পর্কে তীব্রভাবে সচেতন হয়েছে। আমাদের উপনিষদে বলা হয়েছে যে আমাদের মন আর ভাষা শীর্ষ সত্য থেকে হতবুদ্ধি হয়ে ফিরে আসে, তবে যে তাকে জানে, আপন আত্মার অব্যবহিত আনন্দের মাধ্যমে সকল সন্দেহ আর ভয় থেকে তার রক্ষা মেলে।
রাতে আমরা জিনিসপত্রে হোঁচট খাই, আর তীব্রভাবে তাদের প্রাতিস্বিক ভিন্নতাকে বুঝে নিই। তবে তাদেরকে জড়িয়ে রয়েছে যে বড়ো ঐক্য, দিবস তাকে উদঘাটন করে দেয় এবং যে মানুষটি তাঁর চেতনার আলোয় স্নাত, বর্ণগত সব পার্থক্যের উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত যে আত্মিক ঐক্য, মুহূর্তে সে তাকে উপলব্ধি করে। আর তার মন আর আচম্বিতে পার্থক্যের স্বতন্ত্র সত্যসমূহের ওপরে হোঁচট খায় না, তাদেরকেই চূড়ান্ত মনে করে। সে উপলব্ধি করে যে সত্যের মধ্যস্থ আন্তর সৌসাম্যের মধ্যেই রয়েছে শান্তি, বাইরের কোনো খাপ-খাওয়ানোতে নয়; আর সৌন্দর্যই বহন করে সেই চিরন্তন আশ্বাস যে বাস্তবের সাথে আমাদের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।
(চলবে)
ভাষান্তর : কাজল বন্দোপাধ্যায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here