একজন শিল্পীর ধর্ম

0
161

একজন শিল্পীর ধর্ম – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি জন্ম নিই ১৮৬১ সালে। এটি ইতিহাসের কোনো গুরুত্বপূর্ণ তারিখ নয়, তবে এটি বাংলার একটি মহান যুগের অন্তর্ভুক্ত, যখন তিনটি আন্দোলনের স্রোত আমাদের দেশের জীবনে মিলিত হয়েছিল। এর একটি ধর্মীয় যা প্রবর্তিত হয়েছিল প্রকান্ড বুদ্ধির অধিকারী ও মহৎ-হৃদয় এক ব্যক্তি কর্তৃক। তিনি রাজা রামমোহন রায়। এ- আন্দোলন ছিল বিপ্লবী, কারণ, তিনি আধ্যাত্মিক জীবনের সেই স্রোত খুলে দিতে চেয়েছিলেন, যা বহু বছর যাবৎ ধর্মতত্ত্বের বালু আর ভগ্নাবশেষে রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এগুলো ছিল আচারবাদী, বস্তুতান্ত্রিক, বাহ্যিক অনুশীলনে নিবন্ধ; এ সবের কোনো আধ্যাত্মিক অর্থ ছিল না।


আমি যখন জন্ম নিই তখন এরূপ ঘটছিল। আমি গর্বের সঙ্গে বলছি যে আমার বাবা ঐ আন্দোলনের মহান নেতাদের একজন ছিলেন, এমন একটি আন্দোলন যার জন্যে তিনি সমাজচ্যুত হন আর সামাজিক সব অবমাননা সহ্য করেন। নতুন আদর্শ আগমনের এই পরিবেশে আমার জন্ম হয়, একই সময়ে যা আবার ছিল পুরনো, ঐ যুগটি যা-কিছু নিয়ে গর্বিত ছিল, তার সবকিছুর চেয়ে পুরোনো। একই রকম গুরুত্বপূর্ণ ছিল দ্বিতীয় আন্দোলনটি। বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জী যদিও আমার চেয়ে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ, তিনি আমার সমসাময়িক ছিলেন আর আমার তাঁকে দেখার মতো দীর্ঘকাল তিনি বেঁচেছিলেন। সে-সময়ে বাংলায় যে সাহিত্যিক বিপ্লব ঘটে, তিনি তার পথিকৃৎ ছিলেন। তাঁর আগমনের পূর্বে আমাদের সাহিত্য এমন এক কঠোর অলঙ্কারশাস্ত্র দ্বারা নিপীড়িত ছিল, যা এর প্রাণ রুদ্ধ করে তোলে আর তা তাকে এমন অলংকারে পূর্ণ করে যা পরিণত হয় শৃঙ্খলে। সমাধি-পাথরের নিরাপত্তায় আর নিষ্প্রাণের চূড়ান্ততায় বিশ্বাস করে যে গোঁড়ামি, তার বিরুদ্ধে যাওয়ার পর্যাপ্ত সাহস বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল। আমাদের ভাষার ওপর থেকেÑ আঙ্গিকের মারণ ওজন তিনি তুলে নিয়েছিলেন, আর তার যাদুর দন্ডের এক ছোঁয়ায় আমাদের সাহিত্যকে তার যুগ-যুগের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তার শক্তি আর সুষমার পূর্ণতায় যখন সে জাগল তখন সে আমাদের সামনে উপস্থিত করল এক বড়ো প্রতিশ্রুতি আর দৃষ্টিপথ
১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ধর্ম বিষয়ে চীনে একটি বক্তৃতা দেন। পরে এটি ঞধষশং রহ ঈযরহধ বইয়ে গৃহীত হয়। অনেকটা একই বিষয়ে তিনি আরেকটি বক্তৃতা দেন ১৯২৬ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ‘গবধহরহম ড়ভ অৎঃ’ নামে তা ঠরংাধ-ইযধৎধঃর ছঁধৎঃবৎষু-তে এপ্রিল, ১৯২৬-এ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধ দুটো পরিবর্তিত আকারে প্রকাশিত হয় ‘ঞযব জবষরমরড়হ ড়ভ ধহ অৎঃরংঃ’ নামে, রাধাকৃষ্ণান সম্পাদিত ‘ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু ওহফরধহ চযরষড়ংড়ঢ়যু বইয়ে। রবি-জীবন সম্পর্কে তাঁর নিজের অসাধারণ সব বক্তব্য ও বিশ্লেষণ থাকায় এটি অনূদিত এবং সংকলিত হলো।
এসময়ে আরো এক আন্দোলনের সূচনা হয়, যাকে জাতীয় বলা হয়েছিল। এটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ছিল না, তবে নিজেদের ব্যক্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছিল যে- মানুষ, এটি তাদের মনকে ভাষা দিতে শুরু করেছিল। প্রাচ্যের নয় এমন যে ব্যক্তিবর্গ আমাদের ওপর অনবরত অপমানের বোঝা চাপাচ্ছিল, যারা বিশেষত সেই সময়ে মনুষ্য পৃথিবীকে তাদের নিজ-নিজ গোলার্ধ-মাফিক ভালো-মন্দে ধারালোভাবে ভাগ করায় অভ্যস্ত ছিল, তাদের প্রতি অসহিষ্ণুতার কণ্ঠস্বর ছিল এটি।
ভিন্নতার এই ঘৃণ্য চেতনা আমাদেরকে অনবরত আঘাত করে যাচ্ছিল, আর আমাদের সংস্কৃতির জগতের বড়ো ক্ষতি। অতীত থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে আসা সবকিছুর প্রতি আমাদের তরুণদের মধ্যে একটি অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। সেই ফিলিস্তিন যুগের ইউরোপীয় প্রধান শিক্ষকদের অনুকরণে আমাদের ছাত্ররাও প্রাচীন ভারতীয় ছবি আর অন্যান্য শিল্পকর্ম নিয়ে হাসাহাসি করত।
যদিও পরবর্তীতে আমাদের শিক্ষকেরা তাঁদের মন বদলেছিল, তাঁদের ছাত্ররা তখনও আমাদের শিল্পের মূল্যে আস্থা ফিরে পায় নি। তৃতীয় শ্রেণির ফরাসি ছবি, বেজায় সস্তা… আর গৎবাঁধা মানের যান্ত্রিক শুদ্ধতার ফসল কিছু ছবির দিকে রুচি তৈরির প্রতি উৎসাহের এক দীর্ঘ সময়-কাল তাদের ছিল, আর তারা তখনও প্রাচ্যের সৃষ্টিকর্মকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান-করতে-পারাকে শ্রেয়তর সংস্কৃতির লক্ষণ বিবেচনা করত।

ঐ যুগের আধুনিক তরুণেরা তাদের মাথা দোলাতো আর বলত যে সত্য মৌলিকত্ব নেই বাস্তবের হৃদয়স্থ আত্যন্তিকের ছন্দে, রয়েছে তা আমদানিকৃত ছবির পূর্ণ অধর, রঙিন গাল আর খোলা বক্ষে। আমাদের সংস্কৃতির অন্যান্য বিভাগেও কর্ষণ করার হয়েছিল প্রত্যাখ্যানের একই চৈতন্য। উচ্চকণ্ঠ আর প্রবলবাহু ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক তরুণ প্রজন্মের সভ্যদের মনে অনুশীলিত আবেশের ফল ছিল তা। জাতীয় আন্দোলন শুরু করা হয়েছিল এই ঘোষণা জানাতে যে অতীতকে প্রত্যাখ্যান-করাতে আমাদের নির্বিচার হওয়া চলবে না। এ কোনো প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন ছিল না, বরং বিপ্লবী; কারণ, তার সূচনা হয়েছিল নিছক কর্জের মধ্যে গৌরব-খোঁজাকে অস্বীকার করার আর তাকে বাঁধা-দানের বড়ো সাহস নিয়ে।
এই তিনটে আন্দোলন জোর চলছিল আর এই তিনটেতেই আমাদের পরিবারের সদস্যরা সক্রিয় অংশ নিয়েছিল। ধর্ম সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মতামতের কারণে আমাদেরকে সমাজচ্যুত করা হয়েছিল এবং সমাজতাড়িতের স্বাধীনতা আমরা ভোগ করেছি। নিজেদের চিন্তা আর মানসিক শক্তির সাহায্যে আমাদেরকে আমাদের জগৎ গড়ে নিতে হয়েছিল।
তিন-তিনটে সমান বিপ্লবী আন্দোলনের সময়-মোহনায় আমি জন্ম নিই আর বড়ো হই। আমাদের পরিবারকে তার নিজের জীবন-যাপন করতে হয়, যা আমাকে ছোটোবেলা থেকেই আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে পথনির্দেশ সংগ্রহ করতে বলে বিচারের নিজস্ব ও ভেতরকার মাপকাঠি থেকে। প্রকাশের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে ছিল আমার মাতৃভাষা। কিন্তু যে-ভাষা মানুষের, তাকে পালটে নিতে হয়েছিল ব্যক্তি হিসেবে আমার আকাক্সক্ষা-অনুযায়ী।
গোঁড়া সম্ভ্রান্ততার কোনো দোকান থেকে কোনো কবিরই তাঁর প্রকাশমাধ্যমটি ধার করা উচিৎ নয়। তাঁর শুধু নিজস্ব বীজ থাকলে হবে না, নিজের জমিও তাঁকে তৈরি করতে হবে। প্রত্যেক কবির নিজস্ব-বিশিষ্ট ভাষামাধ্যম থাকে- একারণে নয় যে, সম্পূর্ণ ভাষাটি তাঁর নিজের তৈরি, বরং তা এ কারণে যে তাঁর ব্যক্তিক ব্যবহার, জীবনের নিজস্ব ছোঁয়া নিয়ে, একে তাঁর নিজ সৃষ্টির বিশিষ্ট বাহনে পরিণত করে।


মানব-জনগোষ্ঠীসমূহের হৃদয়ে কবিতা থাকে, আর তাদের এই হৃদয়াবেগগুলোকে যথাসম্ভব সুষম ভাষা-দান করাটা তাদের প্রয়োজন। এজন্য তাঁদের একটি মাধ্যম থাকতেই হবে, সচল এবং সুনম্য, যা বারবার তাঁদের সম্পূর্ণ নিজেদের হয়ে উঠতে পারে, যুগ-যুগ ধরে। সব বড়ো ভাষাই বদ্লেছে, এখনও বদলাচ্ছে। পরিবর্তনের চেতনাকে যে সব ভাষা বাধা দিয়েছে সেগুলোর ধ্বংস নিশ্চিত ছিল এবং তারা কখনো চিন্তা এবং সাহিত্যের বড়ো ফসল ফলাবে না। যখন আঙ্গিক স্থির হয়ে পড়ে, তখন চেতনা হয় তার কারাগারকে মেনে নেয়, নয় তো বিদ্রোহ করে। সব বিপ্লবই বাইরের আক্রমনের বিরুদ্ধে ভেতরের লড়াইয়ের ঘটনা।
পৃথিবীর বুকে প্রাণের ইতিহাসে একটি বড়ো অধ্যায় ছিল যখন মানুষের কিছু অদম্য অন্তরশক্তি বেরিয়ে এসে বস্তুর পরিকল্পনায় স্থান করে নেয়, ছুঁড়ে দেয় তাঁর বিজয়ী-বিদ্রোহী শক্তিকে, এই ঘোষণা জানাতে যে তা বাইরের, দেহের পাশব পশু দ্বারা অভিভূত হওয়ার নয়। সে-মুহূর্তে তাকে কী রকম অসহায় মনে হয়েছিল, কিন্তু সে কি প্রায়ই জিতে যায় নি? আমাদের সামাজিক জীবনেও বিপ্লব উপস্থিত হয় যখন বাইরের ব্যবস্থায় কিছু শক্তি নিজেকে কেন্দ্রীভূত করে আর হুমকি দেয় আমাদের অন্তরের শক্তিকে তার নিজের প্রয়োজনে ক্রীতদাসে পরিণত করার।
যখন একটি যন্ত্রের মতো সংগঠন একটি কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়Ñ রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষামূলক কিংবা ধর্মীয়Ñ তা তখন মানুষের অন্তর জীবনের স্বাধীন প্রবাহকে বাঁধাগ্রস্ত করে, ওঁৎ পেতে থাকে, নিজের শক্তিকে বাড়ানোর জন্যে তাকে শোষণ করে চলে। আজ বাইরে শক্তির এরূপ কেন্দ্রীভবন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর মানুষের নির্যাতিত আত্মার ক্রন্দন বাতাসে ফিরছে, যা মুক্তি চাচ্ছে নাট-বল্টুর বন্ধন থেকে, অর্থহীন সব ঘোর থাকে।
বিপ্লবকে আসতেই হবে এবং মানুষকে অভিশাপ আর ভুল-বোঝাবুঝির ঝুঁকি নিতে হবে, বিশেষত তাদের দিক থেকে যারা আয়েশে থাকতে চায়, যারা বস্তুতন্ত্রে বিশ্বাস রেখেছে, সত্যসত্যই যারা মৃত অতীতের বাসিন্দাÑ আধুনিক কালের নয়Ñ সেই অতীতে যার ঠিকানা দূর প্রাচীনত্বে, যখন দৈহিক মাংস আর আয়তন প্রাধান্য করেছে, মানুষের মন নয়।
শুধু শারীরিক প্রাধান্য যান্ত্রিক, আর আধুনিক যন্ত্রসমূহ শুধুই আমাদের শরীরের অতিরঞ্জন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের লম্বন বর্ধন। আধুনিক মন, তার অন্তনির্হিত ছেলেমি নিয়ে, এই বিপুল দৈহিক দলায় আনন্দ লাভ করে, এক অপরিমিত বস্তুগত ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে, তা এ-কথা বলে: ‘আমাকে বড়ো খেলনাটি পেতে দাও, আর এনো না এমন কোনো ভাবাবেগ যা একে আনমনা করে।’ তা এটা বোঝে না যে এইভাবে আমরা ফিরে যাচ্ছি সেই মহাপাবনপূর্ব যুগে যা গৌরব করত প্রকান্ড দৈহিক কাঠাম- উৎপাদনে, আন্তর চেতনার মুক্তির জন্যে কোনো স্থান না-রেখেই।


পৃথিবীর সকল মহৎ মনুষ্য আন্দোলন কিছু মহৎ আদর্শের সঙ্গে যুক্ত। আপনাদের মধ্যে কেউ-কেউ বলতে পারেন যে, চৈতন্যের তেমন কোনো তত্ত্ব শতাব্দী-অধিক কাল যাবৎ তার মৃত্যু-শয্যায় এবং এখন তা মৃত প্রায়; যে, বাহ্যিক শক্তি আর বস্তুগত ভিত্তির ওপর ছাড়া আমাদের কোনো নির্ভর করার নেই। কিন্তু, আমার পক্ষ থেকে আমি বলছি যে আপনাদের তত্ত্ব বহু পূর্বেই সেকেলে ছিল। জীবনের বসন্তকালেই এর বেলুন ফুটো হয়ে যায়, যখন পৃথিবীর বুক থেকে নিরেট আকার বিদায় নেয়, তার স্থান নেয় মানুষ, সৃষ্টির মাঝখানে যাকে নগ্ন নিয়ে আসা হয়, তার অসহায় দেহে, তবে তাঁর অদম্য মন আর চৈতন্যে।
কবি হিসেবে আমি যখন জীবন শুরু করেছিলাম আমাদের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত লেখকগণ তখন তাদের নির্দেশনা নিতেন ইংরেজী পাঠ্যবই থেকে, যা তাদের ওপর পাঠ ঢেলে দিত, কিন্তু তাতে তাদের মন ভরতো না। আমি ধারণা করি যে আমার সৌভাগ্য যে জীবনে কখনো আমার এমন শিক্ষাগত প্রশিক্ষণ ছিল না, যা কোনো শ্রদ্ধেয় পরিবারের বালকের জন্যে সঙ্গত মনে করা হয়। যদিও আমি এটা বলতে পারব না যে তখনকার তরুণ মনকে যে প্রভাব শাসন করত, আমি তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলাম, তথাপি আমার লেখার ধারা অনুকরণমূলক আঙ্গিকগুলো থেকে সুরক্ষিত ছিল। আমার কাব্যরচনায়, শব্দভান্ডারে আর ধারণাসমূহে আমি অশিক্ষিত এক কল্পনার খোশখেয়ালের কাছে সমর্পিত ছিলাম, যা আমার জন্যে নিয়ে এসেছিল পন্ডিত সমালোচকদের ধিক্কার আর চতুরদের সশব্দ হাসি। আমার অজ্ঞতা আর বিরুদ্ধ বিশ্বাস যুক্তভাবে আমাকে পরিণত করেছিল এক সাহিত্যিক বদমাশে।
জীবনক্রম যখন শুরু করি, তখন আমি হাস্যকররকম তরুণ; যারা নিজেদেরকে সবাক করে তুলেছিল, তাদের দলে তখন আমি তরুণতম। আমার ছিল না পরিণত বয়সের রক্ষক বর্ম কিংবা সম্মান দাবি করার মতো যথেষ্ট ইংরেজি। অতএব, আমার জন্যে বরাদ্দ ঘৃণার গন্ডি আর শর্তযুক্ত উৎসাহেই ছিল আমার স্বাধীনতা। ধীরে-ধীরে আমি বছরে বেড়ে উঠলাম, যার জন্যে অবশ্য কোনো কৃতিত্ব দাবী করার নেই। ধীরস্থির ভাবে, উপহাস আর সাময়িক পোষকতার ভেতর দিয়ে, পথ কেটে একটি স্বীকৃতির স্থানে আমি পৌঁছালাম, যেখানে প্রশংসা আর দোষারোপের অনুপাত ঠিকঠিক পৃথিবীর বুকে স্থল আর জলভাগের অনুরূপ।
তরুণ বয়সে যা আমাকে সাহস যুগিয়েছিল, তা বাংলার বৈষ্ণব কবিতার সাথে আমার দ্রুত পরিচয়, পূর্ণ ছিল যা এর স্বাধীনতা আর প্রকাশের সাহসে আমার মনে হয় আমার বয়স যখন বারো, তখন এই কবিতাগুলো প্রথম পুনর্মুদ্রিত হতে শুরু করে। আমার বড়দের ডেস্ক থেকে গোপনে আমি এগুলোর নমুনা পেতে শুরু করি। তরুণদের শিক্ষার জন্যে আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে আমার বয়সের একটি বালকের জন্যে এটা সঙ্গত ছিল না। আমার তখন উচিৎ ছিল পরীক্ষাগুলোয় উত্তীর্ণ হওয়া, আর নম্বর হারানোর রাস্তায় না-হাঁটা। আরো স্বীকার আমার করা উচিৎ যে এই গীতিকবিতাগুলোর অধিকাংশ ছিল কামদ এবং সদ্য কৈশোর-উত্তীর্ণ কোনো বালকের পক্ষে অনুপযোগী। কিন্তু তাদের আঙ্গিকের সৌন্দর্য এবং শব্দের সঙ্গীতে কল্পনা তখন আমার সবটা পূর্ণ, আর ইন্দ্রিয়পরায়ণতায় ভারী তাদের প্রাণ আমার মন জুড়িয়ে চলে যেত, তাকে আনুগামী না করে।
আমার সাহিত্যিক জীবনক্রমে আমার ভবঘুরেত্বের আর একটি কারণ ছিল। আমার বাবা একটি নতুন ধর্ম-আন্দোলনের নেতা ছিলেন, উপনিষদের শিক্ষাভিত্তিক একটি কঠোর একেশ্বরবাদ। বাংলায় আমার দেশবাসীগণ তাকে কোনো খ্রিষ্টানের সমানই খারাপ ভাবতো, যদি আরো বেশি নাও হয়। সুতরাং আমরা সম্পূর্ণ সমাজচ্যুত ছিলাম, যা সম্ভবত আমাকে আরেকটি বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে, আমাদের নিজ অতীতের অনুকরণের।
(চলবে)
ভাষান্তর : কাজল বন্দোপাধ্যায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here