একমুখী শিক্ষার জন্য আইনের বিকল্প নেই

0
19


ছিদ্দিকুর রহমান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ও পরিচালক ছিদ্দিকুর রহমান। ২০০৯ সালে গঠিত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির অন্যতম এই সদস্য অনেক দিন থেকে দেশে একমুখী শিক্ষা চালু করা নিয়ে কথা বলছেন। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে একমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্বও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে একমুখী শিক্ষার গুরুত্ব, এক দশকেও ২০১০ সালের শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত না হওয়াসহ নানা প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন লতিফুল হক।


আমাদের দেশে সাধারণ, মাদরাসা, ইংরেজিসহ নানা মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এটা কতটা বাস্তবসম্মত?
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ স্পষ্ট বলা আছে, মৌলিক শিক্ষা হবে একমুখী, সবার জন্য বাধ্যতামূলক। মৌলিক শিক্ষার পর কিছুটা বিভাজন হতে পারে। কিন্তু এখন আছে সরকার পরিচালিত সাধারণ প্রাথমিক শিক্ষা, পাশাপাশি মাদরাসা শিক্ষা-যার মধ্যে একটা হলো কওমি, আরেকটা আলিয়া। আছে ইংরেজি মাধ্যম। কোনো কোনো ইংরেজি মাধ্যম আবার বিদেশি শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে, আবার বাংলাদেশের ইংলিশ ভার্সন চালু আছে। এভাবে বহুমুখী শিক্ষা চলছে। কিন্তু আমাদের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ বলা আছে, ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত একই শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে, একই পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক ধরনের শিক্ষা চালু থাকবে। এই শিক্ষানীতি ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীতও হয়। সরকারও গুরুত্ব্ দিয়েছিল। ২০১২ সালে সেভাবেই কারিকুলাম করা হয়। তখন ইংলিশ ভার্সনের ব্যাপারে বলা হয়েছিল, ইংরেজিতে পড়াতে পারবে; কিন্তু পাঠ্যক্রম একই থাকবে। মাদরাসাসহ যত রকমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে সব জায়গায় তাই হবে। কিন্তু সবাই এটা মানেনি।
জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের পর ১১ বছরেও তা বাস্তবায়ন করা গেল না কেন?
কারণ আইন নেই। মাধ্যম-নির্বিশেষে একই পাঠ্যক্রম পড়ানো হবে-আমি যদি সরকারের এই নির্দেশ না মানি তাহলে কী হবে সে বিষয়ে কোনো আইন নেই। ১১ বছর আগে শিক্ষা আইন প্রণয়নের জন্য কমিটি করা হয়। একটি না দুটি মিটিং হয়েছে, এরপর আর অগ্রগতি নেই। আইন করতে তো টাকা-পয়সার প্রয়োজন নেই, মেধার প্রয়োজন। আইন হবে, সেটা ক্যাবিনেটে পাস হয়ে সংসদে যাবে। কিন্তু এক যুগেও এটা কেন হলো না, বুঝলাম না। সব স্কুলে একই শিক্ষা চালু করতে গেলে আইনের বিকল্প নেই।
শিক্ষানীতি সংসদে গৃহীত হওয়ার পর কেউ কেউ বলছিলেন, এটা বাস্তবায়ন বেশ খরচসাপেক্ষ।
মাদরাসা তাদের পাঠ্যক্রমের বদলে এনসিটিবির বই ব্যবহার করবে-এখানে তো তেমন কোনো খরচের ব্যাপার নেই। এখন বরং খরচ বেশি-মাদরাসা, সাধারণ শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম, ভার্সন-সবার জন্য আলাদা বই। খরচের কথাটা উঠেছে অন্য ব্যাপারে। শিক্ষানীতিতে বর্ধিত প্রাথমিক শিক্ষার জন্য (৮ম শ্রেণি পর্যন্ত) অতিরিক্ত খরচের কথা বলা হয়েছে, যেটা যৌক্তিক। কিন্তু এটা বাস্তবায়নের বিকল্প উপায়ও আছে। এতে খরচ দশ ভাগের এক ভাগ হবে। এখন প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম মাধ্যমিকের অধীনে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত যে শিক্ষকরা আছেন তাঁদের মধ্যে যাঁরা এমপিওভুক্ত তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বর্ধিত প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করলে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির জন্য নতুন কোনো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হচ্ছে না। আর যেসব প্রাথমিক স্কুলে জায়গা আছে, সেখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য নতুন শ্রেণিকক্ষ করতে হবে। যেখানে জায়গা নেই সেখানে নিকটবর্তী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রচলিত ক্লাসরুমেই পাঠদান চলবে। এতে বিদ্যমান সম্পদ কাজে লাগিয়েই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা করতে পারি। একমুখী শিক্ষা চালু করতে পরিবর্তন হবে কারিকুলাম, টেক্সট বই। এমনভাবে পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে, যাতে কেউ যদি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর আর নাও পড়ে, তাহলেও সে টেকসই সাক্ষরতা, দক্ষতা, নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টা শিখে যাবে।
বিত্তশালীরা ইংরেজি মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত, মাদরাসা শিক্ষা আবার সংবেদনশীল বিষয়। ফলে একমুখী শিক্ষা বাস্তবায়নে অন্য দিক থেকেও বাধা আছে কি না?


মাদরাসা বা ইংরেজি মাধ্যম কোনো বাধা হতো না। কারণ নতুন শিক্ষাক্রমে মাদরাসার পড়ালেখার ধরনের তেমন বড় পরিবর্তন হতো না। মাদরাসায় কিন্তু এখনো ইংরেজি, বাংলা, সমাজ, গণিত ইত্যাদি পড়ানো হয়। অনেক আলিয়া মাদরাসা এরই মধ্যে একমুখী শিক্ষা শুরু করে দিয়েছে, কওমি মাদরাসায় কিছুটা সমস্যা আছে। আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অভাব নেই। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে কিছুটা ইচ্ছার ঘাটতি লক্ষ করেছি। প্রাথমিক শিক্ষা ও মাধ্যমিক শিক্ষা দুই মন্ত্রণালয়ে ভাগ করাটাও সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।


অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একমুখী শিক্ষা হলে শিক্ষার মান কতটা বাড়বে?
সব আমূল বদলে যাবে তা নয়। জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিক বিকাশের জন্য শিক্ষক নিয়োগে আরো বৈজ্ঞানিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে যেসব শিক্ষক আছেন, তাঁদের একটা অংশ খুবই যোগ্যতাসম্পন্ন। শিক্ষকতা পেশার প্রতি তাঁদের মূল্যবোধ, দৃষ্টিভঙ্গিও ভালো। কিন্তু বড় অংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নয়। জ্ঞান, দক্ষতা, কমিটমেন্টের অভাব আছে। প্রশিক্ষণ নেওয়ার সক্ষমতাও অনেকের নেই। আবার সক্ষমতা থাকলেও সেটা কাজে লাগানোর মন-মানসিকতা নেই অনেকের। দুই দলেরই এ পেশায় থাকা উচিত নয়। আমরা জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলেছি, ‘সবার ওপরে শিক্ষক।’ স্কুল ভবন, আসবাব, বইপত্র দুর্বল হলেও শিক্ষক ভালো হলে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। দুর্বল শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উন্নয়ন ঘটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। এখন এনটিআরসি [বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ] যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে, সেটা ভালো পদ্ধতি নয়। শুধু পরীক্ষা নিয়েই ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্ঞান-দক্ষতার পাশাপাশি কমিটমেন্ট কতটা সেটাও দেখতে হবে। শিক্ষানীতিতে বলেছিলাম, পেশাদার ও দক্ষ শিক্ষাবিদ দিয়ে এডুকেশন সার্ভিস কমিশন করা হোক। সরকারি-বেসরকারি সব স্কুল-কলেজের শিক্ষক তারাই নিয়োগ দেবে। আজ পর্যন্ত করা হয়নি। শিক্ষক নিয়োগের পর মনিটরিং খুব জরুরি। শিক্ষককে সহায়তার জন্য, নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়।
আট বছরের একমুখী প্রাথমিক শিক্ষার পরের ধাপটা কী হবে?


অষ্টমের পর যারা আগ্রহী, মেধাসম্পন্ন তারা উচ্চশিক্ষায় যাবে, বড় অংশ যাবে বৃত্তিমূলক শিক্ষায়। দশম শ্রেণির পর আবার ভাগ হবে। একটা অংশ যাবে কারিগরি শিক্ষায়, অন্যরা উচ্চশিক্ষায়। আমাদের শিক্ষিত কৃষক দরকার, শিক্ষিত বাসচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী দরকার। প্রাথমিক শিক্ষা শেষেই যদি একজনকে বাস চালনার ওপর এক বছরের বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিই, মুরগি পালনের ওপর প্রশিক্ষণ দিই তাহলে তার জীবিকাও হলো, দেশেরও উন্নতি হলো। বিদেশেও তাদের কর্মসংস্থান হবে। মেধাসম্পন্নরা উচ্চশিক্ষা শেষে সহজেই চাকরি পাবে। কারণ প্রতিযোগিতা কমে যাবে। সবাইকে উচ্চশিক্ষা দিলে নিচের দিকে শূন্যতা তৈরি হবে, ওপরে আবার উপচে পড়বে। উচ্চশিক্ষায় কোনোভাবে ৪০ শতাংশের বেশি নেওয়া যাবে না।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নতুন কারিকুলাম প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন কারিকুলাম সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
এর সবল দিক আছে, দুর্বল দিকও আছে। খুবই উচ্চমানের, সংবেদনশীল কারিকুলাম করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব সেটা একটা প্রশ্ন। ২০১৩ সালের নতুন কারিকুলামই এখনো পুরো বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ১০ কি ১২ বছর পর পর কারিকুলাম পরিবর্তন করতেই হবে; কিন্তু আমাদের শিক্ষকদের দিয়ে যতটা করাতে পারব ততটাই রাখা উচিত। নয়তো কারিকুলাম শুধু কারিকুলামেই থেকে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here