এক নারী সুফির কাহিনী

2
345

নারী ও শিশু ডেস্ক: রাবেয়া আল বসরির জন্ম ইরাকের বসরায়, কায়েস বিন আদি গোত্রের এক শাখা গোত্র আল আতিকে। তাঁর জন্মসন সুনির্দিষ্ট নয়। ধারণা করা হয় ৭১৩ থেকে ৭১৭ সনের মধ্যে কোনো এক সময় তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাঁর পিতামাতার ৪র্থ সন্তান। একারণে তাঁর নাম রাখা হয় রাবেয়া অর্থাৎ ৪র্থ। তাঁর পিতা ইসমাঈল ছিলেন হত দরিদ্র। যে রাত্রিতে তাঁর জন্ম হয়, সেই রাতে তাঁদের গৃহে কুপি জ্বালানোর মতো সামান্য তেলও ছিল না। তাঁর মাতা প্রতিবেশী কারও কাছ থেকে কিছুটা তেল ধার করে আনতে তাঁর পিতাকে অনুরোধ করেন। তাঁর পিতা নিজের অভাব-অভিযোগের কথা খোদার কাছে ব্যক্ত করতেন বটে, কিন্তু প্রতিবেশী কারও কাছ থেকে কিছু চাইতে ভীষণ লজ্জা বোধ করতেন। তাই তিনি স্ত্রীকে খুশি করতে এসময় গৃহ থেকে বেরিয়ে গেলেও কিছু সময় বাইরে ঘোরাফেরা করে খালি হাতে ফিরে আসেন। তাকে শূন্য হাতে ফিরে আসতে দেখে বুদ্ধিমতি স্ত্রী সবই বুঝতে পারেন, তাই তাকে অধিকতর লজ্জায় না ফেলতে কোনো প্রশ্ন করেননি।
এদিকে নিজের অক্ষমতা ও অপরগতার কথা খোদার কাছে ব্যক্ত করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েন ইসমাঈল। রাতে স্বপ্নে দেখেন এক ব্যক্তি তাকে বলছেন, তুমি পত্র মারফৎ বসরার আমিরকে জানাও যে সে নবিজির নামে প্রতিদিন রাতে একশত ও প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে চারশত বার দুরুদ পাঠ করত, কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে সে যেন তোমাকে চার’শত দিনার সদকা হিসেবে দিয়ে দেয়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে ইসমাঈল এই অদ্ভূত স্বপ্নের কথা স্ত্রীকে বললেন। সবশুনে স্ত্রী বলল, নিশ্চয়ই আমাদের এই সন্তান পূণ্যবতী। সুতরাং তুমি অবশ্যই পত্র নিয়ে আমিরের কাছে যাবে। ইসমাঈল যেতে অনিচ্ছুক ছিলেন, কিন্তু স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে তিনি আমিরের বাড়িতে গেলেন। ঐ সময় বসরার আমির ছিলেন ঈসা জাদান।
ইসমাঈল তার পত্রটি একজন কর্মচারীর হাতে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। এদিকে আমির ঐ অদ্ভূত পত্র মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। কেউ তার একান্ত ব্যক্তিগত কোনো কর্ম ব্যর্থতার কথা পত্র মারফত স্মরণ করিয়ে দিতে পারে-এ ছিল তার নিকট চরম বিষ্ময়ের। তিনি তৎক্ষণাৎ ইসমাঈলকে ডেকে নিয়ে তার হাতে ৪০০ দিনার অর্পণ করলেন এবং বললেন যে, আগামীতে যদি তিনি কখনও কোনো কিছুর প্রয়োজন বোধ করেন, তবে যেন অনুগ্রহ করে আমিরকে তা একবার অবহিত করেন।

প্রাপ্ত দিনারে রাবেয়াদের পরিবারের অভাব অভিযোগ সাময়িক দূর হলো। কিন্তু কিছুদিন পর তার মাতা মারা গেলেন। তারপর তিনি কৈশোর পেরুনোর আগেই তাঁর পিতাও মারা গেলেন। এরপর এলো দূর্ভিক্ষ। এলাকায় হানা দিল একদল দূর্বৃত্ত। তারা গ্রাম থেকে নারী ও শিশুদের ধরে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে দিলো। রাবেয়াকে কিনে নিল এক ধনী ব্যক্তি এবং তাঁকে গৃহস্থলীর কাজে লাগিয়ে দিলো। গৃহকর্তার বাড়ীতে অনেক রাত পর্যন্ত খানা-পিনার আসর বসত। অত:পর গভীর রাতে আসর শেষে সকলে বিদায় নিলে রাবেয়ার ফুসরত মিলত। এরপর সে বাকী রাতটুকু প্রার্থনা ও গভীর সাধনার মধ্যে অতিবাহিত করত। এমনিই চলছিল।

একদিন অনেক রাতে গৃহকর্তার ঘুম ভাঙ্গল। তিনি বাড়ীর বাইরে এসে পায়চারি করতে লাগলেন। হঠাৎ তার নজরে এলো রাবেয়ার কুটিরে আলো জ্বলছে। এতরাতে তার কুটিরে আলো জ্বলছে দেখে তিনি অবাক হলেন। কৌতুহলী হয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন। তারপর নিকটবর্তী হলে তিনি রাবেয়ার প্রার্থনার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি তাঁর প্রার্থনায় মনোযোগ দিলেন। তার কানে ভেসে এলো রাবেয়ার সকরুণ প্রার্থনা- “প্রভু! আপনি ভালো করে জানেন আমার অন্তরের সুতীব্র বাসনা হচ্ছে আমার হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে আপনার প্রতিটি নির্দেশ পালন করা এবং বাস্তবায়ন করা, হে আমার নয়নযুগলের আলো! যদি আমি মুক্ত থাকতাম আমি সারাদিন তোমার আরাধনয় নিমগ্ন থাকতে পারতাম। কিন্তু আমি কী করতে পারি যেখানে তুমি আমাকে একজন মানুষের দাসী বানিয়ে রেখেছ?”

গৃহকর্তা ফিরে এলেন। মেয়েটির ধর্মনিষ্ঠা তাকে বিষ্মিত করেছে। তিনি বাকী রাতটুকু তার চাল-চলন, আচার-আচরণের সাথে তার ধর্মনিষ্ঠা মিলিয়ে দেখলেন। এতে কোনোভাবেই এমন একটি মেয়েকে দিয়ে দাসীর কাজ করাতে তার বিবেক সায় দিলো না। সুতরাং তিনি সকালে রাবেয়াকে ডেকে বললেন, ’তোমাকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে আমি মুক্ত করে দিলাম। তুমি স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছে সেখানে চলে যেতে পারো। আর যদি তোমার কোথাও যাবার জায়গা না থকে, তবে তুমি আমার এখানেও থাকতে পারো, সেক্ষেত্রে তোমার যাবতীয় ব্যয়ভার আমার কাঁধেই থাকবে।’

নির্জনে একাকী খোদার নিকট অন্তর ঢেলে প্রার্থনা করার সাধ রাবেয়ার সব সময় ছিল। তাই তিনি বিনয়ের সাথে চলে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। গৃহকর্তা তাঁর ইচ্ছেতে সম্মান জানিয়ে সম্মতি দিলেন। তবে রাবেয়া কোথায় গিয়েছিলেন তা পরিস্কার নয়। হয়ত তিনি কোনো মরু এলাকায় গিয়েছিলেন অথবা তাঁর পিতৃবাড়ীতে ফিরে গিয়ে একাকী বাস করেছিলেন। অবশ্য জীবনের শেষ কয়েকটি বৎসর তাঁর জেরুজালেমে কেটেছিল বলে জানা যায়।
রাবেয়া আজীবন কুমারী ছিলেন। তাঁর সুনামের জন্যে অনেকেই তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর পাণিপ্রার্থীদের তালিকায় বসরার আমিরও ছিলেন। তবে সকল প্রস্তাবই রাবেয়া অতি বিনয়ের সাথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এ কথা বলে যে তিনি তাঁর ইহলৌকিক এ ক্ষুদ্র জীবন তার সৃষ্টিকর্তার তরে উৎসর্গ করে দিয়েছেন।
রাবেয়ার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দিকে দিকে। তাঁর কিছু নিঃস্বার্থ নারী ও পুরুষ সেবকও জুটে গিয়েছিল। সম্ভবত এরাই তাঁর প্রয়োজনীয় সকল কিছুর আঞ্জাম দিতো। এদেরই একজন হলেন হাসান আল বসরী।

রাবেয়ার সম্পর্কে অনেক কথাই প্রচলিত আছে। একবার রাবেয়া হজের উদ্দেশে এক কাফেলার সাথে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে মরুর দাবাদহে তাঁর গাধা প্রাণ ত্যাগ করে। তাঁর সঙ্গীরা ঐ সময় তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু রাবেয়া তাদের সাহায্য গ্রহণ করেননি, খোদার প্রতি তাঁর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের কারণে। তিনি তপ্ত মরুর পথ ধরে পায়ে হেঁটেই রওনা দেন। একসময় দিক হারিয়ে ক্ষুধা ও ক্লান্তিজনিত কারণে মরুর বুকে অচেতন হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফিরলে উঠে পথ চলতে শুরু করেন। কথিত আছে এসময় কাবাকে তুলে এনে তার সামনে হাজির করা হয়েছিল। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আমি পাথরের এই গৃহ দেখতে আসিনি। আমি গৃহের মালিকের সাক্ষাতে এসেছি।’ যাই হোক, তিনি মক্কাতে পৌঁছান এবং হজ সম্পন্ন করেই ফিরে আসেন।

অনেক বুজুর্গ ও সুফি সাধক রাবেয়ার সাক্ষাতে আসতেন। একদিন এমনি দুজন মুসাফির তার বাড়িতে এলেন। তাদেরকে বসানো হয়েছিল সমাদরের সাথে। অতিথি দুজন ক্ষুধার্ত ছিলেন। তারা দেখলেন দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু গৃহকর্তী তাদের আপ্যায়ণের কোনো ব্যবস্থা করছেন না। একসময় তারা অধৈর্য্য হয়ে বলেই ফেললেন- ‘মা খাবার কি কিছু আছে?’

রাবেয়া তখন একটি পাত্রে দুখানি রুটি এনে তাদের সামনে তা রাখলেন। অতিথিরা বুঝতে পারছিলেন না রুটি দুখানি তাদের দুজনের নাকি একজনের। এ কারণে তারা কেউই রুটির দিকে হাত বাড়ালেন না।
এ সময়ই দ্বারে এসে এক ভিখারী হাঁক দিল- ‘মা জননী বড়ই ক্ষুধার্ত, দুদিন ধরে অনাহারে আছি।’ রাবেয়া এ সময় ঐ রুটি দুখানি তুলে নিয়ে ঐ ভিখারীকে দিয়ে দিলেন। এতে অতিথিদ্বয় অবাক হলেন।

কিছুসময় পর এক দাসী এক পাত্রে রুটি ও এক পাত্রে কিছু মাংস নিয়ে এসে বলল, ‘আমার কর্ত্রী এগুলি আপনার জন্যে পাঠিয়েছেন। রাবেয়া রুটির পাত্রটি হাতে নিয়ে সেগুলি গুনে দেখলেন। তারপর দাসীকে বললেন, ‘এগুলি আমার নয় তুমি ফিরিয়ে নিয়ে যাও।’

দাসী সেগুলি নিয়ে চলে গেল। অতিথিদ্বয় এ ঘটনায় আরো অবাক হলেন। কিছু সময় পর ঐ দাসী আবার এলো, বলল, ‘তিনি আরও দুখানি রুটি দিয়েছেন এবং বিনীতভাবে এগুলি আপনাকে গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছেন।’
এবার রাবেয়া সেগুলি নিলেন এবং অতিথিদের তা থেকে খেতে দিলেন। এসময় অতিথিদ্বয় নিজেদের কৌতুহল আর চাপা রাখতে পারলেন না। তারা সমস্বরে বললেন, ‘মা, কেন আপনি প্রথমবার এগুলো ফিরিয়ে দিলেন এবং পরে তা গ্রহণ করলেন?’

রাবেয়া বললেন, ’আপনারা ক্ষুধার্ত জেনেও আমি আপনাদেরকে আপ্যায়ন করতে পারছিলাম না। কারণ, ঘরে মাত্র দু’খানি রুটি ছিল, যা দিয়ে আপনাদের দুজনের ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব ছিল না। তাই আমি আপনাদেরকে খেতে দেইনি। কিন্তু যখন আপনারা চেয়ে বসলেন, আমি তখন নিতান্ত বাধ্য হয়ে রুটি দু’খানি আপনাদের সম্মুখে রেখেছিলাম। ঐ সময়ই ভিখারী এলো এবং তার ক্ষুধার কথা জানাল। তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ল, খোদা বলেছেন দানের দশগুণ পাওয়া যাবে। আর আমি তা পাবার আশায় সঙ্গে সঙ্গে রুটি দুখানি তাকে দান করে দিলাম।

তারপর ঐ দাসী রুটি ও মাংস নিয়ে এলো। আমি তখন রুটি গুনে দেখলাম সেগুলি খোদা আমার জন্যে পাঠিয়েছেন কিনা তা জানতে। কিন্তু রুটি ছিল আঠারটা, সুতরাং আমি নিশ্চিত হলাম ঐ রুটি আমার নয়, তাই তা ফেরৎ পাঠিয়ে দিলাম। পরে যখন দাসী ফিরে এল আরও দুখানি রুটি নিয়ে, তখন আমি তা গ্রহণ করলাম।’
রাবেয়া দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন। অনেকের মতে মৃত্যুর সাত বৎসর পূর্বে তিনি জেরুজালেমে আসেন এবং মাউন্ট অলিভে বসবাস করতে থাকেন। অতঃপর নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়সে ১৮৫ হিজরি বা ৮০১ সনে পরলোক গমন করেন। তাঁর ভক্তগণ একটা সমাধি সৌধ তৈরী করেন যার উপস্থিতি এখনও রয়েছে মাউন্ট অলিভের চূড়ায় অবস্থিত খ্রিস্টিয়ান চার্চ এ্যাসেনশনের নিকট।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here