এতিম শিশুর আশার আলো ‘বাংলাহোপ’

0
36

জয়পুরহাট সংবাদদাতা: ‘মানুষ মানুষের জন্য’-এ কথার যথার্থতাই যেন প্রমাণ করেছে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ‘বাংলাহোপ’ এতিমখানা। মানবতার টানেই ভিনদেশের ভিনজাতের এক দম্পতি এগিয়ে এসেছেন বাংলার নিভৃত পল্লীর অসহায় শিশুদের সস্নেহ আশ্রয় দিতে। পাঁচবিবির প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল হাজরাপুরে এর অবস্থান।


ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন প্রবীণ আমেরিকান দম্পতি ডেভিড এল ওয়েড ও বেভারলি জে ওয়েড।
তাঁরা নিজেরা নিঃসন্তান। এ জন্যই হয়তো অপত্যস্নেহ ঢেলে দিয়েছেন অন্যের অসহায় ও এতিম সন্তানদের জন্য। ২০০৪ সালে একটি শিশুকে নিয়ে ঢাকায় এই এতিমখানার যাত্রা শুরু হয়। পরে সেখানে ঠাঁই মেলে ৬৬টি অনাথ শিশুর। সেই শিশুদের আবাসস্থল হিসেবেই বড় পরিসরে গড়ে তোলা হয় ‘বাংলাহোপ’ এতিমখানা। পাঁচবিবি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল হাজরাপুর গ্রামে ১৪ একর জায়গার ওপর ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে এখন শূন্য থেকে ১৭ বছর বয়সের ১৬১টি দুস্থ অসহায় ও অনাথ শিশুর লালন-পালন চলছে।
বাংলাহোপ এতিমখানার অধীনে দেশের আরো ৫টি জেলায় স্থাপিত হয়েছে ১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে ৪৬৬টি শিশু ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা শিখছে। তাদের সব খরচও বহন করছে বাংলাহোপ এতিমখানা।


বাংলাহোপ এতিমখানার উদ্দেশ্য অনাথ, অসহায় ও নিপীড়িত শিশুদের আশ্রয় ও শিক্ষা দিয়ে স্বাবলম্বী করা। এখানে চার একর জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে চিলড্রেন হোম, আবাসিক ভবন ও এতিমখানার প্রধান কার্যালয়। এতিমখানার শিশুদের বেশিরভাগ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের। খেলাধুলার জন্য রয়েছে বিশাল মাঠ। সেখানে আছে বিভিন্ন রাইড। সময় ধরে দিনব্যাপী চলে ‘বাড়ির কাজ’, প্রার্থনা, তিন বেলা খাওয়া, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান খেলাধুলা ও ঘুমাতে যাওয়া। দেখে বোঝার উপায় নেই এখানকার শিশুরা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অনাথ ও অসহায়।
এতিমখানা পরিচালনা করছেন ৭১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন শিক্ষক শিক্ষাদান করেন। ১৬ জন নারী অবুঝ শিশুদের মায়ের যত্নে লালন-পালন করেন।


‘বাংলাহোপ’-এর নির্বাহী পরিচালক সুচিত্রা সরেন বলেন, ‘দুস্থ ও পরিত্যক্ত শিশুরা যেন সমাজের বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, বরং মানুষের মতো মানুষ হয়ে সমাজকে সাহায্য করতে পারে-সেটাই আমাদের প্রধান ও একমাত্র উদ্দেশ্য। ’
মার্কিন নাগরিক ডেভিড ও বেভারলি ওয়েড উভয়ের বয়স এখন ৯৭ বছর। তাঁদের বন্ধুমহল এই প্রতিষ্ঠানের কাজে সহায়তা করেন। সুচিত্রা সরেন বলেন, এতিমখানা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর, বরিশাল, পিরোজপুর ও গাজীপুর জেলায় তাঁরা আরো ১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করছেন। বিদ্যালয়গুলোতে ৪৮৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের স্কুল পোশাক, বই, খাতা, কলম ও বৃত্তি দেওয়া হয়।
বাংলাহোপ উচ্চ বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সঞ্জয় কিসকু বলেন, এই প্রতিষ্ঠান থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর শিক্ষার্থীদের পাঁচবিবির বাজিতপুর মিশন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যন্ত পড়ালেখার ব্যবস্থাও করেছে বাংলাহোপ।
বাংলাহোপে শিশুদের যত্নের দায়িত্বে নিয়োজিত বন্দনা বৈরাগী বলেন, ‘প্রথম প্রথম অনাথ শিশুরা কান্নাকাটি করত। কিন্তু আদর-যত্ন পেয়ে এখন আর কোনো শিশু বিরক্ত করে না। তাদের যত্ন নিতে পেরে ভালো লাগে। ’
স্পন্সর পরিচালক পনুয়েল বাড়ৈ বলেন, ‘প্রথম প্রথম অনাথ শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। অনেকে আমাদের ছেলেধরা বলে ভুল বুঝত। তবে এখন বুঝে গেছে, অনাথ, অসহায় ও নিপীড়িত শিশুদের লালন-পালন তথা সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে আমরা তাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছি।


জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘সুপরিকল্পিতভাবে অনাথ শিশুদের শিক্ষাদানের পাশাপাশি প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত বাংলাহোপ এতিমখানা। ’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here