এসেছে সভ্যতার আরেকটি সংকট

0
244

মমতাজ লতিফ
এই পৃথিবী একদিকে তার প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় ক্রমশ পানি, অক্সিজেন-সহ বাতাস, সূর্যের আলোকে মিলিয়ে মিথস্ক্রিয়ায় জন্ম দিয়েছে পানির নিচে শৈবাল, গুল্ম, তারপর এককোষী প্রাণ। তখন কে কল্পনা করতে পেরেছিল এই প্রাণ থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে চলতে বহুকোষী প্রাণ বা প্রাণীর জন্ম হবে! কেউ হলো জলজ প্রাণী, কেউ উভচর, কেউ বৃক্ষে আবাস গ্রহণ করল। কেউবা ছোট, কেউবা হলো বিশাল দেহধারী। বৃক্ষচারীদের থেকে কোনো এক গোষ্ঠী ডাঙ্গায়, স্থলভূমিতে, পাহাড়ের গুহায় বসবাস করতে শুরু করল। এদের একদল চার পা ছেড়ে দু পায়ে দাঁড়াল, হাঁটল, ছুটল, সামনের দু’পা মুক্ত হয়ে নানা কাজ করতে শুরু করল। প্রধানত বড় বড় পশুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করতে অস্ত্র-হাতিয়ার বানাতে হলো। পশু শিকারের, পানির মাছ ধরতেও তৈরি করতে হলো নানান ছোট-বড় হাতিয়ার। আগুন আবিষ্কার হলো। পশুদের হাত থেকে আত্মরক্ষা আর পশুর মাংস খাবার জন্য ঝলসে নেওয়ার কাজে লাগল। এই দুপায়ে গরিলা, বানরসদৃশ প্রাণী থেকে নানা প্রকৃতির মানবগোষ্ঠীর উদ্ভব হলো, যারা ধাতুকে আগুনে গলিয়ে উন্নততর শিকারের অস্ত্র, নানা কাজের অস্ত্র, হাড়, মাছের কাঁটা দিয়ে সুই বানিয়ে বড়ো বড়ো গাছের পাতা সেলাই করে গায়ের আচ্ছাদনও তৈরি করল। শীতে, বৃষ্টিতে, রোদের তাপ থেকে দেহ ঢাকার দরকার হলো। বড়ো বড়ো পশু শিকার একা একা করা কঠিন। পশুকে বরং একদল মানুষ বা প্রাণী ঘিরে ধরে বধ করা সহজসাধ্য। সুতরাং তারা দলবেঁধে বসবাস করতে শুরু করল। দল বাঁধলে একে অপরের সঙ্গে জীবনের প্রয়োজনে নানা ভাব প্রকাশের চেষ্টায় ধীরে ধীরে মৌখিক ভাষার আবিষ্কার হলো।

তারপর তো মানুষ শস্যের বীজ আবিষ্কার করে খাদ্যে অফুরন্ত উৎসের সন্ধান পেয়ে নদীর তীরে উর্বর স্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস, চাষ করতে শুরু করল। খাদ্যের উৎস লাভের পর আরও সুখাদ্য, সুন্দর ঘর, বাড়ি, রাস্তা, পরিচ্ছদ-পোশাক, সাজসজ্জার উপকরণ, আনন্দ-বিনোদনের বাজনার যন্ত্র, বাঁশি, গান, নৃত্য, দেওয়ালে অঙ্কন কাজ কতকিছু আবিষ্কার হলো। তৈরি হলো পণ্য বাণিজ্যের জন্য সমুদ্র যাত্রার বড়ো বড়ো জাহাজ, নৌকা। কিন্তু দলে-দলে-উপদলে শিকারের স্থান কৃষির উর্বর জমি দখলের লড়াইও শুরু হলো। লড়াইয়ের জন্য উন্নত তীর, ধনুক, সড়কি, তলোয়ার, পোষ মানানো ঘোড়া, পরে বারুদের বোমা, গুলি, বন্দুক-রাইফেল তৈরি হলো।
মহাদেশে দেশ বা রাষ্ট্র তৈরি হলো। তখন এক দেশ অন্য দেশের সম্পদ দখল, উর্বর ভূমির দেশ দখলের লড়াইয়ে নামে। এর অনেক আগেই প্রকৃতিকে পূজা করত মানুষ। আকাশের সূর্য, চন্দ্র, আকাশ, পর্বত, বৃক্ষ, পশু-পাখিকে মানুষ পূজা নিবেদন করে মানসিক শান্তি লাভ করত। পরে উপজাতিতে উপজাতিতে লড়াই, হিংসা, বিশৃঙ্খলা হ্রাস করবার আশায় বড়ো বড়ো ধর্ম প্রচারক শান্তির বাণী প্রচার করতে হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম ধর্মের জন্ম হয়। ভারতে বুদ্ধ তাঁর অহিংসার বাণী প্রচার করেন। আর্যরা এসে বেদ, উপনিষদ, অর্থশাস্ত্র, ব্যাকরণ রচনা করে ঈশ্বরের বন্দনার স্তোত্র, গীত, শ্লোক প্রণয়ন করেন। ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রকৃতির দেব, দেবীসহ মিলে হিন্দু ধর্ম তৈরি হয়, যাতে ব্রাহ্মণদের দ্বারা বর্ণ প্রথার জন্ম হয়ে হিন্দুধর্ম কঠিন বর্ণ প্রথার শিকলে বাঁধা পড়ে।

এরপর শুরু হয় যুদ্ধ- মহাযুদ্ধ। ইউরোপের ছোটো ছোটো দেশ একে অপরের সঙ্গে নানা বাণিজ্যিক স্বার্থে যুদ্ধ শুরু করে। যদিও এর আগেই ইউরোপের দেশগুলো এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকায় সম্পদ আহরণের জন্য এক একটি দেশ দখল করে উপনিবেশ তৈরি করেছিল। ব্রিটিশরা পাক-ভারত উপমহাদেশ দখল করেছিল ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে এক কূট চালে ফেলে পরাজিত ও হত্যা করে। যাই হোক, সেই যে যুদ্ধের কাল শুরু হলো, প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হলে আবারও জার্মানিতে হিটলারের ইহুদি বিরোধী গণহত্যা শুরু হলে নতুন সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত রাশিয়া, ব্রিটেন ও ব্রিটেন থেকে স্বাধীনতা লাভ করা যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, জাপান ও ইতালির মুসোলিনীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানি, জাপান ও ইতালিকে পরাজিত করে ১৯৪৫ সালে। এরপর ব্রিটেন ভারতকে দুভাগে ভাগ করে ভারত ও পাকিস্তান নামকরণ করে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা দেয়।

কিন্তু আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে শান্তি স্থাপিত হয়নি। পুঁজির বিকাশ ঘটেছে, বড়ো বড়ো ব্যাংক, শিল্প-কারখানা, অস্ত্র কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলো শুধু চরম অমানবিক পারমাণবিক বোমাই আবিষ্কার করেনি, হাইড্রোজেন বোমা, নানা রাসায়নিক গ্যাস বোমা, এমনকি রোগের জীবাণু বোমাও আবিষ্কার করেছে, যাতে মানুষের, উন্নত দেশগুলোর শাসক শ্রেণীর ন্যায়-নীতি-মানবিকতাহীন কর্মকাণ্ড পৃথিবীকে আরও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে ধর্মের নামে জঙ্গী-হত্যাকারীরও জন্ম দেওয়া হয়েছে! এসব নেতা কোনোরকম মঙ্গলচিন্তা করে না। এতে তারা অভ্যস্ত নয়। তাদের হিতাহিত জ্ঞানশূন্যতা, কান্ডজ্ঞানহীনতা আজ মানব সভ্যতাকে, একই সঙ্গে পৃথিবীর প্রকৃতিকে ধ্বংসের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। বর্তমানে প্রকৃতির প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ থেকে এই করোনা নামক ক্ষুদ্র কিন্তু যার আছে উন্নত, অনুন্নত, কালো, সাদা সব মানুষ ধরাশায়ী করার ক্ষমতা, তার জন্ম হয়তো মানুষের চিন্তাহীনতা, বুদ্ধিহীনতা, বিবেকহীনতা, দূরদৃষ্টিহীনতা এবং প্রবল, প্রচণ্ড এক ‘ভোগ’ নামক পশুর তাড়নার মধ্যে নিহিত!

এখানে আবুল ফজলের সত্তরের দশকে রচিত প্রবন্ধ ‘সভ্যতার সংকট’ থেকে উদ্ধৃত করা হলোÑ‘সিনেমা, টেলিভিশন-রেডিও, গ্রামোফোন যেখানে মানুষের অবসর সময়টুকুর অধিকাংশ গ্রাস করে চলেছে, সেখানে চিন্তাচর্চার সময় কোথায়? ফলে আজ ধীরে ধীরে, নিজের অজ্ঞাতেই মানুষ যন্ত্রের শামিল হয়ে পড়েছে। … চিন্তার প্রতি এই বিরাগ ও বিতৃষ্ণা মানবসমাজে এক মারাত্মক ব্যাধির রূপ নিয়েছে আজ। আজ সভ্যতার যে সংকট তা হচ্ছে এই চিন্তাহীনতার সংকট, পারমাণবিক বোমা বা আনুষঙ্গিক অন্যান্য মারণাস্ত্র নয়। … বুদ্ধি ও চিন্তার চর্চা মানুষকে যুক্তিবাদী ও বিবেকী করে তোলে। যে কোন অবস্থায় বিবেকী মানুষ হিরোশিমা ও নাগাসাকি ঘটাতে পারে না। বিবেকহীন সভ্যতা মানুষকে বর্বরতার কোন চরম সীমায় নিয়ে গেছে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় এ দুটি নাম তার অক্ষয় স্বাক্ষর। নীতি ও জীবনের মূল্যবোধ ছাড়া যান্ত্রিক সভ্যতা ও তার প্রগতি মানুষকে কোন লক্ষ্যেই নিয়ে যায় না।

… নিজে চিন্তা না করার সবচেয়ে বড় কুফল হচ্ছে সত্য-মিথ্যা যে-কোনো কথা ও প্রচারণাকে বিশ্বাস করে বসা, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন লোকের স্বার্থমূলক কথাকেও বেদবাক্য মনে করা। একনায়ক ও ডিক্টেটররা চিরকাল এ করে এসেছে- স্বাধীন চিন্তাকে তারা মনে করে তাদের স্বার্থের পরিপন্থী এবং তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। ক্ষমতার ঐ এক ধর্মÑ ক্ষমতা সব সময় মাথার চেয়ে হাতের ওপর, হাতের চেয়েও হাতের ডান্ডার ওপর নির্ভর করে বেশি। এই ডান্ডার ভয়েই লোকে তাদের মিথ্যাকেও সত্য বলে মেনে নেয়।… যে মানুষ কিছুটা ভাবে, করে চিন্তার চর্চা, তার কাছে এরা যে খড়ের দেবতা তা ধরা পড়তে দেরি লাগে না। তাই জনসাধারণ বুদ্ধির চর্চা করুক, মাথা খাটাক, এ ক্ষমতাসীন লোকেরা মোটেও চায় না। আর যান্ত্রিক সুখ-সুবিধায় অভ্যস্ত মানুষও মাথা খাটাবার কষ্ট স্বীকার করতে অনিচ্ছুক। তাই আজ সর্বত্র চিন্তার ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে বন্ধ্যাত্ব, মানুষ হয়ে পড়েছে গতানুগতিক, হারিয়ে বসেছে সত্যের প্রতি সব রকম অনুরাগ।… মানুষের জীবনে সত্য ও ন্যায়ের যে কোনো মূল্য আছে মানুষের মন থেকে সে বোধও আজ নিশ্চিহ্ন।

… এ অবস্থায় কোনো বড়ো ও উচ্চ জীবনদর্শন আশা করা যায় না। আশা করা যায় না কোন মহৎ শিল্প-সাহিত্যও।… বিগত সভ্যতা- যা মহৎ শিল্প-সাহিত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, এমনকি রেনেসাঁ ও এনসাইক্লোপিডিস্টদের যুগের দিকে তাকালেও আমরা বুঝতে পারব, মত-বিশ্বাস-আদর্শ-নিষ্ঠা, যা চিন্তা চর্চারই ফল-সভ্যতার স্থিতি, বিকাশ ও সমৃদ্ধির জন্য কতখানি আবশ্যক। আধুনিক সভ্যতার পায়ের তলায় এই অত্যাবশ্যক শর্তগুলো অনুপস্থিত।

…আজ এই মহাসংকটের দিনে বাঁচতে হলে মানবসভ্যতাকে একটা নীতি ও সত্যের ওপর দাঁড় করাতে হবে। আর তা করাতে হলে মানুষকে ভাবতে হবে, করতে হবে চিন্তা ও যুক্তির চর্চা, হতে হবে বিবেকী।’
এই সঙ্কট উত্তরণের উপায় মানুষকেই বের করতে হবে। নতুবা মানবজাতি পৃথিবীকে ধ্বংস করে এবার নিজেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here