ঐশি শক্তির সফলতা

0
280

মো. ইফতেখার হোসেন
ঐশি শক্তি, অলৌকিক ক্ষমতা, মু’জিযা বা কারামত শব্দগুলি বহুল পরিচিত, আমরা অবলীলায় বিভিন্ন সময় উচ্চারণ করে থাকি। করোনার এ বিশেষ সময়ে কথাটি আবার সামনে এসেছে, গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্র্যাম্পের একটি মন্তব্য থেকে, “কঠিন বিপদের সময় মুসলমানদের দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ পাওয়ার রয়েছে।” ট্রাম্প কথিত এই বিশেষ পাওয়ারই হচ্ছে ঐশি শক্তি, যার অপর নাম ’ফায়েজ’। আমার আজকের লেখায় কথিত এই ’পাওয়ার’ বা ঐশি শক্তি কী? কোথা থেকেই বা আসে? কারা এটা চর্চা করতে পারেন? আর কিভাবেই বা তারা তা অর্জন করতে পারেন, সে বিষয়ে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান, আমার মহান মোর্শেদ যুগের ইমাম মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের শিক্ষার আলোকে তা আলোচনার চেষ্টা করবো।

প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্পের কথিত এই পাওয়ার বা ক্ষমতা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বিশেষ কোনো মানুষের বা জাতির নয়। এটি মূলত ঐশি শক্তি, যা স্রষ্টার। স্রষ্টা কর্তৃক তাঁর প্রিয় বান্দাদের অসিলায় জগতের বুকে ইহা নাজিল হয়। এখন প্রশ্ন হলো- কে তাঁর প্রিয় বান্দা? কার অসিলায় তাঁর ঐশি শক্তি পৃথিবীতে নাজিল হয়? এটিই এই সময়ে জগতের বুকে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কে আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা? কে এই ঐশি শক্তির ধারক ও বাহক? আজকের এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এ প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।

জগতে প্রায় ১০ হাজার ধর্ম বর্তমান রয়েছে। ক্ষুদ্র কিছু ধর্ম ব্যতিত সব ধর্মের অনুসারীরাই একজন সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করেন। এই সৃষ্টিকর্তাকে আমরা কেউ ঈশ্বর, কেউ গড, কেউ আল্লাহ্, কেউ ভগবান বা অন্য কোনো নামে ডাকি। মহান আল্লাহ্ প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করে জাগতিক প্রযোজনীয় সবকিছু শিক্ষা দিয়ে জগতে প্রেরণ করলেন। আল্লাহ্ আদমের বংশধরকে সঠিক ধারায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য যুগে যুগে নবি-রাসুল পাঠাবেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি যুগে যুগে নবি-রাসুলদের পাঠালেন। মূলত সবাই একই স্রষ্টার ধর্ম প্রচার করে গেছেন।

জগতের সবকিছুর মতো নবি-রাসুলদের প্রচারিত এসব ধর্মেরও দুটি দিক আছে। এক. অন্তঃস্থ যা মারেফাত নামে পরিচিত। দুই. বহিঃস্থ যা শরিয়ত নামে পরিচিত। মারেফাত হচ্ছে, স্রষ্টাকে ভালোবাসার এবং তাঁকে পাওয়ার বিদ্যা। যে বিদ্যা চর্চা করে খোদা প্রেমিকেরা স্রষ্টার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন তাই মারেফাত। মারেফাত বা স্রষ্টার সাথে যোগাযোগের বিদ্যা কয়েকটি ধাপে অর্জন করতে হয়। মূলত সব নবি-রাসুলদের মারেফাতটা একই। স্রষ্টার প্রতি প্রেমই ধর্মের মূল এবং তাঁকে পাওয়ার পথও প্রেম। স্রষ্টাকে পাওয়ার, তাঁর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হলো ধ্যান। যাকে ইংরেজিতে মেডিটেশন, ইসলামি পরিভাষায় মোরাকাবা, বাংলায় ধ্যান বলে। যুগে যুগে সকল নবি-রাসুল এবং নবুয়ত পরবর্তী যুগে অলী-আল্লাহ্গণ এই ধ্যান চর্চার মাধ্যমেই স্রষ্টাকে পেয়েছেন এবং তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছেন। মারেফাত এক হলেও শরিয়ত বা ধর্মের বাহ্যিক চর্চা বা সামাজিক আচার অনুষ্ঠান এক এক নবি-রাসুলের এক এক রকম। মনে রাখতে হবে- সমস্ত নবি-রাসুল একই স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত এবং তাঁর থেকেই আদিষ্ট হয়ে মূলে একই ধর্ম প্রচার করে গেছেন। একজনের ধর্মের প্রত্যয়নকারী হিসেবে পরবর্তী নবি-রাসুল আগমন করেছেন। তাঁরা নিজেদেরকে একজন আরেকজনের ভাই বলে দাবী করতেন।

যে যুগে যে নবি বা রাসুল বর্তমান থাকেন তাঁর মাধ্যমেই স্রষ্টার ফায়েজ জগতে আবির্ভূত হয়। ফায়েজ হচ্ছে জগত পরিচালনার জন্য স্রষ্টার পক্ষ থেকে এক ধরনের পাওয়ার বা ঐশি শক্তি বিশেষ। আর এই কারণেই হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে যেমন কালিমা রয়েছে- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্’। তেমনি সব নবি-রাসুলের সময় তাঁদের নামে ছিল। যেমন:
হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর সময় ছিল- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ
হযরত মুসা (আ.)-এর সময় ছিল- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুসা কালিমুল্লাহ
হযরত ঈসা (আ.)-এর সময় ছিল- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ঈসা রুহুল্লাহ

পরবর্তী রাসুল আসার পূর্ব পর্যন্ত যে সময়ে যে রাসুল থাকেন তাঁর মাধ্যমে জগতে ফায়েজ নাজিল হয়। নবুয়তের যুগ পরবর্তী সময়ে শেষ নবির পক্ষ থেকে যিনি ঐ যুগের প্রধান অলী-আল্লাহ্ থাকেন- তাঁর মাধ্যমে জগতে ফায়েজ নাজিল হয়।

নবি-রাসুল বা প্রধান অলী-আল্লাহ ছাড়াও অনেক সুফি সাধক ধ্যানের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করে ফায়েজ বা ঐশি শক্তির মাধ্যমে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে পারেন। মনে রাখতে হবে- এই শক্তি কিন্তু উক্ত ব্যক্তির নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নয়। মূলত তাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা কবুল করেন। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর আঙ্গুলের ইশারায় চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন। কিন্তু আঙ্গুলের ইশারা করবার পূর্বে আল্লাহর নিকট থেকে আদিষ্ট হয়েই তিনি শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করেছিলেন। তাতেই চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এ শক্তি হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর নয়, স্বয়ং আল্লাহর। কেউ যদি আল্লাহ্র সাহায়্য নিয়ে কিছু করেন এবং অহংকার জন্মে যে তিনি তা পারেন, তা হলে তার এ ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়।

সব নবি-রাসুলের আমলেই তাঁদের এবং তাঁদের একনিষ্ট সঙ্গী-সাহাবিগণের মাধ্যমেই এই ক্ষমতার প্রকাশ ঘটতো। হযরত মুসা (আ.) লাঠির সাহায্যে অনেক কিছু করতে পারতেন। এই লাঠির আঘাতে মিশরের ভুমধ্য সাগরের পানি দুইভাগ হয়ে রাস্তা তৈরী হয় এবং সেখান দিয়ে তিনি তাঁর দলবল নিয়ে নদী পার হয়ে যান। ফেরাউন এই রাস্তা দিয়ে তাঁকে তাড়া করতে গিয়ে দলবলসহ পানিতে ডুবে মারা যায়। হযরত ঈসা (আ.) মৃতকে জীবিত করতেন, কুষ্ঠ রোগী ভালো করতেন, অন্ধকে ভালো করতে পারতেন। রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এরও অসংখ্য মু’জিযা আছে, যা আল্লাহ ঘটিয়েছেন। ভারতীয় মুনি-ঋষিগণের মাধ্যমেও অনেক ঐশি ক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে।

ঐশি শক্তি এখনও কাজ করে। নীরবে নিভৃতে বিভিন্ন ধর্মের সাধকদের মাধ্যমে মহান আল্লাহ্ অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত। ঐশি শক্তি চর্চার জন্য কতকগুলো শর্ত আছে। শর্তগুলো নিম্নরূপ:

  • এক সৃষ্টিকর্তার সাথে কাউকে শরিক (বা অংশিদার) না করা।
  • পরিশুদ্ধ ক্বালব (আত্মা)’র অধিকারী হওয়া। আত্মার ৬টি ব্যাধি যথা- কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য হতে মুক্ত হওয়া।
  • অহঙ্কার ও আমিত্ব ত্যাগ করা। সত্য কথা বলা, ন্যায়বিচার করা, অন্যের হক আদায় করা, ওজন ও পরিমাপে পুরোপুরি ইনসাফ করা।
  • সমস্ত নবি-রাসুল ও আসমানি কিতাবসমূহে বিশ্বাস স্থাপন করা।
  • একজন অসিলা বা সুপারিশকারী ছাড়া আল্লাহর সাথে যোগাযোগের প্রথম দরজা পার হওয়া যায় না। অসিলা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ বলেন, “তারা যদি নিজেদের ওপর জুলুম করার পর তোমার কাছে এসে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করতো, আর তুমিও যদি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে, তাহলে তারা অবশ্যই আল্লাহ্কে ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালুরূপে পেতো।” [সূরা নিসা ৪: আয়াত ৬৪]
  • ধ্যানমগ্ন হওয়া। ধ্যানের স্তরের ধাপগুলো পার হয়ে গভীর থেকে গভীরতর স্তরে পৌঁছে পার্থিব জগত অতিক্রম করে যাওয়া।
  • শুধুমাত্র সৎকাজে এ শক্তি ব্যবহার করা।

আমরা শুনেছি এককালে ঐশি শক্তি লাভের জন্য সাধককে কঠিন থেকে কঠিনতর সাধনার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। সাধককে চটের ছালা পরতে হতো। সংসার ত্যাগ করে বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ের গুহায় গিয়ে বছরের পর বছর ধ্যান সাধনায় নিয়োজিত থাকতে হতো। গাছের পাতা খেয়ে থাকতে হতো।

মানুষকে আল্লাহ্ ১০টি উপাদানের সমম্বয়ে সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে ৫টি উপাদান আলমে খালক তথা সৃষ্টিজগতের উপাদান। যথা- মাটি (খাক), পানি (আব), আগুন (আতশ), বাতাস (বাদ) ও নফস। অন্যটি হচ্ছে আলমে আমরের তথা আল্লাহময় জগতের যথা- ক্বালব, রূহ, ছের, খফি ও আখফা। প্রথম ধাপে আলমে আমর তথা আল্লাহময় জগতের সাধনার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হতো। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আলমে খালক তথা সৃষ্টিজগতের উপাদানসমূহ হলো- আগুন (আতশ), পানি (আব), বাতাস (বাদ) ও মাটিকে (খাক) কঠিন থেকে কঠিনতম সাধনার মাধ্যমে সাধনার জগত অতিক্রম করে যেতে হতো। এই দ্বিতীয় ধাপটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন সাধনার অংশ। বেশিরভাগ সাধকই জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও এ স্তর অতিক্রম করতে পারতেন না।

গভীর সাধনার মাধ্যমে সুলতানুল আরেফিন হযরত বাহাউদ্দিন নকসবন্দ (রহ.) যে মুহূর্তে সিদ্ধি লাভ করলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই মহান প্রভুর কদম মোবারকে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানিয়ে বললেন, “হে আল্লাহ্! তোমাকে পাওয়া এত কঠিন যে, তোমার বান্দাদের জন্য তা প্রায় অসম্ভব। তুমি দয়া করে সাধনাটি তাদের জন্য সহজ করে দাও।” তিনি দীর্ঘক্ষণ সেজদারত থাকলেন, যতক্ষন না আল্লাহ্ সাড়া দিলেন। অতপর আল্লাহ্ তাকে বললেন, “আপনি সেজদা থেকে উঠুন। আমি আপনার ফরিয়াদ কবুল করলাম।

এরপর থেকে সাধককে আর সাধনার জন্য কঠিনতম পথ অতিক্রম করতে হয় না। সাধনার জন্য এখন আর ছালা পরতে হয় না, বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ের গুহায় গিয়ে ধ্যান করতে হয় না। এখন সংসারী মানুষ হিসেবেই সাধনা করে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। মহান আল্লাহ্ ও নবি-রাসুলদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব। আল্লাহর ইচ্ছায় ঐশি শক্তি কার্যকর হয়। তাঁর ইচ্ছায় অলৌকিক ঘটনা ঘটে থাকে। এই অলৌকিক ঘটনাকে নবুযতের যুগে বলা হতো মু’জিযা। আর নবুওত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে বলা হয় ‘কারামত’। আর আল্লাহকে পাওয়ার এবং আল্লাহর সাথে যোগাযোগের এই বিদ্যা বা বিজ্ঞানকে বলা হয় ‘এলমে তাসাউফ’।

মুসলমান ছাড়া অন্য কেউ কি ‘এলমে তাসাউফ’ চর্চা করতে পারে?
মুসলিম আধ্যাত্মিক সাধক ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের অসংখ্য সাধক আছেন যারা আল্লাহ্ এবং হযরত রাসুল (সা.)-এর সাথে যোগাযোগ করে এলমে তাসাউফ চর্চা করে থাকেন। তবে খুব নিভৃতে, লোক চক্ষুর আড়ালে। এরা সবাই নিজ নিজ মোর্শেদ বা গুরুর মাধ্যমে সর্বশেষ রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে অসিলা হিসাবে গ্রহণ করেই সাধনা জগতে প্রবেশ করেন। অমুসলিমদের তাসাউফ চর্চার সবচেয়ে বড়ো বাধা হচ্ছে, তারা তাদের নিজেদের ধর্মগ্রন্থ কাট-ছাট করে আংশিক মানে আর আংশিক মানে না। তাদের প্রত্যেকের ধর্মগ্রন্থেই পরবর্তী নবি-রাসুল এবং শেষ নবি হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমনের কথা বলা আছে। এই আংশটুকু তারা উচ্চারণ করে না বা পড়ে না। এ কথার প্রমাণ হিসাবে বিভিন্ন জাতির ধর্মগ্রন্থে হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর আগমনের বিষয়ে কী ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তা অতি সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

তৌরাতে হযরত মুসা (আ.):
The Lord the God will raise up unto there a Prophet from the midst of there, of the brethren, like unto me. Unto him ye shall hearken (Duet, ১৫:১৮)
অর্থাৎ “তোমাদের প্রভূ ঈশ্বর তোমাদের ভ্রাতৃদিগের মধ্য হতে আমার (মুসার) মতোই একজন পয়গম্বর উত্থিত করবেন, তার কথা তোমরা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করবে”।

[উঁবঃ, ১৮: ১৮-১৯] তে আরো দেখুন. এখানে প্রতিক্ষিত নবির কথা এবং তার গুণাবলির বর্ণনাও উল্লেখ আছে।
বাইবেলে হযরত ঈসা (আ.):
কিন্তু সেই সহায় যিনি পবিত্র আত্মা, যাকে পিতা (আল্লাহ্) আমার নামে পাঠিয়ে দিবেন, তিনি সকল বিষয়ে তোমাদেরকে শিক্ষা দিবেন এবং আমি তোমাদেরকে যা যা বলেছি, সে সকল স্মরণ করিয়ে দিবেন।
[যোহন: অধ্যয়-২৪, পদ-২৬]
হযরত ঈসা (আ.) ইঞ্জিল বাইবেলে বারবার সেই নবির আগমনের সুসংবাদ দিচ্ছেন। হযরত ঈসা (আ.) তাঁর গুণাবলি এবং বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করে গেছেন। তিনি তাঁকে ‘ফারাক্লিত’ বলে অভিহিত করেছন। যার হুবহু আরবি অনুবাদ মুহাম্মাদ (পরম প্রশংসাকারী) এবং আহাম্মদ (পরম প্রশংসিত)।

এ ছাড়াও হিন্দুশাস্ত্র বেদ-পূরাণ এবং উপনিষদে আল্লাহ, রাসুল, মুহাম্মাদ ইত্যাদি শব্দগুলো উল্লেখ আছে। বৌদ্ধদের প্রামাণ্যগ্রন্থ দিঘা-নিকারায় হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর আগমনের বার্তা আছে। এখানে তাঁর নাম হবে মৈত্রেয় (শান্তি ও করুণার বুদ্ধ) বলে উল্লেখ আছে।

ঐশি শক্তি তথা এলমে তাসাউফ চর্চায় অন্যান্য প্রায় সব ধর্মের অনুসারীদের প্রধান সমস্যা এটি। তারা নিজেদের ধর্মগ্রন্থ মানে না। সব নবি-রাসুলকে স্বীকার করে না। এদের অনেকেই ধ্যানমগ্ন হয় কিন্তু সর্বশেষ রাসুল (সা.) তাঁকে তারা অসিলা (মাধ্যম) হিসাবে মানতে চায় না। এদের মধ্যে একান্তে কেউ কেউ তাঁকে শেষ নবি হিসাবে মানে এবং অসিলা অন্বেষণ করেন। তাঁরা আল্লাহ্র সান্নিধ্য লাভ করে সফল হন।

মুসলমানদের তাসাউফ চর্চার বড়ো বাধা হচ্ছে- প্রথমত তাদের বড়ো একটা অংশ ইসলামের দেহ ও আত্মাকে বিভক্ত করে ধর্ম চর্চা করছে। অর্থাৎ শরিয়ত ও মারেফাত এই দুইটা মিলেই হয় পরিপূর্ণ ইসলাম। মুসলমানেরা এ দুটো অস্তিত্বকে বিভক্ত করে শুধু শরিয়ত বা শুধু মারেফাত চর্চা করছে। ফলে এরা ধর্মের কিছুই লাভ করতে পারে না। দ্বিতীয় সমস্যা হলো, একটি ভ্রান্ত শিক্ষার ভিত্তিতে এদের অহংকার। এরা মনে করে ইসলামের পূর্বের সকল নবি-রাসুলের ধর্মই আল্লাহ্ বাতিল করেছেন এবং তারাই (মুসলমানেরা) সঠিক এবং ইসলামই বর্তমানে আল্লাহ্র একমাত্র বৈধ ধর্ম। মুসলমানরা ছাড়া আর কেউ বেহেস্তে যাবে না। অথচ আমরা এখনো হযরত ইব্রাহীম (আ.) প্রবর্তিত কোরবানির প্রথা অনুসরণ করছি। নামাজে দরূদে ইব্রাহিম পাঠ করছি। এ প্রসংগে কুরআন বলছে- “নিশ্চয়ই যারা মুমিন, যারা ইহুদি, সাবেয়ি বা নাসারা, তাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে আল্লাহ্রা প্রতি, আখেরাতেরা প্রতি এবং নেক কাজ করেছে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। [সুরা মায়িদা ৫ : আয়াত ৬৯]
মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে আরো বলছেন, “আর যদি আহলে কিতাব ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে অবশ্যই আমি তাদের দোষত্রুটি মার্জনা করতাম এবং শান্তিদায়ক জান্নাতে দাখিল করতাম।” [সুরা মায়িদা ৫ : আয়াত ৬৫]

মুসলমান জাতি যদি এ দুটো সমস্যা সমাধান করে নিয়ে উপযুক্ত শিক্ষকের মাধ্যমে তাসাউফ চর্চা করলে তারাও ঐশি শক্তির অধিকারী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যাও আছে, তা হলো ভ্রান্ত শিক্ষক। যে কোনো জনপ্রিয় এবং সম্মানজনক স্থানেই একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মানুষের আনাগোনা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এখানেও একশ্রেণীর প্রতারকচক্র আস্তানা গেড়ে বসেছে। প্রসঙ্গত, এদের মধ্যে যারা সাধনায় সফল হয়েছেন, ঐশি শক্তির অধিকারী হয়েছেন তাঁরাই সত্যিকার পথপ্রদর্শক। সুতরাং উপযুক্ত শিক্ষকের অনুসারী হয়ে তাসাউফ চর্চা ও আমল করলে ঐশি শক্তি তথা আধ্যাত্মিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here