কবি নজরুলের নারী দর্শন

0
236

অধ্যাপক ড. আমিনুল ইসলাম
সুদূর খ্রিষ্টপূর্ব যুগের এক অমানবিক পরিবেশে শুধু নারীসমাজ নয়, সমগ্র জনসংখ্যার এক উল্লেখযোগ্য অংশ যখন ছিল সবরকম অধিকারবঞ্চিত ক্রীতদাস, তখন প্লেটো তাঁর রিপাবলিক গ্রন্থে শিক্ষা-দীক্ষা ও দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর যুক্তিটি ছিল এরকম : যে শিক্ষা একজন পুরুষকে দক্ষ অভিভাবকে পরিণত করে, সেই একই শিক্ষা একজন নারীকেও একই মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে পারে; কারণ নারী-পুরুষের মৌলিক শক্তি ও গুণাবলি অভিন্ন। সুতরাং নারী-পুরষের জন্য চাই সমান সুযোগ-সুবিধা, চাই একই শিক্ষাব্যবস্থা। সব ধরনের বৈষ্যম্যের বিরোধী এবং এই একই সমানাধিকার মন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ উচ্চারণ করেছিলেন এই নালিশ :
নারীরে আপন ভাগ্য করিবারে জয়,
হে বিধাতা, কেন নাহি দিবে অধিকার?

শুধু প্লেটো রবীন্দ্রনাথ নয়, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের আরও যেসব মনীষী বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নারীসমাজের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লিখেছেন ও সংগ্রাম করেছেন, কাজী নজরুল ইসলামকে দেখা যায় সেই মানবতাবাদীদের কাতারে। মানবতাবাদী দার্শনিকমাত্রই যেমন নারী-পুরুষের ন্যায্য অধিকারের সমর্থক, নজরুলও ঠিক তা-ই। হিন্দু মুসলিম ঐক্যের জন্য যেমন, দুস্থ মানবতার দুঃখমোচনে যেমন, নারী অধিকারের ব্যাপারেও তেমনি তিনি সোচ্চার। বস্তুত, নজরুলের অন্তরে যে মানবতাবোধ বদ্ধমূল, যার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি অবলম্বন করেন শোষিত-বঞ্চিত-ভাগ্যাহতদের পক্ষ, তা-ই তাঁকে সচেতন ও সিরিয়াস করেছে নারী অধিকার ও নারী পুরুষের সমতা সম্পর্কে। নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা সম্পর্কে তাঁর অতি পরিচিত বাণী :
বিশ্বের যা কিছু মহান চির কল্যাণক
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

এখানে উল্লেখ্য যে, নজরুলের মানুষ ওপরতলার তথাকথিত বড়লোক নয়, ব্যথিত নিপীড়িত সাধারণ মানুষ। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর কাছে লেখা এক পত্রে এ বিষয়ে কবি তাঁর মনোভাব অকপটে ব্যক্ত করেন। ওই দীর্ঘ পত্রের এক জায়গায় তিনি বলেন : “আমি মানুষকে শ্রদ্ধা করি-ভালোবাসি। স্রষ্টাকে আমি দেখিনি কিন্তু মানুষকে দেখেছি। এই ধূলিমাখা, পাপলিপ্ত, অসহায়-দুঃখী মানুষই একদিন বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত করবে…. এ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। সকল ব্যথিতের সকল অসহায়ের অশ্রুজলে আমি আমাকে অনুভব করি… এ ব্যথিতের অশ্রুজলের মুকুরে যেন আমি আমার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।” বিশেষত কবি ক্ষুব্ধ এজন্য যে, তথাকথিত অভিজাত ধনাঢ্য প্রভুদের ক্ষুধার অন্ন যোগায় যারা, “ধরণীর হাতে তুলে দিল যারা ফসলের ফরমান”, সেই কৃষক-চাষী, শ্রমজীবী মানুষের অন্ন নেই, নেই বেঁচে থাকার ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা। এই নিষ্ঠুর প্রভুরা ও অসহায়দের রীতিমত ব্যবহার করে বলির ছাগল হিসেবে। তাই নজরুলের ফরিয়াদ :
এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে,
হে ঋষি, তেত্রিশ কোটি বলির ছাগল
চলিতেছে দিবানিশি।

এভাবে যারা শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের বিনিময়ে সম্পদ অর্জন করে তাদের কথা ভুলে যায়, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও দুঃখের অন্ত নেই নজরুলের; আর তাই কবিকে দেখি এই হৃদয়হীন অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে :
প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস
যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই অঞ্চলের অপর এক মহাপুরুষ বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ শূদ্রের জাগরণ চেয়েছিলেন এবং বলেছিলেন সেই জাগরণ অবশ্যম্ভাবী। তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস সাধারণ মানুষের আধিপত্য বাড়বে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা একদিন তাদের হাতেই আসবে। এক পর্যায়ে সমাজের অত্যাচারী বড়লোকদের তিনি ভৎর্সনা করেছিলেন বিশ্বাসঘাতক, এমনকি দেশদ্রোহী বলে এবং সতর্ক করে দিয়েছিলেন শূদ্রজাগরণের মধ্য দিয়ে তাদের অনিবার্য পতন সম্বন্ধে। তাঁর যুক্তিটি ছিল এই যে, সমাজের নিচের তলার মানুষকে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না; আর তা নয় বলেই শোষিত মানুষকে আজ লড়াই করতে হবে তাদের প্রাপ্য আদায়ের জন্য। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই স্বামীজী সাধারণ মানুষকে ডাক দিয়েছিলেন এই বলে : Arise, awake and stop not till the goal is reached. অর্থাৎ উঠো, জাগো এবং তোমার লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত থেমে যেয়ো না।
ঠিক একই কথার যেন প্রতিধ্বনি শোনা যায় নজরুলের রুদ্র মঙ্গল গ্রন্থে। এখানে তিনি বলেন : “জাগো জনশক্তি! হে আমার অবহেলিত পদপিষ্ট কৃষক, আমার মুটে মুজুর ভাইরা।….. আনো তোমার হাতুড়ি, ভাঙ্গো ঐ উৎপীড়কের প্রাসাদ, ধুলায় লুটাও অর্থপিশাচ বলদপীর শির।” স্বামী বিবেকানন্দের ন্যায় নজরুলও যে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর বিজয় ও মুক্তির ব্যাপারে আশাবাদী, তা সুস্পষ্ট এ কয়েকটি লাইন থেকে :
ঐ দিকে দিকে বেজেছে ডংকা শংকা
নাহিক আর।
মরিয়ার মুখে মারণের বাণী
উঠিছে মার মার।
…. …. ….
শত শতাব্দী ভাঙেনি যে হাড়, সেই
হাড়ে ওঠে গান
জয় নিপীড়িত জনগণ জয়!

প্রধানত বিদ্রোহী মননের অধিকারী হলেও নজরুলের কবিতায় ভাববাদী মানসিকতা ও রোমান্টিকতারও কমতি নেই। কারণ, প্লেটো রবীন্দ্রনাথের মতো ভাববাদীদের ন্যায় নজরুলও সুন্দর, কল্যাণ ও প্রেমের আদর্শের অনুসারী। এ মহৎ আদর্শের লক্ষ্যেই নিবেদিত তাঁর চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা তথা সমগ্র কর্মকাণ্ড। কিন্তু নজরুলের আক্ষেপ এখানে যে, চিন্তার জগতে যতই আকর্ষণীয় হোক না কোন দৈনন্দিন জীবনের রূঢ় বাস্তবতার জগতে এ আদর্শের নাম-নিশানটি পর্যন্ত নেই। অভিজ্ঞতার চলমান জগতে সুন্দর মর্মান্তিকভাবে ভূলুণ্ঠিত, প্রেম বিপর্যস্ত, শৈল্পিক নান্দনিক চেতনা নিয়ত আক্রান্ত। তাই আনন্দের কবি রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে বিদ্রোহী কবি নজরুল বলতে পারেন না, “এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধুলি/অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি।” প্রেমহীন নির্মম বাস্তবতার ঘাত-প্রতিঘাতে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ; তাই তিনি পূর্বাপর রোমান্টিক আনন্দে উদ্বেল থাকতে পারেন না, বাস্তবাবস্থার তাগিদে হয়ে যান প্রতিবাদী, বিদ্রোহী। এ কারণেই তাঁর সৃজনক্রিয়ার উপাদান কোনো বিশুদ্ধ আদর্শ নয়, বরং মূর্ত বিপর্যস্ত বাস্তব। একই কারণে তিনি জ্ঞানের খাতিরে জ্ঞানচর্চা, সত্যের খাতিরে সূত্রানুসন্ধান, এক কথায় কলাকৈবল্যবাদের বিরোধী। কোনো দূরবর্তী আদর্শ নয়, চোখের সামনের বাস্তবতাই তাঁর ধ্যান-ধারণা ও কাব্যসাধনার মূল উপজীব্য। তাই তো দেখি একেবারে সজ্ঞানে, সবকিছু জেনে শুনে ভাবাবেগজড়িত কণ্ঠে কবি বলেন :
বড় কথা বড় ভাব আসেনাকো মাথায়, বন্ধু, বড় দুঃখে।
অমর কাব্য তোমরা লিখিও বন্ধু, যাহারা আছ সুখে।

এ দুঃখ ও অভিমানের কারণ এই যে মানুষ প্রেমময়, প্রেমের কাঙাল; কিন্তু জীবন ও সমাজ হিংসা-বিদ্বেষ ও নিষ্ঠুরতায় ভরপুর। এ প্রতিকূল শক্তির বিরুদ্ধে সত্য-সুন্দর-কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রাণপণ সংগ্রাম করতে করতেই কবি হয়ে গেলেন ক্লান্ত। তাই দেখি ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা মুসলিম ইনষ্টিটিউট হলে সভাপতির ভাষণে স্বাজ্ঞিক জ্ঞানসম্পন্ন সুফি সাধকের ভাষায় কবি বলেন : “বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসিনি, আমি নেতা হতে আসিনি- আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম- সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।” বুঝতে কষ্ট হয় না যে, বিদ্রোহী কবি নজরুল এখানে আর আগের সেই আপসহীন সংগ্রামী বিদ্রোহী নন, পরমসত্তার কাছে আত্মসমর্পিত একজন পুরোদস্তুর মিষ্টিক (Mystic)|। প্রতিবাদ প্রতিরোধ ছিল যাঁর আমরণ পণ, মানে অভিমানে শেষটায় তিনিই পরমসত্তার কাছে পুরোপুরি সমর্পণ করে দিলেন তাঁর বৈপ্লবিক চেতনা ও বিদ্রোহী সত্তাকে।


যাই হোক, মাত্র ২২ বছরের সক্রিয় জীবনে (১৯২০-১৯৪২) নজরুল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন যৌবনের কবি, চিরতারুণ্যের সাধক হিসেবে। এ স্বল্প সময়ে তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে অন্যায় ও অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, বিশেষত তরুণসমাজকে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন স্বদেশ, স্বাধিকার ও পৌরুষ চেতনায়। কোনো কোনো মহলের অসহযোগিতা ও বৈরিতা সত্ত্বেও দেশের যুবসমাজ তথা নিপীড়িত মানুষের আন্তরিক অভিনন্দন তিনি পেয়েছেন। আগেই বলেছি, দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে প্রতিপালিত হয়েছিলেন বলেই তিনি বুঝতেন সাধারণ মানুষের জীবন কত কায়ক্লেশের, কত দুঃখ-দুর্ভোগের জীবন। এটাই ছিল বঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার, তাঁর মানবতাবাদের মূলীভূত উপাদান। মানুষকে যেহেতু তিনি ভালোবেসেছেন, যুগ ও গণমানুষের শ্রদ্ধা যেহেতু তিনি পেয়েছেন, সুতরাং বাংলা সাহিত্যে ও বাঙালির জীবনদর্শনে তাঁর আসন চিরদিনের। নিপীড়িত মুক্তিকামী মানুষের কবি হিসেবে তাই যুগ যুগ ধরে উচ্চারিত হবে তাঁর নাম, গীত হবে তাঁর গান।

[লেখক : অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দর্শন বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, কলা অনুষদের প্রাক্তন ডিন, উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের প্রাক্তন প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সভাপতি, গোবিন্দদেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রাক্তন সহ-সভাপত]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here