করোনাকালীন মে দিবস এবং আমাদের করণীয়

0
210

মোহাম্মদ সায়েদুল হক
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৯, অনুসারে দেশে মোট শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৩৫ লাখ। খাতভিত্তিক শ্রমশক্তি-কৃষিখাতে নিয়োজিত ৪০.৬ শতাংশ, শিল্পখাতে নিয়োজিত ২০.৪ শতাংশ এবং সেবাখাতে নিয়োজিত ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মে নিয়োজিত। অনানুষ্ঠানিক খাত মানে যেখানে কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই যেমন পরিবহন শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক; যারা দিন আনে দিন খায়। মাত্র ১৫ শতাংশ শ্রমিক প্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। প্রতিবছর দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে ২৮ লাখ থেকে ২৯ লাখ নতুন শ্রমিক। কর্মে নিয়োজিত শ্রমশক্তির ৯০ শতাংশ তার পেশায় সন্তুষ্ট নয়।

এই শ্রমিক অসন্তুষ্টির প্রভাব শুধু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতা বা সেবার মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন নয়, এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব প্রতিফলিত হয় সমাজ জীবন, রাজনৈতিক জীবন, পারিবারিক জীবন এবং ব্যক্তি জীবনে। আমাদের দেশে একজন কর্মজীবীর কর্মক্ষেত্রে অসন্তুষ্টির বহুবিধ যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে। তবে মোটাদাগের কারণগুলো যদি বলি তাহলো-যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়া, পরিশ্রম অনুযায়ী মজুরি না পাওয়া, নির্ধারিত সময়ে মজুরি না পাওয়া, প্রাপ্ত মজুরি দিয়ে প্রাত্যহিক ব্যয় নির্বাহ করতে না পারা, জবরদস্তি করে অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো, ছুটি না পাওয়া, নিরাপদ কর্মপরিবেশ না পাওয়া, মর্যাদা না পাওয়া, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং বিনোদনের অভাব সর্বোপরি চাকরির কোনো নিশ্চয়তা না থাকা। অসন্তুষ্টি থেকে ব্যক্তি প্রায়শ হীনমন্যতায় ভোগে; কর্মদক্ষতা সবটুকু প্রয়োগ না করে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে; সুযোগ পেলে অসৎ পন্থা অবলম্বন করে; অধঃস্তনের সাথে অন্যায় আচরণ করে। কিন্তু আমি একটা হিসাব মেলাতে পারিনা, তাহলো স্বাধীনতার পর যেসকল ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, দাতব্য বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে সেসব প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন ফুলেফেপে এতো বড় হয়েছে যে, মাঝে মধ্যে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে বসে; সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে দ্ধিধা করেনা অথচ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সাথে ছল চাতুরির শেষ নেই। তৈরী পোশাক কারখানা, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ব্যাংক বীমা, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, আমদানি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শ্রমিক শোষণের একই চিত্র দৃশ্যমান। এদের অবস্থা দেখে স্কুলে পড়া ঐ ভাব সম্প্রসারণের কথা মনে হয়- “এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি”। এসব কারণে সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। নিজস্ব বা আত্মীয় স্বজনের প্রতিষ্ঠান না হলে পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করা কোনো ছাত্রের প্রথম পছন্দ সরকারি চাকরি।

১ মে ২০১৯, জাতীয় দৈনিকে দেখলাম ‘বাংলাদেশে তৈরী পোশাক কারখানায় শ্রমিকের মজুরি বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন্ন। জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের জরিপ ও অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থার প্রতিবেদন মতে, ‘তিন বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন শ্রমিকের মাসিক মজুরি বাংলাদেশে ১০৮, মিয়ানমারে ১৬২, পাকিস্তানে ১৮৭, কম্বোডিয়ায় ২০১ এবং ভারতে ২৬৫ মার্কিন ডলার। আর প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপকদের মাসিক বেতন বাংলাদেশে ২৮৭, মিয়ানমারে ৩৪৯, পাকিস্তানে ৪৯২ এবং ভারতে ৫৯১ মার্কিন ডলার।” আন্তার্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এক গবেষণায় বলেছে, তৈরী পোশাক কারখানার ৮০ শতাংশ নারী শ্রমিক রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। শুধু রক্তস্বল্পতাই নয়, অপুষ্টিজনিত অন্যান্য শারীরিক জটিলতায়ও ভুগছেন তারা। কারখানায় দীর্ঘদিন কাজ করার এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে বিষণ্নতাসহ শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যা দেখা দেয়। এরপরও তৈরী পোশাক কারখানার মালিকরা যখন কথা বলেন তখন মনে হয় শ্রমিকদেরকে তাঁরা সর্বস্বান্ত হয়ে সব বিলিয়ে দিচ্ছেন। সব সময় সরকারকে চাপে রাখেন আর কত কম সুদে ব্যাংক ঋণ পাওয়া যায়; ভ্যাট ট্যাক্স কত কমানো যায়; কত বেশি প্রণোদনা আদায় করা যায় সেসব নিয়ে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও মোটামুটি একই কথা প্রযোজ্য। জাতীয় এক দৈনিকে দেখলাম ২০১৯ সালে দেশের ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ৩ কোটির অধিক লোককে ঋণ দিয়েছে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) কর্তৃক প্রকাশিত ‘স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ নির্দেশিকা, ২০১৯’-এ দেখা যায় পিকেএসএফ’র সহযোগী সংস্থার সংখ্যা ২৭৭টি। ৩০ জুন ২০১৮ পর্যন্ত সহযোগী সংস্থাসমূহের সংগঠিত মোট সদস্য ১ কোটি ৩২ লাখ ও ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ১ কোটি ৩ লাখ। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ, আশার ঋণগ্রহীতা ৬৮ লাখ, ব্র্যাকের ঋণগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৫৫ লাখ। এই ঋণীদের ৯০ ভাগ নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মহিলা। করোনাকালে এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর যখন কার্যত কোনো উর্পাজন নেই তখন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের সহযোগী হয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারতো; কিন্তু তেমন কোনো লক্ষণ বা কর্মপরিকল্পনা তাদের কাছ থেকে এসেছে বলে মনে হয়না। করোনাকালে যতই দিন যাচ্ছে এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর জীবনমান নিয়ে ততই অনিশ্চয়তা বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রে আয় উর্পাজন সন্তুষ্টির শেষ কথা নয়। ব্যক্তি জীবনে একটু অবসর বা বিনোদন এখন মৌলিক উপকরণের মতোই জরুরী। ওভার টাইমের নাম করে অধিকাংশ তৈরী পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয়।

পরিবহন খাতে যুক্ত ৪০ লাখ শ্রমিকের প্রায় সকলেই দৈনিক ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করে; ১৪ থেকে ১৫ ঘন্টা পর্যন্ত। প্রায় ৫ লাখ নিরাপত্তা কর্মীর মধ্যে ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে দৈনিক শ্রম ঘন্টার কোনো হিসাব নেই। ১০ লক্ষাধিক হোটেল কর্মচারীর মধ্যে ৯৮ শতাংশকে ৮ ঘন্টার বেশি কাজ করতে হয়। দোকান কর্মচারী, ঔষধ কোম্পানি এবং কনজ্যুমার প্রোডাক্ট কোম্পানির সেলস পার্সন, ডেলিভারী ম্যান, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে কিস্তি আদায়ের সাথে যুক্ত ব্যক্তি কারোর শ্রম ঘন্টার কোনো হিসাব নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি ২ দিন হলেও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে ছুটি একদিন। ৮০ শতাংশ পরিবহন শ্রমিক, দুই-তৃতীয়াংশ নিরাপত্তা কর্মী, ৮০ শতাংশ হোটেল কর্মচারী সর্বোপরি কৃষিখাতে নিয়োজিত ২ কোটি ৩০ লাখ শ্রমিক জানেই না সাপ্তাহিক ছুটি কি জিনিস। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের ২২ লাখ রিকশাচালকের মধ্যে ৯৪ শতাংশ রিকশাচালক অসুস্থ। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ জন্ডিসে আক্রান্ত।

অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের মধ্যে রিকশাচালকের উর্পাজন অপেক্ষাকৃত ভাল। কিন্তু একজন রিকশাচালকের উপার্জন যখন পরিবারের ৪.৫ জন সদস্যদের মাঝে ভাগ হয়ে যায় তখন প্রয়োজনীয় ক্যালরির খাবার গ্রহণ আর সম্ভব হয়না। আবাসন খরচ, ছেলে মেয়ের শিক্ষা খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং সামাজিক ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে সে চলে যায় চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে। এসব কারণেই দিন দিন আমরা একটা রুগ্ন, পুষ্টিহীন, ভালোবাসাবিহীন, নিরানন্দ জাতিতে পরিণত হতে চলেছি। উচ্চবিত্তের হিসাব অবশ্য ভিন্ন। দেশের মাত্র ১০ ভাগ উচ্চবিত্তের হাতে প্রায় ৯০ ভাগ সম্পদ। এই উচ্চবিত্তের নিজেদের আরাম আয়েশের জন্য ইউরোপ আমেরিকা দুবাই সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়াতে গড়ে তুলেছে সেকেন্ড হোম। এরাই আসলে জাতির রক্ত শোষণ করে নিচ্ছে নিয়মিত। দেশকে যা দেবার তা দিচ্ছে প্রবাসী শ্রমিক, তৈরী পোশাক কারখানার রক্তশূন্য শ্রমিক, রাজনীতিমুক্ত নিরীহ কৃষক এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ এই উচ্চবিত্তের লাগাম টেনে ধরুন। যে সিআইপি আপৎকালীন সময়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানের শ্রমিককে এক/দুই মাসের জন্য নিরাপত্তা দিতে পারে না, তার কাছ থেকে দেশ কি পেতে পারে? যারা বিভিন্ন অজুহাতে বিদেশে সেকেন্ড হোম গড়েছেন তাঁদেরকে বলছি, নভেল করোনা দেখে শিক্ষা নিন সেকেন্ড হোম আপনার জন্য, আপনার পরিবারের জন্য কতখানি অনিরাপদ।

আমাদের শ্রমজীবীদের কিভাবে রক্ষা করতে হবে তা ঠিকই জানতেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে তিনি প্রণয়ন করেছিলেন জাতীয় শ্রমনীতি। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে যে সংবিধান পাশ হয় তাতে কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তির কথা, মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থার কথা এতো স্পষ্ট করে সহজ ভাষায় বলা আছে যা বুঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হবার দরকার নেই। সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিকের এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।” ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বন্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়: (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা; (খ) কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার; (গ) যুক্তিসঙ্গত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং (ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য লাভের অধিকার।” মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে সকল কর্মক্ষম নাগরিকের জন্য উৎপাদনমুখী, বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত, শোভন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সকল ক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকার ও শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে সর্বশেষ ২০১২ সালে নতুন যে শ্রমনীতি পাস করা হয়েছে তা আপনার হাতেই বাস্তবায়ন করে যাবেন; এবারের মে দিবসে শ্রমজীবীদের দিয়ে যাবেন নতুন জীবনের দিশা।

লেখক : কৃষিবিদ। মোবাইল : ০১৭৬৭-৪৯৫০২২, [email protected]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here