করোনাকালের দিনলিপি

0
217

হাসান আজিজুল হক
আজিজুল পারভেজ

জন্মের পরই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বেড়ে উঠতে উঠতে পরিচয় ঘটেছে বীভৎস কলেরা ও বসন্তের সঙ্গে। হয়েছে টাইফয়েডও। মোটকথা শৈশব থেকেই নানাভাবে মৃত্যুকে দেখেছেন হাসান আজিজুল হক খুব কাছে থেকে। কিন্তু করোনার মতো এমন অভিনব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হননি কখনোই।

৮১ বছরের শক্তিমান কথাসাহিত্যিক বললেন, ‘কলেরা, গুটিবসন্ত নির্মূল হয়েছে। টাইফয়েডও আগের মতো ভয়াবহ নয়। কিন্তু করোনা? এখন সাবান-স্যানিটাইজার দিয়ে বারবার হাত ধুতে ধুতেই দিন চলে যায়। মুখে মাস্ক সেঁটে বসে থাকি। সারাক্ষণ ভয়, কে যেন ছুঁয়ে দেয়! আমরা লড়ছি এক অদৃশ্য ভাইরাস করোনার বিরুদ্ধে। লকডাউন শেষ হলেও সবার মধ্যে ভয়, কখন কী হয়ে যায়! জীবনসায়াহ্নে এসে এ দৃশ্য দেখতে হবে, একদমই ভাবিনি। মহামারি আগেও দেখেছি। তবে এ ধারার সঙ্গে পরিচয় ছিল না।’

তাঁর ছোটবেলায় কলেরা হানা দিয়েছিল গ্রামে। একদিন শুনলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলরাম পালের কলেরা হয়েছে। দেখতে গিয়েছিলেন তাঁকে। বলরাম বলেছিল, ‘আজিজুল, কেন এসেছিস? আমি তো মরে যাব ক’ ঘণ্টা বাদে। তুই পালা।’ পালিয়েও ছিলেন। বলরাম মারা যান ওই দিনই।

সে সময় টাইফয়েডও মড়কের মতো ছিল। শৈশবের খেলার সখী মসবুদা হুট করে মরে গেলেন টাইফয়েডে। টাইফয়েডের থাবায় তিনি নিজেও মরতে বসেছিলেন। বহুদূরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন মা। সে যাত্রায় রক্ষা। জলবসন্তও হয়েছিল। বিস্তর মানুষকে মরতে দেখেছেন গুটিবসন্তে।

‘ছোটবেলায় গ্রামে কলেরা হানা দিলে বাবার কড়া নিষেধ ছিল, বাড়ি থেকে এক পাও বেরোবি না। তাই কলেরার কালে, বাড়িবন্দি থাকতে হয়েছে।’ বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘আজ এত বছর পর আবারও আমি স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। খুব বেশি অসুবিধা হচ্ছে না। ২০০৪ সালে অধ্যাপনা থেকে অবসরের পর থেকে তো আমি এমনিতেই তেমন বের হই না।’ এখন সার্বক্ষণিক সঙ্গী বই। আগে পড়া হয়নি বা পড়তে বাকি রয়েছে, সেসব পড়েই এখন সময় কাটছে। গানও শুনছেন প্রচুর। লেখালেখিও চলছে। ‘দু-একটি ছোটগল্প লিখেছি। একটি অসমাপ্ত উপন্যাস শেষ করার চেষ্টা করছি। একটি বড় উপন্যাসের সূত্র মাথায় এসেছে। শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠবে কি না জানি না। চেষ্টা করে যাব।’

ঘরবন্দি সময়ে কোন বিষয়টা সবচেয়ে মিস করছেন-জানতে চাইলে বলেন, ‘মানুষের সঙ্গ। আগে বন্ধুবান্ধবরা আসত। রাত ১১টা পর্যন্ত আড্ডা হতো। এখন কাউকে আসতে বলিও না। মানুষের সংস্পর্শ না হলে যোগাযোগটা রসহীন হয়ে যায়।’

করোনাকাল গেলে প্রথমেই কোন কাজটা করতে চাইবেন-জানতে চাইলে বলেন, ‘মানুষের সঙ্গ চাইব। একা মানুষ বাঁচে না। সম্মিলিতভাবেই বাঁচে। আদিম মানুষও একা ছিল না। নগর, মহানগর সম্মিলিতভাবেই গড়ে উঠেছে। সুতরাং সবার সঙ্গেই বেঁচে থাকব।’

তাঁর রাজশাহীর বাসায় দিন যাপন করছেন হাসান আজিজুল হক। দুই মেয়ের একজন সঙ্গে আছেন। আছেন ছেলে, ছেলের বউ ও এক নাতি। তাঁর বিশ্বাস, ‘টাইফয়েড, গুটিবসন্তের মতো করোনার প্রতিষেধকও আবিষ্কার হবে অচিরেই। জীবনঘাতী এই মারিকেও আমরা পরাজিত করব।’ বললেন, “জীবনানন্দের মতো দুঃখবাদী কবিও লিখে গেছেন, ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন; মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।’ আসলেও তাই। মারি আসবে, দুর্ভিক্ষ আসবে। তবু আমাদের সব আকাঙ্ক্ষা এই পৃথিবীর কাছে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here