করোনাকালে ঈদের অর্থনীতি

0
151

অর্থনৈতিক ডেস্ক: পবিত্র ঈদুল আজহায় হযরত ইব্রাহীম (আ.) কর্তৃক পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ইচ্ছা প্রকাশের মহান স্মৃতিকে স্মরণ করে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনমন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্তু উৎসর্গ করাকে নিছক জীবের জীবন সংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টারই প্রতীকী প্রকাশ। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এই বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে।

‘আজ আল্লার নামে জান কোরবানে ঈদের মত পূত বোধন

ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্য-গ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন’

(কাজী নজরুল ইসলাম, কোরবানি, অগ্নি-বীণা)

সামাজিক কল্যাণ সাধনে সংশোধিত মানব-চরিত্রবলের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কোরবানির মাংস গরিব, আত্মীয়স্বজন পাড়া-পড়শি ও দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করার যে বিধান তার মধ্যে নিহিত রয়েছে সামাজিক সমতার মহান আদর্শ। ঈদ উৎসবে উৎসর্গের সব আয়োজন আপ্যায়নের মর্মবাণীই হলো সামাজিক সমতা-সখ্য বৃদ্ধি এবং সম্পদ, সুযোগ ও সৌভাগ্যকে বণ্টন ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা, ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে যা নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। আত্মশুদ্ধির জন্য উৎসর্গ বা সংহার প্রকৃত প্রস্তাবে খোদা ভীতি ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় হিসেবে জীবে প্রেম বা দয়া ও সেবার প্রেরণাপ্রদায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়। করোনাকালের এই সম্মোহিত সময়ে এবার ঈদুল আজহা কীভাবে পালিত হবে তা নিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে।

ঈদুল আজহা উদ্যাপনে অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ, শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানান অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রসার ঘটে। এ উৎসবে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনসহ বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয় যা গোটা অর্থনীতি তথা দেশজ উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় শনাক্তযোগ্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি উপলক্ষ্যে জাতীয় অর্থনীতিতে এক ব্যাপক আর্থিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। গত বছর ঈদুল আজহার অর্থনীতি ছিল পিআরআইয়ের তথ্যমতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা; সেবার ১ দশমিক ০৫ কোটি গবাদি পশু জবাই হয়েছিল। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের মতে গবাদি পশু বিক্রি হয়েছিল ২৮ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকার; বাকি ১৫-১৬ হাজার কোটি টাকা ছিল পরিবহন, পর্যটন এবং বিভিন্ন পণ্য বিক্রি থেকে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাবমতে এবার ২০২০ সালে কোরবানির জন্য তৈরি প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ। করোনাকালে গত কয়েক মাসে অবিক্রীত পশুর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ লাখ, যা বাজারে আসার অপেক্ষায় আছে। তার সঙ্গে গত বছরের হাটে তোলা অবিক্রীত প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ এমনিতেই এবার চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ অনেক বেশি। মাংস বিক্রেতা সমিতির সূত্রমতে করোনায় আয় কমে যাওয়ার কারণে গবাদি পশুর চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ কমবে বলে ধরে নেওয়ার পরও পশুর চাহিদা হবে ৮০ লাখের বেশি। চাহিদা কমে যাওয়ায় পশু বিপণন, কোরবানি ও মাংস বিতরণ তিন পর্যায়েই স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের আবশ্যকতাহেতু কোরবানির পর প্রায় সমপরিমাণ পশু অবিক্রীত থেকে যাবে। এর ফলে খামারিসহ ক্ষুদ্র ব্যক্তি উদ্যোগে বিনিয়োগকৃত অর্থ উদ্ধার সীমিত হয়ে যাবে। এমন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত পশুসম্পদকে বিকল্প কোনো ব্যবস্থাপনায় মাংস রপ্তানির পথ অনুসন্ধান উদ্যোগ গৃহীত হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনলাইনে পশু কেনাবেচায় এমনকি মাংস ব্যবস্থাপনার যে উদ্যোগ গৃহীত হচ্ছে তা স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমাবে, তবে সে ব্যবস্থা পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগবে। আশা করা যায়, আগামী বছরের মধ্যে দেশে এ ধরনের পদ্ধতি প্রক্রিয়াকরণ পরিবেশ গড়ে উঠবে। অনলাইন ব্যবস্থাপনায় যাতে প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনা অনুপ্রবেশ না করতে পারে সেদিকে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে ব্যবস্থাপনাটি টেকসইকরণের স্বার্থে।

কোরবানিকৃত পশুর সরবরাহ ও কেনাবেচার শুমার ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় চাঁদা, টোল, বকশিশ, চোরাকারবারি, ফড়িয়া, দালাল, হাসিল, পশুর হাট ইজারা, চাদিয়া, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি ও কসাইয়ের খরচ এমনকি পশুর সাজগোজ বাবদও বিপুল অর্থ হাতবদল হয়; অর্থাৎ অর্থনীতিতে ফরমাল-ইনফরমাল ওয়েতে আর্থিক লেনদেন বা মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়।

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, বিক্রয় ও ব্যবহার উপলক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের কর্মযোজনা সৃষ্টি হয়। আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্যে, পাদুকাশিল্পে, পোশাক, হস্তশিল্পে এক অন্যতম উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ চামড়া সংগ্রহ-সংরক্ষণ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রতি বছর প্রায় ৮০০ কোটি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১০০-১২০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দেয়। চামড়া ব্যবসাকে উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। পত্রিকান্তরে প্রতিবেদনে প্রকাশ, প্রতিবেশী দেশ থেকে বাকিতে গরু সরবরাহ করা হতো কম দামে কাঁচা চামড়া পাচারের প্রত্যাশায়। সে চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে বেশি দামে বিদেশে রপ্তানির মুনাফা অর্জিত হতো তাদের। এবার এ খাতে সে সুযোগ বাংলাদেশকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে নিজেদের চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও উপযুক্ত মূল্যে তা রপ্তানির প্রণোদনা সৃষ্টি করেই এ পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি লাভ ঘটতে পারে। লবণ চামড়া সংরক্ষণের একটি অন্যতম উপাদান। সরকারকে সাধারণত প্রায় ৪০ হাজার টন লবণ শুল্কমুক্ত আমদানির উদ্যোগ নিতে হয় যাতে সিন্ডিকেট করে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয়।

কোরবানির পশুর মাংস আমিষ-জাতীয় খাদ্যের উপাদান এবং এ মাংসের বিলি-বণ্টন প্রক্রিয়ায় রয়েছে আর্থ-সামাজিক তাৎপর্য ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বছরের একটি সময়ে সবাই আমিষ প্রধান এ খাদ্যের সন্ধান/সরবরাহ লাভ করে। মাংস রান্নার কাজে ব্যবহৃত মসলা বাবদ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয় এই সময়ে। শহরের মানুষ আপনজনের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনের জন্য গ্রামে ছোটে। এক মাস আগে থেকে ট্রেন-বাস-লঞ্চের টিকিট বিক্রির তোড়জোড় দেখে বোঝা যায়- এর প্রসার ও প্রকৃতি। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ দামে ফরমাল টিকিট আর ইনফরমাল টাউট দালাল ও বিবিধ উপায়ে টিকিট বিক্রির সার্বিক ব্যবস্থা বোঝা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিবহন খাতে সাকল্যে ২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়েছিল। এও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। কিন্তু হায়! এবার পরিস্থিতি ও পরিবেশ ভিন্ন হওয়ায় ঈদের অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান কমে যাবে। তবে করোনার কারণে যে বিধিনিষেধ তা পরিপালনে সবার স্বার্থেই সাশ্রয় ঘটবে অনেক বাড়াবাড়ি অপচয় অপব্যয়ের।

তবে এটা ঠিক, অর্থনীতিতে মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রা লেনদেন, আর্থিক কর্মকান্ডের প্রসারই অর্থনীতির জন্য আয়। করোনাকালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রা সরবরাহ গতিশীলতা আনয়ন এখন জরুরি। ঘূর্ণায়মান অর্থনীতির গতিপ্রবাহে যে কোনো ব্যয় অর্থনীতির জন্য আয়। দেশজ উৎপাদনে এর থাকে অনিবার্য অবদান। যে কোনো উৎসব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে গতি আনে, মানুষ জেগে ওঠে নানা কর্মকান্ডে, সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থায় একটা স্বতঃপ্রণোদিত আবহ সৃষ্টি হয়। এ আবহকে স্বতঃস্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া, কঠোরভাবে দেখভাল করতে পারলে অর্থাৎ সবার সক্রিয় সহযোগিতায় সামষ্টিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখাতে পারলে, করোনাকালের এ অসুস্থ সময়েও তা অর্থনীতির জন্য আশাজাগানিয়া হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here