করোনাকালে বাংলাদেশের খাদ্যশস্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে: খাদ্য ও কৃষি সংস্থা

0
266

সালাহ উদ্দিন: করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের মজুদ ও সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও। সাম্প্রতিক সময়ে ‘র‌্যাপিড অ্যাসেসমেন্ট অব ফুড এন্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটি ইন দ্যা কনটেক্স অব কোভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এই মত প্রকাশ করে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে খাদ্য শস্যের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আগামী ছয় মাসের জন্য এই মজুদ পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে। আগাম বন্যা ও শ্রমিক সংকটের কারণে বোরো ধান সংগ্রহে অনিশ্চয়তা তৈরী হলেও সেটার সমাধান হয়েছে এবং খাদ্যশস্যের পর্যাপ্ত মজুদ তৈরী হয়েছে।

করোনাকালীন সময়ে খাদ্যশস্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যয়ের ফলে পোল্ট্রি, ডেইরী খাত চাপের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরবরাহ ব্যবস্থা নষ্ট হওয়ার ফলে অনেক খাদ্য পণ্যের দাম বেড়েছে, কিছু খাদ্য পণ্যের দাম কমলেও সামগ্রিকভাবে  খাদ্য পণ্যের দাম বাড়তির দিকে। করোনাকালীন সময়ে নতুনভাবে গরিব হওয়া লোকদের সামাজিক নিরাপত্তা খাতের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি সরকারের পক্ষে থেকে দেওয়া হলেও সেটা অপ্রতুল। এর ফলে অর্থনৈতিক সুযোগ ও খাদ্য-পুষ্টির নিরাপত্তায় ঘাটতি দেখা দেওয়ার  সম্ভাবনা রয়েছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে নতুন সব ব্যবস্থা প্রবর্তন করা ও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ও উন্নয়ন সহযোগীদের মাঝে সমন্বয় সামনের দিনগুলোর জন্য  চ্যালেঞ্জ বলে জানোনো হয় প্রতিবেদনটিতে।

রির্পোটে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩ কোটি ২০ লক্ষ মেট্রিক টন ধান ও ৫৫ লক্ষ মে. টন গমের চাহিদা রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ধান উৎপাদনের লক্ষমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৩৮৭ লক্ষ মে. টন, গম উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১২.৫ লক্ষ মে. টন, আরো ৫২ লক্ষ মে.টন গম আমদানী করতে হবে। সরকার বোরো ফসল থেকে ১৯.৫ লক্ষ মে. টন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে যা গত  বছরের প্রায় দ্বিগুণ। তাছাড়া ৭৫,০০০ টন গম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে।

রিপোর্টে জানানো হয়, করোনার  প্রভাবে ডিম, ব্রয়লার, একদিন বয়সী ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগীর বাচ্চার বিক্রয় ও দাম কমে গেছে। মুরগীর খাদ্য উৎপাদনও কমে গেছে। ভ্যাকসিন ও ঔষধের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় অর্ধেক ব্রয়লার ফার্ম দেউলিয়া হয়ে গেছে এবং নতুন করে ব্যবসা শুরু করার  সম্ভাবনাও কম। প্রায় ৭০০০ খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেয়ার মুরগীর খামারগুলো ক্রমান্বয়ে বন্ধ হয়ে যাবে যদি ডিমের দাম বৃদ্ধি না পায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ বাচ্চা, খাবার ও ঔষধের জন্য ঋণ নিয়ে থাকেন, কিন্ত এসব ঋণ ও উচ্চ ঝুঁকি থাকায় অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি পোল্ট্রি খাতের বিদ্যমান সমস্যাকে আরো প্রকট করেছে। এমনিতেই বিভিন্ন ফ্লু নিয়ে ভয় পোল্ট্রি সেক্টরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, কোভিড-১৯ সেই পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করেছে। সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, কিন্তু এসব সুবিধা পেতে সময় লাগবে এবং সেগুলো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আবার ব্যবসামুখী করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নাও হতে পারে বলে রিপোর্টে মত প্রকাশ করা হয়।

করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৯০% দুধ অবিক্রিত ছিল জানিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, ডেইরী ফার্ম চাষীরা প্রতিদিন ৩৭ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে। গোখাদ্য ও খাদ্য উপাদানের দাম বেড়েছে, কমেছে দুধের দাম। প্রক্রিয়াজাতকৃত মাংসের সরবরাহ ৫০% এরও বেশী কমে গেছে। প্রায় ৩ কোটি ৫০ লক্ষ লোক প্রাণীসম্পদ খাতের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। প্রাণীসম্পদ খাতের উৎপাদকদের জন্য আসন্ন ঈদুল আযহা একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ সময়, ২০১৯ সালের ঈদুল আযহায় ৪৮ লক্ষ গরু ও মহিষ এবং ৫৮ লক্ষ ছাগল ও ভেড়া বিক্রি হয়েছিল। এবারের ঈদে এই পরিমাণ বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

মাছের সরবরাহ অনেকটাই স্বাভাবিক রয়েছে। মাছ ও মাছজাত পণ্যের রপ্তানী সীমিত আকারে চালু রয়েছে তবে চিংড়ির রপ্তানী মূল্য ব্যাপকভাবে  হ্রাস পেয়েছে। মাছের পোনা, বাচ্চা ইত্যাদি অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে অথবা খুবই কম দামে বিক্রি হচ্ছে, বর্তমানে ১০৩৮টি প্রাইভেট হ্যাচারী ৭৩৮ মে. টন চিংড়ি পোনা উৎপাদন করে এবং ১৪৪৮৩টি হ্যাচারী ৮২০ কোটি পোনা উৎপাদন করে।

ফল সবজির বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। কৃষক শাক সবজি সাধারণ দামের প্রায় চার ভাগের একভাগ দামে বিক্রি করছেন এবং উৎপাদন খরচের ২৫-৫০% দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে এই বছর ৪.৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষাবাদ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষমাত্রা ৭২ লক্ষ মে. টন। ঢাকা শহরে এপ্রিল-আগস্ট সময়কালে প্রতিদিন ৮৫০০ টন শাক-সবজি ঢাকা শহরে প্রবেশ করে। কোভিড ১৯ এর কারণে এই সরবরাহ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হয়, খাদ্য শস্য নষ্ট হওয়া ও কৃষকদের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েই যাবে। সরকার সকল কৃষি পণ্যকে চলাচলের নিয়ন্ত্রণের মুক্ত ঘোষণা করেছে। যদি শ্রমিক, বীজ ও সারের সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকে, আগামী মৌসুমে ফল সবজির উৎপাদন ৩০% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে বলে স্থাণীয় সম্প্রসারণ কর্মী ও কৃষকরা জানান। ইউরোপ ও আমেরিকায় ফল ও শাক সবজির রপ্তানী চাহিদা হ্রাস পেয়েছে।

সরকার প্রতি ইঞ্চি জায়গায় আবাদের আওতায় আনার জন্য ৯০০০ কোটি টাকা কৃষি খাতে প্রণোদনা আকারে বরাদ্দ করেছে। বিএডিসি জানিয়েছে, আউশ ও আমন মৌসুমের জন্য বীজ তাদের কাছে রয়েছে, যা চাহিদার ১৩% পূরণ করে। বীজ ও চারা বিতরণে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সরকার ৪% সুদে ৫০০০ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। তবে স্বল্প ব্যাংকিং সময় ও অন্যান্য  কারণে এই বিতরণ প্রক্রিয়া পর্যাপ্ত গতি পায়নি। সরকার সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ১০ টাকা কেজি দরে চালও বিক্রি শুরু করেছে।

আয় কমে যাওয়া ও চাল, ডাল, গরুর মাংস ও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণে খাদ্য ক্রয়ের সক্ষমতায় প্রভাব পড়েছে, প্রায় ১৪% শহরের দরিদ্র জনগণ ও ৫% গ্রামের দরিদ্র লোকজন সরকারী সহায়তা পেয়েছেন এবং সমসংখ্যক লোক আর্থিক সহায়তার আওতাভূক্ত হয়েছেন । সরকার গৃহহীনদের আশ্রায়নের জন্য ২১৩০ কোটি টাকা, মহামারিতে কাজ হারানো লোকদের জন্য ৭৬০ কোটি টাকা, স্বাস্থ্যসেবার মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত সরকারী কর্মচারীদের স্বাস্থ্যবীমা খাতে ৭৫০ কোটি টাকা, কোভিড ১৯ রোগীদের সেবা প্রদানকারী স্বাস্থ্যখাতের ব্যক্তিদের বোনাস হিসেবে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় বিধবা স্বামী পরিত্যাক্তা, প্রতিবন্ধি, কৃষি শ্রমিক ইত্যাদি খাতে সামাজিক নিরাপত্তা বাবদ বরাদ্দ ৪০-১০০% পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। ৫০ লক্ষ দরিদ্র লোকের মধ্যে ১০ টাকা মূল্যে চাল বিক্রি করবে সরকার।

রির্পোটে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কিছু সুপারিশ করা হয় যেমন- স্বল্প মেয়াদে ধান ফসল সংগ্রহে সার্বক্ষণিক মনিটরিং নিশ্চিত করা, কৃষি পণ্য, শ্রমিক ও উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর নজরদারি বাড়ানো, পোল্ট্রি, ডেইরী ও মৎস্য খাতে তড়িৎ প্রণোদনা সরবরাহ, সরকারী খাদ্য সহায়তায় খাদ্য ও টাকার পাশাপাশি সবজি বীজ সরবরাহ, ঈদে নিরাপদ পশুর হাট স্থাপনে প্রস্তুতি গ্রহণ, নিরাপদ খাদ্য ও কোভিড ১৯ বিষয়ে সচেতনতা তৈরী, সরকারী খাদ্য সহায়তায় ডিম অন্তর্ভুক্তকরণ।

মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যদ্রব্যের দামের ওঠানামা কমাতে জেলা পর্যায়ে মনিটরিং জোরদারকরণ, কৃষি খাতে কোভিড ১৯ মোকাবিলায় পরীক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে প্রণোদনা বিতরণ নিশ্চিতকরণ, খাদ্যদ্রব্য আমদানি মনিটরিং এ টাক্সফোর্স গঠন, বোরো মৌসুমে ধানে চাল ক্রয় বৃদ্ধিকরণ, মাছ সংরক্ষণে জেলা পর্যায়ে শীতলীকরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণে ই-কমার্স ও হোম  ডেলিভারীর মত বিষয়ে সরকারী বেসরকারী পার্টনারশীপ জোরদারকরণ ইত্যাদি বিষয়ে সুপারিশ করা হয়।

[লেখক: উপজেলা কৃষি অফিসার, তিতাস, কুমিল্লা]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here