করোনাকালে মানবিক দুই নারী চিকিৎসকের গল্প

0
140

নারী ডেস্ক : করোনা মহামারির সম্মুখ সারির দুই যোদ্ধা ডা. ফারিয়া তাবাসসুম তন্বী ও ডা. রাবেয়া সুলতানা রিমি। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অসহায় ও দুস্থ মানুষদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন তারা।

ডা. ফারিয়া তাবাসসুম

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নন এমন সব রোগের রোগী যারা, করোনাকালে তারা দুর্ভোগে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি। অনেক হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা বন্ধ। কোভিড নেগেটিভ না হলে রোগী ভর্তি নেওয়া হয় না। এ সময়ে এগিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমইউ) অর্থোডন্টিস্ট বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. ফারিয়া তাবাসসুম তন্বী। নিজ থেকেই তিনি আইডিয়া জেনারেট করলেন। সাহায্য চাইলেন বন্ধু চিকিৎসকদের। তারাও তাকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে এলেন। চালু হলো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এবং অন্য রোগীদের চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসা না পেয়ে কেউ যেন ফেরত না যায় সেই ব্যবস্থাই করলেন ডা. ফারিয়া তাবাসসুম তন্বী ও ‘ফিমেল ডেন্টাল সার্জন অব বাংলাদেশ’ এর উদ্যেমী তরুণ চিকিৎসকরা।

ফারিয়া প্রথমে ৫০ জন নারী ডেন্টাল সার্জন নিয়ে একটি ফ্রি মেডিক্যাল টিম গঠন করেন। এরপরে যোগ দেন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং করোনা ডেডিকেটেড চিকিৎসক। তিনি এ টিমের সদস্যদের মোবাইল নম্বর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। যেন যে কেউ ফোন দিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে ডা. ফারিয়া তাবাসসুম গণমাধ্যমকে বলেন, শুরুটা হয়েছিল নকল নেগেটিভ রিপোর্টের কারণে। করোনা ভাইরাস রিপোর্ট নেগেটিভ বলে আমাদের ফিমেল ডেন্টাল সার্জন শুভেচ্ছার বাবার (৬৫) নিঃশ্বাসে কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও উনাকে ভর্তি করছিল না করোনা ডেডিকেটেড কোনো হাসপাতাল। তিন দিন বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ ছিল বলে অন্য হাসপাতালও ভর্তি করছিল না। তখন কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। অনলাইনে অক্সিজেনের খোঁজ পেলাম। পালস অক্সিমিটার কিনলাম। বাসায় রেখেই ইমারজেন্সি চিকিৎসা শুরু করলাম।

অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিলাম আমি আর ডা. শুভেচ্ছা। রাত জেগে ফোনেই চিকিৎসা দিতাম। আমাদের সঙ্গে অনকলে থাকতেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এভাবেই একজন-দু’জন করে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে। যাদের বেশির ভাগের বয়স পঞ্চাশের বেশি। এখন সব রোগীর অবস্থাই স্থিতিশীল। সেই সঙ্গে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।

ডা. ফারিয়া তাবাসসুম তন্বী আরও বলেন, যারা হাসপাতালে ইমারজেন্সি চিকিৎসা পাচ্ছেন না, তাদের জন্য আমরা বাংলাদেশ ফিমেল ডেন্টাল সার্জনের (এফডিএসবি) উদ্যোগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সমন্বয়ে গঠন করেছি ইমারজেন্সি কোভিড-১৯ ম্যানেজমেন্ট টিম। বাড়িতেই চিকিৎসা দিয়ে ইমারজেন্সি রোগীদের অধিকাংশ সুস্থ করা সম্ভব। অসংখ্য রোগীর চিকিৎসা থেকে ধারণা করছি ঘরে বসে চিকিৎসা নিলেই ১৪ দিনে সুস্থ হয়ে যাবেন।

এটি খুব জটিল রোগ নয়। বয়স্ক ও আগে থেকেই অন্য রোগে আক্রান্তরাও বেঁচে যাচ্ছেন। প্রথম থেকেই চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ মানুষের জীবন বেঁচে যাবে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যারা তরুণ তাদের ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার বিনিময়ে আমরা তাদের প্লাজমা ডোনেট করতে উৎসাহ দিচ্ছি। আর যারা সচ্ছল তাদের বলেছি, কোনো অভাবী পরিবারের চিকিৎসার খরচ যেন সম্ভব হলে তারা বহন করেন।

অভাবী পরিবারগুলোর নম্বর সচ্ছলদের দেওয়া হচ্ছে। তারা চাইলে তাদের মতো করে অভাবী রোগীদের সাহায্য করবেন। ফিমেল ডেন্টাল সার্জনদের এ গ্রুপ টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছি। আমার সঙ্গে সারা রাত জেগে ফিমেল ডেন্টাল সার্জন ডা. শাম্মা, ডা. পুণ্য, ডা. মিশি এবং ডা. শুভেচ্ছা প্রমুখ কাজ করে যাচ্ছেন।

ডা. রাবেয়া সুলতানা রিমি

কোভিড-১৯-এ সারা দেশ লকডাউন। প্রতিদিন যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি ডা. রাবেয়া সুলতানা রিমি।

টিউশনির জমানো টাকা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কিনে ৪০ জন রিকশাওয়ালাকে দেন। এছাড়া অন্যান্য অসহায় মানুষের পাশে খাবার নিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে ডা. রাবেয়া সুলতানা রিমি বলেন, প্রথমে রিকশাওয়ালাদের কথাই মনে এলো। তাদেরও সংসার আছে। রিকশা চালাতে না পারায় তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অভুক্ত রয়েছেন। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এ ভাবনা থেকেই বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, আলু ও পেঁয়াজ কিনে প্যাকেট করি।

প্যাকেটগুলো একটি ভ্যানে নিয়ে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার রিকশাওয়ালাদের মধ্যে বিতরণ করি। এর আগেও এ ধরনের কাজ করেছি। ২০১৬ সালে নিঝুম দ্বীপে মেডিকেল ক্যাম্প করেছি। গরিব ও দুঃখীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করেছি।

উই দ্যা ড্রিমস সংগঠনের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এ সংগঠন থেকে ২০১৭ সালে গোল্ডেন ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। এ সংগঠন থেকে শীতকালে অসহায় মানুষদের মাঝে কম্বল বিতরণ, মেডিকেল ক্যাম্প, বিনামূল্যে ওষুধ, দুর্যোগে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করেছি।

ফ্রেন্ডশিপ ঢাকা নামে একটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও তিনি জড়িত। এটি মূলত চিকিৎসক এবং মেডিকেল স্টুডেন্টদের সংগঠন। এমফিল করছেন নর্থ সাউর্থ ইউনিভার্সিটিতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here