করোনাভাইরাস: সংক্রামক ব্যাধি ও মারণাস্ত্র উৎপাদন

0
248
অনেক বিশেষজ্ঞই করোনাকে শুদু ভাইরাস মানতে নারাজ, তাঁদের মতে এটা জীবাণু অস্ত্র ।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ

১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে ২৬৩ দিনে বিশ্বের তিন কোটি ৩৩ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। এখন করোনা সারাবিশ্বকে কাঁপাচ্ছে। শুধু ফ্লু বা করোনা নয়, যুগে যুগে বহুবার ভাইরাস এসেছে এবং মানবসভ্যতাকে আতঙ্কিত ও স্থবির করে দিয়ে গেছে। তারপরও আমাদের টনক নড়েনি, টনক নড়েনি বিশ্বের পরাক্রমশালী শাসক ও নীতিনির্ধারকদের। ক্ষুদ্র একটি রাসায়নিক উপকরণ, যা ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ছাড়া খালি চোখে দেখা যায় না, তার নাম ভাইরাস। এই অদৃশ্য রাসায়নিক উপকরণটিকে মোকাবিলা করার জন্য, শনাক্ত ও প্রতিরোধ করার জন্য এবং পরাস্ত করার জন্য বিশ্বের কোনো দেশ বা শাসক যথাযথ মনোযোগ দেয়নি বা অর্থ বিনিয়োগ করেনি। অথচ বিশ্বের কুচক্রী রাষ্ট্রনায়ক ও তাদের অনুসারীরা প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র উৎপাদন, বিক্রি ও প্রয়োগ করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে শিশু-নারীসহ লাখো কোটি নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে বিশ্ব যখন কাঁপছে, তখনও থেমে নেই যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। মহামারিতে বিশ্ব দুর্দিন পার করলেও পরাক্রমশালীদের তাতে পদক্ষেপ নেই।

বর্তমানে করোনা ভাইরাসের ভয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানিকারক বিশাল ক্ষমতাবান ও ধনবান প্রিন্স পর্যন্ত ভয়ে কাঁপছেন। কেন, আপনারা আপনাদের অ্যাটম বোমা মেরে নিমেষেই লাখো মানুষ, ধনসম্পদ ধ্বংস করতে পারেন, আপনাদের ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের মারণাস্ত্র ও অ্যাটম বোমা ফাটিয়ে দেন না করোনা ভাইরাসটিকে এক নিমেষে চিরতরে উড়িয়ে দিতে পারছেন না, পারবেন না। আপনারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আর লুকিয়ে থাকাটাকে নিরাপদ মনে করছেন। বিশ্বের পরাক্রমশালীদের জানা উচিত, সাময়িক পালিয়ে ও লুকিয়ে, রুদ্ধঘরে আবদ্ধ থেকে পার পাবেন না। করোনা নতুনরূপে, নতুন আঙ্গিকে, নতুন পরাশক্তি নিয়ে আবার আসবে এবং আপনাদের-আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে, কাউকে ছাড়বে না। এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। কোটি কোটি টাকার মারণাস্ত্র না বানিয়ে ও না কিনে সেই টাকা বিনিয়োগ করে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস প্রতিরোধসহ সব ধরনের রোগ ঠেকাও, পর্যাপ্ত চিকিৎসক তৈরি করেন, হাসপাতাল বানান, স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করেন, মানুষ বাঁচান।

জৈবিক যুদ্ধবিগ্রহ তথা জীবাণুভিত্তিক রণযুদ্ধ হলো মানুষ হত্যা কিংবা বিকলাঙ্গ করার উদ্দেশ্যে সামরিক যুদ্ধে জৈবিক বিষাক্ত পদার্থ কিংবা সংক্রামক অণুজীব যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাকের ব্যবহার। বিগত চার দশকে (পেছনের কথা যদি নাও বলি) বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরাক্রমশালীরা হামলা- আক্রমণ চালিয়েছে। ব্যবহার করেছে নানারকম মারণাস্ত্র। ১৯৯২ সালে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ বিষয়ক কনভেনশন অনুমোদিত হয়। এই কনভেনশন অনুযায়ী জীবাণু ও রাসায়নিক মারণান্ত্রের উৎপাদন, মজুদ, বিস্তার ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। যেসব দেশের কাছে এসব অস্ত্র রয়েছে, তারা ওই কনভেনশন অনুযায়ী নিজেদের মজুদকৃত রাসায়নিক মারণাস্ত্রের ভাণ্ডার ধ্বংস করে ফেলতে বাধ্য। কিন্তু তাদের অনেকেই আজও যথারীতি এ ব্যাপারে তাদের অনাগ্রহ দেখিয়ে আসছে। এখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলছে গৃহযুদ্ধ। এদের পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে কোনো কোনো পরাক্রমশালী রাষ্ট্রনায়ক নাক গলিয়েই চলেছেন।

আমাদের মতো দেশগুলোর চিত্র আরও খারাপ। খাওয়ার পয়সা জোটে না, ওষুধ-পথ্যের জন্য বরাদ্দ নেই, পর্যাপ্ত ভালো চিকিৎসক নেই, নার্স নেই, সর্বসাধারণের জন্য হাসপাতাল নেই, ভাইরাস শনাক্তকরণের সাজসরঞ্জাম নেই। অথচ প্রতি বছর মারণাস্ত্র কেনা, আতশবাজি পোড়ানো, উৎসব, রংতামাশা ও বিলাসিতার জন্য কোটি কোটি টাকা ঢালা হচ্ছে। একেই বলে গরিবের ঘোড়া রোগ। বড় কষ্টে আছি, চিন্তায় আছি, আমাদের জন্য, মানুষের জন্য এবং সারাবিশ্বের সব অসহায় নিরীহ মানুষের জন্য। কিন্তু পরাক্রমশালীরা কি এসব কথা ভাবে, না বুঝে?

বাংলাদেশ ছোট একটা দেশ। জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ। অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা এবং দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে একটা সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করেছিলাম স্বাধীনতা। তারপর থেকে চলছে এগিয়ে যাওয়ার লড়াই। জন্মলগ্নেই বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে মূল অনুষঙ্গভুক্ত করেছিল- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা বা শত্রুতা নয়। এই অঙ্গীকারও রয়েছে আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে- আমরা কারও সঙ্গে সামরিক জোটে যাব না। কারও বৈশ্বিক রণকৌশলের অংশীদার হবো না। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, আমরা কি আমাদের অঙ্গীকারে শেষ পর্যন্ত অটল থাকতে পারব? বিকাশমান অর্থনীতির দেশ আজ করোনাভাইরাসের থাবায় ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে। জনস্বাস্থ্যগত সংকট তো প্রকট হচ্ছেই, এর সঙ্গে প্রকট হচ্ছে অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকটও। মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগুক মানুষ মারার আয়োজনে নয়, মানুষকে রক্ষার প্রয়োজনে। এই যে নানারকম রোগব্যাধি কিংবা সংক্রামকের প্রকোপ বাড়ছে, এর গোড়ায় রয়েছে মারণাস্ত্রের নানারকম ব্যবহার কিংবা উৎপাদন প্রক্রিয়াজাতকরণের বিষক্রিয়া। মারণাস্ত্র উৎপাদন বন্ধ হোক, সংক্রামক ব্যাধি ঠেকাতে পরাক্রমশালীদের মধ্যে শুভবোধের উদয় হোক। মানবতা আজ নানাভাবেই বিপন্ন। মানুষকে আতঙ্কমুক্ত-বিপদমুক্ত করতে দরকার সম্মিলিত প্রয়াস।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও ফার্মাসি বিজ্ঞানের গবেষক
(সংকলিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here