করোনার আশীর্বাদ, বিশ্বজুড়ে কমেছে চুরি-ডাকাতি-খুন!

0
215

অনলাইন ডেস্ক : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবসভ্যতার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে নভেল করোনাভাইরাস। দেশে দেশে চলছে লকডাউন, ঘরে বন্দি মানুষ। তবুও প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। আগামী দিন কী অপেক্ষা করছে কেউ জানে না। এমন দমবন্ধ পরিস্থিতিতেও বড় একটা সুখবর নিয়ে এসেছে করোনা। সেটা হল বিশ্বজুড়ে অপরাধের মাত্রা কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে চুরি, ডাকাতি,ছিনতাই,মাদকের মতো অপরাধ।

আমেরিকার অন্যতম সহিংস শহর শিকাগো, সেখানে গত কয়েক সপ্তাহের মাদক সংক্রান্ত অপরাধ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। শহরটিতে অনন্য অপরাধও কমেছে প্রায় সমান হারে। তবে ফৌজদারি আইনজীবীরা বলছেন, এটা অস্বাভাবিক,অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় ড্রাগ ডিলাররা সুসময়ের অপেক্ষায় আছে। তাদের সামনে এখন এই ছাড়া কোন বিকল্প পথ খোলা নেই।

শিকাগোর একজন ক্রিমিনাল লয়ার জোসেফ লোপেজ বলেছেন, ‘আমি যে প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি তা হল তারা যেসব জায়গায় এসব অবৈধ মাদক বিক্রি করতো সেগুলো এখন চালাতে পারছে না। মানুষজন বাইরে বেরুচ্ছে না ফলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।

সামগ্রিকভাবে মহামারিটি আঘাত হানার পরে শিকাগোর অপরাধের হার ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বব্যাপী শহরগুলিতে ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে ব্যবস্থা গ্রহণের পরে গত কয়েক সপ্তাহে আশ্চর্যজনকভাবে অপরাধের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে সর্বাধিক পর্যায়ের সহিংসতা রয়েছে এমন অঞ্চলের মধ্যেও এখন কম লোক নিহত হচ্ছে এবং কম ডাকাতি হচ্ছে।

তবুও, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা অপ্রত্যাশিত ঘরোয়া সহিংসতার বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। করোনা পরবর্তী সময়ে যখন বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হবে তখন অবস্থা কেমন হবে সেটা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।

কোনও শহরে অপরাধের প্রবণতার ক্ষেত্রে হঠাৎ দুই অংকের পরিবর্তন দেখা সত্যিই খুব বিরল ঘটনা। এমনকি অনেক দীর্ঘ সময় ধরেও এমনটা হয় না।। নিউইয়র্ক সিটিতে ১৯৯০এর দশকের অপরাধ হ্রাসের সময় তিন বছরে মধ্যে ৪০ শতাংশ অপরাধ কমেছিল। সেটা ছিল আমেরিকান ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম পরিবর্তন। তবে এবার একই মাত্রার অপরাধ প্রবণতা কমেছে মাত্র কয়েক সপ্তাহে। এটা খুবই আশ্চর্যজনক।

ল্যাটিন আমেরিকা জুড়ে দশকের পর দশক ধরে চলা অপরাধও হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। হত্যাকান্ড কমে গেছে,গ্যাংস্টাররা আর আগের মতো হয়রানি করছে না। সান সালভাদোরের ৪৭ বছর বয়সী এডুয়ার্ডো পেরডোমো নামের একজন নির্মাণকর্মী বলছিলেন,’আমি মনে করি তারা ভাইরাস ধরাতে ভয় পেয়েছে এবং তারা বের হচ্ছে না।’

এল সালভাদোরে কয়েক বছর ধরে গড়ে প্রতিদিন দুটি করে খুন হতো। গত বছরও দেশটিতে ৬০০ খুনের ঘটনা ঘটেছিল। তবে করোনা এসে সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহে সেখানে খুনের ঘটনা একটিও নেই। করোনার কারণে অপরাধ কমে গেছে বলেই সবাই মনে করছেন।

একই দৃশ্য ভারতেও। দেশটিতে চলছে ২১ দিনের লকডাউন। মহামারি করোনা সংক্রমণ রুখতে ভারত সরকারের এমন পদক্ষেপে কলকাতায় গত ১০ দিনে অপরাধের মাত্রা কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। কলকাতার যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মুরলিধর শর্মা জানিয়েছেন, বছরের প্রথম দুই মাসে সংগঠিত অপরাধের তুলনায় প্রায় অর্ধেক অপরাধ হয়েছে গত ১০ দিনে। কেবল ডাকাতি বা ইভটিজিংই নয়, পকেটমার কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনাও হ্রাস পেয়েছে অনেকটাই।

অপরাধের হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে বাংলাদেশেও। করোনা ভাইরাসের কারণে থানাগুলোতে অপরাধ রেকর্ডের হার কমে গেছে। শহর-গ্রামে সর্বত্রই একই অবস্থা। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পথেঘাটে মানুষের কম চলাফেরা করা এবং বেশির ভাগ সময় ঘরে থাকার কারণে অপরাধ কম হচ্ছে। সারাদেশের ৬৪০টি থানায় প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৪০ হাজার অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করা হয়ে থাকে। তাতে প্রতিদিনে গড়ে প্রায় ৪০০টি অপরাধের ঘটনা রেকর্ড হতো। আর এই অপরাধের ঘটনা সাধারণত গ্রামাঞ্চলের থেকে শহরে বেশি হতো। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কারণে গত মাস থেকে তা হ্রাস পেয়েছে।

তবে এ পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই সময়ে অনেক মানুষ যদি বেকার হয়ে পড়ে তাহলে ভাইরাস আতঙ্ক শেষ হওয়ার পর অপরাধ আবার বেড়ে যাবে। অভাবী মানুষের জমানো টাকা শেষ হলে তারা আয় রোজগারের জন্য মরিয়ে হয়ে উঠবেন। তখন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।

করোনার কারণ দরিদ্র মানুষ হয়তো কিছুদিন ঘরে থাকবেন। কয়েক দিনের মধ্যে তাদের জমানো টাকা শেষ হয়ে গেলে তারা পথে নামবেন। এতে করে ওই সময়ে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাবে। তারা কাজ না পেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়বেন। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হবে।

করোনার তান্ডবে বিশ্বজুড়ে বন্ধ হয়ে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনার যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তাতে ৩৩০ কোটি কর্মক্ষম মানুষের আংশিক বা পুরোপুরি বেকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন সংকট বিশ্বে আর আসেনি বলে বলছে জাতিসংঘের এই সহযোগী সংগঠন। এমন বাস্তবতায় করোনায় জীবিকা হারানো মানুষের সুরক্ষায় সরকারগুলি যদি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয় তাহলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পৃথিবী অপরাধের অভয়ারণ্য হয়ে উঠবে।
সূত্র- ওয়ান নিউজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here