করোনার এই মহামারির মাঝে ‘ডেঙ্গি’ কিন্তু কড়া নাড়ছে

0
503

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
রোগটিকে আমরা সবাই ‘ডেঙ্গু’ নামেই চিনি। কিন্তু এর আসল উচ্চারণ ‘ডেঙ্গি’ (Dengue)। করোনার এই বৈষ্যয়িক মহামারিতে সারা পৃথিবী আজ বিপর্যস্ত। আমাদের দেশেও করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এবং এই রোগে মৃত্যুর সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এরই মধ্যে কিন্তু ডেঙ্গির মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। গত বছর ডেঙ্গির ভয়াবহতা আমরা দেখেছি। এই করোনাকালীন সময়ে এতকাল আমরা হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মানা, হাত ধোয়া, মাস্ক পরা ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। এখন কিন্তু এর পাশাপাশি ডেঙ্গি নিয়েও আমাদের সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।

ডেঙ্গি কী?
ডেঙ্গি একটি মশাবাহিত রোগ, যা ডেঙ্গি ভাইরাস দ্বারা হয়ে থাকে। এই ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ (serotype) রয়েছে। যথা: DEN-1, DEN-2, DEN-3, DEN-4. প্রতিটি সেরোটাইপ দিয়ে একটি মানুষের জীবনে একবারই ডেঙ্গি রোগ হয়। অর্থাৎ কারো যদি একবার এই DEN-1 সেরোটাইপ দিয়ে ডেঙ্গি জ্বর হয়, তাহলে পরবর্তীতে এই DEN-1 বাহী কোনো মশা একজন মানুষকে কামড়ালে তার আর ডেঙ্গি হবে না। সুতরাং সেই হিসেবে একটি মানুষের জীবনে সর্বোচ্চ ৪ বার ডেঙ্গি হতে পারে। আমাদের দেশে সাধারণত জুন-জুলাই মাস থেকে ডেঙ্গির সংক্রমণ শুরু হয় এবং তা অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তবে বিগত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে যে জুন-জুলাইয়ের বেশ আগে থেকেই আমাদের দেশে ডেঙ্গির সংক্রমণ ঘটছে।

ডেঙ্গির বাহক:
ডেঙ্গি এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই এডিস মশার দুটি প্রজাতি Aedes aegypi, Aedes albopictus মূলত এই ডেঙ্গি ভাইরাসের বাহক। মশাগুলোর আকৃতি কিছুটা ছোট। এই মশাগুলো সাধারণত দিনের বেলায় বিচরণ করে। ডেঙ্গি মশা সাধারণত কোথাও জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। এই ডিমগুলো থেকে সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই লার্ভা বের হয়ে আসে। এই ডিমগুলো শুকনো পরিবেশে প্রায় এক বছর পর্যন্ত জীবন্ত থাকতে পারে। পরবর্তীতে কখনও যদি পানির সংস্পর্শে আসে তখন ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডিম থেকে লার্ভা বের হয়। শুধু তাই নয় ডেঙ্গি ভাইরাসবহনকারী এডিস মশা যে ডিমগুলো পারে সেখান থেকে জন্ম নেওয়া মশায় জন্মগতভাবেই এই ডেঙ্গি ভাইরাস থাকে। অর্থাৎ, সেই মশাগুলোকে ডেঙ্গি ভাইরাসের বাহক হবার জন্য নতুন করে কোনো ডেঙ্গি রোগীকে কামড়াতে হয় না।

ডেঙ্গির উপসর্গ:
হঠাৎ করে জ্বর দিয়ে এই ডেঙ্গি রোগ শুরু হয়। জ্বর ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। জ্বর সাধারণত দুই থেকে সাত দিন থাকে। সাথে মাথা ব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা থাকে, শরীর ব্যথা থাকে। চার থেকে পাঁচ দিন পর শরীরে র্যাস দেখা দেয়। এর পাশাপাশি খাবারে অরুচি দুর্বলতা পেটে ব্যথা এসব উপসর্গও থাকতে পারে।

ডেঙ্গির ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ কী?
অনেকক্ষেত্রে অসুস্থতার ৩-৪ দিনের মাথায় জ্বর কমে যায় তখন কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে এই সময়কে বলে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ (Critical phase). এই সময় দেখা যায় রক্তের প্লেটলেটের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে, রক্তনালীর মধ্যে রক্তের তরল অংশ বের হয়ে যায়, ফলে রক্ত ঘন হতে থাকে, যা রক্তের haematocrit পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়। রক্তের তরল অংশ বের হয়ে যাবার কারণে রক্ত চাপ কমে যায়, এমনকি রোগী শকে চলে যেতে পারে। সুতরাং কোনো ডেঙ্গি রোগীর যখনই জ্বর কমতে থাকবে তার পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় এই জটিলতাগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কারো যদি এই জটিলতাগুলো দেখা যায় তাহলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে শিরা পথে স্যালাইন দিতে হবে অন্যথায় রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে এমনকি জীবনহানিও ঘটতে পারে।

রোগী ক্রিটিকাল ফেজে যাচ্ছে কিনা তার লক্ষণ:
রোগী ক্রিটিকাল ফেজে যাচ্ছে কিনা তা নিচের এই চিহ্নগুলো দেখে বোঝা সম্ভব। যেমন:

  • বারবার বমি হওয়া,
  • পেটে ব্যথা,
  • একদম নেতিয়ে পড়া বা প্রচণ্ড অস্থির হয়ে যাওয়া। আচরণগত অস্বাভাবিকতাও পরিলক্ষিত হতে পারে।
  • মাথা ঘোরানো বা মাথার ভিতর হালকা বোধ হওয়া,
  • হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া,
  • শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। প্রসাব পায়খানার সাথেও রক্ত যেতে পারে।
  • সুতরাং ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কোনো রোগীর এই সমস্যাগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ।

ডেঙ্গি নাকি করোনা?
ডেঙ্গি এবং করোনা উভয়ই ভাইরাস দ্বারা সংঘটিত রোগ। উভয় রোগের উপসর্গের মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। করোনার প্রধান উপসর্গ জ্বর, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। কিন্তু ইদানিং প্রায় পরিলক্ষিত হচ্ছে যে করোনায় আক্রান্ত অনেকেরই কাশি শ্বাসকষ্ট গলাব্যথা ছাড়াও ভিন্নধর্মী কিছু উপসর্গ প্রকাশ পচ্ছে। যেমন: জ্বর অথবা জ্বরজ্বর ভাব অনুভব করা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা, খাবারের অরুচি ইত্যাদি। দেশে যেহেতু করোনার মহামারি চলছে। সুতরাং এই উপসর্গগুলো থাকলে আমরা করোনার কথাটাই প্রথমে চিন্তা করি। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই উপসর্গগুলো একই সাথে ডেঙ্গি রোগেরও উপসর্গ। সুতরাং কারও এই রকম উপসর্গ দেখা দিলে আমরা যেন ডেঙ্গির কথা ভুলে না যাই।

চিকিৎসা:
জটিলতা দেখা না দিলে ডেঙ্গির চিকিৎসা বাড়িতে বসেই নেওয়া সম্ভব। এই সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন ন্যুনতম ৬ গ্লাস পানি পান করা উচিত। পানি ছাড়াও তরল হিসেবে ফলের রস, ডাবের পানি, দুধ, খাবার স্যালাইন ইত্যাদি পান করা যেতে পারে। জ্বর এবং শরীর ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ঔষধ খাওয়া যাবে না। জ্বরের জন্য ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পরপর ১-২টি প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি মাথায় পানি দেওয়া যাবে, কপালে জলপট্টি দেওয়া যাবে বা শরীর স্পঞ্জ করে দিতে হবে।

প্রতিরোধ:

  • বাড়ির আশপাশে, বারান্দায় অথবা ছাদে কোথাও যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • বাড়ির আশপাশে ঝোপঝাড় আগাছা এসব পরিষ্কার করতে হবে।
  • ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করতে হবে।
  • মশা যেন কামড়াতে না পারে সেজন্য ফুলস্লিভ জামা পরিধান করা যেতে পারে।

[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here