করোনায় আতংক নয়, চাই সহযোগিতা

3
323

করোনা ভাইরাস এখন পৃথিবীতে ছড়িয়ে গেছে। হয়ে গেছে এপিডেমিক, এর দায় অনেকেই বিশ্বায়নের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন এবং বলতে চাচ্ছেন সারা পৃথিবীতে এরকম রোগ বিস্তার শুধুমাত্র বিশ্বায়ন বন্ধ করে দিলেই সম্ভব। দেয়াল বানাও, লোকজনের চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করো, ব্যবসা বন্ধ কর। শর্ট টার্ম কোয়ারেন্টাইন এপিডেমিক বা মহামারি আটকানোর ক্ষেত্রে জরুরি, কিন্তু লম্বা সময়ের জন্য কোয়ারেন্টাইন কোনো কাজের কথা নয়। লম্বা সময় মানুষের এরকম পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাটা অর্থনৈতিক ধ্বস ছাড়া সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে কোনো সত্যিকারের সুরক্ষা দেবে না। বরং করতে হবে এর উল্টোটা। এই ধরনের মহামারি মোকাবিলার আসল অস্ত্র পৃথকীকরণ নয়, অস্ত্র হচ্ছে সহযোগিতা।

বর্তমান যুগের এই বিশ্বায়নের আগেও মহামারিতে কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে বিমান বা কোনো ক্রুজশিপ ছিল না, তবুও ব্ল্যাক ডেথ পূর্ব এশিয়া থেকে পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়েছে মোটামুটি এক দশকের মাঝেই। ওতে মৃত মানুষের সংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি থেকে থেকে ২০ কোটির মধ্যে। ইউরোশিয়া এলাকার মোটামুটি চার ভাগের এক ভাগ মানুষ, ইংল্যান্ডে মারা গিয়েছিল প্রতি দশজনের চারজন। ফ্লোরেন্সে ১ লাখ মানুষের মধ্যে মারা গিয়েছিল ৫০ হাজার মানুষ।

১৫২০ এর মার্চে ফ্রান্সিসকো দ্য এগ্যুইয়া- নামেন মেক্সিকোতে। লোকটা ছিল স্মলপক্সের ক্যারিয়ার, এই একজন মাত্র মানুষ তখন মেক্সিকোতে স্মলপক্স নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময় সেন্ট্রাল আমেরিকায় কোনো ট্রেন, বাস কিংবা গাধাও ছিল না। তাও মোটামুটি ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা সেন্ট্রাল আমেরিকা স্মলপক্স একদম লন্ডভন্ড করে ফেলল। কিছু সূত্রানুসারে জানা যায় মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিল তখন।

১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে গোটা পৃথিবীর একেবারে দুর্গম জায়গাতেও পৌঁছে গিয়েছিল। ৫০ কোটি মানুষ ওতে আক্রান্ত হয়। সংখ্যাটা হচ্ছে ওই সময়ে পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষের মোট সংখ্যার চার ভাগের এক ভাগেরও বেশি।

তথ্যসূত্রানুযায়ী ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মানুষ এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তাহিতি দ্বীপে মারা গিয়েছিল মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ এবং সামোয়াতে ২০ শতাংশ মানুষ। সব মিলিয়ে এই প্যানডেমিকে দশ মিলিয়নের বেশি-সম্ভবত সংখ্যাটা ১০০ মিলিয়নের কাছাকাছি। মানুষ মারা গিয়েছিল এক বছরেরও কম সময়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ চার বছরের ধ্বংসযজ্ঞেও এত মানুষ মারা যায়নি।

১৯১৮ সালের পর পেরিয়েছে এক শতক, এই সময়ে মানব প্রজাতি মহামারির সামনে আরো খোলামেলা হয়ে পড়েছে। কারণ, বাড়ছে মানুষের সংখ্যা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিও হয়েছে চরম মাত্রায়। প্যাথোজেনিক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার জন্য আধুনিক মেট্রোপলিটন সিটি টোকিও বা মেক্সিকো সেই মধ্যযুগের ফ্লোরেন্সের চাইতে শিকারের লোভনীয় জায়গা। তার উপর এখনকার গ্লোবাল ট্রান্সপোর্ট সেই ১৯১৮ সালের চাইতে অনেক বেশি দ্রুতগতির। তাই বলা যায় আমরা আসলে সংক্রামক রোগের এক নরকের ভেতর আছি, যেখানে প্লেগের মতো একটার পর আরেকটা মহামারি আসতেই থাকবে।

যাই হোক, মহামারির প্রকোপ এবং এর প্রভাব আসলে কমেছে অনেকখানি। একবিংশ শতাব্দীতে এইডস এবং ইবোলা ভাইরাস মহামারির চেহারা নিলেও সেই আগের মতো এত পরিমাণে মানুষ মেরে ফেলতে পারছে না। এর কারণটা হচ্ছে জীবাণুর বিরুদ্ধে মানুষের হাতে এখন যে অস্ত্রটি আছে তা আইসোলেশন নয়- অস্ত্রের নাম ইনফরমেশন, তথ্য। মানব সভ্যতা এখন মহামারির বিরুদ্ধে জিতে যাচ্ছে, কারণ, এই জীবাণু আর চিকিৎসকদের মধ্যকার যুদ্ধে জীবাণুরা অন্ধের মতো নির্ভর করে মিউটেশনের উপর আর চিকিৎসকেরা নির্ভর করেন ইনফরমেশন বা তথ্যের সায়েন্টিফিক অ্যানালাইসিসের ওপর।

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here