করোনায় ঝুঁকিতে পোলট্রি ও কৃষি খাত, জোড়ালো হচ্ছে প্রণোদনার দাবি

1
233

অনিরুদ্ধ রুদ্র: করোনা মহামারির প্রভাবে হুমকিতে পড়েছে দেশের কৃষি ও পোলট্রি খাত। রপ্তানি খাতের পাশাপাশি এই খাতেও প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠনের নেতারা। না হলে এই খাতের কয়েক লাখ সুবিধাভোগীকে পথে বসতে হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন তারা।

পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, কিছুদিন আগেও খামারের একেকটা ডিম ৮ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। তা অর্ধেক নেমে একেকটা ৪ থেকে ৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির ব্যবসায়ও নেমেছে ধস। এখন তা পানির দরে, কেজি প্রতি ৪৪ থেকে ৫৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। করোনার প্রভাবে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ডিম আর মুরগির ব্যবসায় এমন মন্দা লেগেছে বলে জানিয়েছেন খামারিরা।

দেশের করোনা ভাইরাস ঠেকাতে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার পর যেসব অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে, এর মধ্যে পোলট্রি খামারিরা অন্যতম। খামারে মুরগি ডিম পাড়ছে, বিক্রি হচ্ছে না। আলাদা করে রাখা ব্রয়লার মুরগির ওজন বাড়ছে, কিন্তু কেনার লোক কম।

খামারের মালিকদের দাবি, একটি ডিম উৎপাদনে খরচ ৬ টাকার মতো। এখন ব্রয়লার মুরগির কেজি প্রতি উৎপাদন খরচ ৯০ টাকার কিছু বেশি। মালিকেরা বলছেন, দাম যখন বেড়ে যায়, তখন চাইলেই উৎপাদন বাড়িয়ে বাড়তি টাকা আয় করা যায় না। আবার যখন কমে যায়, তখন চাইলেও তাৎক্ষণিক উৎপাদন কমিয়ে ফেলা যায় না। ফলে লোকসান অবধারিত।

তবে ঢাকার বাজারে খুব একটা কমেনি ডিম ও ব্রয়লারের দাম। ঢাকায় ফার্মের মুরগির বাদামি ডিম প্রতি ডজন ৮৫ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অবশ্য পাড়া-মহল্লার কোনো কোনো দোকানে দাম ডজন প্রতি ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। আর ব্রয়লার মুরগি কেজি প্রতি ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।

বাংলাদেশ পোলট্রি খামার জাতীয় পরিষদ প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মুরগি ও ডিমের দাম সংগ্রহ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। ৩১ মার্চের প্রতিবেদনে দেখা যায়, খামার পর্যায়ে সাদা ডিমের প্রতিটির দাম খামারিরা ৪ টাকা ২০ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৬০ পয়সা পর্যন্ত পেয়েছেন। আর বাদামি ডিমের দাম মিলেছে ৫ টাকা ২০ পয়সা থেকে ৫ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত। একইভাবে ব্রয়লার মুরগি বিভিন্ন জেলায় ৬০ টাকা, ৮০ টাকা ও ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে।

মুরগির দাম কমে যাওয়ায় এক দিন বয়সী বাচ্চার চাহিদায় ধস নেমেছে। হ্যাচারির মালিকেরা প্রতিটি ১ টাকা দরে বাচ্চা দিতে চাইলেও কেনার মতো খামারি পাওয়া যাচ্ছে না। খামারিরা যদি এখন খামার বন্ধ করে দেন, তাহলে কিছুদিন পরেই আবার মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি কো-অর্ডিনেশন কমিটির (বিপিআইসিসি) সভাপতি মশিউর রহমান জানিয়েছেন, মুরগির বাচ্চা এখন মেরে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। কারণ, এক টাকা দাম দিয়েও কেউ নিচ্ছে না। দেশে ৭০ হাজার মতো ছোট-বড় খামার আছে উল্লেখ করে মশিউর রহমান আরও বলেন, খামারিরা বাচ্চা ওঠালে তাকে খাওয়াতে হবে। বিদ্যুৎ, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। কিন্তু মাংসের দাম নেই। আর পরিস্থিতি কবে ঠিক হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে বিনা মূল্যে বাচ্চা নিয়েও কেউ খামার চালু রাখতে চায় না।

মশিউর রহমান বলেছেন, শুধু রপ্তানি খাতকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়া হলো। আর কৃষি খাতকে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে সেটা মৌখিকভাবে। খামারিরা এ ধরনের দুর্যোগে কখনোই কিছু পায়নি।

পোলট্রি খাতের মতো একই অবস্থা কৃষিতেও। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কাঁচাবাজার বগুড়ার মহাস্থান। গত ২৯ মার্চ ওই বাজারে বগুড়ায় বেগুন দুই টাকা, মুলা এক টাকা, কাঁচা মরিচ ও করলা ১০ টাকা, শসা চার টাকা, টমেটো পাঁচ টাকা, ফুলকপি পাঁচ টাকা, বাঁধাকপি তিন টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। মাঝারি সাইজের মিষ্টি কুমড়া বিক্রি হয়েছে ৭-৮ টাকায়।

আড়তদাররা বলছেন, করোনার প্রভাব পড়েছে মহাস্থান পাইকারি বাজারে। এ বাজারে দুই থেকে তিন হাজার পাইকার আসতো। এখন পাইকারের সংখা ২০০-৩০০ জন। তাও দূরের পাইকার নয়। এতে চরমভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষকরা।

বগুড়া শেরপুরের সালপা গ্রামের বশির উদ্দিনসহ ৭-৮ জন কৃষক পিকআপ ভাড়া করে বেগুন, মুলা, টমেটো, ফুলকপি, মিষ্টি কুমড়া, শসা ও করলা নিয়ে ওইদিন মহাস্থান পাইকারি বাজারে আসেন। তারা যে পরিমাণ পণ্য নিয়ে যান তা বিক্রি করে পিকআপের ভাড়ায় উঠেনি। বরং আড়ৎ ভাড়া ও খাওয়া খরচসহ যে টাকা ব্যয় হয়েছে তা বাড়িতে গিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে। এখান থেকে পাইকাররা সবজি কিনে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অনান্য স্থানে বিক্রি করেন।


শিবগঞ্জের টেপাগাড়ির কৃষক খোরশেদ বলেছিলেন, ‘মুলা, কাঁচা মরিচ, বেগুন, শসা জমিতেই নষ্ট হবে। তাই হাটে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু পাইকার কম থাকায় মুলা দুই টাকা কেজি, কাঁচা মরিচ ১০ টাকা কেজিদরে বিক্রি করেছি। কোনো হরতালেও এত কম দামে বিক্রি করিনি।’

বগুড়া মাটিডালি গ্রামের ইয়াকুব আলী জানিয়েছিলেন, ক্ষেত থেকে আর টমেটো তুলবো না। টমেটো পচে জমিতে পড়লে সার হবে। বিক্রি করলে লোকসান। কারণ পাঁচমণ টমেটো তুলতে দুইজন লোক লাগে। তাদের মজুরি দিতে হয় ৮০০ টাকা। এখন গাড়ি চলে না। সে কারণে ভ্যানে করে পাঁচ মণ টমেটে মহাস্থান নিতে ৫০০ টাকা লাগবে। প্রতি কেজি টমেটো পাঁচ টাকা দরে বিক্রি করলে পাঁচ মণ টমেটোর দাম আসে ১০০০ টাকা। এখানেই লস ৩০০ টাকা। এছাড়া একজন মানুষের খাওয়া দাওয়াসহ আরও ১০০ টাকা ধরলে মোট লোকসান হবে ৪০০ টাকা।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, দেশে করোনা সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হলে অন্যান্য খাতের মতো কৃষি খাতেও নেতিবাচক প্রভাবে পড়তে পারে। তবে কৃষি ও পোলট্রি খাতের জন্য এখন পর্যন্ত কোন প্রণোদনার ঘোষণা আসেনি সরকারের পক্ষ থেকে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here