করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ

1
291

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এখন বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। তাই এর প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী যে দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে দেশের অভ্যন্তরেও ভাইরাসটির সংক্রমণ বৃদ্ধির শঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপকাঠিতে করোনা সংক্রমণের যে চারটি স্তরের কথা বলা হয়েছে, সেখানে কমিউনিটি সংক্রমণের পর্যায়কে তৃতীয় স্তরে প্রবেশ বলে অভিহিত করা হয়। এ পর্যায়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এখন থেকে যথাযথ, সক্রিয় ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা না নিলে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং সামগ্রিকভাবে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ কার্যত কঠিন হয়ে পড়বে। কেননা করোনা ভাইরাস যদি কমিউনিটি পর্যায়ে পৌঁছে, তবে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ডের পরিস্থিতি থেকে আমরা স্পষ্ট ধারণা করতে পারি যে, কীভাবে এ মহামারী দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।

করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। এদিকে ডব্লিউএইচও বলছে, করোনা মোকাবিলায় লকডাউনও যথেষ্ট নয়। উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে রোগটির উৎপত্তিস্থল চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে কর্তৃপক্ষ প্রথম কঠোরভাবে লকডাউন ব্যবস্থা জারি করে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে উহানে লকডাউন ঘোষণার পর শহরে ঢোকা ও বেরোনো বন্ধ হয়ে যায়; নিষিদ্ধ হয় অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় বের করা। খোলা রাখা হয় শুধু খাবার ও ওষুধের দোকান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটি বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেন। লকডাউনের প্রভাব কতটা কী হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকলেও এর সুফল পায় চীন। একই পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুর। তাই বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের লকডাউনের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশেষ করে বিদেশফেরত নাগরিকদের যথাযথভাবে সঙ্গনিরোধে রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা চাই। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব-পরবর্তী আমরা যথেষ্ট সময় পেয়েছি। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আক্রান্ত দেশগুলো থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনকারী প্রবাসীদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণে কোয়ারেন্টিন করতে সক্ষম হলে পরিস্থিতি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণে থাকত বলেই অনুমেয়। চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতিটি সংস্থার সমন্বয় ও প্রস্তুতি কাম্য। তাছাড়া ঘন জনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ প্রচণ্ড ঝুঁকির মুখে। তাই করোনার সংক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ ও সমন্বয়ের পাশাপাশি আক্রান্ত রোগী শনাক্তকরণের পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনীয় মাস্ক, স্যানিটাইজার ও ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সন্দেহভাজন সবাইকে পরীক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। পরীক্ষার গুরুত্বকে কোনোভাবে ছোটো করে দেখা যাবে না। পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই।

দেশে সীমিত আকারে জনসাধারণের চলাচল নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং কিছু এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। প্রয়োজনে আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে লকডাউনের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে লকডাউনের আওতায় থাকা মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের কাজগুলো কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা চাই। সরকারের পাশাপাশি এক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গণপরিবহন ও গণপরিসর এবং সংক্রমণের হটস্পট নিয়মিত জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মজুদদারি বন্ধ করে ন্যায্যমূল্যে বিক্রয়ের বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। নিম্ন ও আয় হারানো মানুষদের জন্য রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। যাদের জীবিকা হুমকির মুখে, তাদের জন্য বিশেষভাবে অর্থনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।

চলমান পরিস্থিতি বিবেচনাপূর্বক সংক্রমণের সময় আক্রান্ত দেশগুলো থেকে ফিরে আসা প্রবাসীদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে আক্রান্ত অঞ্চলের তালিকা তৈরি জরুরি। করোনা টেস্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় কিটসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ ও তার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হতে হবে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোকে। মাস্ক, সাবান, স্যানিটাইজারের জোগান নিশ্চিত রাখতে হবে। কিট তৈরির কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে দ্রুত খালাস ও ট্যাক্স মওকুফের ব্যবস্থা গ্রহণ ফলপ্রসূ হবে। ভারতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক রাজ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশ লঙ্ঘনে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরাও এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারি। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ করা চাই। করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদেরও দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা চাই। ডাক্তার-নার্স, চিকিৎসা কর্মীসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপদ পোশাক ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here