করোনা ভাইরাসের মৃদু এবং ব্যতিক্রমধর্মী উপসর্গগুলোর ব্যাপারে সতর্ক হোন।

1
397

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
আমরা প্রায় সবাই জানি যে করোনার মূল লক্ষণগুলো হলো জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। আমরা ধরে নিয়েছি করোনা মানে অনেক জ্বর থাকবে, কাশি থাকবে, শ্বাসকষ্ট থাকবে। রোগীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটবে। কিন্তু একজন করোনা আক্রান্ত রোগীর সব সময় এই উপসর্গ যে থাকবে তা কিন্তু নয়। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে যে আমাদের দেশে বেশিরভাগ করোনা আক্রান্ত রোগীর উপসর্গগুলো মৃদু। যার ফলে অনেক রোগী নিজে বুঝতেও পারছে না যে সে করোনায় আক্রান্ত। ফলে সে আইসোলেশনে থাকছে না। যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং নিজের অজান্তেই সমাজে করোনা সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এর ফলে আমাদের দেশে প্রায় প্রতিদিনই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড করছে। তিন মাস আগে মাত্র তিনজন আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার মাধ্যমে যে করোনা সংক্রমণ আমাদের দেশে শুরু হয়েছিল, তার সংখ্যা আজ প্রায় পৌনে এক লাখ এবং দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা এখন প্রায় তিন হাজারের উপরে। টেস্টের অপ্রতুলতার কারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া এই হিসাবের চেয়ে বাস্তবে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যে অনেক বেশি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আজ কথা বলব করোনার মৃদু এবং ব্যতিক্রমধর্মী কিছু উপসর্গ নিয়ে, যেন এই উপসর্গগুলোর ব্যাপারে আপনারা সতর্ক থাকেন। নিজে সতর্ক থাকলে আপনি যথাসময়ে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবেন এবং আপনার মাধ্যমে এই রোগ যেন অন্য কারও দেহে না ছড়ায় সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে পারবেন।

করোনার মৃদু এবং ব্যতিক্রমধর্মী উপসর্গগুলো কী?
> করোনায় হালকা জ্বর থাকতে পারে। এই জ্বর ২-৩ দিন পর ভালো হয়ে যেতে পারে। এমনকি জ্বর নাও থাকতে পারে; শুধু জ্বর জ্বর ভাব থাকতে পারে।
আপনার হয়তো শরীর ম্যজ ম্যজ করছে। কিন্তু থার্মোমিটারে তাপমাত্রা মেপে দেখলেন তা ৯৯ ডিগ্রির নীচে। সুতরাং জ্বর না থাকলেই যে এটা করোনা নয় বিষয়টা কিন্তু এ রকম নয়। আবার আপনি এই হালকা জ্বরের বিষয়টি হয়তো সাধারণ কোনো ভাইরাল জ্বর ভেবে উপেক্ষা করে গেলেন। অথবা ভাবছেন যে দুদিন আগেই বৃষ্টিতে ভিজে ছিলেন এ কারণে জ্বর এসেছে। কিন্তু এটা হয়তো ছিল আপনার করোনা রোগ। সুতরাং, এই সময় যদি জ্বর, কাশি, গলা ব্যাথা থাকে, তাহলে বিষয়টি মোটেও হালকাভাবে নিবেন না। বরং, এই অসুস্থতার কারণ হিসেবে সবার আগে করোনার বিষয়টি বিবেচনায় রাখুন।
> অসুস্থতার শুরুর দিকে মাথা ব্যথা, পিঠ ব্যাথা বা হাত-পা ব্যথা থাকতে পারে।
> করোনায় ভীষণ শারীরিক দুর্বলতা থাকতে পারে। দৈনন্দিন সাধারণ কাজ কর্ম যেমন টয়লেটে যাওয়া বা জামা কাপড় পাল্টাতে গিয়েও যদি আপনি হঠাৎ খুব ক্লান্ত অনুভব করেন তাহলে এই উপসর্গটির ব্যাপারে সাবধান হোন। এমনকি ভীষণ শারীরিক দুর্বলতার এই উপসর্গটি হতে পারে করোনা রোগের প্রথম লক্ষণ।
> করোনা আক্রান্ত অনেক রোগীর সাময়িকভাবে ঘ্রাণ শক্তি লোপ পেতে পারে। ঘ্রাণশক্তি এতটাই লোপ পেতে পারে যে দেখা গেলো আপনার নাকের সামনে পারফিউম স্প্রে করলেও আপনি কোনো ঘ্রাণ পাচ্ছেন না এবং স্রেফ এই ঘ্রাণ শক্তি লোপ পাওয়া সমস্যাটিও হতে পারে করোনার প্রথম উপসর্গ।
> করোনায় খাবারের রুচি কমে যেতে পারে বা একেবারেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যা খাবার খাচ্ছেন তার কোনো স্বাদ পাচ্ছেন না অথবা যা খাচ্ছেন সবকিছুই তিতা লাগছে। এটাও হতে পারে করোনার অন্যতম উপসর্গ।
> জ্বর-কাশির সাথে পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, বমি হওয়া বা বমি বমি ভাব হওয়া ইত্যাদি উপসর্গও ইদানিং প্রায়ই দেখা যাচ্ছে।
> চোখের প্রদাহ বা কনজাঙ্কটিভাইটিস করোনার অন্যতম একটি উপসর্গ হিসেবে ইদানিং বিবেচিত হচ্ছে।
এই উপসর্গগুলোর সবকিছু সবার মধ্যে যে থাকবে তা কিন্তু নয়। কারো একটি বা দুইটি উপসর্গ থাকতে পারে। সুতরাং, বর্তমানে আপনার যদি কখনো জ্বর, কাশি গলা ব্যথা হয় এবং তা যে মাত্রায়ই থাকুক না কেন অথবা
উল্লিখিত এই উপসর্গগুলো যদি আপনার মাঝে পরিলক্ষিত হয় তাহলে অবহেলা না করে অনতিবিলম্বে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এর জন্য আপনার পরিচিত কোনো চিকিৎসককে ফোন করে পরামর্শ নিতে পারেন অথবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হটলাইন নাম্বারে যোগাযোগ করে এই অসুস্থতার বিষয়ে করণীয় কি তা জেনে নিতে পারেন।

করোনা রোগের উপসর্গ দেখা দিলে কী করবেন?
> করোনার উপসর্গ যদি আপনার মাঝে পরিলক্ষিত হয় তাহলে অযথা ভয় পাবেন না। কারণ, শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ রোগী বাসায় চিকিৎসা নিয়েই সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। মনে রাখবেন যে করোনার এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা বের হয়নি। করোনার চিকিৎসা মূলত উপসর্গের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। যেমন: জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খাবেন। শুকনা কাশি থাকলে ফেক্সোফেনাডিন জাতীয় ঔষধ খেতে পারেন। গরম পানির ভাপ নিতে পারেন। আদা-লেবু চা খেতে পারেন। দিনে কয়েকবার কুসুম গরম পানি দিয়ে গলা গরগরা করবেন। তাছাড়া ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি খেতে পারেন।
> সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন।
> ইদানিং টেস্ট করা বেশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। টেস্ট এর জন্য সিরিয়াল দিয়ে রাখুন। সেই হিসেবে সুযোগ পেলে টেস্ট করাবেন। তবে এই টেস্ট-এর আশায় বসে না থেকে একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ নিন।
> করোনার অন্যান্য উপসর্গের চেয়ে আপনার যদি কেবল জ্বর এবং শরীর ব্যথার উপসর্গ বেশি থাকে তাহলে ডেঙ্গু জ্বরের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ডেঙ্গু জ্বরের পরীক্ষা করে রাখুন।
> নিজেকে আইসোলেশনে রাখুন অর্থাৎ অন্যান্যদের কাছ থেকে নিজেকে আলাদা রাখুন। চিকিৎসা সেবা বা টেস্ট করানোর প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে যাবেন না। বাহিরে গেলে অবশ্যই মাস্ক পরিধান করুন । অন্যান্যদের কাছ থেকে ন্যূনতম ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে চলুন। মনে রাখবেন, দুই-তিন দিন পরে জ্বর ভালো হয়ে গেলও যে আপনি রোগ থেকে মুক্ত হয়ে গেলেন বিষয়টি কিন্তু তা নয়। কারণ এই করোনা ভাইরাস মানুষের শরীরে দুই-তিন সপ্তাহের বেশিও থাকতে পারে। তাই কমপক্ষে ১৪ দিন নিজেকে আইসোলেশনে রাখুন।
> বাড়িতে একটি পালস-অক্সিমিটার কিনে রাখতে পারেন। এই পালস-অক্সিমিটার আপনাকে গাইড করবে যে আপনি কখন হাসপাতালে যাবেন। আমাদের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা সাধারণত ৯৫% এর বেশি থাকে। যদি কখনো লক্ষ্য করেন যে এই মাত্রা ৯২-৯৩% এ নেমে এসেছে সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করুন বা রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করুন।
পরিশেষে সকলের সুস্থতা কামনা করছি এবং করোনা বিহীন দিনের প্রত্যাশায় আজ এখানেই শেষ করছি।

[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here